Author: Rabiul Hasan

  • আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ – পর্ব ২

    আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ – পর্ব ২

    মার্কিন রাজনীতি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য রাজনীতির একটি চিরায়ত সংজ্ঞা বিবেচনা করা যেতে পারে: “কে”, “কখন” এবং “কীভাবে” “কী” পায়। প্রতিটি সমাজে অর্থ, ক্ষমতা এবং মর্যাদার মতো কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো সীমিত। রাজনীতি এই সীমিত সম্পদ বণ্টনের নিয়ম ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, রাজনীতি হলো একটি সমাজের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি বিষয়ের উপর কেন্দ্র করে গঠিত: ধারণা (Ideas), প্রতিষ্ঠান (Institutions), স্বার্থ (Interests), এবং ব্যক্তি (Individuals)।

    প্রথমত, মার্কিন রাজনীতি শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী ধারণার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। “All men are created equal” – এই বিস্ময়কর ধারণাটি দিয়ে দেশটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর পাশাপাশি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সীমিত সরকার, আমেরিকান স্বপ্ন এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস—এই মৌলিক ধারণাগুলো মার্কিন সমাজকে রূপ দিয়েছে। তবে এই ধারণাগুলোর প্রত্যেকটিরই দুটি ভিন্ন দিক রয়েছে এবং এগুলোর সংজ্ঞা ও বাস্তবায়ন নিয়ে ক্রমাগত বিতর্ক বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, গণতন্ত্রের অর্থ “জনগণের শাসন” হলেও, দেশটির প্রতিষ্ঠাতারা সাধারণ মানুষের সরাসরি শাসনের বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। সাংবিধানিক সম্মেলনের প্রথম দিনেই একজন প্রতিনিধি বলেছিলেন, “সরকারের বিষয়ে জনগণের সম্পৃক্ততা যত কম থাকে ততই মঙ্গল।” এই মনোভাবের ফলেই মার্কিন সংবিধানে জনগণের প্রভাব সীমিত করার জন্য ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা এলিট বা অভিজাতদের শাসনকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী গণআন্দোলন, যেমন নাগরিক অধিকার আন্দোলন, এই এলিটতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে দেশটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

    দ্বিতীয়ত, রাজনীতিকে বুঝতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা জানা অপরিহার্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়শই নির্দিষ্ট নেতা বা ব্যক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর বেশি জোর দেন। কংগ্রেস, আদালত, আইনসভা, সরকারি দপ্তর এবং সংবাদমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও কাঠামোর মাধ্যমে রাজনৈতিক কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম রয়েছে, যা কিছু মানুষকে বা গোষ্ঠীকে অন্যদের চেয়ে বেশি সুবিধা দেয়। বিষয়টি একটি সাধারণ উপমা দিয়ে বোঝা যায়: শ্রেণিকক্ষে যে শিক্ষার্থী যুক্তিতে পারদর্শী, সে সুবিধা পায়, কিন্তু বাস্কেটবল কোর্টে যে শিক্ষার্থী শারীরিকভাবে দক্ষ, সুবিধা তার। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ঠিক একইভাবে কাজ করে; তাদের নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দেয় কোন স্বার্থগুলো প্রাধান্য পাবে। তাই যেকোনো রাজনৈতিক ঘটনা বিশ্লেষণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এর পেছনে কোন প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত?

    তৃতীয়ত, স্বার্থ রাজনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা থেকে উদ্ভূত হয়। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো (Interest groups) যেমন পরিবেশবাদী সংগঠন বা বাণিজ্যিক লবি, নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, ‘র‍্যাশনাল চয়েস থিওরি’ বা যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যক্তিরা যেকোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব করে। আবার, রাজনীতিবিদরা প্রায়শই “সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক কল্যাণ” বা জনস্বার্থের কথা বলেন, কিন্তু কোনটি ‘সর্বাধিক কল্যাণ’ তা নির্ধারণ করা নিয়েই বিরোধ তৈরি হয়। আচরণগত বিজ্ঞানীরা আরও দেখিয়েছেন যে, মানুষ সবসময় যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না; প্রায়শই তারা ভুল তথ্যের সম্মুখীন হলেও নিজেদের পূর্বের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকে, যা রাজনৈতিক আচরণকে আরও জটিল করে তোলে।

    চতুর্থত, ব্যক্তি এককভাবে রাজনীতিতে এবং সমাজে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিশালতার মাঝেও একজন সাধারণ মানুষের উদ্যোগ ইতিহাস বদলে দিতে পারে। এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ মার্লা রুজিকা। মাত্র ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ও ইরাকে গিয়ে বেসামরিক মানুষের দুর্দশা দেখে মর্মাহত হন। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি ‘সিভিক’ (CIVIC) নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। পেন্টাগনের প্রাথমিক বিরোধিতা সত্ত্বেও, তার অক্লান্ত প্রচেষ্টা কংগ্রেসের সমর্থন লাভ করে। দুঃখজনকভাবে, এক বোমা হামলায় তিনি নিহত হন, কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি আজও বিশ্বজুড়ে নিরীহ মানুষদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে একজন ব্যক্তিও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মার্লা রুজিকার মতোই, মার্কিন রাজনীতিতে একক উদ্যোগে বিশাল পরিবর্তন এনেছেন এমন আর একজন ব্যক্তির চমৎকার উদাহরণ হলেন রোসা পার্কস (Rosa Parks)।১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর, অ্যালাবামার মন্টগোমারি শহরে, বর্ণবৈষম্য আইন (Jim Crow laws) অনুযায়ী বাসগুলো বিভক্ত ছিল। রোসা পার্কস বাসের “রঙিন” অংশে বসে থাকার সময় চালক তাকে এক শ্বেতাঙ্গ যাত্রীকে তার আসন ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। তিনি এই অন্যায্য নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন।তার এই একক প্রতিবাদী পদক্ষেপের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা পুরো আফ্রিকান-আমেরিকান কমিউনিটিকে আলোড়িত করে এবং এর ফলে ঐতিহাসিক ‘মন্টগোমারি বাস বয়কট’ শুরু হয়। ডক্টর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে এই বয়কট ৩৮১ দিন ধরে চলে এবং এর ফলে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাসে বর্ণবৈষম্যকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।রোসা পার্কসের এই একটি সাহসী পদক্ষেপকে মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের (Civil Rights Movement) অন্যতম প্রধান অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং, তার ব্যক্তিগত সাহসিকতা শুধু একটি শহরের আইন পরিবর্তন করেনি, বরং পুরো দেশে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে নতুন শক্তি জুগিয়েছে এবং মার্কিন রাজনীতি ও সমাজকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।

    পরিশেষে, এই চারটি বিষয়কে সঠিকভাবে বুঝতে হলে এদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন। স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের মতো ধারণাগুলো কেন এত শক্তিশালী? কংগ্রেস বা সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কেন একটি নির্দিষ্ট উপায়ে আচরণ করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্যে। ইতিহাস ছাড়া কোনো ধারণা, প্রতিষ্ঠান বা জাতির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ গতিপথ বোঝা সম্ভব নয়।

  • মিথষ্ক্রিয়া

    মিথষ্ক্রিয়া

    বিপাশা, তোমার একটি বিনিদ্র রাত আমাকে দাও।
    হোকনা একটি রাত গল্পে গল্পে ভোর।
    অথবা, তুমি চাইলে চুক্তি নবায়ন করতে পারি
    তোমার হাজার নির্ঘুম রজনীর..
    আমার সঞ্চয়ে আছে পথের গল্প,
    তোমার নামে লিখে দেবো।
    আজ থেকে শত বছর পরে,
    তুমি সঞ্চয় ভেঙে খেয়ো।

  • দৈনিকের আত্মকথা

    দৈনিকের আত্মকথা

    কালো অক্ষরেরা কথা বলে,
    কখনো অভয়, কখনো ঘাতকের ছলে,
    কখনো সাদা সত্যের বেশে,
    কখনো বা বেদনার নীলে মেশে,
    কখনো হলুদে মোড়া কুটিল ইশারা,
    সত্যেরা পথ খুঁজে দিশেহারা।

    বত্রিশ পৃষ্ঠার এক বিশাল ক্যানভাসে,
    কারো স্বপ্ন, কারো দীর্ঘশ্বাসে,
    সাজানো বাগানের গল্প ফোটে,
    জোড়া খুনের গন্ধে পাঠক ছোটে।
    ভালোবাসা আর মনোবিকলন,
    কখনো ছাপা হয় নীরব কথন।

    শব্দেরা প্রতিদিন লাশ হয় এখানে,
    ধর্ষিত হয়, অথবা হলুদ হয় কোন ইশারায়!
    ভাষা পাল্টায় এখানে আদালতের রায়!

