Category: Food for thought

  • সোনায় সর্বনাশ

    আমাদের এই ‘সোনার বাংলা’য় সোনা ফলুক আর না ফলুক, আলমারির লকারে সোনা থাকাটা কিন্তু চাই-ই চাই। মতিঝিলের যে কেরানি ভদ্রলোকটি সারাজীবন লোকাল বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে অফিস করলেন, কিংবা পুরান ঢাকার যে ব্যবসায়ীটি ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গদিতে বসে দিন পার করলেন—দিনশেষে তাঁদের উভয়েরই জীবনের একমাত্র মহৎ উদ্দেশ্য হলো মেয়ের বিয়ের জন্য অন্তত বিশ ভরি সোনা জমানো। ব্যাপারটা কী জানেন? আমাদের দেশে সোনা জিনিসটা ঠিক অলংকার নয়, ওটা হলো মধ্যবিত্তের ‘লাইফ জ্যাকেট’। গুলশানের কোনো কমিউনিটি সেন্টারে নববধূর গাভর্তি গয়না দেখে আত্মীয়স্বজনরা যতটা না তার রূপের প্রশংসা করেন, তার চেয়ে ঢের বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন—যাক বাবা, মেয়েটার ভবিষ্যৎ একেবারে ‘নিশ্ছিদ্র’ হলো! অর্থনীতির বাঘা বাঘা পণ্ডিতরা যাকে বলেন ‘ডেড ক্যাপিটাল’ বা মরা পুঁজি, আমাদের খালাম্মা-চাচিদের কাছে সেটাই হলো একমাত্র ‘জীবন্ত বিমা’। সোজা কথায়, আমরা সোনা কিনি সাজতে নয়, আমরা সোনা কিনি বাঁচতে।

    গয়না কেনার সময় প্যারিসের কোনো মাদাম আর আমাদের ঢাকার ভাবিদের মাথার ভেতরের ক্যালকুলেটরটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা নিয়মে চলে। একজন পশ্চিমা নারী যখন জুয়েলারি শপে যান, তিনি ভাবেন—”এই নেকলেসটা কি আমার ইভিনিং গাউনের সাথে মানাবে? ডিজাইনটা কি যথেষ্ট ইউনিক?” তাঁদের কাছে গয়না হলো ফ্যাশন, অনেকটা ড্রয়িংরুমের শৌখিন ল্যাম্পশেডের মতো—দেখতে সুন্দর, কিন্তু বিপদে ওটা দিয়ে পেট ভরবে না। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁদের আসল লক্ষ্মী তো বাঁধা আছে ব্যাংকে, বিমায় আর শেয়ার বাজারে। কিন্তু আমাদের মায়েরা? তাঁরা গয়না কেনার সময় ডিজাইনের দিকে তাকান আড়চোখে, আর আসল নজরটা থাকে ওজনের কাঁটায় আর হলমার্কের সিলমোহরে। কেনার মুহূর্তেই তাঁদের মাথায় ঘুরপাক খায়—”ধরা যাক কালই যদি জামাইটা বখাটেগিরি করে তাড়িয়ে দেয় কিংবা ব্যবসা লাটে ওঠে, তবে এটা বেচে কত পাওয়া যাবে?” খাদহীন একুশ ক্যারেট সোনার প্রতি আমাদের এই যে নাড়ির টান, তা প্রমাণ করে যে আমরা গয়নাকে গয়না ভাবি না, ভাবি ‘পোর্টেবল এটিএম বুথ’—যা শাড়ির আঁচলে বেঁধে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেখানে খুশি নিয়ে যাওয়া যায়।

    কিন্তু বাঙালির এই হাড়কাঁপানো নিরাপত্তাহীনতা এল কোত্থেকে? এর শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের একটু টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে যেতে হবে সাড়ে তিনশো বছর আগে, সোজা মোগল সুবেদারদের আমলে। বিনয় ঘোষের ‘বাদশাহী আমল’ বইটিতে ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের আমাদের এই গোপন অসুখটার নাড়ি টিপে ধরেছেন। বার্নিয়ের সাহেব মোগল ভারতে এসে তো থ! দেখলেন, এ দেশে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ বা প্রাইভেট প্রপার্টি বলে কিচ্ছুটি নেই। যা আছে সব সম্রাটের বা সুবেদারের। আজ আপনি জমিদার, কাল সুবেদার চোখ রাঙালে আপনি পথের ভিখারি। স্থাবর সম্পত্তি বলে কিছু নেই, সবই ‘অস্থাবর’।

    বার্নিয়ের লিখছেন, এই যে আজ আছি কাল নেই—এই ভয় থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষরা একটা অদ্ভুত ফন্দি আঁটল। দালান-কোঠা তো আর পকেটে করে পালানো যায় না, আর মগ জলদস্যু কিংবা মোগল পেয়াদা যেকোনো সময় তা কেড়ে নিতে পারে। তাই বুদ্ধিমান বাঙালি তার সব ধন-সম্পত্তি গলিয়ে সোনা বানিয়ে ফেলল। তারপর সেই সোনা মাটির হাঁড়িতে করে পুঁতে রাখল, নয়তো গয়না বানিয়ে বাড়ির মেয়েদের গায়ে চড়িয়ে দিল। যাতে যুদ্ধ বাধুক বা মহামারি আসুক—গয়নাটুকু নিয়ে সোজা দৌড় দেওয়া যায়। বিনয় ঘোষের মতে, আমাদের এই সোনাপ্রীতি কোনো বিলাসিতা নয় মশাই, এ হলো ইতিহাসের এক মজ্জাগত ভয় থেকে জন্মানো আত্মরক্ষার ঢাল।

    মজার ব্যাপার হলো, সেই শায়েস্তা খাঁ-ও নেই, মগ দস্যুও নেই; এখন আমাদের ব্যাংক আছে, শেয়ার বাজার আছে—তবু সেই ভয়টা আমাদের জিন থেকে যায়নি। মোগল আমলে এই অভ্যাসের ফলে বাংলা হয়েছিল ‘সোনার চোরাবালি’ বা ‘Sink of Gold’। সারা দুনিয়ার সোনা এ দেশে ঢুকত বটে, মসলিন বিক্রি করে আমরা সোনা আনতাম, কিন্তু তা আর বের হতো না। টাকাটা বাজারে না খেটে সিন্দুকবন্দি হয়ে থাকত বলে এ দেশে শিল্পবিপ্লব হলো না, হলো শুধু তাঁতি আর কারিগর। আজও আমরা সেই একই তিমিরে। হাজার হাজার কোটি টাকা আমরা আলমারিতে ফেলে রেখেছি ‘নিরাপত্তা’র নামে। অথচ এই টাকাটা যদি গাজীপুর বা সাভারের কোনো কারখানায় খাটত, তবে হয়তো আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকরির জন্য মামা-চাচা ধরতে হতো না।

    ‘সোনায় সর্বনাশ’ কথাটা শুনতে কানে লাগলেও, ওটাই খাঁটি সত্য। সোনা জমিয়ে আমরা নিজেদের বড়লোক ভাবি বটে, কিন্তু আদতে আমরা হচ্ছি সেই কৃপণ যে টাকার ওপর শুয়ে থেকেও না খেয়ে মরে। বিনয় ঘোষ আর বার্নিয়েরের চশমা দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বাঙালি নারীর ওই গয়নার বাক্সটা আসলে সৌন্দর্যের আধার নয়, ওটা হলো আমাদের কয়েক শতাব্দীর অবিশ্বাসের এক করুণ দলিল। সোনাকে যতদিন আমরা ‘গয়না’ না ভেবে ‘বিমা’ ভাবব, ততদিন আমরা সত্যিকারের ধনী হতে পারব না। এখন সময় এসেছে সোনাকে গলায় না ঝুলিয়ে, পুঁজিকে বাজারে খাটানোর—তবেই যদি আমাদের ‘সোনার বাংলা’র কপালটা সত্যি সত্যি একটু খোলে!

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ২৫ শে নভেম্বর, ২০২৫ ইং

  • আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ –  পর্ব ১

    আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ – পর্ব ১

    প্রতি চার বছর অন্তর, ক্যাপিটল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের নতুন নেতা যখন শপথবাক্য পাঠ করেন, তখন তা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা থাকে না, বরং জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকে চলে আসা গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যটি বিশ্বের প্রাচীনতম গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের এক শক্তিশালী বার্তা দেয়। মঞ্চে আইনসভা (কংগ্রেস) এবং বিচার বিভাগের (সুপ্রিম কোর্ট) উপস্থিতি এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করে যে, এখানকার শাসনব্যবস্থা কোনো একক ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। “শাসিতের সম্মতিতেই সরকার তার ন্যায্য ক্ষমতা লাভ করে”—স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের এই বাণীটিই হলো এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

    কিন্তু এই আদর্শ চিত্রের গভীরে তাকালেই চোখে পড়ে নানা জটিলতা ও বৈপরীত্য, যা প্রশ্ন তোলে—দেশ আসলে কারা চালায়? আমেরিকার ইতিহাসে পাঁচবার এমন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন যিনি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বা ‘পপুলার ভোট’ পাননি, যা ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ নামক এক পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার ফল। আবার, এমনও দেখা গেছে যে, দেশের জনগণ কংগ্রেসের উপর সার্বিকভাবে ক্ষুব্ধ এবং তাদের সমর্থনের হার তলানিতে, অথচ নির্বাচনে সেই কংগ্রেসেরই প্রায় সকল সদস্য বিপুল ভোটে নিজ নিজ এলাকা থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। শাসনব্যবস্থার চূড়ায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতি, যারা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নন এবং আজীবন মেয়াদের জন্য নিযুক্ত হন। এই মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি দেশের কোটি কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তৈরি করা আইন বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যা গণতন্ত্রের মূল ধারণার সাথেই এক ধরনের সংঘাত তৈরি করে।

    এই প্রশ্নটি নতুন নয়। ১৭৮৭ সালে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি কেমন সরকার দিয়েছেন, তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, “একটি প্রজাতন্ত্র—যদি তোমরা তা রক্ষা করতে পারো।” এই “রক্ষা করার” চ্যালেঞ্জটিই আমেরিকার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। সংবিধানের প্রথম শব্দ “WE THE PEOPLE” শুনতে যতটা শক্তিশালী, তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল ততটাই সীমাবদ্ধ। শুরুতে এই ‘জনগণ’-এর মধ্যে নারী, দাস, দরিদ্র মানুষ বা আমেরিকার আদিবাসীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দেশটির ইতিহাস হলো সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শকে সকলের জন্য বাস্তবায়িত করার এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস।

    আজকের দিনেও সাধারণ মানুষের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয় সমাজের গভীরে প্রোথিত। ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ার দেশের সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আঁতাত, অর্থাৎ “মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স” নিয়ে সতর্ক করেছিলেন, যা নিজেদের স্বার্থে দেশের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারত। বর্তমানে এই ভয় নতুন রূপ নিয়েছে। একদিকে যেমন অনেকে মনে করেন যে, দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি তাদের বিপুল অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনই অন্যদিকে অনেকের বিশ্বাস যে, অনির্বাচিত সরকারি আমলা এবং প্রভাবশালী গণমাধ্যমই আসল ক্ষমতার অধিকারী। অর্থাৎ, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে একটি সাধারণ অনুভূতি হলো—জনগণের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছে।

    তাহলে ক্ষমতা আসলে কোথায় কেন্দ্রীভূত? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এর উত্তরে কয়েকটি তত্ত্বের কথা বলেন। ‘অভিজাত তত্ত্বে’র মতে, ক্ষমতা আদতে অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতেই কুক্ষিগত, এবং মুলত তারা ঘুরেফিরে দেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেখানে দিনদিন আমেরিকায় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে এবং সাধারণ জনগণের হাতে আসলে ক্ষমতার কিছুই থাকছে না, কিন্তু সে ধণীক শ্রেণী আরো ধণী এবং ক্ষমতাবান হচ্ছে। ‘আমলাতান্ত্রিক তত্ত্বে’র দাবি, আসল ক্ষমতা লুকিয়ে আছে সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো লক্ষ লক্ষ কর্মকর্তার হাতে, যারা নীরবে দেশের নীতি নির্ধারণ করেন। এর বিপরীতে, ‘বহুত্ববাদী তত্ত্ব’ বলে যে ক্ষমতা কোনো একক গোষ্ঠীর হাতে নেই, বরং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর (যেমন পরিবেশবাদী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমিতি বা শ্রমিক ইউনিয়ন) মধ্যে ক্ষমতার লড়াই ও দর-কষাকষির মাধ্যমেই সরকারি নীতি নির্ধারিত হয়, যা বহু মানুষকে নিজেদের কথা বলার সুযোগ করে দেয়।

    তবে এর বাইরেও ক্ষমতার একটি উৎস রয়েছে, যা প্রায়শই সব হিসাবকে ওলটপালট করে দেয়। সেটি হলো ‘সামাজিক আন্দোলন তত্ত্ব’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকরা যখন কোনো একটি উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠিত হয়ে পথে নামে, তখন তারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার (Black Lives Matter) সামাজিক আন্দোলন ২০১৫ সাল থেকে সক্রিয় থাকলেও, ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর এই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি কোনো একক নেতার দ্বারা পরিচালিত আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল বর্ণবাদ এবং পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন। এর প্রভাবে আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। ফলাফলের দিক থেকে, এই আন্দোলনের চাপে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার করা হয়। যেমন, পুলিশের বিপজ্জনক কৌশল (যেমন শোকহোল্ড) নিষিদ্ধ করা হয় এবং পুলিশের জবাবদিহিতা বাড়াতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এর পাশাপাশি, সমাজের গভীরে থাকা বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয় এবং অনেক বড় বড় কর্পোরেশন তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। এছাড়া এই ঘটনাগুলোই ফ্র্যাঙ্কলিনের সেই সতর্কবাণীকে মনে করিয়ে দেয়—প্রজাতন্ত্র কোনো উপহার নয়, এটি এমন এক অর্জন যা রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি প্রজন্মের জনগণের উপরেই বর্তায়।

