Category: humor

  • সোনায় সর্বনাশ

    আমাদের এই ‘সোনার বাংলা’য় সোনা ফলুক আর না ফলুক, আলমারির লকারে সোনা থাকাটা কিন্তু চাই-ই চাই। মতিঝিলের যে কেরানি ভদ্রলোকটি সারাজীবন লোকাল বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে অফিস করলেন, কিংবা পুরান ঢাকার যে ব্যবসায়ীটি ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গদিতে বসে দিন পার করলেন—দিনশেষে তাঁদের উভয়েরই জীবনের একমাত্র মহৎ উদ্দেশ্য হলো মেয়ের বিয়ের জন্য অন্তত বিশ ভরি সোনা জমানো। ব্যাপারটা কী জানেন? আমাদের দেশে সোনা জিনিসটা ঠিক অলংকার নয়, ওটা হলো মধ্যবিত্তের ‘লাইফ জ্যাকেট’। গুলশানের কোনো কমিউনিটি সেন্টারে নববধূর গাভর্তি গয়না দেখে আত্মীয়স্বজনরা যতটা না তার রূপের প্রশংসা করেন, তার চেয়ে ঢের বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন—যাক বাবা, মেয়েটার ভবিষ্যৎ একেবারে ‘নিশ্ছিদ্র’ হলো! অর্থনীতির বাঘা বাঘা পণ্ডিতরা যাকে বলেন ‘ডেড ক্যাপিটাল’ বা মরা পুঁজি, আমাদের খালাম্মা-চাচিদের কাছে সেটাই হলো একমাত্র ‘জীবন্ত বিমা’। সোজা কথায়, আমরা সোনা কিনি সাজতে নয়, আমরা সোনা কিনি বাঁচতে।

    গয়না কেনার সময় প্যারিসের কোনো মাদাম আর আমাদের ঢাকার ভাবিদের মাথার ভেতরের ক্যালকুলেটরটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা নিয়মে চলে। একজন পশ্চিমা নারী যখন জুয়েলারি শপে যান, তিনি ভাবেন—”এই নেকলেসটা কি আমার ইভিনিং গাউনের সাথে মানাবে? ডিজাইনটা কি যথেষ্ট ইউনিক?” তাঁদের কাছে গয়না হলো ফ্যাশন, অনেকটা ড্রয়িংরুমের শৌখিন ল্যাম্পশেডের মতো—দেখতে সুন্দর, কিন্তু বিপদে ওটা দিয়ে পেট ভরবে না। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁদের আসল লক্ষ্মী তো বাঁধা আছে ব্যাংকে, বিমায় আর শেয়ার বাজারে। কিন্তু আমাদের মায়েরা? তাঁরা গয়না কেনার সময় ডিজাইনের দিকে তাকান আড়চোখে, আর আসল নজরটা থাকে ওজনের কাঁটায় আর হলমার্কের সিলমোহরে। কেনার মুহূর্তেই তাঁদের মাথায় ঘুরপাক খায়—”ধরা যাক কালই যদি জামাইটা বখাটেগিরি করে তাড়িয়ে দেয় কিংবা ব্যবসা লাটে ওঠে, তবে এটা বেচে কত পাওয়া যাবে?” খাদহীন একুশ ক্যারেট সোনার প্রতি আমাদের এই যে নাড়ির টান, তা প্রমাণ করে যে আমরা গয়নাকে গয়না ভাবি না, ভাবি ‘পোর্টেবল এটিএম বুথ’—যা শাড়ির আঁচলে বেঁধে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেখানে খুশি নিয়ে যাওয়া যায়।

    কিন্তু বাঙালির এই হাড়কাঁপানো নিরাপত্তাহীনতা এল কোত্থেকে? এর শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের একটু টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে যেতে হবে সাড়ে তিনশো বছর আগে, সোজা মোগল সুবেদারদের আমলে। বিনয় ঘোষের ‘বাদশাহী আমল’ বইটিতে ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের আমাদের এই গোপন অসুখটার নাড়ি টিপে ধরেছেন। বার্নিয়ের সাহেব মোগল ভারতে এসে তো থ! দেখলেন, এ দেশে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ বা প্রাইভেট প্রপার্টি বলে কিচ্ছুটি নেই। যা আছে সব সম্রাটের বা সুবেদারের। আজ আপনি জমিদার, কাল সুবেদার চোখ রাঙালে আপনি পথের ভিখারি। স্থাবর সম্পত্তি বলে কিছু নেই, সবই ‘অস্থাবর’।

    বার্নিয়ের লিখছেন, এই যে আজ আছি কাল নেই—এই ভয় থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষরা একটা অদ্ভুত ফন্দি আঁটল। দালান-কোঠা তো আর পকেটে করে পালানো যায় না, আর মগ জলদস্যু কিংবা মোগল পেয়াদা যেকোনো সময় তা কেড়ে নিতে পারে। তাই বুদ্ধিমান বাঙালি তার সব ধন-সম্পত্তি গলিয়ে সোনা বানিয়ে ফেলল। তারপর সেই সোনা মাটির হাঁড়িতে করে পুঁতে রাখল, নয়তো গয়না বানিয়ে বাড়ির মেয়েদের গায়ে চড়িয়ে দিল। যাতে যুদ্ধ বাধুক বা মহামারি আসুক—গয়নাটুকু নিয়ে সোজা দৌড় দেওয়া যায়। বিনয় ঘোষের মতে, আমাদের এই সোনাপ্রীতি কোনো বিলাসিতা নয় মশাই, এ হলো ইতিহাসের এক মজ্জাগত ভয় থেকে জন্মানো আত্মরক্ষার ঢাল।

    মজার ব্যাপার হলো, সেই শায়েস্তা খাঁ-ও নেই, মগ দস্যুও নেই; এখন আমাদের ব্যাংক আছে, শেয়ার বাজার আছে—তবু সেই ভয়টা আমাদের জিন থেকে যায়নি। মোগল আমলে এই অভ্যাসের ফলে বাংলা হয়েছিল ‘সোনার চোরাবালি’ বা ‘Sink of Gold’। সারা দুনিয়ার সোনা এ দেশে ঢুকত বটে, মসলিন বিক্রি করে আমরা সোনা আনতাম, কিন্তু তা আর বের হতো না। টাকাটা বাজারে না খেটে সিন্দুকবন্দি হয়ে থাকত বলে এ দেশে শিল্পবিপ্লব হলো না, হলো শুধু তাঁতি আর কারিগর। আজও আমরা সেই একই তিমিরে। হাজার হাজার কোটি টাকা আমরা আলমারিতে ফেলে রেখেছি ‘নিরাপত্তা’র নামে। অথচ এই টাকাটা যদি গাজীপুর বা সাভারের কোনো কারখানায় খাটত, তবে হয়তো আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকরির জন্য মামা-চাচা ধরতে হতো না।