    এখানে প্রথম পাতায় কারো জীবনী,
    রাজনীতিকের জবানবন্দী, অথবা সারমেয় ঘেউ ঘেউ,
    অথবা হত্যাকারীর সাজাপ্রাপ্ত আত্মহত্যাকারী কেউ!
    রাত ঘুম শেষে চাকাপ হাতে কারো মৌনতা।
    এটি একটি দৈনিকের আত্মকথা।

  • এ জার্নি বাই ট্রেন বা ভাগের কবিতা

    এক জানালা, দুই মানুষ, চার চোখ।
    আমরা ভাগাভাগি করে দেখছিলাম ট্রেনের জানালায়;
    কখনোবা সে, কখনো আমি,
    কিন্তু দুজন একসাথে কখনোই নয়।

    হয়তো হতে পারতো,
    একসাথে শেষ রাতে রুপালী চাঁদের
    তবক মোড়ানো পাহাড় দেখলাম,
    আবার সোনালী তবক দেওয়া সকাল,
    অথবা তুলোয় ফোলানো মেঘ, কিন্তু না!

    আমরা ভাগাভাগিতে ব্যস্ত থাকলাম,
    আর পরস্পরের চোখে উদাসীনতা;
    হয়তো তাকে বলা যেতো,
    এসো গান শুনি ভাগাভাগি করে;
    অথবা প্রশ্ন করতে পারতাম,
    আপনি কখনো কবিতা লিখেছেন, অথবা আপনাকে নিয়ে কেউ?

    এসব ভাবতে ভাবতে গন্তব্য চলে এলো,
    এবং সে বললো, “আপনার যাত্রা শুভ হোক।”
    প্রত্যুত্তরে হেসে বললাম, “আপনারও।”

    অথচ কল্পনায় আমরা একসাথে মেঘ বিছিয়ে,
    আলোর তবক দেওয়া আইসক্রীম খাচ্ছিলাম।

  • আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ –  পর্ব ১

    আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ – পর্ব ১

    প্রতি চার বছর অন্তর, ক্যাপিটল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের নতুন নেতা যখন শপথবাক্য পাঠ করেন, তখন তা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা থাকে না, বরং জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকে চলে আসা গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যটি বিশ্বের প্রাচীনতম গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের এক শক্তিশালী বার্তা দেয়। মঞ্চে আইনসভা (কংগ্রেস) এবং বিচার বিভাগের (সুপ্রিম কোর্ট) উপস্থিতি এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করে যে, এখানকার শাসনব্যবস্থা কোনো একক ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। “শাসিতের সম্মতিতেই সরকার তার ন্যায্য ক্ষমতা লাভ করে”—স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের এই বাণীটিই হলো এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

    কিন্তু এই আদর্শ চিত্রের গভীরে তাকালেই চোখে পড়ে নানা জটিলতা ও বৈপরীত্য, যা প্রশ্ন তোলে—দেশ আসলে কারা চালায়? আমেরিকার ইতিহাসে পাঁচবার এমন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন যিনি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বা ‘পপুলার ভোট’ পাননি, যা ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ নামক এক পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার ফল। আবার, এমনও দেখা গেছে যে, দেশের জনগণ কংগ্রেসের উপর সার্বিকভাবে ক্ষুব্ধ এবং তাদের সমর্থনের হার তলানিতে, অথচ নির্বাচনে সেই কংগ্রেসেরই প্রায় সকল সদস্য বিপুল ভোটে নিজ নিজ এলাকা থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। শাসনব্যবস্থার চূড়ায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতি, যারা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নন এবং আজীবন মেয়াদের জন্য নিযুক্ত হন। এই মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি দেশের কোটি কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তৈরি করা আইন বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যা গণতন্ত্রের মূল ধারণার সাথেই এক ধরনের সংঘাত তৈরি করে।

    এই প্রশ্নটি নতুন নয়। ১৭৮৭ সালে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি কেমন সরকার দিয়েছেন, তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, “একটি প্রজাতন্ত্র—যদি তোমরা তা রক্ষা করতে পারো।” এই “রক্ষা করার” চ্যালেঞ্জটিই আমেরিকার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। সংবিধানের প্রথম শব্দ “WE THE PEOPLE” শুনতে যতটা শক্তিশালী, তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল ততটাই সীমাবদ্ধ। শুরুতে এই ‘জনগণ’-এর মধ্যে নারী, দাস, দরিদ্র মানুষ বা আমেরিকার আদিবাসীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দেশটির ইতিহাস হলো সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শকে সকলের জন্য বাস্তবায়িত করার এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস।

    আজকের দিনেও সাধারণ মানুষের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয় সমাজের গভীরে প্রোথিত। ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ার দেশের সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আঁতাত, অর্থাৎ “মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স” নিয়ে সতর্ক করেছিলেন, যা নিজেদের স্বার্থে দেশের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারত। বর্তমানে এই ভয় নতুন রূপ নিয়েছে। একদিকে যেমন অনেকে মনে করেন যে, দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি তাদের বিপুল অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনই অন্যদিকে অনেকের বিশ্বাস যে, অনির্বাচিত সরকারি আমলা এবং প্রভাবশালী গণমাধ্যমই আসল ক্ষমতার অধিকারী। অর্থাৎ, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে একটি সাধারণ অনুভূতি হলো—জনগণের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছে।

    তাহলে ক্ষমতা আসলে কোথায় কেন্দ্রীভূত? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এর উত্তরে কয়েকটি তত্ত্বের কথা বলেন। ‘অভিজাত তত্ত্বে’র মতে, ক্ষমতা আদতে অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতেই কুক্ষিগত, এবং মুলত তারা ঘুরেফিরে দেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেখানে দিনদিন আমেরিকায় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে এবং সাধারণ জনগণের হাতে আসলে ক্ষমতার কিছুই থাকছে না, কিন্তু সে ধণীক শ্রেণী আরো ধণী এবং ক্ষমতাবান হচ্ছে। ‘আমলাতান্ত্রিক তত্ত্বে’র দাবি, আসল ক্ষমতা লুকিয়ে আছে সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো লক্ষ লক্ষ কর্মকর্তার হাতে, যারা নীরবে দেশের নীতি নির্ধারণ করেন। এর বিপরীতে, ‘বহুত্ববাদী তত্ত্ব’ বলে যে ক্ষমতা কোনো একক গোষ্ঠীর হাতে নেই, বরং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর (যেমন পরিবেশবাদী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমিতি বা শ্রমিক ইউনিয়ন) মধ্যে ক্ষমতার লড়াই ও দর-কষাকষির মাধ্যমেই সরকারি নীতি নির্ধারিত হয়, যা বহু মানুষকে নিজেদের কথা বলার সুযোগ করে দেয়।