  • ভাঙা জানালা –  শেষ পর্ব

    ভাঙা জানালা – শেষ পর্ব

    শৃঙ্খলা রক্ষায় সামাজিক অংশগ্রহণের দ্বিতীয় যে ঐতিহ্যটি রয়েছে, তা হলো “ভিজিলান্টি” বা স্বঘোষিত আইনরক্ষক গোষ্ঠীর। এটি প্রথম ঐতিহ্যের, অর্থাৎ “কমিউনিটি পাহারাদার”-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীল এবং পুরোনো সম্প্রদায়গুলোতে এই ধরনের গোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রায় ছিলই না। এদের মূলত সেইসব সীমান্ত শহরগুলোতে খুঁজে পাওয়া যেত, যেগুলো সরকারি আইন-কানুন পৌঁছানোর আগেই দ্রুত গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি ভিজিলান্টি গোষ্ঠীর কথা জানা যায়। তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তারা আইনকে পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নিত। তারা নিজেরাই পুলিশ, বিচারক, জুরি এবং প্রায়শই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দায়িত্বও পালন করত। যদিও আজকের দিনে নাগরিকরা প্রায়ই ভয় প্রকাশ করে যে পুরোনো শহরগুলো অপরাধের কারণে এক ধরনের “শহুরে সীমান্ত” হয়ে উঠছে, তবুও ভিজিলান্টি আন্দোলন এখন আর তেমন দেখা যায় না। তবে, কিছু কমিউনিটি পাহারাদার গোষ্ঠী এই বিপজ্জনক সীমানার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে এবং ভবিষ্যতে অন্যরাও সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে। এর একটি অস্পষ্ট কিন্তু চিন্তার উদ্রেককারী উদাহরণ নিউ জার্সির বেলভিল শহরের সিলভার লেক এলাকার একটি নাগরিক টহলদারী দলের ঘটনা। দলের একজন নেতা সাংবাদিকদের জানান, “আমরা মূলত বাইরের লোক খুঁজি।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, যদি পাড়ার বাইরের কোনো কিশোর-কিশোরীকে এলাকায় ঘুরতে দেখা যায়, “আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি এখানে কী কাজ।” যদি তারা উত্তর দেয় যে তারা রাস্তার ওপারে মিসেস জোনসের বাড়িতে যাচ্ছে, তাহলে তাদের যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দলটি এরপর তাদের পিছু পিছু গিয়ে নিশ্চিত করে যে তারা আসলেই মিসেস জোনসের বাড়িতে যাচ্ছে কি না। এই আচরণটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার না হলেও, এটি সন্দেহ, জেরা এবং নজরদারির মাধ্যমে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, যা ভিজিলান্টি মানসিকতারই একটি প্রাথমিক রূপ।

    যদিও সাধারণ নাগরিকরা শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক ভূমিকা রাখতে পারে, এটা পরিষ্কার যে এই কাজের আসল চাবিকাঠি পুলিশের হাতেই রয়েছে। এর একাধিক কারণ আছে। প্রথমত, রবার্ট টেইলর হোমস-এর মতো কিছু এলাকা এতটাই অপরাধ আর হতাশায় নিমজ্জিত যে, সেখানকার বাসিন্দাদের পক্ষে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, একজন সাধারণ নাগরিক, এমনকি তিনি যদি কোনো সংগঠিত দলের সদস্যও হন, তার পক্ষে পুলিশের ব্যাজ পরার সাথে যে গভীর দায়িত্ববোধ আসে, তা অনুভব করা প্রায় অসম্ভব। মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, কোনো বিপদে পড়া ব্যক্তিকে সাহায্য করার জন্য সাধারণ মানুষ কেন এগিয়ে আসে না। এর কারণ তাদের “উদাসীনতা” বা “স্বার্থপরতা” নয়, বরং এর কারণ হলো, সেই মুহূর্তে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো জোরালো ভিত্তি তারা খুঁজে পায় না। অদ্ভুতভাবে, যখন চারপাশে অনেক লোক উপস্থিত থাকে, তখন দায়িত্ব এড়ানো আরও সহজ হয়ে যায়, কারণ প্রত্যেকে ভাবে অন্য কেউ হয়তো এগিয়ে আসবে। একে “দায়িত্বের বিভাজন” (diffusion of responsibility) বলা হয়। রাস্তাঘাট বা প্রকাশ্য স্থানে, যেখানে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সবচেয়ে জরুরি, সেখানে সাধারণত অনেক মানুষ থাকে। আর এই ভিড়ের কারণেই কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে পুরো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হয়ে এগিয়ে আসার সম্ভাবনা কমে যায়। এখানেই পুলিশ অফিসারের ইউনিফর্ম একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ওই ইউনিফর্মটি তাকে ভিড়ের মধ্যে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়, যার উপর দায়িত্ব অর্পিত আছে এবং যাকে সাহায্য করতে বললে তিনি তা করতে বাধ্য। এছাড়া, একজন সাধারণ নাগরিকের তুলনায় একজন প্রশিক্ষিত পুলিশ অফিসার অনেক সহজে আবেগবর্জিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। রাস্তার নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কোনটি জরুরি এবং কোনটি কেবল একটি এলাকার জাতিগত অহংকার বা বিশুদ্ধতা রক্ষা করার চেষ্টা—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করার মতো মানসিকতা তাদের থাকার কথা, যা সিলভার লেকের মতো নাগরিক টহলদারদের নাও থাকতে পারে।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমেরিকার পুলিশ বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা বাড়ার বদলে কমছে। অনেক বড় বড় শহরে কর্মরত পুলিশ অফিসারের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই ঘাটতি পূরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে, প্রতিটি পুলিশ বিভাগকে তাদের সীমিত সংখ্যক অফিসারদের অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করতে হচ্ছে। কিছু এলাকা এতটাই অপরাধপ্রবণ এবং সেখানকার বাসিন্দারা এতটাই হতাশ যে, সেখানে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার মতো সাধারণ পুলিশি ব্যবস্থা একেবারেই অকার্যকর। সীমিত সম্পদ দিয়ে পুলিশ সেখানে বড়জোর একের পর এক আসতে থাকা জরুরি কলের ভিত্তিতে সাড়া দিতে পারে। আবার, অন্য কিছু এলাকা এতটাই শান্ত ও স্থিতিশীল যে সেখানে বাড়তি টহলদারির কোনো প্রয়োজনই নেই। তাই, সফল কৌশল হলো সেইসব এলাকাকে চিহ্নিত করা, যেগুলো “টিপিং পয়েন্ট” বা পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। অর্থাৎ, এমন এলাকা যেখানে জনশৃঙ্খলা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে কিন্তু পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি; যেখানে মানুষ ভয়ে ভয়ে রাস্তাঘাট ব্যবহার করে; যেখানে যেকোনো মুহূর্তে একটি জানালা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং যদি পুরো এলাকাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হয়, তবে সেই প্রথম ভাঙা জানালাটি খুব দ্রুত মেরামত করা আবশ্যক। এখানেই একজন পুলিশ অফিসারের উপস্থিতি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

    দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ পুলিশ বিভাগের কাছে এই ধরনের “টিপিং পয়েন্ট” এলাকাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার এবং সেখানে বিচক্ষণতার সাথে অফিসার নিয়োগ করার মতো কোনো পদ্ধতিগত ব্যবস্থা নেই। পুলিশ মোতায়েন করা হয় মূলত দুটি ভুল পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে। প্রথমত, অপরাধের হারের ভিত্তিতে, যার ফলে একটি মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়: যেসব এলাকা সবেমাত্র খারাপ হতে শুরু করেছে, সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে সেইসব এলাকায় পাঠানো হয়, যেখানে অপরাধ পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অর্থাৎ, যেখানে রোগ প্রতিরোধ করা যেত, সেখান থেকে ডাক্তার সরিয়ে মুমূর্ষু রোগীর কাছে পাঠানো হয়। দ্বিতীয়ত, পরিষেবা দেওয়ার জন্য আসা কলের সংখ্যার ভিত্তিতে পুলিশ পাঠানো হয়। কিন্তু এই পদ্ধতিও ত্রুটিপূর্ণ, কারণ বেশিরভাগ সাধারণ নাগরিক কেবল ভয় পেলে, বিরক্ত হলে বা কোনো ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দেখলে পুলিশকে ফোন করে না; তারা ফোন করে যখন কোনো বড় অপরাধ ঘটে যায়। তাই বিচক্ষণতার সাথে টহল ব্যবস্থা সাজাতে হলে, পুলিশ বিভাগকে পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে সরাসরি এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে হবে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের বুঝতে হবে, ঠিক কোন এলাকায় একজন অতিরিক্ত পুলিশ অফিসারের উপস্থিতি মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারবে।

    পুলিশের এই সীমিত সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার একটি নতুন উপায় কিছু সরকারি আবাসন প্রকল্পে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এইসব প্রকল্পে ভাড়াটিয়াদের সংগঠনগুলো তাদের ভবনে টহলের জন্য ডিউটির বাইরে থাকা পুলিশ অফিসারদের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ করছে। এই ব্যবস্থার একাধিক সুবিধা রয়েছে। জনপ্রতি খরচের পরিমাণ খুব বেশি নয়, ডিউটির বাইরে থাকা অফিসারটি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, বাসিন্দারা নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করে। এই ব্যবস্থাটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী বা প্রাইভেট গার্ড নিয়োগের চেয়ে সম্ভবত অনেক বেশি সফল। নিউয়ার্কের পরীক্ষাটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন এটি বেশি কার্যকর। একজন প্রাইভেট গার্ড তার উপস্থিতির মাধ্যমে হয়তো অপরাধীদের ভয় দেখাতে পারে বা বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করছে না, অথচ সমাজের বা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনকে (যেমন, ভবনের ভেতরে গোলমাল করা বা বহিরাগতদের নিয়ে এসে উৎপাত করা) তোয়াক্কা করছে না, তাকে বাধা দেওয়ার বা নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভাবনা তার কম। কারণ তার সেই আইনি বা মানসিক অধিকার নেই। অন্যদিকে, একজন শপথবদ্ধ অফিসার—অর্থাৎ একজন “আসল পুলিশ”—হওয়ার কারণে তার মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস, কর্তব্যের অনুভূতি এবং ক্ষমতার একটি আবহ বা “aura of authority” থাকে, যা এই ধরনের কঠিন কিন্তু জরুরি কাজগুলো করার জন্য অপরিহার্য।

    এর পাশাপাশি আরও কিছু ছোট কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, টহলরত অফিসারদের তাদের কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার সময় বাস বা সাবওয়ের মতো গণপরিবহন ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। গণপরিবহনে থাকাকালীন তারা এর নিয়মকানুন, যেমন—ধূমপান, মদ্যপান বা বিশৃঙ্খল আচরণ করা—ইত্যাদি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। এই নিয়ম প্রয়োগ করার জন্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার মতো জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই; কেবল তাকে বাস বা ট্রেন থেকে নামিয়ে দিলেই যথেষ্ট। কারণ এই ধরনের ছোটখাটো অপরাধ নিয়ে পুলিশ স্টেশন বা আদালত মাথা ঘামাতে চায় না। সম্ভবত, বাসে এইভাবে এলোমেলো কিন্তু নিরলসভাবে নিয়মকানুন প্রয়োগ করতে থাকলে গণপরিবহনেও এমন একটি সভ্য ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা আমরা এখন বিমানে ভ্রমণ করার সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নিই।

    তবে, এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলো মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের সবাইকে—পুলিশ, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ—এটা বুঝতে হবে যে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের একটি অত্যন্ত জরুরি এবং মৌলিক কাজ। পুলিশ বিভাগ জানে যে এটি তাদের দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি। তারা এটাও সঠিকভাবে বিশ্বাস করে যে, অপরাধ তদন্ত করা বা জরুরি কলে সাড়া দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাদ দিয়ে কেবল শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা— অর্থাৎ সমাজ এবং নীতিনির্ধারকরা—গুরুতর এবং সহিংস অপরাধ নিয়ে এত বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছি যে, আমরা হয়তো পরোক্ষভাবে পুলিশকে এটা ভাবতে উৎসাহিত করেছি যে, তাদের কাজের বিচার হবে কেবল বড় বড় অপরাধী ধরার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। পুলিশ প্রশাসকরা তাদের লোকবল সেইসব এলাকায় পাঠান যেখানে অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি (যদিও সেই এলাকাগুলো অপরাধমূলক আক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ না-ও হতে পারে)। তারা পুলিশি প্রশিক্ষণে আইন এবং অপরাধী ধরার কৌশলের উপর জোর দেন, কিন্তু রাস্তার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কীভাবে শান্তিপূর্ণ রাখা যায়, সেই ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণে জোর দেন না। এবং তারা প্রায়শই “নিরীহ” বলে বিবেচিত আচরণগুলোকে (যেমন, প্রকাশ্য মদ্যপান, রাস্তায় পতিতাবৃত্তি, বা অশ্লীল পোস্টার প্রদর্শন) অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে খুব দ্রুত সায় দেন। অথচ তারা ভুলে যান যে, এই “নিরীহ” আচরণগুলোই একটি পেশাদার চোরের দলের চেয়েও অনেক দ্রুত একটি সুন্দর সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিতে পারে।

    সর্বোপরি, আমাদের সেই পুরোনো কিন্তু এখন প্রায় পরিত্যক্ত একটি ধারণায় ফিরে আসতে হবে: পুলিশের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিবিশেষকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়কে রক্ষা করা। আমাদের বর্তমান অপরাধের পরিসংখ্যান বা সমীক্ষাগুলো কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির হিসাব রাখে—যেমন, কার গাড়ি চুরি হলো বা কার বাড়ি ডাকাতি হলো। কিন্তু এগুলো কখনোই সাম্প্রদায়িক ক্ষতি পরিমাপ করে না—যেমন, একটি পার্ক শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে যাওয়া বা প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়া। ঠিক যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন কেবল রোগের চিকিৎসার পরিবর্তে সামগ্রিক স্বাস্থ্য গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছে, যা একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা; তেমনি পুলিশ এবং আমাদের সমাজের বাকি সবারও এটা স্বীকার করা উচিত যে, রোগের চিকিৎসার মতো করে অপরাধ দমনের পাশাপাশি, ভাঙা জানালাবিহীন একটি সুস্থ ও অক্ষত সম্প্রদায় বজায় রাখা—যা একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল—কতটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ২

    ভাঙা জানালা – পর্ব ২

    রাস্তার লোকগুলো ছিল মূলত কৃষ্ণাঙ্গ; আর যে অফিসার রাস্তায় টহল দিতেন তিনি ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। মানুষগুলো বিভক্ত ছিল “নিয়মিত” এবং “অপরিচিত”-দের মধ্যে। নিয়মিতদের মধ্যে “ভদ্রস্থ লোক” এবং কিছু মাতাল ও ভবঘুরে উভয়ই ছিল, যারা সবসময় সেখানেই থাকতো কিন্তু নিজেদের “সীমা” জানত। অপরিচিত মানে অপরিচিত, এবং তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হতো, কখনও কখনও উদ্বেগের সাথেও। সেই অফিসার—ধরা যাক তার নাম কেলি—জানতেন কারা নিয়মিত, এবং তারাও তাকে চিনত।

    কেলি তার কাজকে যেভাবে দেখতেন: তা হলো অপরিচিতদের ওপর নজর রাখা এবং এটা নিশ্চিত করা যে অশিষ্ট নিয়মিতরা কিছু অলিখিত কিন্তু ব্যাপকভাবে প্রচলিত নিয়ম মেনে চলে। মাতাল এবং মাদকাসক্তরা বাড়ির সামনের সিঁড়িতে বসতে পারত, কিন্তু শুয়ে যেতে পারবে না। মানুষজন পাশের গলিতে মদ্যপান করতে পারবে, কিন্তু প্রধান মোড়ে নয়। মদের বোতল কাগজের ব্যাগে রাখতে হবে। বাস স্টপে অপেক্ষারত মানুষের সাথে কথা বলা, তাদের বিরক্ত করা বা ভিক্ষা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । যদি কোনো ব্যবসায়ী এবং গ্রাহকের মধ্যে বিবাদ হতো, তবে ব্যবসায়ীকে সঠিক বলে ধরে নেওয়া হতো, বিশেষ করে যদি গ্রাহক অপরিচিত হতেন। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করলে, কেলি তাকে জিজ্ঞেস করতেন তার কোনো আয়ের উৎস আছে কি না এবং সে কী করে; যদি সে সন্তোষজনক উত্তর না দিত, তবে তাকে তার পথে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। যারা এই অলিখিত নিয়ম ভঙ্গ করত, বিশেষ করে যারা বাস স্টপে অপেক্ষারত লোকদের বিরক্ত করত, তাদের ভবঘুরে হিসেবে গ্রেপ্তার করা হতো। গোলমালকারী কিশোর-কিশোরীদের চুপ থাকতে বলা হতো।