    ‘সোনায় সর্বনাশ’ কথাটা শুনতে কানে লাগলেও, ওটাই খাঁটি সত্য। সোনা জমিয়ে আমরা নিজেদের বড়লোক ভাবি বটে, কিন্তু আদতে আমরা হচ্ছি সেই কৃপণ যে টাকার ওপর শুয়ে থেকেও না খেয়ে মরে। বিনয় ঘোষ আর বার্নিয়েরের চশমা দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বাঙালি নারীর ওই গয়নার বাক্সটা আসলে সৌন্দর্যের আধার নয়, ওটা হলো আমাদের কয়েক শতাব্দীর অবিশ্বাসের এক করুণ দলিল। সোনাকে যতদিন আমরা ‘গয়না’ না ভেবে ‘বিমা’ ভাবব, ততদিন আমরা সত্যিকারের ধনী হতে পারব না। এখন সময় এসেছে সোনাকে গলায় না ঝুলিয়ে, পুঁজিকে বাজারে খাটানোর—তবেই যদি আমাদের ‘সোনার বাংলা’র কপালটা সত্যি সত্যি একটু খোলে!

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ২৫ শে নভেম্বর, ২০২৫ ইং

  • গোলাপী যখন ট্রেনে, হাতুড়ে তখন আমিরিকায়

    গোলাপী যখন ট্রেনে, হাতুড়ে তখন আমিরিকায়

    ​গ্রামে চিকিৎসা করিতে করিতে হাতুড়ে ডাক্তার রিক্ত হইয়াছে, হয় রোগ নতুবা রোগী, উভয়েই তল্লাট ছাড়িয়াছে। অবশ্য সে পশুপালের চিকিৎসা আরম্ভ করিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু মর্ম না বুঝিয়া এক গোমাতা তাঁহার কর্ম সমাধা করিয়া দিয়াছে।

    ​আর এই গ্রাম নহে, এইবার বিশ্ব-ধরণীকে হাতুড়ে চিকিৎসা কী বস্তু, তাহা বুঝাইতে মনস্থির করিয়া সে একটি ভূগোলক তুলিয়া লইল। সিদ্ধান্ত এই যে, ভূগোলক ঘুরাইয়া অনুমানে যে দেশে অঙ্গুলি পতিত হইবে, হাতুড়ে সেই দেশেই প্রস্থান করিবে। দুই হস্তে ভূগোলকটি আঁকড়াইয়া ধরিয়া এক ঘূর্ণি দিল, আর মনে মনে জপিতে লাগিল—চায়না, উগান্ডা, হনুলুলু। অঙ্গুলি তাক করিয়া লইল এই ভাবিয়া যে, অঙ্গুলি যে দেশে অবতরণ করিবে, সেই স্থানেই অবতরণ করিব। কয়েক ঘূর্ণি খাইয়া ভূগোলক থামিল; অঙ্গুলি যে দেশের নাম ইঙ্গিত করিল, বহু কষ্টে হাতুড়ে উচ্চারণ করিল—উচা।

    ​এত দেশ থাকিতে এই ‘উচা’ আবার কোনো দেশ? নিদেনপক্ষে চীন হইত, নতুবা ভারত। এই দুইটি দেশ ইতিমধ্যেই চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত; তথায় তাঁহার অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, নিমপ্যাথি উত্তমরূপেই চলিত। কিন্তু ‘উচা’ দেশে এই সকল কি চলিবে? কিন্তু হাতুড়ের এক বাক্য, অঙ্গুলি যেখানে পতিত হইয়াছে, সেই স্থানেই অবতরণ। তল্পিতল্পা গুটাইয়া সে প্ল্যানে বসিয়া গেল। উড়োজাহাজ নহে, স্বীয় পরিকল্পনা।

    ভূগোলক অনুসারে ‘উচা’ দেশে যাইতে হইলে সাগর, বন, জঙ্গল পাড়ি দিয়া যাইতে হইবে। অথবা উড়োজাহাজে চড়িয়া যাওয়া যায়। গ্রামে মুরুব্বিস্থানীয়দের সহিত সলা পরামিশে বসিয়া জানা গেল যে, উত্তর পাড়ার মাকু ঐ দেশে থাকে। আরও জানা গেল, দেশটি আসলে ‘উচা’ নহে, উহা আমিরিকা। তবে মাকুর কথা মনে পড়ায় হাতুড়ে মনে মনে কিঞ্চিৎ দমিয়া গেল। এই মাকুকেই সে সেই শৈশবে ইঞ্জেকশন দিয়াছিল!

    ​যেহেতু যাওয়াই মনস্থির, অগত্যা কিছু সলা পরামিশ কাজে লাগাইবার নিমিত্ত মাকুর গৃহে যাওয়াই স্থির হইল। অপরাহ্ণে কোবতের পুস্তক রাখিয়া ছাতা বগলে চাপিয়া হাতুড়ে মাকুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।

    ​মাকুর প্রাঙ্গণে বৈঠক জমিয়া থাকে। মাকুর পিতা আলিসান কেদারায় বসিয়া বিভিন্ন বিষয়ে বক্তিমা দেন। আর কেমন করিয়া যেন তিনি সকল বিষয়েই আমিরিকা টানিয়া আনিতে পারেন। কোনো বিষয় না থাকিলেও আমিরিকা, প্রসঙ্গ না থাকিলেও আমিরিকা। বেশ জবরদোস্ত ব্যাপার। আমিরিকার প্রধান খাদ্য বার্গার, রাস্তায় ফেলিয়া ভাত খাওয়া যায়, আর বাতাসে কেবল ডলার উড়িতে থাকে। সপ্তাহে মাত্র পাঁচ দিন কার্য করিলে চলে, এদেশের ন্যায় ত্রিশ দিন নহে— ইত্যাকার নানা আলাপ চলিতে চলিতে রাত্রি হয়। হাতুড়ে আমিরিকা যাইতে ইচ্ছুক, এবং মাকুর পিতার মতে ইহা কোনো ব্যাপারই নহে।