    তবে এর বাইরেও ক্ষমতার একটি উৎস রয়েছে, যা প্রায়শই সব হিসাবকে ওলটপালট করে দেয়। সেটি হলো ‘সামাজিক আন্দোলন তত্ত্ব’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকরা যখন কোনো একটি উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠিত হয়ে পথে নামে, তখন তারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার (Black Lives Matter) সামাজিক আন্দোলন ২০১৫ সাল থেকে সক্রিয় থাকলেও, ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর এই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি কোনো একক নেতার দ্বারা পরিচালিত আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল বর্ণবাদ এবং পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন। এর প্রভাবে আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। ফলাফলের দিক থেকে, এই আন্দোলনের চাপে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার করা হয়। যেমন, পুলিশের বিপজ্জনক কৌশল (যেমন শোকহোল্ড) নিষিদ্ধ করা হয় এবং পুলিশের জবাবদিহিতা বাড়াতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এর পাশাপাশি, সমাজের গভীরে থাকা বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয় এবং অনেক বড় বড় কর্পোরেশন তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। এছাড়া এই ঘটনাগুলোই ফ্র্যাঙ্কলিনের সেই সতর্কবাণীকে মনে করিয়ে দেয়—প্রজাতন্ত্র কোনো উপহার নয়, এটি এমন এক অর্জন যা রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি প্রজন্মের জনগণের উপরেই বর্তায়।

  • ভাঙা জানালা –  শেষ পর্ব

    ভাঙা জানালা – শেষ পর্ব

    শৃঙ্খলা রক্ষায় সামাজিক অংশগ্রহণের দ্বিতীয় যে ঐতিহ্যটি রয়েছে, তা হলো “ভিজিলান্টি” বা স্বঘোষিত আইনরক্ষক গোষ্ঠীর। এটি প্রথম ঐতিহ্যের, অর্থাৎ “কমিউনিটি পাহারাদার”-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীল এবং পুরোনো সম্প্রদায়গুলোতে এই ধরনের গোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রায় ছিলই না। এদের মূলত সেইসব সীমান্ত শহরগুলোতে খুঁজে পাওয়া যেত, যেগুলো সরকারি আইন-কানুন পৌঁছানোর আগেই দ্রুত গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি ভিজিলান্টি গোষ্ঠীর কথা জানা যায়। তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তারা আইনকে পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নিত। তারা নিজেরাই পুলিশ, বিচারক, জুরি এবং প্রায়শই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দায়িত্বও পালন করত। যদিও আজকের দিনে নাগরিকরা প্রায়ই ভয় প্রকাশ করে যে পুরোনো শহরগুলো অপরাধের কারণে এক ধরনের “শহুরে সীমান্ত” হয়ে উঠছে, তবুও ভিজিলান্টি আন্দোলন এখন আর তেমন দেখা যায় না। তবে, কিছু কমিউনিটি পাহারাদার গোষ্ঠী এই বিপজ্জনক সীমানার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে এবং ভবিষ্যতে অন্যরাও সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে। এর একটি অস্পষ্ট কিন্তু চিন্তার উদ্রেককারী উদাহরণ নিউ জার্সির বেলভিল শহরের সিলভার লেক এলাকার একটি নাগরিক টহলদারী দলের ঘটনা। দলের একজন নেতা সাংবাদিকদের জানান, “আমরা মূলত বাইরের লোক খুঁজি।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, যদি পাড়ার বাইরের কোনো কিশোর-কিশোরীকে এলাকায় ঘুরতে দেখা যায়, “আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি এখানে কী কাজ।” যদি তারা উত্তর দেয় যে তারা রাস্তার ওপারে মিসেস জোনসের বাড়িতে যাচ্ছে, তাহলে তাদের যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দলটি এরপর তাদের পিছু পিছু গিয়ে নিশ্চিত করে যে তারা আসলেই মিসেস জোনসের বাড়িতে যাচ্ছে কি না। এই আচরণটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার না হলেও, এটি সন্দেহ, জেরা এবং নজরদারির মাধ্যমে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, যা ভিজিলান্টি মানসিকতারই একটি প্রাথমিক রূপ।

    যদিও সাধারণ নাগরিকরা শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক ভূমিকা রাখতে পারে, এটা পরিষ্কার যে এই কাজের আসল চাবিকাঠি পুলিশের হাতেই রয়েছে। এর একাধিক কারণ আছে। প্রথমত, রবার্ট টেইলর হোমস-এর মতো কিছু এলাকা এতটাই অপরাধ আর হতাশায় নিমজ্জিত যে, সেখানকার বাসিন্দাদের পক্ষে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, একজন সাধারণ নাগরিক, এমনকি তিনি যদি কোনো সংগঠিত দলের সদস্যও হন, তার পক্ষে পুলিশের ব্যাজ পরার সাথে যে গভীর দায়িত্ববোধ আসে, তা অনুভব করা প্রায় অসম্ভব। মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, কোনো বিপদে পড়া ব্যক্তিকে সাহায্য করার জন্য সাধারণ মানুষ কেন এগিয়ে আসে না। এর কারণ তাদের “উদাসীনতা” বা “স্বার্থপরতা” নয়, বরং এর কারণ হলো, সেই মুহূর্তে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো জোরালো ভিত্তি তারা খুঁজে পায় না। অদ্ভুতভাবে, যখন চারপাশে অনেক লোক উপস্থিত থাকে, তখন দায়িত্ব এড়ানো আরও সহজ হয়ে যায়, কারণ প্রত্যেকে ভাবে অন্য কেউ হয়তো এগিয়ে আসবে। একে “দায়িত্বের বিভাজন” (diffusion of responsibility) বলা হয়। রাস্তাঘাট বা প্রকাশ্য স্থানে, যেখানে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সবচেয়ে জরুরি, সেখানে সাধারণত অনেক মানুষ থাকে। আর এই ভিড়ের কারণেই কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে পুরো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হয়ে এগিয়ে আসার সম্ভাবনা কমে যায়। এখানেই পুলিশ অফিসারের ইউনিফর্ম একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ওই ইউনিফর্মটি তাকে ভিড়ের মধ্যে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়, যার উপর দায়িত্ব অর্পিত আছে এবং যাকে সাহায্য করতে বললে তিনি তা করতে বাধ্য। এছাড়া, একজন সাধারণ নাগরিকের তুলনায় একজন প্রশিক্ষিত পুলিশ অফিসার অনেক সহজে আবেগবর্জিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। রাস্তার নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কোনটি জরুরি এবং কোনটি কেবল একটি এলাকার জাতিগত অহংকার বা বিশুদ্ধতা রক্ষা করার চেষ্টা—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করার মতো মানসিকতা তাদের থাকার কথা, যা সিলভার লেকের মতো নাগরিক টহলদারদের নাও থাকতে পারে।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমেরিকার পুলিশ বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা বাড়ার বদলে কমছে। অনেক বড় বড় শহরে কর্মরত পুলিশ অফিসারের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই ঘাটতি পূরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে, প্রতিটি পুলিশ বিভাগকে তাদের সীমিত সংখ্যক অফিসারদের অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করতে হচ্ছে। কিছু এলাকা এতটাই অপরাধপ্রবণ এবং সেখানকার বাসিন্দারা এতটাই হতাশ যে, সেখানে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার মতো সাধারণ পুলিশি ব্যবস্থা একেবারেই অকার্যকর। সীমিত সম্পদ দিয়ে পুলিশ সেখানে বড়জোর একের পর এক আসতে থাকা জরুরি কলের ভিত্তিতে সাড়া দিতে পারে। আবার, অন্য কিছু এলাকা এতটাই শান্ত ও স্থিতিশীল যে সেখানে বাড়তি টহলদারির কোনো প্রয়োজনই নেই। তাই, সফল কৌশল হলো সেইসব এলাকাকে চিহ্নিত করা, যেগুলো “টিপিং পয়েন্ট” বা পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। অর্থাৎ, এমন এলাকা যেখানে জনশৃঙ্খলা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে কিন্তু পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি; যেখানে মানুষ ভয়ে ভয়ে রাস্তাঘাট ব্যবহার করে; যেখানে যেকোনো মুহূর্তে একটি জানালা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং যদি পুরো এলাকাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হয়, তবে সেই প্রথম ভাঙা জানালাটি খুব দ্রুত মেরামত করা আবশ্যক। এখানেই একজন পুলিশ অফিসারের উপস্থিতি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

    দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ পুলিশ বিভাগের কাছে এই ধরনের “টিপিং পয়েন্ট” এলাকাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার এবং সেখানে বিচক্ষণতার সাথে অফিসার নিয়োগ করার মতো কোনো পদ্ধতিগত ব্যবস্থা নেই। পুলিশ মোতায়েন করা হয় মূলত দুটি ভুল পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে। প্রথমত, অপরাধের হারের ভিত্তিতে, যার ফলে একটি মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়: যেসব এলাকা সবেমাত্র খারাপ হতে শুরু করেছে, সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে সেইসব এলাকায় পাঠানো হয়, যেখানে অপরাধ পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অর্থাৎ, যেখানে রোগ প্রতিরোধ করা যেত, সেখান থেকে ডাক্তার সরিয়ে মুমূর্ষু রোগীর কাছে পাঠানো হয়। দ্বিতীয়ত, পরিষেবা দেওয়ার জন্য আসা কলের সংখ্যার ভিত্তিতে পুলিশ পাঠানো হয়। কিন্তু এই পদ্ধতিও ত্রুটিপূর্ণ, কারণ বেশিরভাগ সাধারণ নাগরিক কেবল ভয় পেলে, বিরক্ত হলে বা কোনো ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দেখলে পুলিশকে ফোন করে না; তারা ফোন করে যখন কোনো বড় অপরাধ ঘটে যায়। তাই বিচক্ষণতার সাথে টহল ব্যবস্থা সাজাতে হলে, পুলিশ বিভাগকে পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে সরাসরি এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে হবে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের বুঝতে হবে, ঠিক কোন এলাকায় একজন অতিরিক্ত পুলিশ অফিসারের উপস্থিতি মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারবে।

    পুলিশের এই সীমিত সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার একটি নতুন উপায় কিছু সরকারি আবাসন প্রকল্পে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এইসব প্রকল্পে ভাড়াটিয়াদের সংগঠনগুলো তাদের ভবনে টহলের জন্য ডিউটির বাইরে থাকা পুলিশ অফিসারদের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ করছে। এই ব্যবস্থার একাধিক সুবিধা রয়েছে। জনপ্রতি খরচের পরিমাণ খুব বেশি নয়, ডিউটির বাইরে থাকা অফিসারটি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, বাসিন্দারা নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করে। এই ব্যবস্থাটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী বা প্রাইভেট গার্ড নিয়োগের চেয়ে সম্ভবত অনেক বেশি সফল। নিউয়ার্কের পরীক্ষাটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন এটি বেশি কার্যকর। একজন প্রাইভেট গার্ড তার উপস্থিতির মাধ্যমে হয়তো অপরাধীদের ভয় দেখাতে পারে বা বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করছে না, অথচ সমাজের বা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনকে (যেমন, ভবনের ভেতরে গোলমাল করা বা বহিরাগতদের নিয়ে এসে উৎপাত করা) তোয়াক্কা করছে না, তাকে বাধা দেওয়ার বা নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভাবনা তার কম। কারণ তার সেই আইনি বা মানসিক অধিকার নেই। অন্যদিকে, একজন শপথবদ্ধ অফিসার—অর্থাৎ একজন “আসল পুলিশ”—হওয়ার কারণে তার মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস, কর্তব্যের অনুভূতি এবং ক্ষমতার একটি আবহ বা “aura of authority” থাকে, যা এই ধরনের কঠিন কিন্তু জরুরি কাজগুলো করার জন্য অপরিহার্য।

    এর পাশাপাশি আরও কিছু ছোট কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, টহলরত অফিসারদের তাদের কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার সময় বাস বা সাবওয়ের মতো গণপরিবহন ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। গণপরিবহনে থাকাকালীন তারা এর নিয়মকানুন, যেমন—ধূমপান, মদ্যপান বা বিশৃঙ্খল আচরণ করা—ইত্যাদি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। এই নিয়ম প্রয়োগ করার জন্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার মতো জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই; কেবল তাকে বাস বা ট্রেন থেকে নামিয়ে দিলেই যথেষ্ট। কারণ এই ধরনের ছোটখাটো অপরাধ নিয়ে পুলিশ স্টেশন বা আদালত মাথা ঘামাতে চায় না। সম্ভবত, বাসে এইভাবে এলোমেলো কিন্তু নিরলসভাবে নিয়মকানুন প্রয়োগ করতে থাকলে গণপরিবহনেও এমন একটি সভ্য ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা আমরা এখন বিমানে ভ্রমণ করার সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নিই।

    তবে, এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলো মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের সবাইকে—পুলিশ, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ—এটা বুঝতে হবে যে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের একটি অত্যন্ত জরুরি এবং মৌলিক কাজ। পুলিশ বিভাগ জানে যে এটি তাদের দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি। তারা এটাও সঠিকভাবে বিশ্বাস করে যে, অপরাধ তদন্ত করা বা জরুরি কলে সাড়া দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাদ দিয়ে কেবল শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা— অর্থাৎ সমাজ এবং নীতিনির্ধারকরা—গুরুতর এবং সহিংস অপরাধ নিয়ে এত বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছি যে, আমরা হয়তো পরোক্ষভাবে পুলিশকে এটা ভাবতে উৎসাহিত করেছি যে, তাদের কাজের বিচার হবে কেবল বড় বড় অপরাধী ধরার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। পুলিশ প্রশাসকরা তাদের লোকবল সেইসব এলাকায় পাঠান যেখানে অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি (যদিও সেই এলাকাগুলো অপরাধমূলক আক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ না-ও হতে পারে)। তারা পুলিশি প্রশিক্ষণে আইন এবং অপরাধী ধরার কৌশলের উপর জোর দেন, কিন্তু রাস্তার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কীভাবে শান্তিপূর্ণ রাখা যায়, সেই ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণে জোর দেন না। এবং তারা প্রায়শই “নিরীহ” বলে বিবেচিত আচরণগুলোকে (যেমন, প্রকাশ্য মদ্যপান, রাস্তায় পতিতাবৃত্তি, বা অশ্লীল পোস্টার প্রদর্শন) অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে খুব দ্রুত সায় দেন। অথচ তারা ভুলে যান যে, এই “নিরীহ” আচরণগুলোই একটি পেশাদার চোরের দলের চেয়েও অনেক দ্রুত একটি সুন্দর সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিতে পারে।

    সর্বোপরি, আমাদের সেই পুরোনো কিন্তু এখন প্রায় পরিত্যক্ত একটি ধারণায় ফিরে আসতে হবে: পুলিশের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিবিশেষকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়কে রক্ষা করা। আমাদের বর্তমান অপরাধের পরিসংখ্যান বা সমীক্ষাগুলো কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির হিসাব রাখে—যেমন, কার গাড়ি চুরি হলো বা কার বাড়ি ডাকাতি হলো। কিন্তু এগুলো কখনোই সাম্প্রদায়িক ক্ষতি পরিমাপ করে না—যেমন, একটি পার্ক শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে যাওয়া বা প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়া। ঠিক যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন কেবল রোগের চিকিৎসার পরিবর্তে সামগ্রিক স্বাস্থ্য গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছে, যা একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা; তেমনি পুলিশ এবং আমাদের সমাজের বাকি সবারও এটা স্বীকার করা উচিত যে, রোগের চিকিৎসার মতো করে অপরাধ দমনের পাশাপাশি, ভাঙা জানালাবিহীন একটি সুস্থ ও অক্ষত সম্প্রদায় বজায় রাখা—যা একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল—কতটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৮