    এই নিয়মগুলো রাস্তার “নিয়মিত” লোকদের সহযোগিতায় প্রচলিত এবং প্রয়োগ করা হতো। অন্য কোনো এলাকার নিয়ম হয়তো ভিন্ন হতে পারত, কিন্তু সবাই বুঝত যে এগুলোই এই এলাকার নিয়ম। যদি কেউ সেগুলো লঙ্ঘন করত, তবে নিয়মিতরা কেবল কেলির কাছে সাহায্যের জন্যই যেত না, বরং লঙ্ঘনকারীকে উপহাসও করত। কখনও কখনও কেলি যা করতেন তা “আইন প্রয়োগ” হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে, কিন্তু প্রায়শই তিনি অনানুষ্ঠানিক বা আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ নিতেন, যা এলাকার মানুষজন নিজেদের জন্য যে জনশৃঙ্খলা স্থির করেছিল, তা রক্ষা করতে সাহায্য করত। তার করা কিছু কাজ সম্ভবত আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে টিকত না।

    একজন দৃঢ় সংশয়বাদী হয়তো স্বীকার করবেন যে একজন দক্ষ ফুট-প্যাট্রোল অফিসার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন, কিন্তু তারপরেও জোর দিয়ে বলবেন যে এই ধরনের “শৃঙ্খলার” সাথে সমাজের ভয়ের আসল উৎসের—অর্থাৎ, গুরুতর অপরাধের—তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। একদিক দিয়ে দেখলে, এটা সত্যি। কিন্তু দুটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। প্রথমত, বাইরের পর্যবেক্ষকদের এটা ধরে নেওয়া উচিত নয় যে তারা জানেন, বড় শহরের অনেক এলাকার endemic উদ্বেগের কতটা “আসল” অপরাধের ভয় থেকে আসে এবং কতটা আসে রাস্তার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে, যা বিরক্তিকর ও উদ্বেগজনক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। নিউয়ার্কের মানুষ, তাদের আচরণ এবং সাক্ষাৎকারে দেওয়া মন্তব্য থেকে বিচার করলে, জনশৃঙ্খলাকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করে এবং পুলিশ যখন সেই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে তখন তারা স্বস্তি ও reassurance বোধ করে।

    দ্বিতীয়ত, সামাজিক স্তরে, বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধ সাধারণত এক ধরনের ক্রমবিকাশের ধারায় একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। সমাজ মনোবিজ্ঞানী এবং পুলিশ কর্মকর্তারা প্রায়শই একমত হন যে যদি কোনো বিল্ডিংয়ের একটি জানালা ভেঙে যায় এবং তা মেরামত না করা হয়, তবে শীঘ্রই বাকি সব জানালাও ভেঙে যাবে। এই কথাটি যেমন অভিজাত এলাকার জন্য সত্য, তেমনই জরাজীর্ণ এলাকার জন্যও সত্য। জানালা ভাঙার ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটে না কারণ কিছু এলাকায় জানালা ভাঙার প্রবণতাসম্পন্ন লোক বাস করে আর অন্য এলাকায় জানালা-প্রেমী লোক বাস করে; বরং, একটি ভাঙা এবং অমেরামতকৃত জানালা এই সংকেত দেয় যে “কেউ পরোয়া করে না,” এবং তাই আরও জানালা ভাঙলে কোনো ক্ষতি নেই। (কারণ এটা বরাবরই মজার।)

    স্ট্যানফোর্ডের মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিম্বারডো ১৯৬৯ সালে “ভাঙা জানালা তত্ত্ব” (broken-windows theory) পরীক্ষা করার জন্য কিছু গবেষণার কথা জানান। তিনি নম্বর প্লেট ছাড়া একটি গাড়িকে হুড খোলা অবস্থায় ব্রঙ্কসের একটি রাস্তায় এবং একই ধরনের আরেকটি গাড়িকে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো অল্টোর একটি রাস্তায় পার্ক করিয়ে রাখেন। ব্রঙ্কসের গাড়িটি “পরিত্যক্ত” হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই “দুষ্কৃতকারীদের” দ্বারা আক্রান্ত হয়। প্রথমে যারা এসেছিল তারা ছিল একটি পরিবার—বাবা, মা এবং ছোট ছেলে—যারা গাড়ির রেডিয়েটর এবং ব্যাটারি খুলে নিয়ে যায়। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে, গাড়ির প্রায় সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় যথেচ্ছ ধ্বংসযজ্ঞ—জানালা ভেঙে ফেলা হয়, যন্ত্রাংশ ছিঁড়ে নেওয়া হয়, সিটের গদি ছিঁড়ে ফেলা হয়। বাচ্চারা গাড়িটিকে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। প্রাপ্তবয়স্ক “দুষ্কৃতকারীদের” অধিকাংশই ছিল সুসজ্জিত, পরিপাটি চেহারার শ্বেতাঙ্গ। পালো অল্টোর গাড়িটি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল। তারপর জিম্বারডো নিজে একটি হাতুড়ি দিয়ে গাড়িটির একটি অংশ ভেঙে দেন। শীঘ্রই, পথচারীরাও সেই কাজে যোগ দিতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গাড়িটিকে উল্টে দেওয়া হয় এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়। এক্ষেত্রেও “দুষ্কৃতকারীরা” ছিল মূলত respectable শ্বেতাঙ্গ।

    অযত্নে পড়ে থাকা সম্পত্তি মজা বা লুটের জন্য বের হওয়া মানুষদের কাছে সহজ শিকারে পরিণত হয়; এমনকি এমন লোকেরাও এতে অংশ নেয় যারা সাধারণত এমন কাজ করার স্বপ্নও দেখে না এবং সম্ভবত নিজেদের আইন মেনে চলা নাগরিক হিসেবেই মনে করে। ব্রঙ্কসের সামাজিক জীবনের প্রকৃতির কারণে—যেমন সেখানকার পরিচয়হীনতা, প্রায়শই গাড়ি পরিত্যক্ত হওয়া এবং জিনিসপত্র চুরি বা ভাঙার ঘটনা, এবং “কেউ পরোয়া করে না” এই অতীত অভিজ্ঞতা—সেখানে ভাঙচুর অনেক দ্রুত শুরু হয়। কিন্তু রক্ষণশীল পালো অল্টো, যেখানে মানুষের বিশ্বাস জন্মেছে যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির যত্ন নেওয়া হয় এবং দুষ্টুমি করলে তার ফল ভুগতে হয়, সেখানে এমনটা হয় না। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বাধা—পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সভ্য আচরণের দায়বদ্ধতা—যখন “কেউ পরোয়া করে না” এমন সংকেত দেওয়া কাজের মাধ্যমে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যেকোনো জায়গাতেই ভাঙচুর ঘটতে পারে।

    আমরা মনে করি যে “উপেক্ষিত” আচরণও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়। একটি স্থিতিশীল এলাকা, যেখানে পরিবারগুলো তাদের বাড়ির যত্ন নেয়, একে অপরের সন্তানদের খেয়াল রাখে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশকারীদের বাধা দেয়, তা কয়েক বছরের মধ্যে, এমনকি কয়েক মাসের মধ্যেই, একটি প্রতিকূল এবং ভীতিকর জঙ্গলে পরিণত হতে পারে। একটি সম্পত্তি পরিত্যক্ত হয়, আগাছা গজায়, একটি জানালা ভেঙে যায়। প্রাপ্তবয়স্করা উচ্ছৃঙ্খল শিশুদের বকাঝকা করা বন্ধ করে দেয়; শিশুরা সাহস পেয়ে আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। পরিবারগুলো এলাকা ছেড়ে চলে যায়, নিঃসঙ্গ প্রাপ্তবয়স্করা এসে বসবাস শুরু করে। কিশোর-কিশোরীরা কোণার দোকানের সামনে জড়ো হয়। দোকানদার তাদের সরে যেতে বললে তারা অস্বীকার করে। মারামারি হয়। আবর্জনা জমতে থাকে। লোকেরা মুদি দোকানের সামনে মদ্যপান শুরু করে; একসময়, কোনো মাতাল ফুটপাতে পড়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং তাকে সেই অবস্থাতেই থাকতে দেওয়া হয়। পথচারীরা ভিক্ষুকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ১

    ভাঙা জানালা – পর্ব ১

    ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি, নিউ জার্সি রাজ্য আঠাশটি শহরে জীবনের মান উন্নত করার লক্ষ্যে “নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন প্রতিবেশ কর্মসূচি” (Safe and Clean Neighborhoods Program) ঘোষণা করে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে, রাজ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের টহল গাড়ি থেকে বের করে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য শহরগুলোকে অর্থ প্রদান করে। গভর্নর এবং অন্যান্য রাজ্যের কর্মকর্তারা অপরাধ কমানোর একটি উপায় হিসেবে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার বিষয়ে বেশ উৎসাহী থাকলেও, অনেক পুলিশ প্রধানই এ বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাদের দৃষ্টিতে, পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার পদ্ধতিটি অনেকটাই অচল বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এটি পুলিশের গতিশীলতা কমিয়ে দিত, ফলে নাগরিকদের সেবার আহ্বানে সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত এবং টহলরত কর্মকর্তাদের ওপর সদর দফতরের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যেত।

    অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া পছন্দ করতেন না, তবে তার কারণ ছিল ভিন্ন: এটি ছিল বেশ পরিশ্রমের কাজ, কনকনে ঠান্ডা বা বৃষ্টির রাতেও তাদের বাইরে থাকতে হতো এবং এর ফলে বড় কোনো অপরাধী ধরার সম্ভাবনা কমে যেত। কোনো কোনো বিভাগে, কর্মকর্তাদের পায়ে হেঁটে টহলের দায়িত্ব দেওয়াকে এক ধরনের শাস্তি হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। এমনকি, পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করা শিক্ষাবিদরাও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে পায়ে হেঁটে টহল অপরাধের হারে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে কি না। অধিকাংশের মতে, এটি ছিল জনমতকে শান্ত রাখার জন্য একটি লোকদেখানো কৌশল মাত্র। কিন্তু যেহেতু রাজ্য এর জন্য অর্থ প্রদান করছিল, তাই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।

    কর্মসূচি শুরু হওয়ার পাঁচ বছর পর, ওয়াশিংটন ডিসি-র পুলিশ ফাউন্ডেশন পায়ে হেঁটে টহল প্রকল্পের একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করে। মূলত নিউয়ার্কে পরিচালিত একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে ফাউন্ডেশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, পায়ে হেঁটে টহল অপরাধের হার কমাতে পারেনি, যা প্রায় কেউই অপ্রত্যাশিত মনে করেনি। কিন্তু পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া এলাকাগুলোর বাসিন্দারা অন্য এলাকার মানুষের তুলনায় বেশি নিরাপদ বোধ করতেন, তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে অপরাধ কমেছে এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্য কম পদক্ষেপ নিতেন (যেমন, দরজা বন্ধ করে বাড়িতে থাকা)। অধিকন্তু, পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া এলাকাগুলোর নাগরিকদের পুলিশের প্রতি মনোভাব অন্য এলাকার বাসিন্দাদের চেয়ে বেশি অনুকূল ছিল। এবং টহল গাড়িতে থাকা কর্মকর্তাদের তুলনায়, যারা পায়ে হেঁটে টহল দিতেন, তাদের মনোবল, কর্মসন্তুষ্টি এবং নিজেদের এলাকার নাগরিকদের প্রতি মনোভাব অনেক উন্নত ছিল।

    এই ফলাফলগুলোকে হয়তো প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে যে সন্দিহান ব্যক্তিরাই সঠিক ছিলেন—পায়ে হেঁটে টহলের অপরাধের ওপর কোনো প্রভাব নেই; এটি কেবল নাগরিকদের বোকা বানিয়ে অনুভব করায় যে তারা আরও নিরাপদ। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে, এবং পুলিশ ফাউন্ডেশনের গবেষণার লেখকদের (যাদের মধ্যে কেলিং একজন ছিলেন) দৃষ্টিতে, নিউয়ার্কের নাগরিকরা মোটেও বোকা বনেননি। তারা জানতেন পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তারা কী করছেন, তারা জানতেন যে এটি গাড়িতে থাকা কর্মকর্তাদের কাজ থেকে ভিন্ন, এবং তারা এটাও জানতেন যে কর্মকর্তাদের পায়ে হেঁটে টহল দেওয়াটা তাদের এলাকাকে আরও নিরাপদ করে তুলেছিল।

    কিন্তু অপরাধের হার না কমে—এমনকি বেড়ে যাওয়ার পরেও—একটি এলাকা কীভাবে “নিরাপদ” হতে পারে? এর উত্তর খুঁজে পেতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে যে প্রকাশ্য স্থানে মানুষ সাধারণত কিসে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। অনেক নাগরিকই অবশ্যই প্রাথমিকভাবে অপরাধকে ভয় পান, বিশেষ করে কোনো অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা আকস্মিক, হিংস্র আক্রমণের শিকার হওয়াকে। এই ঝুঁকি নিউয়ার্কের মতো অনেক বড় শহরেই অত্যন্ত বাস্তব। কিন্তু আমরা ভয়ের আরেকটি উৎসকে উপেক্ষা করি বা ভুলে যাই—তা হলো বিশৃঙ্খল লোকদের দ্বারা বিরক্ত হওয়ার ভয়। এরা হিংস্র লোক নয়, বা অপরিহার্যভাবে অপরাধীও নয়, বরং এরা হলো অশিষ্ট, উগ্র বা খামখেয়ালি স্বভাবের লোক: যেমন ভিক্ষুক, মাতাল, মাদকাসক্ত, উচ্ছৃঙ্খল কিশোর-কিশোরী, পতিতা, ভবঘুরে এবং মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরা।

    পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তারা যা করতেন তা হলো, নিজেদের সাধ্যমতো এই এলাকাগুলোতে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। যদিও এলাকাগুলো ছিল মূলত কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত এবং টহলরত পুলিশ কর্মকর্তারা ছিলেন মূলত শ্বেতাঙ্গ, পুলিশের এই “শৃঙ্খলা-রক্ষার” কাজটি উভয় পক্ষের সাধারণ সন্তুষ্টির সাথেই সম্পাদিত হতো। আমাদের মধ্যে একজন (কেলিং) নিউয়ার্কের পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তাদের সাথে বহু ঘণ্টা হেঁটে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে তারা কীভাবে “শৃঙ্খলা”কে সংজ্ঞায়িত করতেন এবং তা বজায় রাখতে কী করতেন। একটি টহল এলাকা ছিল বেশ সাধারণ: নিউয়ার্কের কেন্দ্রস্থলে একটি ব্যস্ত কিন্তু জরাজীর্ণ এলাকা, যেখানে অনেক পরিত্যক্ত ভবন, প্রান্তিক দোকান (যার কয়েকটিতে জানালায় ছুরি এবং ক্ষুর স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা ছিল), একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, একটি ট্রেন স্টেশন ও কয়েকটি প্রধান বাস স্টপ ছিল।

    যদিও এলাকাটি জরাজীর্ণ ছিল, এর রাস্তাগুলো লোকে লোকারণ্য থাকতো, কারণ এটি ছিল একটি প্রধান পরিবহন কেন্দ্র। এই এলাকার “শৃঙ্খলা” কেবল সেখানে যারা বাস করতেন এবং কাজ করতেন তাদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং আরও অনেকের জন্যেও ছিল, যাদের বাড়ি, সুপারমার্কেট বা কারখানায় যাওয়ার পথে এর মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হতো।

  • জর্জ ওয়াশিংটন প্লাঙ্কিট: একজন প্র্যাকটিক্যাল রাজনীতিকের কথা – পর্ব ৩


    অধ্যায় ৫

    নিউ ইয়র্ক সিটি হলো ‘হেসিড’দের জন্য একটা কেকের টুকরা

    এই শহরটা সম্পূর্ণরূপে অ্যালবানির ‘হেসিড’ (গ্রাম্য, আনাড়ি) আইনপ্রণেতাদের দ্বারা শাসিত হয়। আমি আমার দীর্ঘ আইনসভা জীবনে একজনও এমন আপস্টেট রিপাবলিকানকে দেখিনি যে এখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়নি। এই গ্রাম্য লোকেরা ভাবে আমরা যেন জাতীয় সরকারের কাছে থাকা আমেরিকান আদিবাসীদের মতো—অর্থাৎ, রাজ্যের এক ধরনের আশ্রিত যারা নিজেদের খেয়াল রাখতে পারে না এবং সেন্ট লরেন্স, অন্টারিও এবং অন্যান্য গ্রামের কাউন্টিগুলোর রিপাবলিকানদের দ্বারা তাদের খেয়াল রাখা উচিত। প্রাক্তন গভর্নর ওডেল কেন এখানে এসে রিপাবলিকান মেশিন পরিচালনা করবেন, তা নিয়ে কেন কেউ অবাক হবে? নিউবার্গ তার জন্য যথেষ্ট বড় নয়। সে অন্য সব আপস্টেট রিপাবলিকানের মতোই নিউ ইয়র্ক সিটি দখল করতে চায়। নিউ ইয়র্ক হলো তাদের কেকের টুকরা।

    শোনো, তোমরা আয়ারল্যান্ডের নিপীড়িত জনগণ, রাশিয়ার কৃষক এবং অত্যাচারিত বোয়ারদের সম্পর্কে অনেক কথা শোনো। এবার আমি তোমাকে বলি যে এই মহান ও রাজকীয় শহরের মানুষের চেয়ে তাদের সত্যিকারের স্বাধীনতা এবং স্ব-শাসন অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ডে তারা আইরিশদের কিছু স্ব-শাসন দেওয়ার ভান করে। এই রাজ্যে রিপাবলিকান সরকার কোনো ভানই করে না। তারা সরাসরি বলে: “নিউ ইয়র্ক সিটি একটা সুন্দর, বড়, মোটাতাজা রাজহাঁস। তোমাদের ছুরি নিয়ে এসো আর একটা টুকরা কেটে নাও।” তারা রাজহাঁসের সম্মতি নেওয়ার ভানটুকুও করে না।

    আমাদের নিজস্ব রাস্তা, ডক, জলসীমা বা অন্য কোনো কিছুই আমাদের নিজেদের নয়। রিপাবলিকান আইনসভা এবং গভর্নর পুরো ব্যাপারটাই চালান। তারা আমাদের যা খেতে এবং পান করতে বলে, আমাদের তা-ই খেতে ও পান করতে হয়। এমনকি আমাদের নিজেদের খাওয়া এবং পান করার সময়টাও তাদের সুবিধার জন্য ঠিক করতে হয়। যদি তাদের রবিবার বিয়ার পান করতে ভালো না লাগে, তাহলে আমাদেরকেও বিরত থাকতে হবে। যদি তাদের গ্রামে কোনো বিনোদন না থাকে, তাহলে আমাদেরও কোনো বিনোদন থাকতে পারবে না। আমাদের পুরো জীবন তাদের সুবিধার জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর এর ওপর আমাদের তাদের করও দিতে হয়।

    তুমি কি কখনো আইনসভার কাছ থেকে কিছু চাইতে প্রতিনিধি দল নিয়ে এই শহর থেকে আলবানিতে গিয়েছিলে? না? তাহলে যেও না। যে গ্রাম্য লোকেরা সব কমিটি চালায়, তারা তোমাকে এমনভাবে দেখবে যেন তুমি একটা শিশু, যে জানে না সে কী চায়। আর তারা তোমাকে অনেক কথায় বলবে যে বাড়ি যাও আর ভালো ছেলে হয়ে থাকো, আইনসভা তোমার জন্য যা ভালো মনে করে, তা-ই দেবে। তারা এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার ভাব দেখায়, যেন বলছে, “এই ছেলেমেয়েরা খুব ঝামেলা করে। তারা সবসময় লজেন্স চায়, আর তারা জানে যে সেটা খেলে তাদের শরীর খারাপ হবে। তাদের ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত যে আমরা তাদের খেয়াল রাখার জন্য আছি।” আর যদি তুমি তাদের সাথে তর্ক করার চেষ্টা করো, তারা করুণার হাসি হেসে এমনভাবে দেখাবে যেন তারা একটা নষ্ট হওয়া শিশুকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

    কিন্তু কেমুং, ওয়েন বা টায়োগা থেকে একজন রিপাবলিকান কৃষককে ক্যাপিটলে আসতে দাও। রিপাবলিকান আইনসভা তার দিকে ছুটে যাবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করবে সে কী চায় আর বলবে যদি সে যা চায় তা দেখতে না পায়, তাহলে যেন চেয়ে নেয়। যদি সে বলে তার কর খুব বেশি, তারা তাকে উত্তর দেবে: “ঠিক আছে, বুড়ো, এটা নিয়ে চিন্তা করো না। আমরা তোমার কতটুকু ছাড় দেব?”

    “আমার মনে হয় আপাতত প্রায় ৫০ শতাংশ হলেই হবে,” লোকটি বলল। “এটা কি করে দিতে পারবেন?”

    “অবশ্যই,” আইনসভা রাজি হয়। “আমাদের আরও কিছু দাও, ‘নিউ ইয়র্ক সিটি গ্রাম্যদের জন্য কেকের টুকরা’, আরও চেষ্টা করো, লজ্জা পেও না। তুমি চাইলে আমরা ৬০ শতাংশও ছাড় দেব। আমরা এই জন্যই এখানে এসেছি।”

    এরপর আইনসভা নিউ ইয়র্ক সিটিতে মদের ওপর কর বা অন্য কোনো কর বাড়ানোর আইন পাস করে, আয়ের অর্ধেক রাজ্য কোষাগারের জন্য নেয় এবং কৃষকদের কর তাদের ইচ্ছেমতো কমিয়ে দেয়। এটা একটা গাছের গুঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ার মতোই সহজ—যখন তোমার কাছে একটা ভালো কার্যকরী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে আর বিবেকের কোনো বালাই থাকে না।

    আমাকে তোমাকে আরেকটা উদাহরণ দিতে দাও। এটা আমাকে প্রচণ্ড রাগান্বিত করে। গত বছর হাডসন নদীর ধারে কিছু গ্রাম্য লোক, বেশিরভাগই ওডেলের আশেপাশের এলাকার, তাদের ডকগুলো নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিল, যেখানে তারা তাদের সবজি, ইট এবং তাদের উৎপাদিত অন্যান্য জিনিসপত্র তুলত। তারা একসাথে হয়ে বলল: “চলো নিউ ইয়র্কে একটা ট্রিপ দিই আর সবচেয়ে ভালো ডকটা বেছে নিই। বাকিটা ওডেল আর আইনসভা করে দেবে।” তারা সত্যিই এখানে এসেছিল, আর কী মনে করো তারা বেছে নিয়েছিল? আমার ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে ভালো ডকটা! জর্জ ডব্লিউ. প্লাঙ্কিটের ডিস্ট্রিক্টে অনুমতি না নিয়েই ঢুকে পড়ল। এরপর তারা ওডেলকে একটি বিল পাস করিয়ে দিতে বলল, যাতে সেই ডকটা তাদের দেওয়া হয়, আর সে তা-ই করল।

    যখন বিলটি মেয়র লো-এর সামনে এল, তখন আমি আমার জীবনের সেরা বক্তৃতাটি দিয়েছিলাম। আমি তুলে ধরেছিলাম কীভাবে আইনসভা ডক কমিশনারকে পাশ কাটিয়ে পুরো জলসীমাটা গ্রাম্য লোকদের দিয়ে দিতে পারে, এবং মেয়রকে সতর্ক করে বলেছিলাম যে জাতিগুলো এর চেয়ে কম কারণেও তাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ওডেল আর লো ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর—যাই হোক, আমার ডকটা চুরি হয়ে গেল।

    রাজ্যের প্রচারণায় তোমরা ওডেলের রাজ্য কর প্রায় কিছুই না করে দেওয়ার মহান কাজ সম্পর্কে অনেক শুনেছ, আর আগামী বছরের প্রচারণায় আরও অনেক কিছু শুনবে। সে কীভাবে এটা করল? রাজ্যের সরকারের খরচ কমিয়ে? ওহ, না! খরচ বরং বেড়েছিল। সে শুধু নিউ ইয়র্ক সিটিকে শোষণ করার পুরোনো রিপাবলিকান কাজটি করেছিল। পার্থক্য শুধু এই ছিল যে সে প্রায় শহরটাকে একদম শুকিয়ে ফেলেছিল। সে কেবল মদের করই বাড়ায়নি, বরং কর্পোরেশন, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি এবং তার চোখে যা কিছু ছিল, তার উপর সব ধরনের কর বসিয়েছিল। অবশ্যই, প্রায় পুরো করটাই শহরের ওপর পড়েছিল। এরপর ওডেল গ্রামের ডিস্ট্রিক্টগুলোতে গিয়ে বলল: “দেখো আমি তোমাদের জন্য কী করেছি। তোমাদের আর রাজ্যের কোনো কর দিতে হবে না। আমি কি একজন ভালো মানুষ নই?”

    একবার অরেঞ্জ কাউন্টির একজন কৃষক তাকে জিজ্ঞেস করল: “বেন, তুমি এটা কীভাবে করলে?”

    “একদম সহজ,” সে উত্তর দিল। “যখনই আমার রাজ্য কোষাগারের জন্য টাকার দরকার হয়, আমি জানি কোথায় তা পাব,” আর সে নিউ ইয়র্ক সিটির দিকে আঙুল দেখাল।

    আর তারপর নিউ ইয়র্ক সিটির সনদ নিয়ে সব রিপাবলিকানদের tinkering। কেউ এর সাথে তাল মেলাতে পারে না। যখন একজন রিপাবলিকান মেয়র থাকে, তখন তারা তাকে সব ধরনের ক্ষমতা দেয়। যদি আগামী শরৎকালে একজন ট্যামানি মেয়র নির্বাচিত হয়, আমি অবাক হব না যদি তারা পুরো ব্যবস্থাটাই বদলে দেয় এবং এমনভাবে সাজায় যেন প্রতিটি শহরের দপ্তরের চারজন প্রধান থাকে, যাদের মধ্যে দুজন হবে রিপাবলিকান। যদি আমরা প্রতিবাদ করি, তারা বলবে: “তোমরা জানো না তোমাদের জন্য কী ভালো। আমাদের উপর ছেড়ে দাও। এটা আমাদের কাজ।”


    অধ্যায় ৬

    তোমার ডিস্ট্রিক্ট ধরে রাখার উপায়: মানুষের প্রকৃতি বোঝো এবং সেই অনুযায়ী কাজ করো

    একটা ডিস্ট্রিক্ট ধরে রাখার একটাই উপায় আছে: তোমাকে মানুষের প্রকৃতি বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তুমি বই পড়ে মানুষের প্রকৃতি শিখতে পারবে না। বই বরং একটা বাধা ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি তুমি কলেজে গিয়ে থাকো, তাহলে সেটা তোমার জন্য আরও খারাপ। মানুষের প্রকৃতি সঠিকভাবে বোঝার আগে তোমাকে যা শিখেছ, তার সবই ভুলে যেতে হবে, আর ভুলে যেতে অনেক সময় লাগে। কিছু মানুষ যা কলেজে শিখেছে, তা কখনোই ভুলতে পারে না। এমন মানুষরা হয়তো কোনো কারণে ডিস্ট্রিক্ট লিডার হতে পারে, কিন্তু তারা কখনোই টিকে থাকে না।

    প্রকৃত মানুষের প্রকৃতি শিখতে হলে তোমাকে মানুষের মাঝে যেতে হবে, তাদের দেখতে হবে এবং তাদের কাছে নিজেকে দেখাতে হবে। ফিফটিন্থ ডিস্ট্রিক্টের প্রতিটি পুরুষ, মহিলা এবং শিশুকে আমি চিনি, শুধু যারা এই গরমে জন্মেছে তারা বাদে—আর আমি তাদের কয়েকটাকেও চিনি। আমি জানি তারা কী পছন্দ করে আর কী করে না, তারা কীসে পারদর্শী আর কীসে দুর্বল, আর আমি তাদের সঠিক দিক থেকে কাছে আসার চেষ্টা করি।

    উদাহরণস্বরূপ, আমি কীভাবে তরুণদের জড়ো করি, তা বলছি। আমি শুনি যে একজন তরুণ তার কণ্ঠস্বর নিয়ে গর্বিত, ভাবে যে সে ভালো গান গাইতে পারে। আমি তাকে ওয়াশিংটন হলে এসে আমাদের গ্লি ক্লাবে যোগ দিতে বলি। সে আসে এবং গান গায়, আর সে সারা জীবনের জন্য প্লাঙ্কিটের অনুসারী হয়ে যায়। আরেকজন তরুণ একটা খালি জমিতে বেসবল খেলোয়াড় হিসেবে সুনাম অর্জন করে। আমি তাকে আমাদের বেসবল ক্লাবে নিয়ে আসি। এতেই তার কাজ হয়ে যায়। তুমি দেখবে, আগামী নির্বাচনের দিন সে আমার টিকিটের জন্য বুথে কাজ করছে। এরপর আরও আছে যে নদীতে নৌকা চালাতে পছন্দ করে, যে তরুণ তার ব্লকে ওয়াল্টজ নাচে সুনাম অর্জন করে, যে তরুণ হাতে খুব শক্তিশালী—আমি তাদের সবাইকে তাদের নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ দিয়ে আমার দলে টেনে নিই। আমি তাদের রাজনৈতিক যুক্তি দিয়ে বিরক্ত করি না। আমি শুধু মানুষের প্রকৃতি বুঝি আর সেই অনুযায়ী কাজ করি।

    কিন্তু তুমি হয়তো বলবে যে এই খেলাটা ‘হাই-টোনড’ লোকগুলোর সাথে কাজ করবে না, যারা কলেজ থেকে পাশ করে আর সিটিজেনস ইউনিয়নে যোগ দেয়। অবশ্যই তাদের সাথে এটা কাজ করবে না। তাদের জন্য আমার আলাদা চিকিৎসা আছে। আমি সেই পেটেন্ট ওষুধের বিক্রেতার মতো নই যে সব রোগের জন্য একই ওষুধ দেয়। সিটিজেনস ইউনিয়নের মতো তরুণ! আমি তাকে ভালোবাসি! সে হলো সবচেয়ে লোভনীয় খাবার, আর সে সহজে আমার হাত থেকে পালায় না।

    আমি তাকে কীভাবে ধরি, তা বলার আগে আমাকে বলতে দাও যে গত বছরের নির্বাচনের আগে সিটিজেনস ইউনিয়ন বলেছিল যে আমার ডিস্ট্রিক্টে তাদের চারশো বা পাঁচশো নিবন্ধিত ভোটার আছে। তাদের একটা সুন্দর সদর দপ্তরও ছিল, সুন্দর রো-টপ ডেস্ক আর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কার্পেট ছিল। যদি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে আমি তাদের জন্য সেই বাসা তৈরি করতে সাহায্য করেছি, তাহলে আমি শপথ করে সেটা অস্বীকার করব না। আমি এর মাধ্যমে কী বলতে চাই? কিছু মনে করো না। যদি তুমি চালাক হও, তাহলে পরের ঘটনা থেকে অনুমান করতে পারবে।

    যাই হোক, নির্বাচনের দিন এল। সিনেটর পদের জন্য সিটিজেনস ইউনিয়নের যে প্রার্থী আমার বিরুদ্ধে লড়েছিল, সে এই ডিস্ট্রিক্টে মাত্র পাঁচটি ভোট পেয়েছিল, আর আমি পেয়েছিলাম ১৪,০০০-এর বেশি ভোট। আমার ডিস্ট্রিক্টে সেই চারশো বা পাঁচশো সিটিজেনস ইউনিয়নের নিবন্ধিত ভোটারদের কী হয়েছিল? কিছু মানুষ অনুমান করে যে তাদের মধ্যে অনেকেই আসলে শুরু থেকেই ভালো প্লাঙ্কিট লোক ছিল এবং তারা সিটিজেনস ইউনিয়নের সাথে শুধু এই কারণে কাজ করেছিল, যাতে নির্বাচনের দিনের মধ্যে তাদের প্লাঙ্কিটের দলে নিয়ে আসা যায়। তুমিও চাইলে এই ধরনের অনুমান করতে পারো। আমি আমার সম্পর্কে কোনো গল্পে বাধা দিই না, বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায়। আমি শুধু তোমার মনোযোগ এই তথ্যের দিকে আকর্ষণ করছি যে গত নির্বাচনের দিন আমার ডিস্ট্রিক্টে ৩৯৫ জন সিটিজেনস ইউনিয়নের নিবন্ধিত ভোটার নিখোঁজ ছিল আর তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

    তবে আমি তোমাকে সত্যি সত্যি বলছি, আমি কীভাবে সিটিজেনস ইউনিয়নের কিছু তরুণকে কব্জা করেছি। আমার একটা পরিকল্পনা আছে যা কখনো ব্যর্থ হয় না। আমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিজ্ঞাপন দেখার জন্য সিটি রেকর্ড খেয়াল করি। এরপর আমি আমার তরুণ ‘সিট’কে (Cit) হাতে নিই, তাকে ভালো জিনিসগুলো সম্পর্কে সব বলি এবং তাকে উত্তেজিত করি যতক্ষণ না সে গিয়ে পরীক্ষা দেয়। এরপর আমি আর তাকে নিয়ে মাথা ঘামাই না। এটা নিশ্চিত যে সে কয়েক দিনের মধ্যে আমার কাছে ফিরে আসে এবং ট্যামানি হলে যোগ দিতে চায়। কোনো এক রাতে ওয়াশিংটন হলে এসো, আমি তোমাকে আমাদের তালিকায় থাকা এমন সব নামের একটি তালিকা দেখাব, যেখানে “সি.এস.” (C.S.) লেখা আছে, যার অর্থ, “সিভিল সার্ভিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হেরে গেছে।”

    বয়স্ক ভোটারদেরও আমি কাছে টানি। না, আমি তাদের প্রচারণার সাহিত্য পাঠাই না। ওটা বাজে জিনিস। মানুষ কাগজে যথেষ্ট রাজনৈতিক জিনিসপত্র পায়—আর তার চেয়েও বেশি—পড়তে পারে। আজকাল কে-ই বা বক্তৃতা পড়ে? সেগুলো শোনাটাই যথেষ্ট খারাপ। প্রচারণার কাগজপত্র দিয়ে লেটার বক্স ভরে তুমি কোনো ভোট পাবে না। বরং এতে করে তুমি ভোট হারাতেও পারো, কারণ একজন মানুষ তার লেটার বক্সের ঘণ্টা বাজতে শুনে যতটা চিঠি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে, ততটা আর কিছুতে ঘৃণা করে না, আর সেখানে শুধু একগাদা ছাপানো রাজনৈতিক কাগজ পায়। আমি আজ সকালেই এমন একজনের সাথে দেখা করেছি যে আমাকে বলল যে সে গত বছর ডেমোক্র্যাট স্টেট টিকিটে ভোট দিয়েছে, কারণ রিপাবলিকানরা তার লেটার বক্স প্রচারণার কাগজপত্রে ভরে রেখেছিল।

    তোমার ডিস্ট্রিক্টে তোমার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে হলে দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে সরাসরি যেতে হবে এবং তাদের বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করতে হবে। এর জন্য আমার একটা নির্দিষ্ট ব্যবস্থা আছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি নবম, দশম বা একাদশ অ্যাভিনিউতে দিনের বা রাতের যেকোনো সময় আগুন লাগে, আমি সাধারণত আমার কিছু নির্বাচনী এলাকার ক্যাপটেনদের নিয়ে ফায়ার ইঞ্জিনের মতোই দ্রুত সেখানে পৌঁছে যাই। যদি কোনো পরিবার আগুনে পুড়ে গৃহহীন হয়, আমি জিজ্ঞেস করি না তারা রিপাবলিকান নাকি ডেমোক্র্যাট। আমি তাদের দাতব্য সংস্থায় যেতেও বলি না, যারা এক-দু মাসে তাদের বিষয় তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা সাহায্যের যোগ্য কি না, আর ততক্ষণে হয়তো তারা অনাহারে মারা যাবে। আমি শুধু তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিই, যদি তাদের জামাকাপড় পুড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো কিনে দিই এবং তারা আবার নিজেদের সামলে না নেওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে দিই। এটা মানবপ্রেম, তবে এটাও রাজনীতি—খুবই ভালো রাজনীতি। কে বলতে পারে, এমন একটা আগুন আমাকে কত ভোট এনে দেয়? দরিদ্ররা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে কৃতজ্ঞ মানুষ, আর আমাকে বলতে দাও, তাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে যত বন্ধু আছে, ধনীদের তত বন্ধু নেই।

    যদি আমার ডিস্ট্রিক্টে কোনো পরিবার অভাবে থাকে, আমি দাতব্য সংস্থাগুলোর আগেই তা জানতে পারি এবং আমার লোকজন নিয়ে সবার আগে সেখানে পৌঁছে যাই। এমন ঘটনাগুলো খুঁজে বের করার জন্য আমার একটি বিশেষ দল আছে। এর ফলস্বরূপ, দরিদ্ররা জর্জ ডব্লিউ. প্লাঙ্কিটকে একজন পিতার মতো দেখে, বিপদে তার কাছে আসে—আর নির্বাচনের দিন তাকে ভোলে না।

    আরেকটা বিষয়, আমি সবসময় একজন যোগ্য মানুষের জন্য চাকরি জোগাড় করতে পারি। আমি চাকরির খোঁজ রাখার জন্য সবসময় সতর্ক থাকি, আর এমন খুব কমই হয় যে আমার হাতে ব্যবহারের জন্য কিছু থাকে না। আমি ডিস্ট্রিক্টের এবং পুরো শহরের সব বড় বড় নিয়োগকর্তাকে চিনি, আর যখন আমি তাদের কাছে কোনো চাকরির জন্য বলি, তখন তারা সাধারণত ‘না’ বলে না।

    আর শিশুরা—ডিস্ট্রিক্টের ছোট ছোট গোলাপগুলো! আমি কি তাদের ভুলে যাই? ওহ, না! তারা সবাই আমাকে চেনে, আর তারা জানে যে আঙ্কল জর্জকে দেখা আর ক্যান্ডি পাওয়া একই জিনিস। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেরা ভোট সংগ্রাহক। তোমাকে একটা ঘটনা বলি। গত বছর একাদশ অ্যাভিনিউর একটা ছোট্ট গোলাপ, যার বাবা একজন রিপাবলিকান, নির্বাচনের দিন তার বাবার দাড়ি ধরে বলেছিল যে সে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়বে না, যতক্ষণ না তিনি আমাকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আর সে ছাড়েনিও।


    অধ্যায় ৭

    শহরের লজ্জা নিয়ে

    আমি লিঙ্কন স্টেফেন্সের একটা বই পড়ছিলাম, যার নাম ‘দ্য শেইম অফ দ্য সিটিস’। স্টেফেন্সের উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু সব সংস্কারকের মতো সে পার্থক্য করতে পারে না। সে সৎ চুরি আর অসৎ চুরির মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পায় না এবং ফলস্বরূপ, সবকিছুকে গুলিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক লুটেরা আর সেইসব রাজনীতিকদের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে, যারা চোখ খোলা রেখে রাজনীতি থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। লুটেরা কেবল নিজের জন্য কাজ করে, তার সংগঠন বা শহরের কথা ভাবে না। একজন রাজনীতিক একই সাথে নিজের স্বার্থ, সংগঠনের স্বার্থ এবং শহরের স্বার্থ দেখেন। পার্থক্যটা ধরতে পারছ? উদাহরণস্বরূপ, আমি কোনো লুটেরা নই। লুটেরা সবকিছু একা হজম করে। আমি কখনোই তা করিনি। আমি রাজনীতি থেকে টাকা কামিয়েছি, কিন্তু একই সাথে আমি সংগঠনকে সেবা দিয়েছি এবং অন্য যে কোনো জীবিত মানুষের চেয়ে নিউ ইয়র্ক সিটির জন্য বেশি বড় উন্নতি এনেছি। আর আমি কখনোই কোনো ফৌজদারি আইন ভঙ্গ করিনি।

    একজন লুটেরা আর একজন প্র্যাকটিক্যাল রাজনীতিকের মধ্যে পার্থক্যটা হলো ফিলাডেলফিয়ার রিপাবলিকান গ্যাং আর ট্যামানি হলের মধ্যেকার পার্থক্যের মতো। স্টেফেন্স মনে করে তারা প্রায় একই; কিন্তু সে পুরোপুরি ভুল। ফিলাডেলফিয়ার দলটা ফৌজদারি আইনের বিরুদ্ধে যায়। ট্যামানি তা করে না। ফিলাডেলফিয়ানরা শুধু ব্যাংক থেকে সব সোনা আর কাগজের টাকা চুরি করেই সন্তুষ্ট নয়। তারা সেখানে থেকে নিকি আর পেনিসও কুড়াতে থাকে, আর পুলিশ এসে তাদের ধরে ফেলে। ট্যামানি এমন বোকা নয়। আরে, আমার মনে আছে, প্রায় পনের বা বিশ বছর আগে, ফিলাডেলফিয়ার এ্যালমহাউসের (গরিবদের আশ্রয়কেন্দ্র) একজন রিপাবলিকান সুপারিনটেনডেন্ট বিল্ডিংয়ের জিঙ্কের ছাদ চুরি করে স্ক্র্যাপ হিসাবে বিক্রি করে দিয়েছিল। এটা বাড়াবাড়ি ছিল। সবকিছুরই একটা সীমা থাকে, আর ফিলাডেলফিয়ার রিপাবলিকানরা সেই সীমা পার করে ফেলে। মনে হয় তারা সত্যিকারের রাজনীতিকদের মতো শান্ত এবং সংযত হতে পারে না। তাই, ট্যামানি দলীয় লোকদের ফিলাডেলফিয়ার গ্যাং-এর সাথে একই কাতারে ফেলা ঠিক নয়। যে কোনো মানুষ যে রাজনৈতিক বই লেখার উদ্যোগ নেয়, তার কখনোই সৎ চুরি আর অসৎ চুরির মধ্যেকার পার্থক্যটা ভুলে যাওয়া উচিত নয়, যা আমি অন্য একটা আলাপে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করেছি। যদি সে সব ধরনের চুরিকে একই স্তরে রাখে, তাহলে সে স্টেফেন্সের মতো মারাত্মক ভুল করবে এবং তার বইটি নষ্ট করে ফেলবে।

    নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া বা শিকাগোর মতো একটা বড় শহরকে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এক ধরনের ইডেন গার্ডেনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এটা সুন্দর আপেল গাছে ভরা একটি বাগান। গাছগুলোর একটিতে বড় করে একটা সাইন লাগানো আছে, যেখানে লেখা: “ফৌজদারি আইনের গাছ—বিষ।” অন্য গাছগুলোতে সবার জন্য প্রচুর আপেল আছে। তবুও বোকারা ফৌজদারি আইনের গাছের দিকে যায়। কেন? আমার মনে হয় এর কারণ হলো, একটা খামখেয়ালি শিশু যেমন ভালো খাবার খেতে চায় না, কিন্তু আগ্রহ নিয়ে ম্যাচের বাক্স চিবায়, তেমন। ফৌজদারি আইনের গাছে হাত দেওয়ার লোভ আমার কখনোই হয়নি। অন্য আপেলগুলো আমার জন্য যথেষ্ট ভালো, আর হে ভগবান! একটা বড় শহরে কত আপেলই না আছে!

    স্টেফেন্স তার বইয়ে একটা ভালো পয়েন্ট তুলে ধরেছিল। সে বলেছিল যে সে দেখেছে ফিলাডেলফিয়া, যেখানে প্রায় সবাই আমেরিকান, তা নিউ ইয়র্কের চেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, যেখানে আইরিশরা প্রায় পুরো শাসনকার্য পরিচালনা করে। সে কোনো তদন্ত করার আগেই যদি আমার কাছে আসত, আমি তাকে এটা বলতে পারতাম। আইরিশরা শাসন করার জন্য জন্ম নিয়েছে, আর তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ মানুষ। আমাকে এমন একজন আইরিশম্যান দেখাও যে একটি এ্যালমহাউসের ছাদ চুরি করবে! তার কোনো অস্তিত্ব নেই। অবশ্যই, যদি একজন আইরিশম্যানের রাজনৈতিক প্রভাব থাকে আর ছাদটা খুব পুরোনো হয়, তাহলে সে শহর কর্তৃপক্ষকে একটি নতুন ছাদ লাগানোর জন্য রাজি করাতে পারে এবং সেই কাজের চুক্তি নিজে পেতে পারে, আর পুরোনো ছাদটা কম দামে কিনে নিতে পারে—কিন্তু সেটা সৎ চুরি। এটা একজন ভদ্রলোকের মতো কাজ করা, আর এতে পুরোনো ছাদ ভেঙে স্ক্র্যাপম্যানের কাছে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি টাকা আছে—বেশি টাকা আর কোনো ফৌজদারি আইন ভঙ্গের ভয় নেই।

    আইরিশম্যানরা কেন অনেক ‘সন্স অব দ্য রেভল্যুশন’-এর চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সৎ, তার একটা কারণ হলো, যখন তাদের নিপীড়নের কারণে পান্না দ্বীপ (আয়ারল্যান্ড) থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন এই দেশ আর এই শহর তাদের আশ্রয় ও সমৃদ্ধি দিয়েছিল, আর তারা এর প্রতি কৃতজ্ঞ। শোনো, এই বাক্যটা দারুণ, তাই না? আমি কোনো সাহিত্যিককে দিয়ে এটা পরের সেন্ট প্যাট্রিক’স ডে-এর ডিনারের জন্য কবিতায় রূপান্তর করাব।

    হ্যাঁ, আইরিশম্যান কৃতজ্ঞ। তার একমাত্র চিন্তা হলো সেই শহরকে সেবা করা, যা তাকে একটি বাড়ি দিয়েছে। এই চিন্তা তার নিউ ইয়র্কে নামার আগেও থাকে, কারণ তার এখানকার বন্ধুরা প্রায়শই তার জন্য শহরের কোনো একটা দপ্তরে ভালো একটা জায়গা ঠিক করে রাখে, যখন সে এখনো পুরোনো দেশে থাকে। সে নিউ ইয়র্কে নামার পরের দিনই যখন এর বেতনভোগীর তালিকায় থাকে, তখন তার হৃদয়ে পুরোনো নিউ ইয়র্কের জন্য একটা কোমল জায়গা থাকবে—এতে কি কোনো অবাক হওয়ার কিছু আছে?

    এবার তথাকথিত ‘শহরের লজ্জা’র সাধারণ বিষয়টা নিয়ে কিছু কথা বলি। আমি বিশ্বাস করি না যে আমাদের শহরগুলোর সরকার পঞ্চাশ বছর আগের চেয়ে সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী কোনো অংশে খারাপ। “সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী” বলতে আমি কী বোঝাতে চেয়েছি, তা আমি ব্যাখ্যা করব। অর্ধ শতাব্দী আগে, আমাদের শহরগুলো ছিল ছোট এবং গরিব। রাজনীতিকদের জন্য তেমন কোনো লোভনীয় জিনিস ছিল না। চুরি করার মতো কিছুই ছিল না, এমনকি সৎ চুরিরও তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। একটি শহর ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন রাতে তার টাকা গুনতে পারত, আর যদি তিন সেন্টও কম থাকত, তাহলে সব ফায়ার বেল বাজানো হতো। সেই পরিস্থিতিতে সৎ হওয়ার কী কৃতিত্ব ছিল? আমি যখন শুনি যে ত্রিশ বা চল্লিশের দশকের পুরোনো বুড়োরা গর্ব করে বলে যে তারা তাদের পেশা বা ব্যবসা থেকে যা উপার্জন করেছে, তা ছাড়া এক ডলারও না নিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছে, তখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। যদি তারা আজ বেঁচে থাকত, বর্তমানের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে, তাহলে তারাও বিংশ শতাব্দীর রাজনীতিকদের মতোই হত। এখনকার দিনে সিঙ্গ সিংয়ের (Sing Sing) বন্দিদের চেয়ে বেশি সৎ মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তাদের মধ্যে একজনও কিছু চুরি করে না। কেন? কারণ তারা পারে না। ব্যাপারটা বুঝতে পারছ?

    বুঝতে পারো, আমি আজকের সেইসব রাজনীতিকদের পক্ষে কথা বলছি না যারা চুরি করে। যে রাজনীতিক চুরি করে, সে একজন চোরের চেয়েও খারাপ। সে একজন বোকা। একজন রাজনৈতিক প্রভাব আছে এমন মানুষের জন্য চারপাশে এত চমৎকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, একটি সেন্টও চুরি করার কোনো অজুহাত নেই। আমি যে কথাটা বলতে চাই, তা হলো, যদি রাজনীতিতে কিছু চুরি হয়ে থাকে, তার মানে এই নয় যে ১৯০৫ সালের রাজনীতিকরা, একটা শ্রেণি হিসেবে, ১৮৩৫ সালের রাজনীতিকদের চেয়ে খারাপ। এর মানে শুধু এই যে, পুরোনোদের চুরি করার মতো কিছুই ছিল না, যখন বর্তমানের রাজনীতিকরা সব ধরনের প্রলোভনে ঘেরা, আর তাদের মধ্যে কিছু—বোকাগুলো—স্বাভাবিকভাবেই ফৌজদারি আইনের বিরুদ্ধে যায়।


    অধ্যায় ৮

    রাজনীতিতে অকৃতজ্ঞতা

    রাজনীতিতে অকৃতজ্ঞতার চেয়ে জঘন্য অপরাধ আর কিছু নেই, কিন্তু পৃথিবীর শুরু থেকে সব মহান রাজনীতিককে এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। সিজারের ছিল তার ব্রুটাস; শেক্সপিয়ারের সেই রাজা—আমার মনে হয় তোমরা তাকে লিয়ারি বলো—তার নিজের মেয়েরাই তার বিরুদ্ধে গিয়েছিল; প্লাটের ছিল তার ওডেল, আর আমার আছে আমার “দ্য” ম্যাকম্যানাস। এটা একটা সত্যিকারের প্রমাণ যে একজন মানুষ মহান যখন সে রাজনৈতিক অকৃতজ্ঞতার শিকার হয়। মহান মানুষেরা কোমল, বিশ্বাসী প্রকৃতির হয়। আমারও তাই, ঠিকাদারি আর রিয়েল এস্টেট ব্যবসার বাইরে। রাজনীতিতে আমি সেইসব মানুষকে বিশ্বাস করেছি যারা আমাকে বলেছে তারা আমার বন্ধু। আর যদি আমার শিবিরে বিশ্বাসঘাতকেরা এসে থাকে—যাই হোক, আমার একই অভিজ্ঞতা হয়েছে যা সিজার, লিয়ারি এবং অন্যদের হয়েছিল।

    আমার ব্রুটাস সম্পর্কে বলি। ম্যাকম্যানাসের, তুমি তো জানো, সাত ভাই আছে আর তারা তাকে “দ্য” বলে ডাকে কারণ সে তাদের সবার নেতা, আর তাকে অন্য সব ম্যাকম্যানাসের থেকে আলাদা করার জন্য। কয়েক বছর ধরে সে একজন রাজনৈতিক গুপ্তচর ছিল। প্রচারাভিযানে সে কখনো নিরপেক্ষ থাকত, কখনো দুই দলের পক্ষে থাকত, আর কখনো নিরপেক্ষতার আড়ালে থাকত। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে তাকে কোথায় পাওয়া যাবে, তা কেউ জানত না, আর কেউই তাকে বিশ্বাস করত না—অর্থাৎ, আমি ছাড়া কেউই না। আমি ভেবেছিলাম তার মধ্যে ভালো কিছু আছে এবং আমি যদি তাকে হাতে ধরি, তাহলে আমি তাকে একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

    আমি তাকে কয়েক বছর আগে হাতে ধরেছিলাম। আমার বন্ধুরা আমাকে বলেছিল এটা আবার ব্রুটাস-লিয়ারি ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে, কিন্তু আমি তাদের কথা বিশ্বাস করিনি। আমি “দ্য”-এর ওপর ভরসা রেখেছিলাম। আমি তাকে অ্যাসেম্বলির জন্য মনোনীত করেছিলাম, এবং সে নির্বাচিত হয়েছিল। এক বছর পর, যখন আমি সিনেটর হিসেবে পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়ছিলাম, আমি তাকে আমার টিকিটে আবার অ্যাসেম্বলির জন্য মনোনীত করেছিলাম। তুমি কী মনে করো, কী ঘটল? আমরা দুজনেই ফিফটিন্থ অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্টে জিতেছিলাম, কিন্তু সে আমার চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেয়েছিল। শুধু ভেবে দেখো! আমার নিজের ডিস্ট্রিক্টে আমার চেয়ে এগিয়ে! আমি তো হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যখন আমি কিছুটা সামলে উঠলাম, তখন আমার নির্বাচনী এলাকার ক্যাপটেনরা আমার কাছে এসে বলল যে ম্যাকম্যানাস আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে যাতে আমাকে সিনেটর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, আর তারপর সে ডিস্ট্রিক্টের নেতৃত্ব দখল করার চেষ্টা করবে। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার বিশ্বাসী প্রকৃতি এমন বিশ্বাসঘাতকতা কল্পনা করতে পারছিল না।

    আমি ম্যাকম্যানাসকে ডেকে পাঠালাম আর আমার গলা আবেগে কাঁপছিল: “তারা বলছে তুমি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ, ‘দ্য’। এটা সত্যি হতে পারে না। আমাকে বলো এটা সত্যি নয়।”

    “দ্য” প্রায় কেঁদে ফেলল যখন সে বলল যে সে নির্দোষ।

    “আমি তোমার সাথে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, জর্জ,” সে বলল। “কিছু দুষ্ট বিশ্বাসঘাতক তোমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে। আমি এখনো জানি না তারা ঠিক কারা, কিন্তু আমি তাদের পিছু নিয়েছি, আর আমি তাদের খুঁজে বের করব, না হলে ‘দ্য’ ম্যাকম্যানাস নাম ত্যাগ করব। আমি এখনই তাদের খুঁজতে যাচ্ছি।”

    যাই হোক, বিশ্বাসঘাতকদের খুঁজে বের করার ব্যাপারে “দ্য” তার কথা রেখেছিল। সে তাদের ঠিকই খুঁজে বের করেছিল—এবং তাদের নেতৃত্ব নিজেই হাতে নিয়েছিল। ওহ, না! তাকে তাদের খুঁজতে বেশি দূরে যেতে হয়নি। সে তাদের এখন তার ক্লাবরুমে জড়ো করেছে, আর সে সেই মানুষটার কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে, যে মানুষটা তাকে তৈরি করেছিল। সুতরাং তুমি দেখছ যে সিজার আর লিয়ারি আর আমি একই নৌকায় আছি, শুধু পার্থক্য হলো আমি সফল হয়েছি, আর সিজার ও লিয়ারি হেরে গিয়েছিল।

    এখন আমাকে বলতে দাও যে রাজনীতিতে অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি বেশিদিন উন্নতি করতে পারে না। আমি তোমাকে অনেক উদাহরণ দিতে পারি। সেইসব লোকদের দিকে তাকাও যারা রসকো কনক্লিংকে পরাজিত করেছিল, যখন সে ইউনাইটেড স্টেটস সিনেট থেকে পদত্যাগ করে পুনর্নির্বাচনের জন্য আলবানিতে গিয়েছিল! তাদের কী হয়েছে? চলন্ত ছবির মতো তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে। কে কনক্লিংয়ের জায়গা নিয়েছিল সিনেটে? বিশ ডলার বাজি ধরতে পারো যে তুমি পঞ্জিকা না দেখে তার নাম মনে করতে পারবে না। আর বেচারা পুরোনো প্ল্যাট! সে এখন ক্ষমতা থেকে নেমে গেছে আর ওডেল ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে সে সবসময়ই ক্ষমতায় থাকবে। তার শত্রুরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সবসময় কঠোর পরিশ্রম করছে, আর আমি একটুও অবাক হব না যদি সে পরের রাজ্য প্রচারণার আগেই সরে যায়।

    যেসব রাজনীতিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী সফলতা অর্জন করে, তারা হলো সেইসব মানুষ যারা সবসময় তাদের বন্ধুদের প্রতি অনুগত থাকে, প্রয়োজনে এমনকি স্টেট প্রিজন পর্যন্ত; যেসব মানুষ তাদের প্রতিশ্রুতি রাখে এবং কখনোই মিথ্যা বলে না। রিচার্ড ক্রোকার বলতেন যে সত্য কথা বলা এবং বন্ধুদের পাশে থাকা একজন রাজনৈতিক নেতার প্রধান সম্পদ। এর চেয়ে সত্যি কথা আর কেউ বলেনি, আর ক্রোকারের চেয়ে ভালো করে কেউই এর চর্চা করেনি। এই কারণেই সে যতদিন চেয়েছিল, ততদিন ট্যামানি হলের নেতা হিসেবে ছিল। সংগঠনের প্রতিটি মানুষ তাকে বিশ্বাস করত। কখনও কখনও সে এমন ভুল করত যা প্রচারণায় ক্ষতি করত, কিন্তু সেগুলো সবসময়ই তার বন্ধুদের সেবা করার পক্ষেই থাকত।

    চার্লস এফ. মারফির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সে সবসময় তার বন্ধুদের পাশে থেকেছে, এমনকি যখন মনে হয়েছে যে এটা করার জন্য সে ক্ষমতা হারাবে। মনে আছে কীভাবে সে ২০০৩ সালে ম্যাকক্লেলানের পাশে ছিল যখন ব্রুকলিনের সব নেতা তার বিরুদ্ধে ছিল, আর মনে হচ্ছিল যেন ট্যামানির একটা বড় পরাজয় আসন্ন! ক্রোকার এবং মারফির মতো লোকেরাই যতদিন বেঁচে থাকে, ততদিন নেতা হিসেবে থাকে; ব্রুটাস আর ম্যাকম্যানাসের মতো লোক নয়।

    এখন আমি তোমাকে বলতে চাই, কেন রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকদের, বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক সিটিতে, দ্রুত শাস্তি দেওয়া হয়। এর কারণ হলো এখানে আইরিশরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আইরিশরা, পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে, একজন বিশ্বাসঘাতককে ঘৃণা করে। যখন কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতক তাদের সামনে আসে, তখন তুমি তাদের আটকে রাখতে পারবে না, আর পুরোনো আয়ারল্যান্ডের কথা মনে করে, তারা একজন রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতককে পরাজিত করতে বিশেষ আনন্দ পায়। আমার ডিস্ট্রিক্টের বেশিরভাগ ভোটারই আইরিশ বা আইরিশ বংশোদ্ভূত; তারা “দ্য” ম্যাকম্যানাসকে চিনে ফেলেছে, আর পরের বার যখন তারা তাকে ভোটে সুযোগ পাবে, তখন তারা তাকে উচিত শিক্ষা দেবে।

    একটা প্রশ্ন করা হয়েছে: একজন রাজনীতিক কি কখনো তার ডিস্ট্রিক্ট লিডারের বিরুদ্ধে যেতে পারেন? আমি উত্তর দিই: “না; যতক্ষণ পর্যন্ত নেতা তার ভোটারদের জন্য সম্ভব সব চাকরি জোগাড় করার জন্য ছোটাছুটি করে।” যখন ভোটাররা একজন লোককে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে, তখন তারা তার সাথে এক ধরনের চুক্তি করে। যদিও এটা লেখা থাকে না, তারা বলে: “আমরা তোমাকে আমাদের স্বার্থ দেখার জন্য এখানে বসিয়েছি। তুমি দেখবে এই ডিস্ট্রিক্ট যেন সব চাকরি পায় যা তার প্রাপ্য। তুমি আমাদের প্রতি অনুগত থেকো, আর আমরা তোমার প্রতি অনুগত থাকব।”

    ডিস্ট্রিক্ট লিডার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এটা একটা গুরুতর চুক্তি হয়ে যায়। যদি সে সেই চুক্তি মেনে চলে, তার বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন দপ্তরের চাকরির পেছনে ছোটাছুটি করে, তার অনুসারীদের জন্য রেলপথ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাকরি জোগাড় করে, এবং সব দিক থেকে নিজেকে একজন সত্যিকারের রাজনীতিক হিসেবে প্রমাণ করে, তাহলে তার অনুসারীরা তাকে সম্মান করে সমর্থন করতে বাধ্য, ঠিক যেমন তারা ইউনাইটেড স্টেটস সংবিধানকে সমর্থন করতে বাধ্য। কিন্তু যদি সে শুধু নিজের স্বার্থ দেখে বা চাকরি খুঁজে বের করার প্রতিভা না দেখায় বা ভালো কিছু পাওয়ার জন্য দাবি করার এবং আদায় করার সাহস না থাকে, তাহলে তার অনুসারীদের তার প্রতি আনুগত্য থেকে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে এবং তারা তাকে আঘাত করতে পারে, আর তাতে তাদের রাজনৈতিক অকৃতজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হবে না।

  • কেন আমি বই পড়াকে বেছে নিলাম

    কেন আমি বই পড়াকে বেছে নিলাম

    বই পড়া, আমার জন্য শুধুমাত্র একটি বিনোদন নয়, বরং এটি জ্ঞান আহরণের একটি অমূল্য মাধ্যম। যখন আমি একটি বই পড়ি, তখন আমি সরাসরি লেখকের মনোভাব, অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানকে অনুভব করি। একটি বই হলো এক ধরনের ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, যা লেখকের চিন্তাভাবনা এবং জ্ঞানকে পাঠকের সামনে তুলে ধরে। এর মাধ্যমে আমি এমন মানুষদের চিন্তা জানতে পারি যাদের সাথে আমি বাস্তব জীবনে কখনোই আলাপ করতে পারতাম না, যেমন বিলিয়নিয়ার উদ্যোক্তা মার্ক কিউবান। যদিও আমি তাকে ইমেল করতে পারি, তার ভিডিও দেখতে পারি, তবে তার ব্যবসায়িক উপদেশের নির্যাস আসলে আমি তার লেখা বই থেকেই সবচেয়ে ভালোভাবে পেতে পারি।

    বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি লেখকের মনের গভীর থেকে উঠে আসা চিন্তাগুলোকে সাজিয়ে উপস্থাপন করে। একজন লেখক যখন একটি বই লিখেন, তিনি তার ভেতরের সবচেয়ে মূল্যবান জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, এবং বিশ্লেষণকে সাজিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরেন, যা অন্য মাধ্যমের তুলনায় অনেক বেশি গভীর। আমি যখন একশটি বই পড়ি, আমি একশজন বিশেষজ্ঞের মতামত এবং চিন্তাভাবনা জানতে পারি। এটি আমার চিন্তাভাবনাকে সমৃদ্ধ করে, জ্ঞানকে বিস্তৃত করে এবং আমাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি দক্ষ করে তোলে।

    এটি সত্যি যে এখন বিভিন্ন জ্ঞান আহরণের মাধ্যম রয়েছে, যেমন ইউটিউব ভিডিও বা ফেসবুক পোস্ট। তবে, আমি কেন বইকে প্রাধান্য দিচ্ছি তা ব্যাখ্যা করতে চাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে, যেমন ফেসবুক বা টুইটারে, অনেক তথ্য একই সঙ্গে এসে পড়ে। ফেসবুকের “ডুম স্ক্রলিং” প্রক্রিয়া – ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রল করে যাওয়া – একদিকে যেমন মানসিক ক্লান্তি তৈরি করে, অন্যদিকে এটি তথ্যের উপর পূর্ণ মনোযোগ দেওয়াও কঠিন করে তোলে। অধিকাংশ সময়, ফেসবুকের সবচেয়ে লম্বা পোস্টটিও একটি বইয়ের এক অধ্যায়ের চেয়ে ছোট। ফলে, ফেসবুকের পোস্ট পড়ে আপনি যেটুকু জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন, তা বইয়ের তুলনায় অনেকটাই সীমিত।

    আরেকটি সমস্যা হলো সামাজিক মাধ্যমগুলোতে তথ্যের অতিরিক্ততা। একসঙ্গে অনেক রকমের তথ্য পাওয়া যায়, যার ফলে আসলে কোন বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আপনি যুক্তি দিতে পারেন যে এক প্যারাগ্রাফের মধ্যেই অনেক তথ্য থাকতে পারে, তবে বইয়ের মতো গভীর ও বিস্তৃত লেখার মধ্যে থেকে আপনি যে গভীর জ্ঞান পাবেন, তা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে এতটা বিস্তৃতভাবে পাওয়া কঠিন।

    ইউটিউব, অবশ্যই, একটি চমৎকার ভিজ্যুয়াল স্টিমুলেন্ট হতে পারে। তবে এর সাথেও কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। আপনি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে হয়তো ভিডিওটি আপনাকে সহায়তা করবে, কিন্তু সেই সাথে এটি আপনাকে একাধিক ডিসট্রাকশনে ফেলে দিতে পারে। বড় বড় কোম্পানির উদ্দেশ্য হলো আপনাকে যত বেশি সম্ভব সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা, যেন তারা বিজ্ঞাপন দেখাতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, ফেসবুকে প্রতি দুইটি অর্গানিক পোস্টের পর একটি বিজ্ঞাপন দেখা যায়। ইউটিউব ভিডিও দেখার সময়ও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে। কিন্তু, বই পড়ার সময়, আপনি এমন কোনো বিজ্ঞাপনের বিরক্তির সম্মুখীন হন না।

    বই পড়া আপনাকে সম্পূর্ণভাবে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ দিতে সহায়তা করে। আপনি যদি একটি বই পড়েন বা অডিও বুক শুনতে শুরু করেন, আপনার মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে সেই বিষয়ের উপর থাকে এবং আপনাকে নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞান আহরণের সুযোগ দেয়। এটি আপনাকে বিজ্ঞাপনের ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখে এবং দীর্ঘ সময় ধরে একটি বিষয়ে গভীরভাবে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়, যা অন্য মাধ্যমগুলোতে প্রায়ই পাওয়া যায় না।

    এ কারণেই, আমি বইকে প্রাধান্য দেই। এটি কেবল জ্ঞান আহরণের একটি উপায় নয়, এটি আমার মনোযোগ ধরে রাখতে, চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করতে এবং বিজ্ঞাপনের ঝামেলা থেকে মুক্ত থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে একটি বিষয়ে গভীরভাবে জানার একটি চমৎকার মাধ্যম। বই পড়ার গুরুত্ব এতটাই যে, আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, প্রায় সব বিশেষজ্ঞই উপদেশ দেন বই পড়তে, এবং তারা নিজেরাও সময় বের করে বই পড়েন। উদাহরণস্বরূপ, বিল গেটস বছরে ৫০টিরও বেশি বই পড়েন, যা তার বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারের একটি প্রধান উৎস। তাই, বই পড়া শুধু একটি অভ্যাস নয়, বরং সাফল্যের পথে একটি অপরিহার্য উপায়।

  • কেন আমেরিকার রাজনীতি আপনার মূল ফোকাস হওয়া উচিত

    কেন আমেরিকার রাজনীতি আপনার মূল ফোকাস হওয়া উচিত

    আপনি যদি প্রবাসে থাকেন এবং বিশেষত যদি আপনি সিটিজেন হন, তাহলে সেই দেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবা উচিত যেখানে আপনি বর্তমানে বসবাস করছেন। যেমন, আপনি যদি আমেরিকার নাগরিক হন, তবে আপনার উচিত আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, কারণ সেই দেশের রাজনীতি সরাসরি আপনার জীবনযাত্রা, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা, এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির উপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু যদি আপনি সারাক্ষণ বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তাহলে এর পেছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক বা সাংস্কৃতিক কারণ থাকতে পারে।

    প্রথম কারণ হতে পারে আমেরিকার রাজনীতি বুঝতে কিছুটা কঠিন বলে মনে হওয়া। আমেরিকার রাজনীতি অত্যন্ত জটিল, বহুস্তরীয়, এবং নানা বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত, যেমন ফেডারেল এবং স্টেট পর্যায়ের আইন, নানা ধরনের কমিটি ও সংস্থা, এবং নানা রাজনৈতিক দল ও আদর্শ। অনেক সময় প্রবাসী বাংলাদেশিরা এ ধরনের সিস্টেমের সাথে অভ্যস্ত না হওয়ায় এটি বুঝতে একটু সময় এবং পরিশ্রমের প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া, আমেরিকার রাজনীতি অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং তর্ক-বিতর্কপূর্ণ, যেখানে প্রতিটি ইস্যু নিয়ে বিতর্ক হয় এবং অনেক সিদ্ধান্তের পিছনে জটিল প্রক্রিয়া কাজ করে।

    দ্বিতীয়ত, আমেরিকার রাজনীতি অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত এবং পরিপক্ক। এই ধরনের প্রতিষ্ঠিত সিস্টেমে ব্যক্তিগত বা ক্ষুদ্র পরিসরের পরিবর্তন করা অনেক কঠিন। অনেক প্রবাসী বাংলাদেশিরা হয়তো মনে করেন যে তাদের মতামত বা অবদান এই বড় সিস্টেমে খুব কম প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটাই অস্থিতিশীল এবং পরিবর্তনশীল, যেখানে মাঝে মাঝে খুব সহজে নতুন নেতা উঠে আসে এবং পরিবর্তন ঘটে।

    বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করা অনেক প্রবাসীর কাছে সহজ হতে পারে কারণ তারা মনে করেন যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সিস্টেম তুলনামূলকভাবে দুর্বল এবং এতে খুব দ্রুত ও সহজে পরিবর্তন আনা সম্ভব। যেমন, বাংলাদেশে কখনও কখনও নতুন নেতা বা সংগঠক খুব অল্প সময়ের মধ্যে খ্যাতি পায় এবং নেতৃত্বের আসনে পৌঁছে যায়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা হয়তো এই ধরণের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা গতিশীলতার দিকে আকৃষ্ট হতে পারেন, যেখানে তারা মনে করেন যে পরিবর্তন বা প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা বেশি।

    যেমন, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ঘটনা, যেখানে নাহিদ কিংবা আসিফ ৫ই আগস্টের আগে অজানা ছিলেন, কিন্তু হঠাৎ তারা উপদেষ্টা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এই ধরনের দ্রুত উত্থান এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্রুত পরিবর্তন অনেকের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে, কারণ এটি অনেকের মনে আশার সঞ্চার করে যে তারা দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারেন।

    এর মানে হচ্ছে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা অনেক সময় মনে করেন যে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করা এবং এতে অংশ নেওয়া সহজ এবং কার্যকর হতে পারে, কারণ এটি দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং এতে তাদের নিজস্ব পরিচিতি বা মতামতের মূল্য আছে। অন্যদিকে, আমেরিকার রাজনীতি স্থিতিশীল এবং ধীরে পরিবর্তিত হওয়ায় এটি তাদের কাছে কম আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।

    এটি প্রায়ই ঘটতে পারে কারণ বাংলাদেশের মিডিয়া রাজনীতিবিদদের প্রচার করে এবং তাদের নিয়ে প্রচুর আলোচনা করে। এই কারণে, রাজনীতিবিদরা নিজেদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, এবং তাদের কথাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে, প্রবাসীদের মনেও এদের নিয়ে এক ধরনের চিন্তা বা আকর্ষণ তৈরি হয়, এবং তারা বাংলাদেশি রাজনীতির দিকে বেশি মনোনিবেশ করেন। তবে, বাংলাদেশের রাজনীতির বাইরেও অনেক স্টেকহোল্ডার রয়েছে, যেমন সিন্ডিকেট যারা দ্রব্যমূল্যের কারসাজি করে, বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান যারা দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন স্তর নিয়ন্ত্রণ করে, এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যারা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করেন। এদের প্রভাব রাজনীতিবিদদের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে, কিন্তু এদের সম্পর্কে অনেকেই খুব কম জানেন বা বোঝেন।

    এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে যদি কেউ কেবলমাত্র রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে দেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট এবং ক্ষমতার কাঠামো পুরোপুরি বোঝা সম্ভব হয় না। রাজনীতিবিদরা দেশের একটি মাত্র অংশ, কিন্তু অর্থনীতি, সমাজ, এবং প্রশাসনের উপর নির্ভর করে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাই, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ভাবা যতটা সহজ বা আকর্ষণীয় মনে হোক না কেন, এর বাইরের স্টেকহোল্ডারদের প্রভাব অনেক বড়, এবং এদের বোঝা সমানভাবে জরুরি।

    আমেরিকার রাজনীতি জটিল হলেও এতে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে আপনি নিজের এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারেন। আমেরিকার রাজনীতি অনেক বেশি খোলামেলা এবং সেখানে সবকিছু তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। আপনি চাইলে সরকারী নথি, আইন, এবং বিভিন্ন নীতিমালার রিপোর্ট খুব সহজেই পেতে পারেন। যদিও আপনাকে শুরুতে মনে হতে পারে যে আপনি একজন ক্ষুদ্র নাগরিক, এবং আপনার অবদান তেমন কোনো প্রভাব ফেলছে না, কিন্তু সত্য হলো আমেরিকায় প্রচুর বাংলাদেশি রয়েছেন যারা ঠিক আপনার মতোই ভাবছেন। তারা নিজেদের অবস্থানকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন না কারণ তারা মনে করছেন যে তাদের মতামত বা অবদান অপ্রাসঙ্গিক।

    কিন্তু আপনি যদি এই ধারণা বদলান এবং সক্রিয়ভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন, তাহলে আপনি এবং অন্যান্য প্রবাসী বাংলাদেশিরা একসঙ্গে বড় একটি শক্তি হয়ে উঠতে পারেন। যেমন, স্থানীয় নির্বাচনে বা নীতিনির্ধারণে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা, কমিউনিটির মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনা করা এবং আরও অনেককে এই প্রক্রিয়ার অংশ করতে উদ্বুদ্ধ করা। এর মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা একসঙ্গে আমেরিকার রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

    উদাহরণস্বরূপ, নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটি এমন একটি শক্তি হিসেবে গড়ে উঠছে যার প্রভাব রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারী কর্মকাণ্ডে। আপনি হয়তো লক্ষ্য করেছেন, সরকারি নথিপত্র এবং লিফলেটগুলোতে প্রায়শই বাংলায় অনুবাদ করা হয়। তবে সমস্যা হলো, এই অনুবাদগুলো প্রায়শই গুগল অনুবাদকের সাহায্যে করা হয়, যা আক্ষরিক অনুবাদের মাধ্যমে অনেক সময় ভুল বোঝার সৃষ্টি করে। এতে করে অনেক বাংলাদেশি সঠিকভাবে নীতিমালা বা সরকারি নির্দেশনা বুঝতে পারেন না, এবং তাদের সুবিধাগুলোও ঠিকভাবে নিতে পারেন না। এটি একটি ছোট সমস্যা মনে হলেও, এর সমাধান প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বড় ধরনের সুবিধা এনে দিতে পারে।

    এ ধরনের সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য, আপনি এবং আপনার কমিউনিটির অন্যান্য সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনের সাথে আলোচনা করতে পারেন। আপনারা একসঙ্গে একটি দল তৈরি করে এই ধরনের অনুবাদের মান উন্নত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে পারেন। এটি স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। এছাড়া, স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আলোচনা সভা, ওয়ার্কশপ, এবং বিভিন্ন ইভেন্ট আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশিরা একসঙ্গে তাদের চাহিদা এবং সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলবেন।

    এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, আপনি যেমন আমেরিকার রাজনীতির সম্পর্কে সচেতন হবেন, তেমনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আরও কার্যকর পরিবর্তন আনতে সহায়ক হতে পারেন। আপনার অংশগ্রহণের মাধ্যমে ছোটখাটো সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি, বড় ধরনের পরিবর্তনেরও সূচনা করতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি শক্তিশালী কমিউনিটি হিসেবে গড়ে তুলবে এবং আমেরিকার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অবদানকে দৃঢ় করবে।

  • Upbringing বা বেড়ে উঠা

    Upbringing বা বেড়ে উঠা

    একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে নির্ভর করে তার বেড়ে ওঠার পরিবেশের উপর। পরিবারে যে ধরনের শিক্ষা, আদর্শ, এবং সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়, তা একজন মানুষের সারাজীবনের পথচলায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ‘জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভাল’ — এই লাইনটি আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, কিন্তু যে বাস্তবতা আমরা প্রায়ই অস্বীকার করি, তা হলো—পরিবারের ভিত্তি যদি শক্ত না হয়, তাহলে জীবনের প্রতিটি ধাপে সেই দুর্বলতার মাশুল গুনতে হয়।

    শৈশবের অভিজ্ঞতা এবং মানসিক বিকাশ

    শৈশবের পরিবেশ এবং অভিজ্ঞতা একটি শিশুর মানসিক বিকাশের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার সময় তার পরিবার তাকে যে ধরনের শিক্ষা এবং স্নেহ দেয়, তা তার আত্মবিশ্বাস এবং আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একটি সুরক্ষিত এবং উৎসাহমূলক পরিবেশ শিশুকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার মানসিক শক্তি তৈরি করে। অন্যদিকে, পরিবারের মধ্যে যদি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার অভাব থাকে, তাহলে তা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

    পারিবারিক সম্প্রীতি এবং যোগাযোগ

    পরিবারের মধ্যে সুস্থ ও খোলামেলা যোগাযোগ একজন মানুষের আবেগীয় স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে যদি সন্তানের চিন্তা, অনুভূতি, এবং সমস্যাগুলো শোনার সুযোগ না থাকে, তাহলে সে নিজের ভাবনা প্রকাশের জায়গা খুঁজে পায় না। এটি তার ব্যক্তিগত জীবন এবং ভবিষ্যতের অন্যান্য সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একটি খোলামেলা পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুদের আবেগীয় ভারসাম্য বজায় থাকে এবং তারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়।

    প্রতিযোগিতায় প্রস্তুতি এবং পারিবারিক ভূমিকা

    প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। প্রতিযোগিতার জন্য শিশুকে ছোটবেলা থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হয়। কিন্তু অনেক অভিভাবক নিজের সন্তানকে প্রতিযোগিতায় না যেতে বলার ভুল করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে সন্তানের ক্ষতি করতে পারে। বাস্তবতা হলো, প্রতিযোগিতা এড়ানো সম্ভব নয়; বরং সন্তানের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলা প্রয়োজন। যদি মা-বাবা এই দিকটি না বোঝেন, তাহলে সন্তানকে পরবর্তী জীবনে চরম মূল্য দিয়ে শিখতে হয়।

    অর্থনৈতিক শিক্ষা এবং স্বাধীনতা

    একটি পরিবারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সন্তানকে অর্থের মূল্য শেখানো। সঠিক অর্থনৈতিক শিক্ষা না পেলে সন্তান ভবিষ্যতে অর্থ পরিচালনায় সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। শৈশব থেকেই সন্তানের মধ্যে সঞ্চয়, ব্যয়ের পরিকল্পনা, এবং দায়িত্বশীলতা গড়ে তোলা উচিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারে অর্থের অভাবে শিশুকে পেটের দায়ে অল্প বয়সেই কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এটি তার শিক্ষাজীবন এবং শারীরিক শক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সঠিক সময়ে শিক্ষা এবং পুষ্টি না পেলে জীবনে সাফল্যের পথে অনেক বাধা তৈরি হয়।

    আত্মপরিচয় এবং মূল্যবোধের বিকাশ

    পরিবারের আদর্শ এবং মূল্যবোধ একটি শিশুর আত্মপরিচয় গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখে। পরিবারে যে ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়া হয়, তা একজন মানুষের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং নৈতিক অবস্থান গড়ে তোলে। একটি সুস্থ পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশু তার শেকড় এবং সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। এটি তাকে জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে তার মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

    মানসিক চাপ মোকাবেলা

    পরিবারের পরিবেশে যদি শিশুকে মানসিকভাবে চাপে রাখা হয়, তাহলে সে ভবিষ্যতে মানসিক চাপ মোকাবেলায় অক্ষম হতে পারে। অনেক পরিবারে দেখা যায়, সন্তানের উপর অত্যধিক চাপ দেওয়া হয়, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিবারের উচিত সন্তানকে চাপ সামলানোর সঠিক পদ্ধতি শেখানো, যাতে সে জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে।

    শিক্ষা ও সৃজনশীলতার বিকাশ

    শুধু একাডেমিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব না দিয়ে পরিবারের উচিত সন্তানের সৃজনশীলতা এবং কৌতূহলকেও উৎসাহিত করা। সৃজনশীলতা মানুষের চিন্তা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা উন্নত করে, যা তার পেশাগত এবং ব্যক্তিগত জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে শিশুরা জীবনে নতুন নতুন জিনিস শিখতে আগ্রহী হয় এবং তা থেকে সাফল্য অর্জন করতে পারে।

    আদর্শ এবং নেতৃত্বের প্রভাব

    শিশুদের প্রথম এবং প্রধান আদর্শ হলো তাদের মা-বাবা। পরিবারের দায়িত্বশীলতা, পরিশ্রম, এবং সততা সন্তানের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। সন্তানরা পরিবার থেকে যে আদর্শ শিখে তা তাদের ভবিষ্যতের জীবনে নেতৃত্ব এবং ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়ক হয়। মা-বাবার সঠিক দিকনির্দেশনা সন্তানের আত্মবিশ্বাস এবং মূল্যবোধ গড়ে তুলতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

    পরিশেষ

    সুতরাং, একজন মানুষের জীবন গঠনের প্রাথমিক ভিত্তি তার পরিবার এবং তার বেড়ে ওঠার পরিবেশে নিহিত। পরিবারের সঠিক দিকনির্দেশনা, শিক্ষা, মূল্যবোধ এবং স্নেহ একজন মানুষকে তার জীবনের প্রতিটি ধাপে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। পরিবারের এই অবদানই একজন মানুষের ভবিষ্যত সাফল্য এবং মানসিক স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি।

  • সোশ্যাল মিডিয়ার ১০১

    সোশ্যাল মিডিয়ার ১০১

    আমরা একটা সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান শুরু করেছিলাম, যেখানে আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতাম। একবার অস্ট্রেলিয়া থেকে রকি ভাই যুক্ত হয়ে একটা কথা বলেছিলেন আলোচনার প্রসঙ্গে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হয়, এবং আমাদের সেটা কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

    ফেসবুক ব্যবহার করেন না এমন মানুষ আজকাল খুব কমই পাওয়া যায়। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের অনেকেই এখন এখানে আসছেন। তারাও আমাদের মতো একটা কমিউনিটি খুঁজতে আসেন। অনেকেই খবরের কাগজে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ সম্পর্কে শুনে এখানে আসেন। যদিও সোশ্যাল মিডিয়া বলতে ফেসবুক, এক্স, স্ন্যাপচ্যাট, ইনস্টাগ্রামসহ আরও অনেক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, বাংলাদেশে ফেসবুক মূলত সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে পরিচিত। এখন, যদি আগের প্রজন্মের কেউ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ‘খবর’ পেতে চান, তাহলে তারা কীভাবে তা পাবেন? ফেসবুক তো আর সংবাদপত্র নয় যে এখানে খবর ছাপানো হয়। তাহলে এখানে খবর কীভাবে আসে?

    এটি জানার আগে আমাদের ফেসবুক কীভাবে কাজ করে তা একটু জানা দরকার। ফেসবুক খুবই সিম্পল একটি স্ট্রাকচার, যেখানে আপনি নিজের প্রোফাইল তৈরি করে স্ট্যাটাস আকারে লম্বা লেখা, ছবি বা ভিডিও দিতে পারেন। আপনি অন্য প্রোফাইলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারেন এবং তাদের স্ট্যাটাস দেখতে পারেন। এভাবেই মূলত আপনি জানতে পারেন আপনার চারপাশে কী ঘটছে। এটাকেই আমরা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খবর পাওয়া বলি—মানে আপনি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে অন্যদের জানিয়ে দিলেন তাজা খবর, খবরের বিশ্লেষণ, ‘গুজব’, কিংবা শুধুই ফুল-ফল-লতা-পাতা।

    এখন একজন পাঠক হিসেবে আপনি কীভাবে বুঝবেন যে অন্যের লেখা বা শেয়ার করা তথ্যটি নিছক গুজব, প্রোপ্যাগান্ডা, তাজা খবর, একটি ভালো বিশ্লেষণ, নাকি শুধু ফুল-ফল-লতা-পাতা? যদিও বোঝা সহজ নয়, গত পনেরো বছরের ফেসবুক ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে, যা আপনাকে কোনটি কী বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

    ফুল-ফল-লতা-পাতা: এই ক্যাটাগরি সবচেয়ে সহজ। এতে ফুলের ছবি, পাতার ছবি, নিজের ছবি, প্রেমিক-প্রেমিকার হাতের তালু, ঘড়ি বা চুলের ছবি, কিংবা ‘হাই গাইজ গুড মর্নিং’ এর মতো স্ট্যাটাস দেয়া হয়। আবার অনেক বিশ্লেষক চলমান ইস্যুতে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে এই স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করেন। উদাহরণ হিসেবে দেখবেন, একদিকে মানুষ মরে কয়লা হয়ে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে কেউ একজন ফুলের ছবি দিয়ে কবিতা লিখছে—যেমন, ‘যার পুঙ্গা যে মারুক, আমার কী, আমি আমার পুঙ্গায় হাত দিয়ে আছি।’

    তাজা খবর এবং খবরের বিশ্লেষণ: এই ক্যাটাগরি সবচেয়ে সাহসী। অনেকে ব্রেকিং নিউজ দেন, যা অনেক সময় ভাইরালও হয়ে যায়। খবরের বিশ্লেষণ দেখে আমরা শুধু খবরই নয়, খবর প্রকাশকারীর দৃষ্টিভঙ্গিও বুঝে ফেলি। তবে এর সাথেই গুজব এবং প্রোপ্যাগান্ডা ক্যাটাগরি চলে আসে।

    প্রোপ্যাগান্ডা: এই জাতীয় খবর বা লেখাগুলোতে সত্যের সাথে কিছু মিথ্যা মিশিয়ে বা মিথ্যার সাথে কিছু সত্য মিশিয়ে আসল ঘটনা আড়াল করা হয়। আপনারা যারা ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ শব্দটির সাথে পরিচিত, তারা এভাবে এটি দেখতে পারেন।

    গুজব: আলাদা করে বলার দরকার নেই। মাথায় মগজ থাকলে লেখা থেকেই বুঝবেন, আর গু থাকলে আপনি নিজেই শেয়ার দিবেন।

    এগুলোই মোটামুটি প্রধান ক্যাটাগরি। এর বাইরে আরো কিছু থাকতে পারে, তবে এই মুহূর্তে মনে আসছে না। আমরা যারা অনেক বছর ধরে এই লাইনে আছি, তাদের অনেকেই ব্লগে লেখালেখি করতাম। এজন্য আমরা লেখার পাশাপাশি লেখককেও জানা জরুরি মনে করি। ‘তাজা খবর এবং খবরের বিশ্লেষণ’ ক্যাটাগরি সাহসের প্রয়োজন, এই ধরণের লেখা লিখতে গিয়ে অনেকে জেলে গিয়েছে, অনেকে কল্লা হারিয়েছে। এজন্য এটা জরুরী কারণ কারো ধড়ে কল্লা দুইটা থাকেনা।

    আমরা প্রায় সব সেলিব্রেটি, নেতা-নেত্রীসহ পাবলিক ফিগারকে পরিচিত নামের পাশাপাশি আরেকটি নামে চিনি। যেমন হরলিক্স ণূরা, কাগু, স্টিভ জব্বার ইত্যাদি। যাদের নাম এখানে নিয়েছি তারা এটি পড়ে থাকলে পারসোনালি নেবেন না। উদাহরণ দেয়ার জন্য এই নাম চলে এসেছে। তো, আমরা প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা প্রোফাইল মাথায় তৈরি করে ফেলি। সময়ের সাথে তার কাজকর্ম, পারসোনালিটি, ডিগবাজীর ভিত্তিতে এই প্রোফাইল তৈরি হয়।
    এজন্য যখন রেফারেন্স হিসেবে আমরা এই নামগুলো ব্যবহার করি লেখায় তখন যারা আগে থেকেই এর সাথে পরিচিত তারা চট করে বুঝে ফেলেন কী লিখা হয়েছে। এখন কেউ যদি এই প্রিকনসেপ্টগুলো না জানেন তার জন্য এটি বেশ কঠিন হয়ে যাবে, এমনকি লেখাটি বাংলা হলেও।

    এই লেখাগুলো সেলফ-সেন্সরড হওয়ায় এদের ভাষা অনেক সময় দৃষ্টিকটু মনে হতে পারে। কিছু করার নেই—তাজা খবর নিতে আসলে এসব সহ্য করতে হবে। এজন্য অনেকেই চুপি চুপি পড়ে চলে যান, কোনো ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ না দিয়ে।

    ইতিমধ্যে আপনি সোশ্যাল মিডিয়ার ১০১ জেনে ফেলেছেন। এবং এখন আপনার প্রশ্ন হতে পারে, ‘আমার কাছে তাজা খবর আসছে না কেন?’ এর কারণ হতে পারে, আপনি সেই বাবলে নেই। বাবলে ঢুকতে হলে আপনাকে সেই ধরনের খবর শেয়ার করা ব্যক্তিদের বন্ধু বানাতে হবে। যদিও আমি ‘বাবল’ শব্দটি পছন্দ করি না, এটি ভেন ডায়াগ্রামের মতো কাজ করে। আশা করি, আপনাকে ভেন ডায়াগ্রাম চেনাতে হবে না। যদি না চিনে থাকেন, তাহলে পরের প্যারাগ্রাফগুলো আপনার জন্য নয়। লাইক দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। ধন্যবাদ।

    ভেনচিত্রের বৃত্তগুলো হলো একেকটা বাবল। যেকোনো একজন ইউজার অনেকগুলো বৃত্তে থাকতে পারে। এখানেই মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের ধারণাটি আসে। আমি মিউচুয়াল বলতে ফেসবুকের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড নয়, বরং মানসিকতার দিক থেকে সমমানসিকতা বুঝাচ্ছি। আপনারা যারা দুইলাইন বেশী বুজ্জেন তাদের জন্যও লেখা এখানে শেষ। খুদাপেজ।