    প্রাত্যহিক নিয়ম ভঙ্গ করিয়া হাতুড়ে আরও তথ্য পাইবার আশায় মাকুর বাসাতেই রাত্রিযাপন করিবার সিদ্ধান্ত লইল। সে আরও জানিতে পারিল যে, পাসপোর্ট ও ভিসা আবশ্যক। মাকুর পিতা পান চর্বণ করিতে করিতে একে একে নানা প্রকার ভিসার ব্যাখ্যা দিতে লাগিলেন—আঁচল ভিসা, পেটিকোট ভিসা, টারজান ভিসা—ইত্যাকার নানা প্রকার ভিসায় যে আমিরিকা যাওয়া যায়, তাহার বিরাম নাই। তবে টারজান ভিসাটি তাহার মনে ধরিল। এই ভিসা তুলনামূলক সহজ বলিয়া মনে হইতেছিল। বস্তুত, ইহা ব্যতীত তাহার আর কোনো উপায় খোলা ছিল না। কিন্তু ইহা করিতে হইলে তাহার পাসপোর্ট থাকা লাগিবে, যাহা ইতিমধ্যে তাহার ছিল না। আর পাসপোর্ট বানাইতে হইলে তাহাকে গঞ্জে যাইতে হইবে। তবে মাকুর পিতার একজনের সহিত কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে। একটি চুক্তি করিলে হাতুড়ের কোনো কিছুই করিতে হইবে না, সে গৃহে বসিয়াই পাসপোর্ট হস্তে পাইবে। শৈশবে গলাকাটা পাসপোর্ট পাওয়া যাইত, এখন নাকি এসকল আর পাওয়া যায় না। যাহা হউক, হাতুড়ের কিছু জমিজিরাত ছিল, তাহা বিক্রয় করিবার মনস্থির করিল, আমিরিকা তাহাকে যাইতেই হইবে।

    নানা বৃত্তান্তের পর অবশেষে সে পাসপোর্ট হস্তে পাইল। আপনারা বিদ্যান ব্যক্তি, পাসপোর্ট পাওয়া যে সহজ, তাহা আপনারা জানেনই, তাই আর বৃত্তান্ত লিখিলাম না। দশজনের যে গতি, হাতুড়েরও সেই গতি। চাহিলে সে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, দুর্বাল আন্দোলন করিয়া কঠিনভাবে পাসপোর্ট লাভ করিতে পারিত, কিন্তু সেই তেজ সে আমিরিকা যাইবার পশ্চাতে ব্যয় করিবে বলিয়া মনস্থির করিয়াছিল বলিয়াই সহজ পথে পাসপোর্ট হস্তে পাইল। ছবিতে ইঞ্জেকশন হস্তে তুলিতে পারিলে যে সে চিকিৎসা করিতে পারে, ইহা বুঝানো সহজ হইত, কিন্তু কোনোমতেই তাহা দফতরে বুঝানো গেল না।

    হাতুড়ের দুর্বার মনোবল দেখিয়া মাকুর পিতার ইচ্ছা হইল যে, সে-ও তাহার সহিত যাত্রা করিবে। মাকুর মুখ হইতে আমিরিকার কেচ্ছা শুনিয়া সেই ইচ্ছা তীব্র হইতে তীব্রতর হইয়াছে মাত্র। তদ্ব্যতীত, বাতাসে টাকা উড়া দেখিতে কেমন, তাহাও একটি দর্শনীয় বস্তু বটে। মাকু যেহেতু বহু পূর্বে টারজান ভিসায় চলিয়া গিয়াছে, মাকুর বাপও সিদ্ধান্ত লইল যে, সে আর হাতুড়ে মিলিয়া একই পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া যাইবে, জীবনে আর কী আছে! সে সবিস্তারে হাতুড়ের নিকট পরিকল্পনা বর্ণনা করিল, যাহা শুনিয়া হাতুড়ে পাসপোর্ট বানাইবার পেছনে এতগুলো পয়সা ব্যয় করিয়াছে ভাবিয়া আফসোস করিল।

    পরদিন দুইজন মিলিয়া টেকনাফ চলিয়া গেল এবং ‘সামুদ্রিক অভিজ্ঞতা অর্জনে আগ্রহী শিক্ষানবিশ’ হিসাবে মাঝিদের সহিত যোগ দিল। দিনভর জাল নিক্ষেপ ও নৌকা বাহিবার কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তাহাদের রাত্রির আহার জুটিত সমুদ্রের টাটকা মৎস্যের ঝোল আর গরম ভাত। উদ্দেশ্য ছিল ভংভাং দিয়া মাঝিদের বার্মা-থাইল্যান্ড উপকূল পর্যন্ত লইয়া যাওয়া। যদিও তাহাদের আলাপের ঢং শুনিয়া কানের নিচে দুইটা দিতে কেবল বাকি রাখিয়াছিল মাঝিরা।

    ট্রলার সাগরবক্ষে দুলিতে আরম্ভ করিবার অর্ধ ঘণ্টার মধ্যেই মাকুর বাপের বদনমণ্ডল সবুজ বর্ণ ধারণ করিল এবং সে ট্রলারের এক কোণে গিয়া আশ্রয় লইল। তাহার একমাত্র কার্য ছিল, মস্তক ঘূর্ণনপূর্বক ভূপতিত হইবার পূর্বেই বমন করা। অন্যদিকে, হাতুড়ে প্রবল উৎসাহে কার্যে নামিয়া পড়িল। কিন্তু “টাটকা মৎস্যের ঘ্রাণ” আর “মৎস্যের আঁশটে গন্ধের” মধ্যে যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, তাহা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিল। দিবসের অন্তে তাহার সর্বাঙ্গ হইতে এমন এক গন্ধ নির্গত হইতেছিল যে, তাহার নিজেরই বমনোদ্রেক হইবার উপক্রম হইল!

    ​হাতুড়ে অবশ্য মাকুর বাপকে সান্ত্বনা প্রদান করিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু মাকুর বাপের অবস্থা তখন শোচনীয়। সে কেবল কোনোমতে উত্তর দিল যে, তাহার আত্মা দেহত্যাগ করিবার উপক্রম হইয়াছে এবং সে স্থলে অবতরণ করিতে চায়। তাহাদের “টাটকা মৎস্যের ঝোল” পাইবার স্বপ্নও ভগ্ন হইল, কারণ নাবিকদের আহার্য ছিল কেবল লবণ সহযোগে সিদ্ধ মৎস্য ও ভাত।

    ​ট্রলারের মাঝি হাতুড়ের অতিরিক্ত উৎসাহ এবং মাকুর বাপের পীড়ায় বিরক্ত হইয়া তাহাদিগকে থাইল্যান্ডের এক অপরিচিত জেলেপাড়ায় নামাইয়া দিল। আগেই বলিয়াছিলাম মাঝি কানের নিচে দুইটা দিতে বাকি রেখেছে, তবে পারিশ্রমিকস্বরূপ তাহাদের হস্তে দুইটি মাঝারি আকারের রুপচাঁদা মৎস্য ধরাইয়া দেওয়া হইল।