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৮

    অনেক সময় দেখা যায়, ছোট শহরের বাসিন্দারা বড় শহরের একই রকম এলাকার বাসিন্দাদের তুলনায় তাদের পুলিশের কাজে বেশি সন্তুষ্ট থাকে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে তাদের মানসিকতা। তারা হয়তো ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার চেয়েও একটি গোষ্ঠীর বা সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির গবেষক এলিনর অস্ট্রোম এবং তার সহকর্মীরা এই বিষয়টি নিয়ে একটি চমৎকার গবেষণা করেন। তারা ইলিনয় রাজ্যের দুটি দরিদ্র ও সম্পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত ছোট শহর (ফিনিক্স এবং ইস্ট শিকাগো হাইটস)-এর সাথে শিকাগো শহরের তিনটি একই ধরনের কৃষ্ণাঙ্গ পাড়ার তুলনা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধের হার কিংবা পুলিশ ও নাগরিকদের মধ্যেকার সাধারণ সম্পর্ক— উভয় ক্ষেত্রেই ছোট শহর এবং বড় শহরের পাড়াগুলোর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। কিন্তু মানসিকতার দিক থেকে একটি বড় পার্থক্য ছিল। ছোট শহরের বাসিন্দারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলত যে, তারা অপরাধের ভয়ে নিজেদের ঘরে গুটিয়ে রাখেন না। তারা পুলিশকে অনেক বেশি ক্ষমতা দিতেও রাজি ছিল; তারা মনে করত, এলাকার সমস্যা সমাধানের জন্য পুলিশের “যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আছে”। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা বিশ্বাস করত যে পুলিশ “সাধারণ নাগরিকদের ভালো-মন্দের দিকে খেয়াল রাখে”।

    এর থেকে গবেষকরা একটি সিদ্ধান্তে আসেন: সম্ভবত ছোট শহরগুলোর বাসিন্দা এবং পুলিশ—উভয়েই নিজেদেরকে একটি দলের সদস্য হিসেবে দেখে। তাদের লক্ষ্য অভিন্ন: একসঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের এলাকার জীবনযাত্রার একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা। অন্যদিকে, বড় শহরের বাসিন্দারা পুলিশকে একটি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে দেখে। তাদের সম্পর্কটা অনেকটা লেনদেনমূলক: আমার সমস্যা হয়েছে, আমি ফোন করে পুলিশকে জানিয়েছি, পুলিশ এসে পরিষেবা দিয়ে চলে গেছে। এখানে কোনো সমষ্টিগত অনুভূতির স্থান নেই।

    যদি উপরের কথাগুলো সত্যি হয়, তাহলে একজন বিচক্ষণ পুলিশ প্রধান তার সীমিত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে কী কৌশল অবলম্বন করবেন? এর কোনো সহজ বা একমাত্র উত্তর নেই।

    • প্রথম উত্তর: সত্যি কথা হলো, কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না কোনটি সেরা উপায়। তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো। যেমন, নিউয়ার্কে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই বিভিন্ন পাড়ায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে দেখা উচিত যে কোনটি কোথায় সবচেয়ে ভালো কাজ করে। কারণ সব এলাকার চরিত্র এক নয়।
    • দ্বিতীয় উত্তর: এটিও একটি সতর্কতামূলক জবাব। পাড়া-মহল্লায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনই হয় না। পুলিশের অংশগ্রহণ খুব সামান্য রেখে, বা ক্ষেত্রবিশেষে একেবারেই না রেখেও অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। যেমন, একটি ব্যস্ত শপিং সেন্টার যেখানে সারাদিন প্রচুর মানুষ যাতায়াত করে, অথবা একটি শান্ত ও গোছানো শহরতলি—এই জায়গাগুলোতে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির প্রায় কোনো দরকারই পড়ে না। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই, ভালো ও আইন মেনে চলা মানুষের সংখ্যা এতটাই বেশি থাকে যে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা এমনিতেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একেই “অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ” (informal social control) বলা হয়, যেখানে সমাজ নিজেই নিজেকে ঠিক রাখে।

    এমনকি যেসব এলাকায় অপরাধমূলক কার্যকলাপের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানেও অনেক সময় পুলিশের বড় ধরনের ভূমিকা ছাড়াই শুধুমাত্র নাগরিকদের উদ্যোগই যথেষ্ট হতে পারে।

    • আলোচনা ও বোঝাপড়া: যেমন, ধরা যাক পাড়ার একটি নির্দিষ্ট মোড়ে কিছু কিশোর-তরুণ আড্ডা দিতে ভালোবাসে, কিন্তু এলাকার প্রাপ্তবয়স্কদের তাতে অসুবিধা হয়। এক্ষেত্রে পুলিশ ডাকার পরিবর্তে, উভয় পক্ষ আলোচনায় বসতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে তারা কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে পারে—যেমন, কতজন একসঙ্গে আড্ডা দিতে পারবে, ঠিক কোন জায়গায় তারা বসবে এবং কতক্ষণ থাকবে। একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বোঝাপড়া প্রায়শই পুলিশি হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়।
    • নাগরিকদের টহল (Citizen Patrols): যখন আলোচনা বা বোঝাপড়া সম্ভব হয় না, বা নিয়ম তৈরি হলেও তা কেউ মানে না, তখন নাগরিকরাই নিজেদের উদ্যোগে টহলদারির ব্যবস্থা করতে পারে। এই ধারণাটি মোটেও নতুন নয়। আমেরিকায় এর দুটি পুরনো ঐতিহ্য রয়েছে। একটি হলো “কমিউনিটির পাহারাদার” (community watchmen)-এর ধারণা, যা আমেরিকার প্রথম বসতি স্থাপনের সময় থেকেই চলে আসছে। উনিশ শতক পর্যন্ত পুলিশ নয়, বরং এলাকার স্বেচ্ছাসেবকরাই পালা করে নিজেদের এলাকা পাহারা দিত। তাদের মূল কাজ ছিল শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কিন্তু তারা কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নিত না। অর্থাৎ, তারা কাউকে শাস্তি দিত না বা গায়ে হাত তুলত না। তাদের উপস্থিতিই অপরাধীদের মনে ভয় জাগাতো এবং কোনো গোলমাল শুরু হলে তারা বাকিদের সতর্ক করে দিত।
      • আধুনিক উদাহরণ: বর্তমানেও এই ধরনের শত শত উদ্যোগ সারা দেশে চালু আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো “গার্জিয়ান অ্যাঞ্জেলস” নামের একটি দল। এই দলের সদস্যরা হলো নিরস্ত্র তরুণ-তরুণী, যারা একটি বিশেষ ধরনের টুপি ও টি-শার্ট পরে। নিউ ইয়র্ক শহরের পাতাল রেলে (subway) টহল দেওয়ার মাধ্যমে তারা প্রথম পরিচিতি লাভ করে। এখন আমেরিকার ৩০টিরও বেশি শহরে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।

    দুর্ভাগ্যবশত, এই ধরনের নাগরিক উদ্যোগগুলো আদতে অপরাধ কমাতে কতটা সক্ষম, সে বিষয়ে আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা পরিসংখ্যান খুব কম। কিন্তু একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: অপরাধের সংখ্যা কমুক বা না কমুক, এই দলগুলোর উপস্থিতি এলাকার সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আস্থা ও সাহস জোগায়। মানুষ নিজেদের নিরাপদ বোধ করে। আর এই অনুভূতিটাই একটি এলাকার শৃঙ্খলা এবং সভ্য পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ, অপরাধ কমানোর পাশাপাশি “ভয় কমানো” ও একটি বড় সাফল্য।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৭

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৭

    সমাজের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আমাদের সামনে আসে, কিন্তু এর কোনো সম্পূর্ণ সন্তোষজনক উত্তর আমরা দিতে পারি না। সত্যি বলতে, এই জটিলতার কোনো নিখুঁত সমাধান আছে কি না, সে বিষয়ে আমরা নিজেরাই নিশ্চিত নই। আমরা কেবল একটি বিষয়ে আশা রাখতে পারি: যদি পুলিশ সদস্যদের সঠিকভাবে নির্বাচন করা হয়, তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং তাদের কাজের যথাযথ তত্ত্বাবধান করা হয়, তবেই হয়তো তাদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ধারণা গেঁথে দেওয়া সম্ভব হবে। সেই ধারণাটি হলো তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার (অর্থাৎ, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা) একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। সেই সীমাটি সহজ ভাষায় বললে এইরকম— পুলিশের মূল কাজ হলো সমাজে মানুষের আচরণকে নিয়মকানুনের মধ্যে রাখতে সাহায্য করা, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জাতিগত বা বর্ণগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করা নয়। অর্থাৎ, কে কোন এলাকায় থাকবে বা থাকবে না, তা তাদের বর্ণ বা জাতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা পুলিশের কাজ হতে পারে না।

    এই বিষয়টি বোঝার জন্য আসুন আমরা শিকাগোর ‘রবার্ট টেইলর হোমস’-এর উদাহরণটি বিবেচনা করি। এটি আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম সরকারি আবাসন প্রকল্প। প্রায় ২০,০০০ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এখানে বসবাস করেন এবং প্রকল্পটি সাউথ স্টেট স্ট্রিট বরাবর প্রায় ৯২ একর বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর নামকরণ করা হয়েছিল ১৯৪০-এর দশকে শিকাগো হাউজিং অথরিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এক বিশিষ্ট কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির নামে। কিন্তু ১৯৬২ সালে এই প্রকল্পটি চালু হওয়ার কিছুদিন পরেই, এখানকার বাসিন্দা এবং পুলিশের মধ্যেকার সম্পর্ক মারাত্মকভাবে খারাপ হতে শুরু করে।অবিশ্বাসের এক চক্র তৈরি হয়। বাসিন্দারা মনে করত, পুলিশ তাদের প্রতি সহানুভূতিহীন এবং প্রায়শই নৃশংস আচরণ করে। অন্যদিকে, পুলিশ অভিযোগ করত যে, কোনো উস্কানি ছাড়াই বাসিন্দারা তাদের ওপর হামলা চালায়। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফল হয়েছিল ভয়াবহ। শিকাগোর কিছু পুলিশ অফিসার এমন সময়ের কথা বলেন, যখন তারা ওই আবাসন প্রকল্পে দিনের বেলাতেও প্রবেশ করতে ভয় পেতেন। স্বাভাবিকভাবেই, যেখানে আইন প্রয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকে না, সেখানে অপরাধের হার আকাশ ছুঁয়েছিল।

    তবে আজ সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। পুলিশ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেকার সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে উভয় পক্ষই শিক্ষা নিয়েছে। বাসিন্দারা বুঝেছে যে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের প্রয়োজন, এবং পুলিশও উপলব্ধি করেছে যে কমিউনিটির আস্থা ছাড়া কার্যকরভাবে কাজ করা অসম্ভব। এই পরিবর্তনের একটি চমৎকার উদাহরণ সম্প্রতি দেখা গেছে: একটি ছেলে এক মহিলার পার্স চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় বেশ কয়েকজন তরুণ ঘটনাটি দেখতে পায়। অতীতে হয়তো তারা চুপ থাকত, কিন্তু এবার তারা স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে চোরের পরিচয় এবং সে কোথায় থাকে, তা পুলিশকে জানিয়ে দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা এই কাজটি প্রকাশ্যে, তাদের বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সামনেই করেছিল, যা প্রমাণ করে যে পুলিশকে সাহায্য করাটা এখন আর লজ্জার বা ভয়ের বিষয় নয়।

    কিন্তু এত কিছুর পরেও কিছু গভীর সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উঠতি সন্ত্রাসী গ্যাং বা দলগুলোর উপস্থিতি। এই দলগুলো বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত ভয় দেখায়, আতঙ্কিত করে রাখে এবং অল্পবয়সী ছেলেদের নিজেদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করে। স্বাভাবিকভাবেই, সাধারণ মানুষ আশা করে যে পুলিশ এই বিষয়ে “কিছু একটা করুক” এবং তাদের জীবনকে নিরাপদ করুক। পুলিশও এই গ্যাংগুলোর দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর।

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুলিশ ঠিক কী করতে পারে? সমস্যাটা যতটা সহজ মনে হয়, ততটা নয়। যদি গ্যাং-এর কোনো সদস্য সরাসরি কোনো আইন ভাঙে— যেমন চুরি, ডাকাতি বা হামলা করে— তবে পুলিশ তাকে সহজেই গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু একটি গ্যাং আইন না ভেঙেই একটি কমিউনিটির জন্য আতঙ্কের কারণ হতে পারে। তারা কোনো অপরাধ না করেও দলবদ্ধভাবে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, সদস্য সংগ্রহ করতে পারে এবং নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে পারে। গ্যাং-সম্পর্কিত যেসব অপরাধ ঘটে, তার অতি সামান্য একটি অংশই প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হয়। সুতরাং, যদি আইনসম্মত গ্রেপ্তারই পুলিশের একমাত্র হাতিয়ার হয়, তবে বাসিন্দাদের মনের ভয় কখনোই দূর হবে না। এর ফলে পুলিশ সদস্যরা শীঘ্রই নিজেদের অসহায় বোধ করতে শুরু করবে, কারণ তারা দেখবে যে তাদের প্রধান অস্ত্র (গ্রেপ্তার) এই সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ। আর যখন বাসিন্দারা দেখবে যে তাদের ভয়ের কারণ সেই গ্যাংগুলো আগের মতোই রয়ে গেছে, তখন তাদের মধ্যে আবার সেই পুরনো বিশ্বাস ফিরে আসবে যে পুলিশ আসলে “কিছুই করে না”।

    এই পরিস্থিতিতে বাস্তবে পুলিশ যা করে তা হলো, একটি আইন-বহির্ভূত পন্থা অবলম্বন করা। তারা পরিচিত গ্যাং সদস্যদের ধরে প্রকল্প এলাকা থেকে জোর করে তাড়িয়ে দেয়। এক পুলিশ অফিসারের ভাষায় বলতে গেলে, “আমরা ওদের এলাকাছাড়া করি।” আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রকল্পের বাসিন্দারা পুলিশের এই বেআইনি কাজের কথা জানে এবং মনে মনে তা অনুমোদনও করে। কারণ তাদের কাছে আইনের জটিল প্রক্রিয়ার চেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এইভাবেই পুলিশ ও নাগরিকদের মধ্যে একটি নীরব বা অলিখিত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। এই বোঝাপড়াটি এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে আরও শক্তিশালী হয় যে, ওই এলাকায় ক্ষমতার দুটি কেন্দ্র রয়েছে— একপাশে পুলিশ, অন্যপাশে গ্যাং। আর এই লড়াইয়ে গ্যাং-কে কোনোভাবেই জিততে দেওয়া যাবে না।

    অবশ্যই, পুলিশের এই ধরনের কার্যকলাপ আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (due process) বা ন্যায্য বিচারের ধারণার সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। কারণ আইন অনুযায়ী, প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কোথাও থেকে বিতাড়িত করা যায় না। রবার্ট টেইলর হোমস-এর এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, যেহেতু প্রকল্পের বাসিন্দা এবং গ্যাং সদস্য উভয়ই কৃষ্ণাঙ্গ, তাই বর্ণ বা জাতিগত পক্ষপাতের বিষয়টি বড় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্নও হতে পারত। একবার ভাবুন, যদি একটি শ্বেতাঙ্গ-অধ্যুষিত আবাসন প্রকল্পে একটি কৃষ্ণাঙ্গ গ্যাং-এর উপদ্রব হতো, অথবা এর উল্টোটা ঘটত, তখন পুলিশ যদি কোনো একটি পক্ষ নিয়ে এভাবে আইন হাতে তুলে নিত, তবে আমরা নিশ্চয়ই বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগে উদ্বিগ্ন হতাম।

    কিন্তু মূল সমস্যাটা একই থেকে যায়: প্রকাশ্য স্থানে মানুষের ভয় কমানোর জন্য পুলিশ কীভাবে একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বা অনানুষ্ঠানবিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে (informal social control) শক্তিশালী করতে পারে? শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে অপরাধী ধরা এই সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। কারণ একটি গ্যাং কোনো সদস্যকে শারীরিকভাবে আঘাত না করেও, কেবল ভয় দেখিয়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে বা পথচারীদের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করে একটি গোটা কমিউনিটিকে মানসিকভাবে দুর্বল এবং এমনকি ধ্বংস করে দিতে পারে।