    ​হাতুড়ে কিঞ্চিৎও হতাশ হইল না। সে মাকুর বাপকে বুঝাইল যে, ইহাই হইল বিনিময় প্রথা এবং তাহারা মৎস্যের বিনিময়ে তণ্ডুল-ডাল সংগ্রহ করিয়া ফেলিবে। কিন্তু মাকুর বাপ তাহার এই উদ্ভট পরিকল্পনায় সায় দিতে পারিল না। সে স্মরণ করাইয়া দিল যে, জেলেপাড়ায় কেহ মৎস্য ক্রয় করিতে আসিবে না। মাকুর বাপের কথাই সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইল।

    ​কয়েক ঘণ্টা পর, এক দয়ালু বৃদ্ধা তাহাদের দুরবস্থা দেখিয়া এক বাটি টম ইয়াম স্যুপ ও ভাত দিয়া গেল। সুরুয়ার প্রথম চামচ মুখে দিতেই মাকুর বাপের কর্ণ দিয়ে ধুঁয়া নির্গত হইবার উপক্রম হইল। অগ্নিবৎ ঝাল সেই স্যুপ খাইতে খাইতে তাহার মনে হইতেছিল, ইহার অপেক্ষা সাগরের লবণাক্ত জলও শ্রেয় ছিল। কিন্তু হাতুড়ে সগর্বে ঘোষণা করিল যে, তাহাদের মৎস্য বিক্রয়ের পরিকল্পনা সফল হইয়াছে এবং এই স্যুপ হইল তাহাদের লভ্যাংশ! তাছাড়া নোনা মাছ খাইতে খাইতে জিব পঁচিয়া গিয়াছে প্রায়।

    ​তাহারা উপকূল ধরিয়া উত্তর দিকে হাঁটিতে শুরু করিলে পথে এক বিশাল ফলের উদ্যান পড়িল। হাতুড়ের মাথায় তৎক্ষণাৎ নূতন চাকুরির বুদ্ধি খেলিয়া গেল। সে একটি পেঁপে বাগানের মালিকের নিকট গিয়া ইঙ্গিতে বুঝাইবার চেষ্টা করিল যে, তাহারা দুইজন উদ্যানে দণ্ডায়মান থাকিলে কোনো পক্ষী আসিবে না। হাতুড়ে হস্তদ্বয় পক্ষীর ডানার ন্যায় ঝাপটাইয়া “কা কা” শব্দ করিতে লাগিল, আর মাকুর বাপ বিষণ্ণবদনে একটি বৃক্ষের ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিল। উদ্যানের মালিক তাহাদের অদ্ভুত কাণ্ড দেখিয়া এতই আমোদ পাইলেন যে, তিনি তাহাদিগকে তাড়াইয়া না দিয়া উদরপূর্তি করিয়া পেঁপে ও কলা খাইতে দিলেন। পেঁপে খাইতে খাইতে হাতুড়ে মাকুর বাপকে বলিল যে, তাহাদের মেধা মোটেও নষ্ট হইতেছে না।

    ​তাহার কিছুদিন পর তাহারা দেখিল, এক কৃষক তাহার পুরাতন পিকআপ ট্রাকে বাঁধাকপি ও লাউ বোঝাই করিতেছে। হাতুড়ে ছুটিয়া গিয়া কৃষককে ইঙ্গিতে বুঝাইল যে, তাহারা এই সবজির ট্রাকের উপরে বসিয়া মালামাল পাহারা দিবে। ইহার পর আরম্ভ হইল তাহাদের জীবনের সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় যাত্রা। পথের ঝাঁকুনিতে তাহারা একবার বাঁধাকপির স্তূপের উপর উঠিয়া যায়, তো পরক্ষণেই লাউয়ের উপর গিয়া আছড়াইয়া পড়ে। মাকুর বাপ দৃঢ়ভাবে একটি লাউ জড়াইয়া ধরিয়া চক্ষু মুদিত করিয়া বসিয়া রহিল।

    ​ট্রাকটি তাহাদিগকে একটি বৃহৎ শহরের নিকটে নামাইয়া দিয়া গেল। ধূলি ও সবজির রসে সর্বাঙ্গ শিক্ত অবস্থায় অবতরণের পর মাকুর বাপের মনে হইতেছিল, যেন তাহার শরীরের সকল অস্থি সবজিতে পরিণত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহারা সফলভাবে এশিয়ার উপকূল পাড়ি দিয়াছে। এক্ষণে সম্মুখে চীনের সীমান্ত।

  • Some Nosy Question

    Some Nosy Question

    বাংলাদেশীরা স্বভাবগতভাবে অন্যের স্বাধীনতা বা স্পেস বিষয়টা মানতে বা বুঝতে চাননা। এমন না যে, দেশ পাল্টালে এটি চেঞ্জ হয়ে যায়। আপনাকে এমন এমন প্রশ্ন করে বসবে বা এমন আচরণ দেখাবে যা মোটেও গ্রহনযোগ্য নয়। আবার ধরে ধরে ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দেবেন সেই সুযোগ ও নেই। অগত্য ফেসবুকে কিছু জিনিস কীভাবে ট্যাকেল করতে হয় তা শিখিয়ে দিচ্ছি। আপনি চাইলে আপনার নাক গলা মুরব্বীদের এই লেসনটি ধরিয়ে দিতে পারেন। আমি এই পোস্টে প্রথমে তারা কী ধরণের প্রশ্ন করে সেটি লিখব, প্রশ্নটি কীভাবে করা উচিত সেটি বলে দেব, আবার সেই প্রশ্নটির উত্তর আপনি খোঁচা সহ এবং রেগুলার ওয়েতে কীভাবে দেবেন সেটি বলে দেব। পোস্টটি একটি জনসেবামূলক। শুধুমাত্র শেয়ার করা যাবে। কপি করে এধরণের পোস্ট লিখতে নিরুৎসাহিত করা যাবেনা।


    Nosy QuestionWhat They Should AskHow to Respond Without HumorHow to Respond With Humor
    Why aren’t you married yet?How are you enjoying your personal life these days?I’m happy with where I am right now.I’m waiting for the perfect Netflix recommendation!
    Are you planning to have kids soon?How’s life treating you these days?That’s not something I’m focused on right now.I’m busy taking care of my plants.
    How much do you make at your job?How are things going at work?I’m comfortable where I am.Let’s just say I can afford my coffee addiction.
    Why did you leave your last job?What kind of work do you enjoy doing these days?I felt it was time for a new challenge.They stopped serving free coffee, so you can imagine!
    Why are you still renting?How do you like the neighborhood so far?Renting works for me at the moment.I’m waiting for the housing market to stop scaring me!
    Why don’t you have a nicer car?How are you liking your car these days?It gets me where I need to go.Oh, it’s a classic with more character!
    Why don’t you travel more?Do you have any upcoming travel plans?I’m enjoying things locally right now.I’ve been traveling plenty through Netflix documentaries!
    Why don’t you come to neighborhood events more often?How have you been spending your free time lately?I’ve had a lot on my plate.I’m secretly an introvert! But I’ll make an appearance one day.
    What’s wrong? You don’t look well. Are you sick?How have you been feeling lately?I’m doing fine, thanks for your concern!Just saving my energy for something fun later!
    Why did you break up with [person’s name]?How are things going in your personal life?We’ve both moved on.We had ‘creative differences’!
    Why are you always home during the day?How’s your daily routine going?I have a flexible schedule.I’m running the world from my couch!
    Why haven’t you renovated your house?How are you liking your house?I’m happy with how it is for now.I’m going for the ‘vintage charm’ look!
    Why are you still single?How are things going in your personal life?I’m focusing on what makes me happy.I guess I’m just too awesome—it intimidates people!
    How much did you pay for that car?That’s a nice car! How are you liking it?Thanks! I really like it—it suits my needs perfectly.It was worth every penny of my imaginary lottery winnings!
    Why don’t you hang out with anyone?What do you like to do in your free time?I prefer to spend my free time doing my own thing.I’ve got plenty of friends—Netflix, books, and snacks!
    Why haven’t you upgraded your furniture?How’s your home decor coming along?I’m happy with how my space feels right now.It’s a minimalist look—at least that’s what I call it!
    Why don’t you attend community events?Have you had a chance to join community events?I’ve been busy, but I’ll try to make it to future events.I’m waiting for the event with free pizza!
    Why do you dress so casually all the time?I see you like a comfortable style—what’s your go-to outfit?I like to stay comfortable.It’s my ‘fashionably lazy’ look—it’s trending!
    Why don’t you go on vacations more often?Do you have any travel plans coming up?I’m enjoying staying local right now.My dream vacation is a staycation with unlimited snacks!
    You’re always working. Are you a workaholic?How do you balance work with your free time?I enjoy my work but take breaks when needed.I’ve got a serious case of workaholism—no cure but weekends!
    Why did you buy that house?How are you liking your new place?It’s perfect for what I need right now.Less space means less cleaning—it’s a win-win!
    Why haven’t you had any big achievements recently?What have you been working on lately?I’ve been focusing on smaller goals.I’m mastering the art of relaxation—does that count?
    Why did you dye your hair that color?What inspired the change?I wanted to try something new.I just wanted to match my personality—bright and bold!
    Why don’t you cut your hair?I noticed you’ve kept your hair long. Do you prefer it that way?I like it this way; it feels right for me.I’m in a long-term relationship with my hair. We’re inseparable!
    Why do you wear baggy clothes?You seem to prefer a comfortable style. What do you like about it?I feel comfortable and confident in what I wear.I’m just giving myself room to grow… literally!
    Why do you wear makeup every day?Your makeup always looks great! What’s your routine?I enjoy putting on makeup.Why not add a little extra glam to everyday life?
    Why don’t you wear makeup?You have such a natural look! Do you prefer going makeup-free?I’m comfortable without it.I let my natural glow do all the talking!
    Why do you always wear black?What do you like about your go-to style with black?I feel confident in black—it’s my style.It’s my secret superhero outfit—always ready for action!
    Why do you wear heels all the time?You always rock heels! How do you stay comfortable in them?I enjoy wearing heels and find them comfortable.It’s all about confidence—and maybe a little magic!
    Why don’t you dress up?What makes you feel your best when dressing casually?I like dressing in a way that suits me.I’m saving the fancy outfits for the red carpet!
    Why don’t you wear jewelry?Do you prefer a minimalist look with accessories?I prefer to keep things simple and practical.I accessorize with confidence instead!
    Why do you wear so much jewelry?You have a great collection of jewelry! What’s your favorite piece?I enjoy wearing jewelry—it’s part of my style.I’m just a walking treasure chest!
    Why don’t you wear trendy clothes?Your style is so unique! How do you put your outfits together?I prefer to stick to my own style rather than follow trends.I’m ahead of the curve—you’ll see my style trending soon!
  • লটারী প্রাপ্তির বিড়ম্বনা

    লটারী প্রাপ্তির বিড়ম্বনা

    গ্রাম্য লটারীতে কালু আংকেল ভাবছেন একটা লটারী কিনবেন। না, আপনি হয়তো ভাবছেন দশ টাকার টিকেটে ত্রিশ লাখ টাকা জিতার মতো একটা ব্যাপার। আসলে এটি নিছক গ্রাম্য একটা লটারী খেলা, প্রথম পুরষ্কার ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন। আজকাল হাতে হাতে সুপার এমোলেড ক্রিস্প স্ক্রিণের মোবাইল বা বিশাল এলইডি টিভি দেখা জেনারেশন হয়তো ভাবতে পারবেনা শুক্রবারের দুপুরে সাদাকালো টিভিতে বাংলা মুভিতে আলমগীর শাবানার ড্রামা দেখতে কেমন উপভোগ্য হতে পারে। কালু আংকেলের নিজের ভাগ্যের উপর তেমন ভরসা হয়তো ছিলোনা, তিনি আরেকটা জুয়া খেলে ফেললেন লটারি নিয়ে। ধর্মমতে এমনিতে লটারী খেলা পাপের কাজ, তার উপর জুয়া খেলা যেন পাপের উপর শোয়া পাপ। কালু আংকেলের কিছুটা প্রায়শ্চিত তো করতেই হয়। কেমনে কী হলো বিস্তারিত জানাচ্ছি ভণিতা না করে।

    চন্দন কাকু গ্রামের ডাক্তার, বিপদে আপদে সবাই উনাকে পান। উনার ডিসপেনসারিতে গ্রামের মুরব্বীদের সলা-পরামর্শ আলাপ-আলোচনা শালিস-বিচার সব চলে। নাসের আংকেল উনার পাশের চেয়ারে বসে পান খেতে খেতে দাঁত খিলাচ্ছেন। উনি এলাকার মান্যগণ্য ব্যক্তিদের একজন, এলাকার সবাই সমীহ করে চলেন। কালু আংকেল হাসির ছলে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করলেন নাসের কাকুর কাছে। বললেন, ‘ভাই দশ টাকা দ্যান, দেখি লটারীতে কী উঠে!” নাসের কাকু ও আগপিছ না ভেবে হাসতে হাসতে লুঙ্গির কোঁচ খুলে টাকার বান্ডিল বের করলেন। ছেপ দিয়ে গুণে একটা কচকচা দশ টাকা দিলেন কালু আংকেলের হাতে। সেই টাকা দিয়ে কালু আংকেল সেদিনের মতো লটারির টিকেট কিনে বাসায় ফিরলেন।