    এই ধরনের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে আমাদের প্রায়শই অসুবিধা হয়। এর কারণ শুধু এই নয় যে এখানকার নৈতিক এবং আইনি প্রশ্নগুলো খুব জটিল, বরং আসল কারণ হলো আমরা আইনকে মূলত একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমাদের আইনি ব্যবস্থা এভাবে কাজ করে: আইন ‘আমার’ অধিকারকে সংজ্ঞায়িত করে, ‘তার’ অন্যায় আচরণকে শাস্তি দেয়, এবং ‘ওই নির্দিষ্ট’ ক্ষতির কারণে একজন পুলিশ অফিসার আইন প্রয়োগ করে। এভাবে চিন্তা করার সময় আমরা অবচেতনভাবে ধরে নিই যে, যা একজন ব্যক্তির জন্য ভালো, তা সমগ্র কমিউনিটির জন্যই ভালো হবে। আমরা ভাবি, যে আচরণ একজনের ক্ষেত্রে ঘটলে তেমন কিছু যায় আসে না, তা যদি অনেকের ক্ষেত্রেও ঘটে, তাহলেও হয়তো তেমন কোনো বড় সমস্যা হবে না।

    সাধারণ পরিস্থিতিতে এই ধারণাগুলো হয়তো ঠিক। কিন্তু যখন কোনো আচরণ (যেমন, রাস্তার মোড়ে দলবেঁধে আড্ডা দেওয়া) একজন ব্যক্তির কাছে সহনীয় বা নির্দোষ মনে হলেও বহু মানুষের কাছে অসহনীয় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তখন সেই বহু মানুষের প্রতিক্রিয়া— যেমন ভয় পাওয়া, সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের না হওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বা শেষ পর্যন্ত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া— একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এই সম্মিলিত ভয়ের ফলে এলাকার সামাজিক জীবন ভেঙে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকের জন্য পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি খারাপ করে তোলে; এমনকি সেই ব্যক্তির জন্যও, যিনি প্রথমে এই বিষয়টিকে গুরুত্বহীন বলে নিজেকে উদাসীন দাবি করেছিলেন। কারণ একটি ভেঙে পড়া সমাজে কেউই নিরাপদ থাকতে পারে না।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৬

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৬

    শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, পুলিশের ‘প্রহরী’ হিসেবে ভূমিকাটি যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হলো কি না, সেই নিরিখে বিচার করা হতো না; বরং বিচার করা হতো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কি না, তার ভিত্তিতে। সেই লক্ষ্য ছিল শৃঙ্খলা, যা আসলে একটি অস্পষ্ট ধারণা, কিন্তু কোনো একটি এলাকার মানুষ সেই পরিস্থিতি দেখলে ঠিকই চিনতে পারত। এই শৃঙ্খলা আনার জন্য সেইসব উপায়ই ব্যবহার করা হতো, যা সেই এলাকার লোকেরাই ব্যবহার করত, যদি তাদের মধ্যে যথেষ্ট সংকল্প, সাহস এবং কর্তৃত্ব থাকত। এর বিপরীতে, অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রেপ্তার করা ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্যের একটি উপায়, নিজে কোনো লক্ষ্য ছিল না; আইন প্রয়োগের চূড়ান্ত ফল হিসেবে আশা করা হতো একটি বিচার বিভাগীয় রায়। প্রথম থেকেই, পুলিশের কাছে আশা করা হতো যে তারা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলবে, যদিও সেই নিয়মগুলো কতটা কঠোর হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ভিন্নমত ছিল। এটা সবসময়ই বোঝা যেত যে, অপরাধী গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়ার সাথে ব্যক্তিগত অধিকার জড়িত, যা লঙ্ঘন করা অগ্রহণযোগ্য। কারণ তার মানে দাঁড়াবে, নিয়ম লঙ্ঘনকারী পুলিশ কর্মকর্তা নিজেই বিচারক এবং জুরির ভূমিকা পালন করছেন—যা তার কাজ নয়। দোষী বা নির্দোষ নির্ধারিত হবে বিশেষ পদ্ধতির অধীনে, সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়মকানুন অনুসারে।

    সাধারণত, এলাকার শৃঙ্খলা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিরা কোনো বিচারক বা জুরির সামনে আসেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে বেশিরভাগ মামলাই রাস্তার মধ্যেই অনানুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যায়, বরং এর আরেকটি কারণ হলো, বিশৃঙ্খলা নিয়ে তর্ক নিষ্পত্তির জন্য কোনো সার্বজনিন বা সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়ম নেই, এবং তাই একজন বিচারক এক্ষেত্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তার চেয়ে বেশি জ্ঞানী বা কার্যকর নাও হতে পারেন। অনেক রাজ্যে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত, এবং কিছু জায়গায় আজও, পুলিশ “সন্দেহভাজন ব্যক্তি” বা “ভবঘুরে” বা “প্রকাশ্যে মদ্যপান” করার মতো অভিযোগে গ্রেপ্তার করে—এই অভিযোগগুলোর আইনি তাৎপর্য প্রায় নেই বললেই চলে। এই অভিযোগগুলো থাকার কারণ এটা নয় যে সমাজ চায় বিচারকরা ভবঘুরে বা মাতালদের শাস্তি দিক, বরং সমাজ চায় যে, রাস্তায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনানুষ্ঠানিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, একজন কর্মকর্তার হাতে যেন এলাকা থেকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার আইনি হাতিয়ার থাকে।

    যখনই আমরা পুলিশের সব কাজকে বিশেষ পদ্ধতির অধীনে সার্বজনিন নিয়ম প্রয়োগের বিষয় হিসেবে ভাবতে শুরু করি, তখনই আমরা অনিবার্যভাবে প্রশ্ন তুলি যে, একজন ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ বলতে কী বোঝায় এবং কেন আমরা ভবঘুরেবৃত্তি বা মদ্যপানকে “অপরাধ” হিসেবে গণ্য করব। মানুষের সাথে যেন ন্যায্য আচরণ করা হয়, তা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী এবং প্রশংসনীয় আকাঙ্ক্ষা আমাদের চিন্তায় ফেলে দেয় যে, পুলিশকে কোনো অস্পষ্ট বা সংকীর্ণ স্থানীয় মানদণ্ডের ভিত্তিতে মাতাল এলাকাছাড়া করার অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে কি না। আবার, এক ধরনের ক্রমবর্ধমান উপযোগবাদ—যা ততটা প্রশংসনীয় নয়—আমাদের মনে এই সন্দেহ তৈরি করে যে, যে আচরণ অন্য কারো ‘ক্ষতি’ করে না, তাকে আদৌ বেআইনি করা উচিত কি না। আর এভাবেই, আমরা যারা পুলিশের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করি, তাদের অনেকেই পুলিশকে সেই কাজটি করতে দিতে দ্বিধা বোধ করি, যা প্রতিটি এলাকা প্রবলভাবে চায় যে তারা করুক, কিন্তু যা পুলিশ কেবল তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতেই করতে পারে।

    এই ধরনের সম্মানহানিকর আচরণ, যা ‘কারো ক্ষতি করে না’, তাকে “অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার” ইচ্ছা—এবং এর মাধ্যমে এলাকার শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশের হাতে থাকা চূড়ান্ত ব্যবস্থাটি সরিয়ে ফেলার প্রবণতা—আমাদের মতে, একটি ভুল। একজন মাতাল বা একজন ভবঘুরেকে গ্রেপ্তার করা, যিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করেননি, তা অন্যায্য বলে মনে হয়, এবং এক অর্থে তা ঠিকও। কিন্তু কুড়িজন মাতাল বা একশোজন ভবঘুরের ব্যাপারে কিছুই না করাটা হয়তো পুরো একটি কমিউনিটিকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। একটি নির্দিষ্ট নিয়ম যা একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে যৌক্তিক মনে হয়, সেটি যখন একটি সার্বজনিন নিয়মে পরিণত হয় এবং সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। এটি অর্থহীন কারণ এটি একটি ভাঙা জানালা ফেলে রাখলে যে হাজারটা জানালা ভাঙা হয়, সেই সংযোগটি বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়। অবশ্যই, মাতাল বা মানসিকভাবে অসুস্থদের নিয়ে সমস্যাগুলোর সমাধানে পুলিশ ছাড়া অন্য সংস্থাও কাজ করতে পারত, কিন্তু বেশিরভাগ কমিউনিটিতে—বিশেষ করে যেখানে “ডি-ইনস্টিটিউশনালাইজেশন” (সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রাখার বদলে কমিউনিটিতে রেখে চিকিৎসা) আন্দোলন শক্তিশালী হয়েছে—তারা তা করে না।

    ন্যায্যতার প্রশ্নটি আরও গুরুতর। আমরা হয়তো একমত হতে পারি যে, কিছু আচরণের কারণে একজন ব্যক্তি অন্যের চেয়ে বেশি অবাঞ্ছিত হয়ে ওঠে, কিন্তু আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব যে বয়স বা গায়ের রঙ বা জাতীয় উৎস বা নিরীহ হাবভাব অবাঞ্ছিতদের থেকে অন্যদের আলাদা করার ভিত্তি হয়ে উঠবে না? সংক্ষেপে, আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব যে, পুলিশ এলাকার মানুষের গোঁড়ামি বা বিদ্বেষের প্রতিনিধি হয়ে উঠবে না?

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৫

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৫

    কিছু পুলিশ প্রশাসক এটা স্বীকার করেন যে এমনটা ঘটে, কিন্তু তাদের যুক্তি হলো, গাড়িতে টহল দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারাও পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তাদের মতোই কার্যকরভাবে পরিস্থিতি সামলাতে পারেন।কিন্তু অবজার্বেশন অনুযায়ী আমরা এতটা নিশ্চিত নই। তত্ত্ব অনুযায়ী, পুলিশের গাড়িতে থাকা একজন কর্মকর্তা পায়ে হাঁটা কর্মকর্তার মতোই সবকিছু দেখতে পারেন; তিনি পায়ে হাঁটা অফিসারের মতোই অনেকের সাথে কথা বলতে পারেন। কিন্তু গাড়ির কারণে পুলিশ-নাগরিক যোগাযোগের বাস্তবতা অনেকটাই বদলে যায়। পায়ে হাঁটা একজন কর্মকর্তা নিজেকে রাস্তার লোকজন থেকে আলাদা করতে পারেন না; যদি কেউ তার কাছে আসে, তবে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য কেবল তার ইউনিফর্ম এবং ব্যক্তিত্বই ভরসা। আর সামনে কী ঘটতে চলেছে, সে সম্পর্কে তিনি কখনোই নিশ্চিত হতে পারেন না—হতে পারে কেউ পথের ঠিকানা জানতে চাইছে, কেউ সাহায্যের জন্য অনুরোধ করছে, কেউ রেগে গিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছে, কেউ ঠাট্টা করছে, কেউ বা বিভ্রান্ত হয়ে বিড়বিড় করছে, আবার কেউ হয়তো ভয় দেখাচ্ছে।

     গাড়িতে থাকলে একজন কর্মকর্তা সাধারণত জানালা নামিয়ে রাস্তার লোকজনের দিকে তাকিয়ে তাদের সাথে কথা বলেন। গাড়ির দরজা এবং জানালা কাছে আসা নাগরিককে একটা দূরত্বের মধ্যে রাখে; এগুলো এক ধরনের বাধা। কিছু কর্মকর্তা, হয়তো অবচেতনভাবেই, এই বাধার সুযোগ নেন এবং গাড়িতে থাকলে এমন আচরণ করেন যা তারা পায়ে হেঁটে থাকলে করতেন না। আমরা এটা বহুবার দেখেছি।

    একটা ঘটনার কথা বলতে পারি। একদিন একটি পুলিশের গাড়ি একটি মোড়ে এসে থামে যেখানে কিছু কিশোর আড্ডা দিচ্ছিল। গাড়ির জানালা নামানো হয়। কর্মকর্তা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারাও পাল্টা তাকায়। কর্মকর্তা তাদের একজনকে বলেন, “এদিকে আয়।” সে তার বন্ধুদের দিকে একটা স্বাভাবিক ভাব দেখিয়ে এমনভাবে হেলেদুলে এগিয়ে আসে যেন সে বোঝাতে চায় যে কর্তৃপক্ষকে সে পাত্তা দেয় না।

    “তোর নাম কী?”

    “চাক।”

    “পুরো নাম?”

    “চাক জোনস।”

    “কী করছিস, চাক?”

    “কিছু না।”

    “তোর কি পি.ও. [প্যারোল অফিসার] আছে?”

    “না।”

    “ঠিক তো?”

    “হ্যাঁ।”

    “ঝামেলা থেকে দূরে থাকিস, চাকি।”

    এর মধ্যেই, অন্য ছেলেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি আর কথা চালাচালি করে, সম্ভবত কর্মকর্তাকে নিয়েই। কর্মকর্তা আরও কড়া চোখে তাকান। কী বলা হচ্ছে তা তিনি ঠিক বুঝতে পারেন না, আবার তাদের সাথে যোগ দিয়ে রাস্তার চলতি রসিকতায় নিজের দক্ষতা দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করতে পারেন না যে তাকে দমানো যাবে না। এই পুরো প্রক্রিয়ায়, কর্মকর্তা প্রায় কিছুই জানতে পারেন না, আর ছেলেরা ধরে নেয় যে এই কর্মকর্তা একটা বিচ্ছিন্ন শক্তি যাকে সহজেই উপেক্ষা করা যায়, এমনকি ঠাট্টাও করা যায়।

    আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, বেশিরভাগ নাগরিকই একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে ভালোবাসেন। এতে তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, গল্প করার একটা বিষয় খুঁজে পান, এবং কর্তৃপক্ষকে তাদের উদ্বেগের কথা জানানোর সুযোগ পান (যার মাধ্যমে তারা সমস্যাটি নিয়ে ‘কিছু একটা করেছেন’—এই ধরনের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি পান)। পায়ে হাঁটা একজন মানুষের কাছে আপনি গাড়িতে থাকা মানুষের চেয়ে সহজে যেতে পারেন এবং তার সাথে স্বচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেন। তাছাড়া, আপনি যদি কোনো কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগত আলাপের জন্য একপাশে ডেকে নেন, তবে আপনার পরিচয় গোপন রাখাও সহজ হয়। ধরুন, আপনি খবর দিতে চান যে কে হাতব্যাগ চুরি করছে, বা কে আপনাকে একটি চোরাই টিভি কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। শহরের ভেতরের এলাকাগুলোতে, অপরাধী সম্ভবত কাছাকাছিই থাকে। পুলিশের একটি চিহ্নিত গাড়ির কাছে হেঁটে গিয়ে জানালার ভেতরে ঝুঁকে কথা বলা মানেই আপনি যে একজন “ইনফর্মার”, তা সবাইকে দেখিয়ে দেওয়া।

    শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকার মূল কথা হলো, একটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করা। পুলিশ, বিপুল সম্পদ খরচ না করে, সেই অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বিকল্প হতে পারে না। অন্যদিকে, সেই স্বাভাবিক শক্তিগুলোকে সমর্থন করতে হলে পুলিশকে অবশ্যই তাদের সাথে মানিয়ে চলতে হবে। আর সমস্যাটা ঠিক এখানেই।

    রাস্তায় পুলিশের কার্যকলাপ কি রাষ্ট্রের নিয়মের পরিবর্তে এলাকার সামাজিক রীতি বা মানদণ্ড দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত? গত দুই দশকে, পুলিশের ভূমিকা শৃঙ্খলা-রক্ষা থেকে আইন-প্রয়োগে বদলে যাওয়ায়, তারা ক্রমশ আইনি বিধিনিষেধের আওতায় চলে এসেছে। গণমাধ্যমের অভিযোগ, আদালতের রায় এবং বিভাগীয় আদেশের ফলে এই নিয়মগুলো কার্যকর হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, পুলিশের শৃঙ্খলা-রক্ষার কাজগুলো এখন সেইসব নিয়ম দিয়ে চালানো হচ্ছে, যা মূলত সন্দেহভাজন অপরাধীদের সাথে পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আমরা মনে করি, এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন ঘটনা।