    দিন গুণে গুণে লটারী ড্র’র দিন এলো। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কালু আংকেলের টিকেট প্রথম পুরষ্কার জিতে নিলেন! এরপরের ঘটনার নাটকের চেয়ে কম যায়না। উনি খুশীতে লাফাতে লাফাতে সাদাকালো টিভি কান্দে তুলে নিলেন। এদিকে নাসের কাকু দিলেন আপত্তি জানিয়ে। যেহেতু উনার টাকা দিয়ে টিকেট কেনা তাই এই টিভির দাবিদার নাসের কাকু!! এক পশলা চোটপাট হয়ে গেলো এনিয়ে। বিনাযুদ্ধে কেউ নাহি দেবে সুচাগ্র মেদেনি। চন্দন কাকুর ডিসপেনসারিতে সালিশ বসল টিভির মালিকানা কে হবে এইনিয়ে। এই পর্যায়ে আপনারাও চিন্তা করেন কাকে মালিকানা দেবেন।

    আমার ছোট মাথায় তখন খেলেনি, এখনো খেলছেনা। আর এমনিতে আমরা এইসব বিচার আচারে আমরা বাচ্চারা কখনো মাথা গলাতে পারতাম না, এমন শত বিচার হয়ে গেছে আমাদের মাথার উপর দিয়ে। আক্ষরিক অর্থে মাথার উপর দিয়ে। কেমনে বুঝায় বলি, তাইলে ক্লিয়ার হবে বুঝতে। ধরেন একটা বিচার হচ্ছে, বাজারে সন্ধ্যায় এইটাও বিনোদনের অংশ। সবাই জড়ো হচ্ছে। চন্দন কাকু মাঝচেয়ারে, আশেপাশের চেয়ারগুলোতে মান্যগণ্য ব্যক্তিরা দখল করে বসেছেন। পাশের টুলে সিনিয়রটি অনুযায়ী অন্যারাও বসেছেন। যারা জায়গা পাননি তারা দাঁড়িয়ে বিচার আচার দেখেন। তো আমরা বাচ্চারা তো তো আর মুরব্বি না যে সামনের সাড়িতে গিয়ে বসব, আবার এত ছোটো ও না যে আংকেলদের কোলে গিয়ে বিচার দেখব। অগত্য সবার পিছনে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে যা দেখা যায় আরকি। মোটামুটি পিচ্চি সাইজের হওয়াতে এজন্য সবাই মাথার উপর সাইজের ই হতো। এজন্যই বললাম বিচার আচার মাথার উপর দিয়ে যেত।

    কালু আংকেল ভার্সেস নাসের কাকু দখলস্বত্বে ফেরত আসি। দুপক্ষের বিস্তর গলাগলির পর সিদ্ধান্ত আসলো টিভির মালিকানা কালু কাকুর ই থাকবে। তবে উনি মুরব্বীদের বাসায় দাওয়াত খাওয়াতে হবে। উনিও রাজী হলেন। খুশী মনে সাদাকালো টিভি কান্দে নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিলেন। অবশ্য উনি উনার কথা রেখেছেন। টিভি জয়ের খুশীতে গ্রামের মুরব্বীদের দাওয়াত খাইয়েছেন। কতটাকা গেছে সেইটা জিজ্ঞেস করছেন তো আমাকে? মিয়া মস্কারী পাইছেন? আমি কী এখন উনার ঘরের খবর ও আপনাকে জানাব?!

  • নিমপ্যাথি

    নিমপ্যাথি

    মারামারি, চুরিচামারি, হল্লাপানা করার ফাঁকে যতটুকু সময় পাওয়া যায় তাহা পড়ালেখার খাতে ব্যয় করিবার জন্য বরাদ্ধ থাকে কানাইদের! আর দশটা গ্রাম্য ছাত্রের মতন কানাই ইস্কুল ফাঁকি দিতে পছন্দ করে। ইচ্ছা করিয়া যে ফাঁকি দে তাহা নয়, যেইদিন পন্ডিত মশাই কঠিন পাঠ মুখস্থ করিতে দেন সেইদিন এই ব্যামোটা তীব্র হইয়া দেখা দেয়! বলা যাইতে পারে, ইস্কুল ফাঁকি দেওয়াটা অভ্যাসবশত ইচ্ছায় পরিনত হইয়াছে! আজ এইরূপ একটা ব্যামো দিবস!

    কানাইয়ের বাবা রঘু কানাইয়ের এই স্বভাব বিগত দিনগুলো ফলো করিয়া আসিতেছিল, তাছাড়া এইরূপ দিবস একদা রঘুরাও কাটাইয়া ছিল। কানাইয়ের ব্যামোর সুত্রপাত আজিকে প্যাটে ব্যথা দিয়া শুরু হইল। ভোর হইতে মটকা মারিয়া প্যাটের ব্যথায় কোকাইতে লাগিল কানাই। পন্ডিত মশাইয়ের কঠিন পাঠ হইতে রক্ষা পাইতে ইহা ছাড়া আর গতি ছিলনা, তাহা ছাড়াও উত্তর পাড়ার রমাদের সহিত বিকালে ফুটবল ম্যাচে অংশগ্রহন করতঃ গ্রামের মান রক্ষার আশু দ্বায়িত্ব কাঁধে নেয়ার প্রয়োজন কানাইয়ের।

    সূর্যটা দশ ঘটিকা পর্যন্ত উদিত হইতেই রঘু ধীরে ধীরে কানাইয়ের বিছানার পাশে গিয়া বসিল, আশু বিপদ আর ভয়ের কথা চিন্তা করিয়া কানাইয়ের কোকানি দ্বিগুন হইতে তিনগুন হইয়া উত্তরোত্তর বাড়িতে লাগিল!

    রঘু জিজ্ঞেস করিল, “এখন কিরূপ বোধ করিতেছ বাপধন?” কানাই কোকানি মিশ্রিত স্বরে যাহা বলিল, তাহার মর্মোদ্ধার করিলে যাহা হয় তাহা হইল আজ কানাইয়ের শেষ দিবস উপস্থিত হইয়াছে। রঘু মনে মনে কি ভাবিতেছিল তাহা ঠাহর করা গ্যালোনা। তারপর বলিয়া উঠিল, “চল বাপধন! বিমার কঠিন হইবার পূর্বেই তাহার সমূলে বিনাশ করিতে হয়। অদ্য তোমাকে হারু ডাক্তারের নিকট হইতে দেখাইয়া আনি। হারু ডাক্তার বহু পুরাতন রোগী ও জটিল রোগ সারাইয়া দিয়াছেন, চল হারু ডাক্তারের কাছে চল!”

    কানাই মনে মনে কহিল, “খাইছে আমারে!” হারু ডাক্তারের মটো যে হয় রোগী নয় রোগ, এই দুইটার যেকোন একটাকে এই তল্লাট ভাগিতে হইবে! কানাইয়ের প্যাটে ব্যথা ক্রমশ ঘামের সহিত কাপুনিতে রূপান্তরিত হইল! আর কহিল, “বাবা, বোধহয় আমার ব্যথা সারিয়া যাইতেছে!” রঘু কহিল, “আজ সারিয়া যাইলেও আগামীকল্য যে আসিবে না তাহা কে বলিতে পারে। বিলম্ব না করিয়া আজিকে একবার দেখাইয়া আসি।” তারপর কানাইকে লইয়া হারুর চেম্বারে রওনা দিল।

    কানাই মনে মনে প্যাট ব্যথার সাপান্ত করিতে লাগিল। আর নিজের পূর্ব কর্মফলের দোষারোপ করিতে লাগিল। চেম্বারে গমন করিবার কিছুদুর পূর্ব হইতে একখান রোগীর মরনপন চিত্‍কার শুনা যাইতেছিল; হারু ডাক্তার রোগীকে ইঞ্জেকশন ফুটাইতেছে। কোবতে,হারু ডাক্তার, ইঞ্জেকশন এই তিনটা সমার্থক শব্দ; যত ব্যথা তত আরোগ্য,ইহা হারুর দর্শন! চিত্‍কার শুনিয়া কানাইয়ের প্রান গলা দিয়া আসিয়া পড়িতে চাহিল, কানাই ঢোক গিলিয়া তাহা নিন্মস্ত করিল। কোন কুক্ষনে যে আজিকে প্যাট ব্যামোর প্ল্যান মাথাই আসিয়াছিল।

    রঘু কানাই সমেত চেম্বার প্রবেশ করতঃ হাতল ভাঙা টুল খানায় বসিয়া পরিল। হারু আজ কোবতের মুডে যে নাই তাহা বিলক্ষন মালুম করা যাইতেছে, কারন প্রতিবারের মতন কোবতে পাঠ খাতার বদলে হাতে শোভা পাইতেছে এলুপ্যাথিক চিকিত্‍সা টুকিটাকি বইখানি! নিশ্চয় কোন পুরাতন রোগী জটিল রোগে ধরাশায়ী হইয়া আসিয়াছেন। হারু রঘুকে সমস্যার কথা জিজ্ঞাসা করিল প্রতিবারের নিয়ম ভঙ্গ করিয়া। রঘু কহিল, “ইস্কুল গমন পূর্বে প্যাটে ব্যামো,মাথা ব্যথা ইত্যাদি নানা প্রকারের ব্যামো কানাইয়ের শরীলে ভর করে। আর ছুটি হইবার পর মুহুর্তে তাহা ছাড়িয়া যায়!”

    হারু ডাক্তার মাথা নাড়িল, এই রোগ তাহার হাড়ে হাড়ে চেনা। হারু ডাক্তার কানাইয়ের চোখের সামনে একটা সিরিঞ্জ রাখিল, আর একটা নির্দোষ ভাইটামিনের এম্পুল ভাঙিয়া তাহা সিরিঞ্জে ভরাইয়া লইল। সকল চিকিত্‍সার বড় চিকিত্‍সা ইঞ্জেকশন, বলিতে বলিতে উহা কানাইয়ের বাম পাশের পাছার উপর খোচাইয়া প্রবেশ করাইয়া দিল। কানাই মাগোওওওও করিয়া একটা চিত্‍কার দিয়াই পরক্ষনে দাঁতে দাঁত চাপিয়া সহ্য করিয়া রইল। হারু ডাক্তার অল্প্ক্ষন পরে সিরিঞ্জখানা পাছা হইতে বাহির করিল। কানাইয়ের মনে হইতে লাগিল তাহার পাছার উপর নরক ভাঙিয়া পড়িয়াছে, একশ ঢেইয়ো পিপীলিকা পাছায় কামড়াইয়া বেড়াইতেছে! অতঃপর রঘু হারুকে জিজ্ঞেস করিল কোন পথ্য দেয়া হইবে কিনা। হারু কহিল, “এলুপেথি,হোমিপথি এইরোগ সমুলে বিনাশ করিতে পারিবে না। এরিজন্য প্রয়োজন নিমপ্যাথি! কানাইকে তিনবেলা নিমপাতা সেদ্ধ করিয়া পথ্য রূপে প্রতিদিন খাওয়াইতে হইবে যতদিন এইরোগের প্রাদূর্ভাব ঘটে! চিকিত্‍সা চলাকালীন সময়ে আহার নিষিদ্ধ,শুধু নিমপাতা খাইয়া প্যাট ভড়াইতে হইবে!”

    অতঃপর তাহারা হারুর চেম্বার হইতে বাড়িতে ফিরিয়া গ্যালো।।

    পুনশ্চঃ সেইবারের পর হইতে পরবর্তীতে কানাই আর এরূপ ব্যামোতে আক্রান্ত হয়নাই!

  • দ্বৈরথ

    দ্বৈরথ

    পড়ালেখায় পাঁঠা শ্রেণীর হওয়াতে আমাকে কালী কাকার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হল। কালী কাকা বাবার দূর সম্পর্কের আত্মীয়, থাকেন শহরের মস্ত ফ্ল্যাটে! অবশ্য গ্রাম থেকে যাওয়ার কারণে শহরের ফ্ল্যাট গুলো আমার মস্ত মস্ত ই লাগে। এর আগেও কালী কাকার বাসায় বেড়াতে গিয়েছি, কিন্তু তল্পিতল্পা গুছিয়ে এই প্রথম। কালী কাকার চৌদ্দপুরুষ জমিদার ছিলেন, জমিদারী রক্ত, চালচলনে জমিদারী ঠাটবাট।

    পাশের ফ্ল্যাট অবিনাশ কাকার, তিনি জমিদার বংশের কেউ না হলেও একেবারে ফেলনা নন, প্রচুর কাঁচা পয়সার মালিক! তিনিও ঠাটবাট নিয়ে ঘোরেন। অবিনাশ কাকার সাথে কালী কাকার সাপে নেউলে সম্পর্ক, কিন্তু কালী কাকা অবিনাশ কাকার সাথে তেমন একটা যুত করতে পারেন না!

    সেবার অবিনাশ কাকা একটি স্কুলের গোড়াপত্তন করে ফেললেন। দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানে গড়ে ঊঠতে লাগল, “অক্সফোর্ড স্কুল এন্ড কলেজ”, প্রাচ্যের নতুন অক্সফোর্ড বলা যায়। পত্রিকায় নতুন অক্সফোর্ডের বিজ্ঞাপন যায়। আমি দক্ষিন জানালায় বসে বসে অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ নিই। ঘ্রানেই অর্ধ ভোজন কিনা, অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ পেয়ে আমার বিদ্যাক্ষুদা চাগার দিয়ে উঠে।

    এদিকে কালী কাকা থেমে নেই। মনে মনে দমে গেলেও অবিনাশ কাকাকে টেক্কা দেয়ার জন্য ফন্দি আঁটেন। সামনে মনসা পূজা, শহরের সবচেয়ে বড় পাঁঠা বলি দিয়ে তিনি অবিনাশ কাকাকে টেক্কা দেবেন! অবিনাশ কাকা যদি অক্সফোর্ড দিয়ে ইহকাল নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে কালী কাকা পাঁঠা দিয়ে ইহকাল পরকাল দুই ই সুনিশ্চিত করতে চান! তবে কালী কাকার পাঁঠা হতে হবে মস্ত বড় আর গায়ের রঙ কুচকুচে কালো।

    টাকায় টাক আনে। কালী কাকার টাকায় নিজের মাথায় টাক না আনলেও টাকার ঘ্রানে কালী কাকার চারপাশে টাক মাথারা মাথা চুলকে ভিড় করেন। কালী কাকা এমনি এক টাক মাথাকে এসিস্ট্যান্ট বানিয়ে নিয়েছিলেন! পাঁঠার ঢাক ঢাক ঢোল রব পেয়ে টাক মাথা বিচলিত হন। খোঁজ খোঁজ রব রব, কিন্তু অতবড় কুচকুচে কালো পাঁঠা মিলবে কোথায়?

    চারিদিক থেকে খবর আসে, কালী কাকা পাঁঠা দেখতে বের হন, কিন্তু পছন্দসই পাঁঠা মিলেনা, সবকটি দেখতে প্রমান সাইজের, কিন্তু উনার চাই ডাবল কিংবা ট্রিপল প্রমান সাইজ! খুঁজতে খুঁজতে নিরাশ কাকু হাল ছেড়ে দেবেন কিনা ভাবেন, মাথা চুলকে এসিস্ট্যান্ট বলেন, কামরুপ থেকে একটি পাঁঠা আনা যেতে পারে, কিন্তু দাম পড়বে মেলা! কাকুর চোখ চকচক করে! দামের ভাবনা কাকুর নেই, কাকুর টাকার অভাব নেই। অবিনাশকে এবার দেখিয়ে দেয়া যাবে!

    দুইদিনের মাথায় গায়ে বোটকা গন্ধ নিয়ে বিশাল কুচকুচে কালো পাঁঠা হাজির। শহরের সবচেয়ে বড় পাঁঠা এবং পাঠার মালিক হিসেবে পত্রিকায় অক্সফোর্ডের বিজ্ঞাপনের পাশে কালী কাকার ছবি যায়। অক্সফোর্ডের বিজ্ঞাপনের পাশে কালী কাকার ছবি পাঁঠা সমেত হাসতে থাকে!

    পাঁঠার জন্য খোঁয়াড় তৈরি হতে থাকে আমার জানালার পাশেই। অক্সফোর্ড আর আমার মাঝখানে ঢুকে যায় পাঁঠার খোঁয়াড়, আর অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ ঠেলে আমার নাকে আসতে থাকে পাঁঠার বোটকা গন্ধ। আমি জানালা বন্ধ করে দিই, অক্সফোর্ডের সব ঘ্রাণ এবারের মতো পাঁঠায় নিক!

    শহরের এমাথা ওমাথা থেকে বড় পাঁঠা দেখতে মানুষের ভিড় বাড়ে। পাঁঠা সর্বভুক, কোন কিছুতেই অরুচি নেই। কাঠালপাতা, খড় ভুষি, কাপড় যা পায় তাই খাবার চেষ্টা করে। দর্শনার্থী দূর থেকে দেখে কালী কাকাকে বাহবা দেয়। একদিন এক দর্শনার্থী পাঁঠার খুব কাছ থেকে পাঠাকে পরখ করতে যায়, আর পাঁঠা উনার ধুতি মুখের কাছে পেয়ে উপাদেয় খাদ্য মনে করে কাছা ধরে টান দেয়! ভেজাল অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ পেতে পেতে পাঁঠার অর্ধ শিক্ষায় ভেজাল প্রবেশ করে, দর্শনার্থী কে ধর্ষণ আর্তি মনে করে ইজ্জতের কাছা ধরে টান মারে পাঁঠা! দর্শনার্থী ধ্রুপদির মতো কাছার একপ্রান্ত ধরে টানাটানি করে কোনরকমে কাছাখানা হ্যাঁচকা টানে উদ্ধার করেন, যদিও ইজ্জতের কিছু অংশ পাঁঠার মুখে রয়ে যায়, আর পাঁঠা সেই অংশটি বিরস মনে জাবড়াতে থাকে!

    পুজোর আর সপ্তাখানেক বাকি, সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে চারিদিকে একটা চনমনে ভাব। আমি বাইরে বের হই, হাটতে হাটতে পাঁঠার খোঁয়াড়ের দিকে এগিয়ে যাই। পাঁঠার গায়ে সামান্য বৃষ্টির ছাঁট মতো লেগেছে মনে হয়, হঠাত ছাঁট লাগা অংশে আমার চোখ যায়। সেখানে কুচকুচে কালো রঙয়ের বদলে ধূসর রঙ প্রতিভাত হয়! আর পায়ের নিচে একটা কালো পানির ধারা! কালী কাকা খবর শুনে দৌড়ে আসেন। পাঠাকে ভাল করে দলাই মলাই দিয়ে স্নান করানো হয়, ইতিমধ্যে পাঁঠার গায়ে জায়গায় জায়গায় ভারত ভূখণ্ডের ম্যাপের মতো ধূসর রঙ প্রতিভাত হতে থাকে! আমাদের সকলের বুঝতে বাকি থাকেনা, টাক মাথার এজেন্ট কামাক্ষার পাঁঠার গায়ে ভেজাল কলপের প্রলেপ লাগিয়েছে! বিমর্ষ কালী কাকা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন।