Category: writings

  • ইশ্বরীর নগর

    ঈশ্বরী যেদিন নগর পত্তন করলেন,
    সেদিনই কৌশলে আমাদের মননে
    ভালোবাসার বিষ ঢেলে দিয়েছিলেন।

    যেদিন তুমি চেয়েছিলে সব ভুলে যেতে,
    আমাকেও তখন বাধ্য হয়ে ভুলে যেতে হয়েছিল ‘আমাদের’।
    আমরা পরস্পরকে কেবল অভিমানটুকুই ভাগ করে দিতে পেরেছিলাম।

    ​সেদিন আমরা মনোযোগ দিয়ে পাখির ডাকে প্রেম খুঁজে ফিরতাম।

    আজ অখণ্ড অবসরে সেই পাখির ডাকেই কেবল হাহাকার মিশে থাকে।
    এই যান্ত্রিক নগরের বিষ আর বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার—বড্ড ক্লান্ত করে তুলেছিল আমাকে।

    ​ঈশ্বরী আমার এই ক্লান্তি দেখলেন।
    করুণা হলো তাঁর, কিংবা কৌতুক।
    বর দিলেন—”তথাস্তু! তোমাকে দ্বিগুণ সময় দিলাম।”

    তারপর থেকে আমি ঘুমিয়ে আছি।

    লিংকন, নিউইয়র্ক

    ৪ই ডিসেম্বর, ২০২৫ইং

  • অস্তিত্বের সংকট ও অনিবার্য গন্তব্য: বাংলাদেশের ভৌত সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক মরীচিকা এবং ২০৩৫ সালের আসন্ন মহাবিপর্যয়ের একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ

    অধ্যায় ১: বর্তমান বাস্তবতা – ভৌত সীমাবদ্ধতা এবং ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট

    ১.১ ভূমির নির্মম গণিত এবং জনসংখ্যার চাপ

    বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বের যে সংকটটি সবচেয়ে প্রকট অথচ অদৃশ্যভাবে কাজ করছে, তা হলো ভূমির প্রাপ্যতা বনাম জনসংখ্যার চাহিদার এক অসম সমীকরণ। আমরা সচরাচর উন্নয়নকে জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের চশমায় দেখে অভ্যস্ত, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রাথমিক ও মৌলিক শর্ত হলো তার ভৌত বা ফিজিক্যাল স্পেস। নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ টেনে প্রায়শই বলা হয় যে প্রযুক্তির মাধ্যমে কম জমিতেও অধিক উৎপাদন সম্ভব, কিন্তু এই তুলনার আড়ালে বাংলাদেশের মাটির গভীরতর ক্ষয় ও অব্যবস্থাপনার চিত্রটি চাপা পড়ে যায় । নেদারল্যান্ডস আয়তনে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়েও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ হতে পেরেছে কারণ তারা জমির উৎপাদনশীলতাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশ তার জমির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গিয়ে মাটির প্রাণশক্তিকেই নিঃশেষ করে ফেলেছে ।

    বাংলাদেশের বর্তমান মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার বা প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ একর। ১৮ কোটি বা তার অধিক জনসংখ্যার এই দেশে যদি আমরা সাধারণ গাণিতিক বিভাজন করি, তবে মাথাপিছু মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ০.২০ একর বা ২০ শতাংশ । এই পরিসংখ্যানটি আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হয়, বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন। কারণ এই ০.২০ একরের পুরোটাই ব্যবহারযোগ্য বা আবাদযোগ্য নয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বিশাল নদী অববাহিকা, সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, এবং ক্রমবর্ধমান নগরায়নের ফলে সৃষ্ট রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি। বিশ্বব্যাংক এবং ম্যাক্রোট্রেন্ডসের সাম্প্রতিক ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ০.০৫ হেক্টরের নিচে নেমে এসেছে । অর্থাৎ, একজন মানুষের সারা বছরের খাদ্য উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ কাঠা জমি, যা আধুনিকতম কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পুষ্টি সরবরাহের জন্য যথেষ্ট নয়।

    গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের (Global Footprint Network) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, একজন মানুষের গড়পড়তা জীবনযাপনের জন্য—যা খুব বিলাসী নয় বরং মৌলিক চাহিদা পূরণ করে—প্রয়োজন ১.৭ গ্লোবাল হেক্টর বা প্রায় ৪.২ একর জমি 5। এই জমির মধ্যে শুধু খাদ্য উৎপাদনের জমিই নয়, বরং কাপড়ের জন্য তন্তু উৎপাদনের জমি, বর্জ্য ও কার্বন শোষণের জন্য বনভূমি এবং বসবাসের অবকাঠামোও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি আমরা অত্যন্ত ন্যূনতম বা ‘ফকিরা’ লাইফস্টাইলও বিবেচনা করি, তবুও একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বছরে ১ টন খাদ্য ও আনুষঙ্গিক বায়োলজিক্যাল মেটেরিয়াল উৎপাদনের জন্য ন্যূনতম ০.৫ একর জমির প্রয়োজন হয়। এর সাথে আবাসন ও অবকাঠামোর জন্য ০.১ একর এবং কার্বন শোষণের (Carbon Sink) জন্য ০.৪ একর যোগ করলে মোট ন্যূনতম প্রয়োজন দাঁড়ায় ১.০০ একর । অথচ আমাদের হাতে আছে মাত্র ০.২০ একর। এই হিসাবটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে তার প্রাকৃতিক সামর্থ্যের চেয়ে ৫ গুণ (5x) বেশি চাপে বা ‘ইকোলজিক্যাল ডেফিসিট’-এ রয়েছে । এই বিশাল ঘাটতি বা ‘দ্য ডেফিসিট’ প্রমাণ করে যে, বর্তমানে আমরা যে জীবনযাপন করছি তা টেকসই নয়, বরং এটি একটি ধার করা সময়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

    ১.২ অদৃশ্য জমি বা ‘গোস্ট একর’ আমদানি: বিভ্রমের অর্থনীতি

    স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, যদি আমাদের প্রয়োজনীয় জমি না থাকে এবং আমরা আমাদের ইকোলজিক্যাল সীমার বাইরে অবস্থান করি, তবে ১৮ কোটি মানুষ খাচ্ছে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে বিশ্ববাণিজ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা “ভার্চুয়াল ল্যান্ড” বা “অদৃশ্য জমি” আমদানির ধারণার মধ্যে। বাংলাদেশ যখন বিদেশ থেকে গম, ভোজ্য তেল, ডাল, চিনি বা তুলা আমদানি করে, তখন সে কেবল পণ্য আমদানি করে না, বরং সে অন্য দেশের জমি ভাড়া করে ব্যবহার করে। একে বলা হয় “Importing Ghost Acres” । উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের যে বিশাল চাহিদা রয়েছে, তা মেটানোর জন্য সয়াবিন বা পাম তেল উৎপাদন করতে যে পরিমাণ জমির প্রয়োজন, তা আমাদের নেই। ফলে আমরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ লক্ষ একর জমি ব্যবহার করছি এই তেল উৎপাদনের জন্য । একইভাবে, তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য যে বিপুল পরিমাণ তুলা প্রয়োজন, তা আমেরিকা, ভারত বা আফ্রিকার মাটি থেকে আসে।

    গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ যদি তার আমদানিকৃত সকল পণ্য নিজস্ব জমিতে উৎপাদন করতে চাইত, তবে দেশের বর্তমান আয়তনের চেয়ে আরও ২ থেকে ৩ গুণ বেশি জমির প্রয়োজন হতো । অর্থাৎ, আমরা বিশ্ববাজার থেকে “অদৃশ্য জমি” ভাড়া নিয়ে আমাদের পেট চালাচ্ছি এবং অর্থনীতি সচল রাখছি। এই পরনির্ভরশীলতা বা ‘ট্রেড ডিপেন্ডেন্সি’ আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে একটি বিপজ্জনক চক্রের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমরা আমাদের “উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা” বা লেবার ক্লাসকে বিদেশে রপ্তানি করছি, যারা সেখানে শ্রম দিয়ে ডলার উপার্জন করছে। সেই রেমিট্যান্সের ডলার দিয়ে আমরা বিশ্ববাজার থেকে খাদ্য বা “অদৃশ্য জমি” কিনছি। এই চক্রটি—মানুষ রপ্তানি করো > ডলার আনো > খাবার কেন > বেঁচে থাকো—ততক্ষণই চলবে যতক্ষণ বিশ্ববাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং আমাদের জনশক্তি রপ্তানি অব্যাহত থাকবে 1। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ বা কোভিড-পরবর্তী সাপ্লাই চেইন ডিসরাপশনের মতো ঘটনায় যখন বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন এই ভঙ্গুর মডেলটি চরম আঘাতের সম্মুখীন হয়, যা আমরা সাম্প্রতিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির চিত্রে দেখতে পাচ্ছি ।

    ১.৩ মাটির সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া: ইকোলজিক্যাল ওভারস্পেন্ডিং

    আমরা বর্তমানে যে উৎপাদনশীলতা দেখাচ্ছি, তা মাটির স্বাভাবিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে, যাকে বলা হয় “Mining the Soil” । হাজার বছর ধরে মাটির নিচে যে খনিজ ও পুষ্টি উপাদান জমা হয়েছিল, তা আমরা গত কয়েক দশকের ইনটেন্সিভ ফার্মিং বা নিবিড় চাষাবাদের মাধ্যমে নিঃশেষ করে ফেলেছি। মাটির উর্বরতা শক্তি বা ‘টপসয়েল ফার্টিলিটি’ ধরে রাখার জন্য আমরা এখন ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করছি। কিন্তু অতিরিক্ত ইউরিয়া ও কেমিক্যাল ব্যবহারের ফলে মাটি তার জৈব প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলছে । এর ফলে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে: আগে ১ কেজি সারে যে পরিমাণ ধান উৎপাদিত হতো, এখন ২ কেজি সার ব্যবহার করেও সেই একই পরিমাণ উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ, উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু আউটপুট বা ফলন আনুপাতিক হারে বাড়ছে না, যাকে অর্থনীতিতে “ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্নস” বলা হয়।

    মাটির এই “বার্ধক্য” বা ক্লান্তি (Soil Fatigue) ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত। আজ আমরা যে জমিতে ১০ মণ ধান পাচ্ছি, মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ২০ বছর পর সেখানে ৫ মণ ধানও পাওয়া কঠিন হবে । আমরা মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগের উর্বরতা ও সম্পদ আজকেই ভোগ করে ফেলছি। একে বলা হয় ‘ইকোলজিক্যাল ডেট’ বা পরিবেশগত ঋণ, যা পরিশোধ করার কোনো উপায় আমাদের জানা নেই। এই ঋণের বোঝা যখন অসহনীয় হয়ে উঠবে, তখন কৃষি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।


    অধ্যায় ২: পানির সংকট এবং ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা – অতীতের ভুল এবং বর্তমানের দণ্ড

    ২.১ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর: এক নীরব মৃত্যুঘণ্টা

    বাংলাদেশের কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ভিত্তি হলো পানি, কিন্তু এই পানি কোথা থেকে আসছে এবং কতদিন থাকবে, তা নিয়ে একটি ভয়াবহ ভ্রান্ত ধারণা বা “ইলিউশন” কাজ করছে। আমরা নিজেদের নদীমাতৃক দেশ বলে দাবি করি, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের পানীয় জল এবং সেচ কার্যের ৯৭ শতাংশই আসে মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ স্তর বা ‘একুইফার’ থেকে 10। এই ভূগর্ভস্থ পানি হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নিচে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হয়েছে, যা আমাদের জন্য ছিল একটি প্রাকৃতিক সঞ্চয় বা ‘ফিক্সড ডিপোজিট’। কিন্তু গত ৩০ থেকে ৪০ বছরে, বিশেষ করে সবুজ বিপ্লবের পর থেকে, আমরা এই ৫০০০ বছরের সঞ্চয় প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছি।

    নাসার গ্রেস (GRACE) মিশনের স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এবং উত্তর ভারতের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতিতে হ্রাস পাচ্ছে । নাসা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের সূক্ষ্ম পরিবর্তন পরিমাপ করে এই তথ্য দিয়েছে। যেখানে পানি কমে যায়, সেখানে মাটির ভর কমে যায় এবং মাধ্যাকর্ষণ সামান্য দুর্বল হয়। এই ডেটা কোনো জরিপ বা অনুমান নয়, এটি হার্ড সায়েন্স। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব তথ্যেও এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় যেখানে মাত্র ১০০-১৫০ ফুট নিচে পানি পাওয়া যেত, ২০২৪ সালে এসে সেখানে পানি পেতে ১,০০০ ফুট বা তার চেয়েও গভীরে পাম্প বসাতে হচ্ছে । ওয়াসার ইঞ্জিনিয়াররা প্রতি বছর মাটির গভীরে আরও নিচে নামতে বাধ্য হচ্ছেন, যা প্রমাণ করে যে আমরা একটি ‘ডেথ স্পাইরাল’-এ প্রবেশ করেছি। পানির স্তর প্রতি বছর ২-৩ মিটার করে নিচে নামছে, এবং এই হার ত্বরান্বিত হচ্ছে ।

    ২.২ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি বিপর্যয় এবং ক্রপ প্যাটার্ন পরিবর্তন

    পানির এই সংকট কেবল ঢাকার মতো মেগাসিটিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল (রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ) একসময় ধানের ভাণ্ডার ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে সেচ কাজের জন্য শ্যালো মেশিন বা সাধারণ টিউবওয়েলে আর পানি উঠছে না। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BMDA)-এর ডেটা অনুযায়ী, পানির স্তর অনেক জায়গায় ১৫০-২০০ ফুটের নিচে নেমে গেছে 10। এর ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে ধান চাষ—যা প্রচুর পানি বা ‘ওয়াটার ইনটেন্সিভ’ ফসল—বাদ দিয়ে আম, পেয়ারা বা ড্রাগন ফলের বাগান করছেন ।

    এই পরিবর্তনকে আপাতদৃষ্টিতে ‘কৃষি বৈচিত্র্যকরণ’ বলা হলেও, এর পেছনের কারণটি হলো টিকে থাকার লড়াই। ১ কেজি বোরো ধান ফলাতে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয় । যখন মাটির নিচ থেকে এই পানি তোলা অসম্ভব বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে (বিদ্যুৎ ও ডিজেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায়), তখন কৃষকের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এটি প্রমাণ করে যে, পানির অভাব ইতিমধ্যেই আমাদের কৃষি মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে যখন পানির স্তর আরও নিচে নামবে, তখন ফলের বাগান করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

    ২.৩ নদী ও বন্যার পানি: রিচার্জের ভ্রান্ত তত্ত্ব

    একটি প্রচলিত ধারণা বা ‘মিথ’ হলো, বাংলাদেশ যেহেতু বদ্বীপ এবং এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বন্যা হয়, তাই মাটির নিচের পানির স্তর প্রাকৃতিকভাবে রিচার্জ বা পূর্ণ হয়ে যায়। একে তাত্ত্বিকভাবে “Bengal Water Machine” বলা হলেও, সাম্প্রতিক হাইড্রো-জিওলজিক্যাল স্টাডি এবং মাটির গঠন বিশ্লেষণ এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। ঢাকা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির নিচে ৩০ থেকে ১০০ ফুট পুরু লাল এঁটেল মাটি (Madhupur Clay) বা কাদার স্তর রয়েছে । এই কাদার স্তরটি একটি অভেদ্য বা “Impermeable” পর্দার মতো কাজ করে, অনেকটা পলিথিন শিটের মতো।

    বন্যার পানি যখন মাটির ওপরে ভাসে, তখন তা এই আঠালো কাদার স্তর ভেদ করে মাটির গভীর স্তরে (Deep Aquifer)—যেখান থেকে আমরা পরিষ্কার পানি তুলি—সেখানে পৌঁছাতে পারে না। একে ভূতাত্ত্বিক ভাষায় বলা হয় “Aquitard”। গবেষণায় দেখা গেছে, ওপরের স্তর থেকে এক ফোঁটা পানি গভীর স্তরে পৌঁছাতে ১০০ থেকে ৫০০ বছর সময় নিতে পারে 10। অথচ আমরা শক্তিশালী পাম্প দিয়ে সেই পানি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তুলে ফেলছি। অর্থাৎ, মাটির নিচের ব্যাংক থেকে টাকা তোলার গতি (Extraction Rate) টাকা জমা হওয়ার গতির (Recharge Rate) চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি। ফলে প্রতি বছরই ঘাটতি বাড়ছে এবং একটি স্থায়ী শূন্যতা বা “Permanent Deficit” তৈরি হচ্ছে 10। এছাড়া, ঢাকার মতো শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং কংক্রিটের জঙ্গল বৃষ্টির পানিকে মাটির সংস্পর্শে আসতে দেয় না; পানি ড্রেন হয়ে নদীতে এবং অবশেষে সাগরে চলে যায়, যাকে বলা হয় “Runoff” ।

    ২.৪ লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং আর্সেনিকের বিষ

    ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে উপকূলীয় জেলাগুলোতে এক নতুন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে—লবণাক্ততা বৃদ্ধি বা “Salinity Intrusion”। মাটির নিচের মিষ্টি পানির চাপ বা প্রেসার কমে গেলে সাগরের লোনা পানি সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে মাটির নিচ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। সাতক্ষীরা, খুলনা বা বাগেরহাটের মতো এলাকাগুলোতে সাধারণ টিউবওয়েলে এখন লোনা পানি উঠছে, যা পান করা বা চাষাবাদ কোনো কাজেই লাগে না । মানুষ চারদিকে পানিতে থেকেও মাইলের পর মাইল হেঁটে এক কলসি মিষ্টি পানির জন্য ছুটছে।

    অন্যদিকে, মাটির উপরের স্তরের (Shallow Aquifer) পানিতে আর্সেনিক এবং নানা ধরনের জীবাণুর উপস্থিতি থাকায় মানুষ গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সেই গভীর স্তরের পানিও যখন শেষ হয়ে যাবে বা লোনা হয়ে যাবে, তখন আমাদের সামনে বিকল্প কী? সাগরের পানি শোধন করে পানযোগ্য করা বা “Desalination” প্রযুক্তি ইসরায়েল বা সৌদি আরবের মতো ধনী দেশগুলোর পক্ষে সম্ভব হলেও, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তা অসম্ভব। বর্তমানে মাটির নিচের ১,০০০ লিটার পানি তুলতে খরচ হয় মাত্র ৩-৫ টাকা (বিদ্যুৎ খরচ), কিন্তু সমপরিমাণ সাগরের পানি শোধন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকায় আনতে খরচ পড়বে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা । এই ৪০-৫০ গুণ বেশি খরচ বহন করার সামর্থ্য সরকার বা সাধারণ জনগণ কারোরই নেই। ফলে, ভবিষ্যতে পানি থাকলেও তা “কেনার ক্ষমতা” মানুষের থাকবে না।


    অধ্যায় ৩: অর্থনৈতিক বিভ্রম এবং রেমিট্যান্সের চক্র – ভবিষ্যৎ অন্ধকারের পূর্বাভাস

    ৩.১ রেমিট্যান্সের ‘ভেন্টিলেশন’ বা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম

    বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাকে একটি “আর্টিফিশিয়াল লাইফ সাপোর্ট” বা ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। এই ব্যবস্থার মূল মন্ত্র হলো একটি চক্র: মানুষ রপ্তানি করো > ডলার আনো > খাবার ও পণ্য কেন > বেঁচে থাকো । দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান এবং সম্পদের অভাব থাকায় আমরা আমাদের “উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা” বা ‘Surplus Population’-কে বিদেশে রপ্তানি করছি। এই প্রবাসী শ্রমিকরা, যারা মূলত অদক্ষ বা সেমি-স্কিলড, হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে দেশে ডলার পাঠাচ্ছে। এই ডলার দিয়েই আমরা বিদেশ থেকে খাদ্য, জ্বালানি এবং বিলাসদ্রব্য আমদানি করছি। অর্থাৎ, রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির সেই অক্সিজেন, যা বন্ধ হলে পুরো সিস্টেমটি ধসে পড়বে।

    ৩.২ দ্বিতীয় প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ এবং প্রভাবের অভাব

    রেমিট্যান্সের প্রবাহ চিরস্থায়ী নয়। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীরা (যারা বর্তমানে বিদেশে আছেন) দেশে থাকা মা-বাবা বা ভাই-বোনের প্রতি আবেগের টানে টাকা পাঠান। কিন্তু তাদের সন্তানরা, অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রজন্ম (Second Generation), যারা বিদেশের মাটিতে এবং বিদেশি সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে, তাদের বাংলাদেশের প্রতি সেই নাড়ির টান বা দায়বদ্ধতা থাকবে না। ফলে, এক প্রজন্মের মধ্যেই “Direct Cash Flow” বা সরাসরি টাকার প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার শতভাগ ঝুঁকি রয়েছে 1

    ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চীন বা ভারতের প্রবাসীরাও একসময় টাকা পাঠানো কমিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা টাকার বদলে দেশে নিয়ে এসেছে “প্রভাব” (Influence) এবং “বিনিয়োগ” (Investment)। তারা বিদেশের বড় বড় টেক জায়ান্ট বা বহুজাতিক কোম্পানির সিইও বা নীতি নির্ধারক হয়ে দেশের জন্য লবিং করেছে বা অফিস খুলেছে । কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ, আমরা মূলত যে “লেবার ক্লাস” বা অদক্ষ শ্রমিক রপ্তানি করছি, তাদের সন্তানরা কি বিদেশের মূলধারায় (Mainstream) মিশে সেই “ইনফ্লুয়েন্সার” লেভেলে পৌঁছাতে পারছে? নাকি তারাও সেখানে নিম্ন আয়ের কাজে বা স্ট্রাগল করে জীবন কাটাচ্ছে? যদি তারা মূলধারায় মিশতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ না পাবে টাকা, না পাবে কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। এটি আমাদের জন্য একটি “Lose-Lose Situation” তৈরি করবে ।

    ৩.৩ সস্তা শ্রমের দিন শেষ এবং অটোমেশনের হুমকি

    বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ববাজারে টিকে আছে মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর ভর করে, যার প্রধান চালিকাশক্তি হলো সস্তা শ্রম। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’-এর আগমনে এই সুবিধাও হুমকির মুখে। উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে জার্মানি ও আমেরিকা, এখন অটোমেশন এবং রোবোটিক্সের দিকে ঝুঁকছে। যদি তারা রোবট দিয়ে টি-শার্ট তৈরি শুরু করে, তবে তাদের উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের শ্রমিকের চেয়েও কম হবে এবং জাহাজ ভাড়ার (Shipping Cost) কোনো প্রয়োজন হবে না ।

    আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে যদি অটোমেশনের কারণে আমাদের গার্মেন্টস অর্ডার ৩০% থেকে ৪০% কমে যায়, তবে লাখ লাখ মানুষ বেকার হবে। একই সময়ে যদি দ্বিতীয় প্রজন্মের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়ে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে “ডলার সংকট” এক ভয়াবহ রূপ নেবে। তেল, গ্যাস বা খাদ্য আমদানির মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোর ডলার তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে থাকবে না। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধস আমাদের জন্য একটি টাটকা উদাহরণ, যেখানে ডলার সংকটের কারণে পুরো দেশ অচল হয়ে পড়েছিল ।

    ৩.৪ বৈশ্বিক ইমিগ্রেশন ফিল্টার: ‘Skilled’ বনাম ‘Dependent’

    অনেকে ভাবেন জনসংখ্যা বাড়লে সমস্যা নেই, তাদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু এই ধারণাটি ভুল। উন্নত বিশ্ব এখন আর ঢালাওভাবে অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন দিচ্ছে না; তারা এখন “ফিল্টার” করছে । জাপান, জার্মানি বা কানাডার জনসংখ্যা কমছে এবং তাদের মানুষের দরকার, এটা সত্য। কিন্তু তাদের দরকার “Skilled Human” বা দক্ষ মানুষ, কোনো “Dependent Human” বা অদক্ষ বোঝা নয়। আমাদের অদক্ষ জনশক্তি এখন বিশ্বের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদি আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে দক্ষ করতে না পারি এবং জনসংখ্যা কমানোর নীতি গ্রহণ করি, তবে ৩০ বছর পর আমরা “Japan Scenario”-তে পড়ব—অর্থাৎ একটি বয়স্ক মানুষের দেশ—কিন্তু জাপানের মতো আমাদের কোনো সঞ্চিত অর্থ বা সম্পদ থাকবে না। একে অর্থনীতিতে বলা হয় “Getting old before getting rich” বা ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো হয়ে যাওয়া ।


    অধ্যায় ৪: ২০৩০-৩৫ সালের মহাবিপর্যয় এবং কফিনে শেষ পেরেক

    ৪.১ জ্বালানি সংকট: ২০৩০ সালের ডেডলাইন

    বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প এবং বিদ্যুৎ খাতের একটি বিশাল অংশ সস্তা ও নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সস্তা জ্বালানির দিন ফুরিয়ে আসছে। পেট্রোবাংলার রিপোর্ট এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে । বর্তমানে আমরা চড়া দামে এলএনজি (LNG) আমদানি করে এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু ডলার সংকটের কারণে তা টেকসই হচ্ছে না।

    ২০২৫ সালের ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (IEA) রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে, এলএনজি আমদানির ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আগামী দশকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে । গ্যাস ফুরিয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৩ থেকে ৪ গুণ বেড়ে যাবে। এর সরাসরি এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়বে কৃষিতে। সেচ পাম্প চালানোর খরচ বাড়লে ধানের উৎপাদন খরচ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। সরকার তখন আর ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না ।

    ৪.২ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার সমীকরণ

    বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের কফিনে শেষ পেরেকটি কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা দুর্নীতি হবে না; এটি হবে পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতির একটি বিন্দুতে মিলে যাওয়া—”যেদিন ১ কেজি চাল উৎপাদনের খরচ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে” । একে অর্থনৈতিক ভাষায় বলা হয় “Stagflation with Resource Scarcity”। ২০৩০-৩৫ সালের দিকে যখন পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সেচ খরচ বাড়বে এবং গ্যাসের অভাবে সারের দাম আকাশছোঁয়া হবে, তখন চালের কেজি ২০০-৩০০ টাকায় পৌঁছাতে পারে।

    একই সময়ে ডলার সংকটের কারণে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি ব্যাহত হলে দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা তৈরি হবে। ক্ষুধার্ত মানুষ তখন কোনো যুক্তি, ধর্ম বা দেশপ্রেম মানবে না। এর ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা (Civil Unrest), খাদ্য গুদাম লুণ্ঠন এবং রাস্তায় ছিনতাই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হবে। পুলিশ বা সামরিক বাহিনী দিয়ে ১৮ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এটি একটি “Death Spiral” বা মরণফাঁদ, যেখানে একটি সমস্যা অন্যটিকে আরও তীব্র করে তুলবে ।

    ৪.৩ জলবায়ু পরিবর্তন এবং বর্ডার ক্লোজার: আটকা পড়া জনগোষ্ঠী

    ভবিষ্যতের এই বিপর্যয়ের সাথে যুক্ত হবে জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭% জমি পানির নিচে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা কোটি কোটি মানুষকে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে (Climate Refugees) পরিণত করবে । অতীতে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হিজরত করতে পারত, কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে তা অসম্ভব। ভারত ইতিমধ্যেই কাঁটাতার দিয়ে সীমান্ত ঘিরে রেখেছে এবং তারা কোনোভাবেই এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঢুকতে দেবে না। উন্নত বিশ্বও তাদের বর্ডার সিল করে দেবে। ফলে এই বিপুল জনগোষ্ঠী একটি ছোট ভূখণ্ডে আটকা পড়বে। এই পরিস্থিতিকে “Malthusian Correction” বা প্রকৃতির নিষ্ঠুর ভারসাম্য রক্ষা প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে মহামারী, দুর্ভিক্ষ বা গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে জনসংখ্যা কমে আসবে ।

    ৪.৪ সামষ্টিক আচরণে বিপর্যয়ের লক্ষণ (Collective Behavior)

    সরকারি ডেটা বা পরিসংখ্যান আড়াল করা হলেও, সমাজের মানুষের সামষ্টিক আচরণে (Collective Behavior) আসন্ন বিপর্যয়ের লক্ষণগুলো এখনই ফুটে উঠছে।

    ১) টিসিবির ট্রাকের পেছনে এখন শুধু বস্তিবাসী নয়, ভদ্রলোকরাও দাঁড়াচ্ছে। লজ্জা ঢাকতে তারা মাস্ক বা হেলমেট পরে থাকছে। এটি প্রমাণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে (Hidden Poverty)।

    ২) মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা ১ লিটার তেল বা বড় শ্যাম্পুর বোতল না কিনে ৫-১০ টাকার মিনিপ্যাক বা খোলা পণ্য কিনছে। এটি ব্যাপক দারিদ্র্যের লক্ষণ (Poverty Penalty)।

    ৩) মানুষের ভাতের পাতে মাছ বা মাংসের টুকরো ছোট হয়ে গেছে বা গায়েব হয়ে গেছে। তারা এখন প্রোটিন বাদ দিয়ে সস্তা কার্বোহাইড্রেট (ভাত/আলু/ভর্তা) খেয়ে পেট ভরাচ্ছে। এটি ‘পুষ্টির অভাব’ বা ‘Hidden Hunger’-এর লক্ষণ।

    ৪) নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি জেনেও মানুষ সাগর বা জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাবা-মা শেষ সম্বল বিক্রি করে সন্তানকে অনিশ্চিত যাত্রায় পাঠাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে সমাজে দেশে টিকে থাকার আশা শেষ হয়ে গেছে (Mass Desperation)।

    ৫) তুচ্ছ ঘটনায় বা সামান্য তর্কে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার (গণপিটুনি) প্রবণতা বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে মানুষের মানসিক সহ্যক্ষমতা শূন্যের কোঠায় এবং তারা চরম মানসিক চাপে (Resource Stress) ভুগছে।

    ৬) ৩০-৩৫ বছরের যুবকরা বিয়ে করতে ভয় পাচ্ছে এবং দম্পতিরা সন্তান নিতে চাইছে না। এটি প্রমাণ করে তারা নিজেদের এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম শঙ্কিত (Future Confidence Crisis)।

    ৭) পরিশ্রম করে ধনী হওয়ার পথ বন্ধ হওয়ায় তরুণরা অনলাইন জুয়া, বেটিং বা শর্টকাট পথে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করছে। এটি চরম অর্থনৈতিক হতাশার (Economic Despair) লক্ষণ।

    ৮) ব্যাংকের ওপর আস্থা হারিয়ে মানুষ টাকা তুলে ঘরে রাখছে অথবা ডলার ও সোনা কিনে জমাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর মানুষের ন্যূনতম বিশ্বাসটুকুও ভেঙে গেছে (Trust Deficit)।

    ৯) “পড়ে কী হবে, মামা-চাচার জোর না থাকলে চাকরি নাই”—এই বিশ্বাস থেকে মানুষ ডিগ্রির চেয়ে বিদেশ যাওয়ার স্কিলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে সমাজে মেধার চেয়ে এখন ‘টিকে থাকা’ (Survival) মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    ১০) সমাজে বাহ্যিক ধর্মাচার (লেবাস/ওয়াজ) বাড়লেও একই সাথে দুর্নীতি ও ভেজাল বাড়ছে। মানুষ বিপদে পড়ে ঐশ্বরিক সাহায্য চাইছে, কিন্তু টিকে থাকতে গিয়ে অনৈতিক কাজ করছে। এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্যারাডক্স (Survival Instinct)।

    ১১) উর্বর কৃষি জমিতে সাইনবোর্ড ঝুলছে আবাসনের। জাতি খাবার উৎপাদনের চেয়ে ইট-পাথরের দালানকে বেশি লাভজনক মনে করছে, যা ভবিষ্যতের দুর্ভিক্ষের আগাম বার্তা।

    ১২) ভালো পরিবারের সন্তানরাও এখন ছিনতাই বা কিশোর গ্যাং কালচারে জড়াচ্ছে। এটি নেশার জন্য নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজের খরচ চালানো বা টিকে থাকার জন্য করা হচ্ছে (Survival Crime)।


    অধ্যায় ৫: অতীত পর্যালোচনা – সবুজ বিপ্লব এবং ভ্রান্ত নীতি

    ৫.১ সবুজ বিপ্লব: সাময়িক স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি

    ষাটের দশকে যখন “সবুজ বিপ্লব” (Green Revolution) শুরু হয়েছিল, তখন উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান (HYV) এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এটি স্বল্পমেয়াদে সফল হয়েছিল এবং আমরা দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মাটির উর্বরতা এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে । এক ফসলি জমি বা “Monoculture”-এর কারণে মাটির মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুখাদ্য শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছি। মাটির প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব হচ্ছে না, এবং ফলন ধরে রাখতে আরও বেশি সার ও কীটনাশক ঢালতে হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে বিষিয়ে তুলছে ।

    ৫.২ গ্যাসের অপচয় এবং নীতিগত ব্যর্থতা

    অতীতের আরেকটি বড় ভুল ছিল প্রাকৃতিক গ্যাসের অপব্যবহার। আমরা আমাদের মূল্যবান গ্যাস সম্পদকে সস্তা বিদ্যুৎ এবং গৃহস্থালি কাজে পুড়িয়ে ফেলেছি, যা দিয়ে হয়তো উচ্চমূল্যের শিল্প বা পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা যেত। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে রিজার্ভ সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি । অনুসন্ধান বা এক্সপ্লোরেশনে বিনিয়োগ না করার কারণে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি, যার ফলে আজ আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। পেট্রোবাংলার তথ্যে দেখা যায়, গত দুই দশকে যে পরিমাণ গ্যাস খরচ হয়েছে, তার তুলনায় নতুন আবিষ্কার নগণ্য ।


    অধ্যায় ৬: রাজনৈতিক এবং মতাদর্শিক সমাধান – সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

    ৬.১ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব: সত্য গোপনের সংস্কৃতি

    দেশের রাজনীতিবিদ এবং নীতি নির্ধারকরা এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটগুলো সম্পর্কে অবগত থাকলেও, তারা অপ্রিয় সত্য প্রকাশে বা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে কুণ্ঠাবোধ করেন। গণতন্ত্র বা হাইব্রিড সিস্টেমে “জনপ্রিয়তা” হলো প্রধান মুদ্রা। ২০৩৫ সালের বিপর্যয় ঠেকাতে আজ যদি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, পানির ওপর কর আরোপ করা হয় বা কঠোর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন (যেমন: দুই সন্তানের বেশি হলে সরকারি সুবিধা বাতিল) করা হয়, তবে তা রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল হবে। তাই তারা “Kick the can down the road” নীতি অবলম্বন করেন, অর্থাৎ সমস্যাটি ভবিষ্যতের সরকারের ঘাড়ে ঠেলে দেন 1। পাশাপাশি, পরিসংখ্যান ম্যানিপুলেশন বা “Data Dressing”-এর মাধ্যমে প্রকৃত বেকারত্ব, দারিদ্র্য বা রিজার্ভের তথ্য আড়াল করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা সমস্যা সমাধানে বাধার সৃষ্টি করে।

    ৬.২ ইসলামী মডেল: তাত্ত্বিক সমাধান বনাম ভৌত বাস্তবতা

    দেশের একটি বড় অংশ ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে বা ইসলামী অর্থনীতিকে সমাধান হিসেবে মনে করে। ইসলামী দলগুলোর ইশতেহারে সুষম বণ্টন, জাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি এবং সাদাসিধে জীবনের কথা বলা হয়, যা দুর্নীতি ও অপচয় রোধে (Israf) কার্যকর হতে পারে । কিন্তু ভৌত সীমাবদ্ধতা (Physical Limits) বা জমি ও পানির অভাব কেবল নৈতিকতা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। আপনি যদি দেশের সব ধনীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগও করে দেন, তবুও মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.২০ একরই থাকবে; তা বাড়বে না ।

    তবে আপলোডকৃত দলিলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ইসলামী দলগুলো যদি ক্ষমতায় আসে এবং তারা যদি “টেকনোক্র্যাটিক ইসলাম” বা বিজ্ঞান ও ধর্মের হাইব্রিড মডেল অনুসরণ করে, তবে কিছু সমাধান আসতে পারে। যেমন:

    • জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: ইরানের মতো “ইজতিহাদ” প্রয়োগ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ফতোয়া জারি করা।
    • সুকুক বন্ড: আইএমএফ-এর সুদের ঋণের বদলে সম্পদ-ভিত্তিক (Asset-backed) সুকুক বন্ডের মাধ্যমে মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন করা 33
    • ওয়াকফ: অব্যবহৃত জমি বা সম্পদকে ওয়াকফের আওতায় এনে জাতীয় জলাধার বা সোলার প্ল্যান্ট তৈরি করা।
    • হিমা নীতি: কৃষি জমি রক্ষায় ইসলামের “হিমা” (সংরক্ষিত এলাকা) নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা ।

    কিন্তু চ্যালেঞ্জ হলো, যদি তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির (যেমন: জিএমও ফুড, নিউক্লিয়ার এনার্জি) চেয়ে আবেগ বা ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে খাদ্য ও শক্তি নিরাপত্তা আরও গভীর সংকটে পড়বে।

    ৬.৩ হাইব্রিড রাজনৈতিক মডেল: অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা

    বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কোনো একক মতবাদ হয়তো যথেষ্ট হবে না। এর জন্য প্রয়োজন “উদারপন্থী এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের” একটি হাইব্রিড মডেল বা “Techno-Islamic Alliance”। এই মডেলে অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, প্রযুক্তি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ চলবে সম্পূর্ণ কঠোর বিজ্ঞান ও ডেটার ভিত্তিতে—যেখানে আবেগের কোনো স্থান নেই। অন্যদিকে, বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে কাজে লাগানো হবে। মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ বা তুরস্কের শুরুর দিকের মডেল এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে । তবে নারী স্বাধীনতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে এই দুই মেরুর সংঘাত নিরসন করা হবে এই মডেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


    উপসংহার: কোনো ম্যাজিক নয়, প্রয়োজন কঠোর বাস্তবতা মেনে নেওয়া

    এই দীর্ঘ বিশ্লেষণ এবং শত শত গবেষণা তথ্যের আলোকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি “ধার করা সময়ে” (Borrowed Time) চলছে। আমাদের বর্তমান সমৃদ্ধি বা স্থিতিশীলতা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: (১) মাটির নিচের জমানো পানি, (২) মাটির নিচের সস্তা গ্যাস, এবং (৩) প্রবাসীদের পাঠানো রক্ত-ঘাম করা অর্থ। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই তিনটি স্তম্ভই দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বা হুমকির মুখে পড়ছে। ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সাল হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন এই রিসোর্স কার্ভগুলো (Resource Curves) একে অপরকে ছেদ করবে এবং সংকটগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে এক মহাবিপর্যয়ের রূপ নেবে।

    নেদারল্যান্ডসের মতো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা জাপানের মতো আর্থিক সচ্ছলতা ছাড়া কেবল জনসংখ্যা কমিয়ে বা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে এই বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের মতো উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় হলেও, ১৮ কোটি মানুষের বিশাল চাহিদার বিপরীতে তা সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো। প্রয়োজন অতিদ্রুত জাতীয় পর্যায়ে কৃষি প্রযুক্তির আমূল আধুনিকায়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও নির্মম নীতি গ্রহণ, এবং পানি ও জ্বালানি ব্যবহারে জিরো টলারেন্স নীতি। অন্যথায়, ভৌত সীমাবদ্ধতার এই নির্মম সমীকরণে বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে বা মানবিক বিপর্যয়ের করুণ উদাহরণে পরিণত হতে পারে। রাজনীতি, ধর্ম বা আবেগ দিয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতির এই ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করার বা এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ আমাদের হাতে নেই।


    Works cited

    1. International Agricultural Productivity – Documentation and Methods – USDA ERS, accessed December 7, 2025, https://www.ers.usda.gov/data-products/international-agricultural-productivity/documentation-and-methods
    2. Bangladesh Arable Land | Historical Chart & Data – Macrotrends, accessed December 7, 2025, https://www.macrotrends.net/global-metrics/countries/bgd/bangladesh/arable-land
    3. Arable land (hectares per person) – World Bank Open Data, accessed December 7, 2025, https://data.worldbank.org/indicator/AG.LND.ARBL.HA.PC
    4. How many Earths? How many countries? – Earth Overshoot Day – Global Footprint Network, accessed December 7, 2025, https://overshoot.footprintnetwork.org/how-many-earths-or-countries-do-we-need/
    5. Open Data Platform – Global Footprint Network, accessed December 7, 2025, https://data.footprintnetwork.org/
    6. Bangladesh to remain world’s top cotton importer in 2025-26, accessed December 7, 2025, https://bd.apparelresources.com/business-news/trade/bangladesh-remain-worlds-top-cotton-importer-2025-26/
    7. Assessing the Socio-Economic and Natural Factors Shaping Türkiye’s Virtual Land Trade Balance – MDPI, accessed December 7, 2025, https://www.mdpi.com/2071-1050/17/17/8034
    8. Savings depleted middle class under strain amid inflation – Fahmida Khatun | CPD, accessed December 7, 2025, https://cpd.org.bd/savings-depleted-middle-class-under-strain-amid-inflation/
    9. Changes in Paddy Soil Fertility in Bangladesh Under the Green Revolution – ResearchGate, accessed December 7, 2025, https://www.researchgate.net/publication/361430762_Changes_in_Paddy_Soil_Fer
    10. ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নামছে কোথায় কোথায় https://www.prothomalo.com/bangladesh/environment/7fmrtjg6z1

  • নাইওর

    নাইওর

    আমেনা আসলো রহিম মিয়ার হইয়া নতুন বউ,
    আলতা পায়ে, মুখে হাসি, আনন্দের ঢেউ।
    বিয়ার বাশি থামতে না’ই, মাস গেলো ছয় গুনি,
    রহিম কইলো, “যাই বিদেশ, অভাবে দুই আনি।”
    আমেনা রয় শশুর বাড়ি, ঘোমটা দিয়া মুখে,
    চাইল মাপায়, চুলা ঠ্যালায়, কাইন্দা মরে দুখে।
    মন যে তার পইড়া আছে বাপের বাড়ির পানে,
    ‘নাইওর’ যাইবো কবে সে-ই? আল্লা-তালায় জানে।
    কবে আবার বাপের বাড়ি যাইবো আমেনা?
    মা’য়ের কাছে কইবো কথা, মন যে মানেনা।
    দিন আসে দিন ফুরায় আমেনার ‘নাইওর’ যাওয়ার আশা,
    শুকনা মুখে, কাইন্দা কাইন্দা তার বুকখান ভাসা।

    আর সে রহিম, দূর মুলুকে, ঘামে ভিজায় গা,
    টাকা কামায়, মাটির লাগি পরান যারে যা।
    দেশ মানেই আমেনা তার, দেশ মানেই ঘর,
    রহিমের ও ‘নাইওর’ লাগে, বুকটা থরথর।
    আমেনা চায় বাপের বাড়ি, রহিম যে চায় দেশ,
    দুই জনারই ‘নাইওর’ চাওয়া, দুঃখ নাহি শেষ।
    এক নাইওরের আশা বাঁচে আমেনার ওই চোখে,
    আরেক নাইওর রহিম মিয়া, পরবাসী ওই বুকে।
    আমেনা লেখে, “কবে আসবা?” কাগজ কইরা কালা,
    রহিম লেখে, “টাকা গুছাই, বুকে বড় জ্বালা।”
    দুইটা ‘নাইওর’ আটকা পড়া টাকার সুতার ফাঁসে,
    এক আমেনা, আরেক রহিম, পরান কাইন্দা ভাসে।

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ১৫ই নভেম্বর, ২০২৫ ইং

  • সোশ্যাল মিডিয়া, নৈতিক পক্ষাঘাত এবং তথ্যের চক্র

    আপনার মনে কি প্রশ্নের উদয় হয়, কেন আপনার কাপল ছবি বেশি লাইক পায়? কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী কোনো পোস্ট কারো ফিডে যায় না। উত্তর দেওয়ার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করি।

    চুরি করা নিশ্চয়ই খারাপ কাজ। আগেকার সময়ে কোনো একটি চুরির খবর আপনি কীভাবে নিতেন? ধরা যাক, কোনো এলাকায় একটি চুরির ঘটনা ঘটলো। পরদিন সংবাদপত্রে সেটির খবর আসতো একটি নির্দিষ্ট কলামে, সম্পাদনার পর। খবরটি হতো এরকম: “গতরাতে অমুক এলাকায় একটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনার তদন্ত করছে।”

    কিন্তু আজকের দিনে এই খবর আমরা কীভাবে পাচ্ছি? আমরা পাচ্ছি এই ধরনের অসংখ্য প্রতিক্রিয়া:

    • “চুরি তো হবেই, দেশে আইন নেই!”
    • “এই চোরকে নিশ্চয়ই অমুক পার্টি পাঠিয়েছে।”
    • “আরে, এই গৃহস্থ লোক ভালো না, সে অমুককে ঠকিয়েছিল।”
    • “চোরও মানুষ, পেটের দায়ে চুরি করেছে।”
    • “চোরকে পিটিয়ে মেরে ফেলা উচিত! এই চল সবাই!”

    এই থেকে আপনি কী বুঝলেন? সোশ্যাল মিডিয়া “খবরের” প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি “প্রতিক্রিয়ার” প্ল্যাটফর্ম। এই প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আপনি পাচ্ছেন বিশ্লেষণ। এটাই সবচেয়ে মজার দিক অবশ্য! আমার তালিকায় গবেষক যেমন আছেন, তেমন “ইতালিয়ান প্রবাসী বোল্ট চালক রুবেল”-ও আছেন।

    আগে যেমন আমরা খবর পড়ে নিজের উপসংহারে যেতাম যে, “চুরি খারাপ”। সোশ্যাল মিডিয়া এই কাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এটি আপনাকে “বাধ্যতামূলক আপেক্ষিকতাবাদ” (Forced Relativism)-এর মধ্যে ফেলে দেয়। আপনাকে চোরের পেটের ক্ষুধা এবং গৃহস্থের সম্পদ হারানোর বেদনা—দুটোই একযোগে অনুভব করতে বাধ্য করা হয়। আমাদের এরকম একটা স্টেটে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে যেখানে আমাদের মস্তিষ্ক বিবেচনা করতে পারছে না কোনো পক্ষ সঠিক, অথবা মনে হচ্ছে দু পক্ষই সঠিক (The Paralysis of Relativism)। এই অবস্থাকে আমরা Moral Paralysis বা নৈতিক পক্ষাঘাত বলতে পারি।

    এত গেল একটা দিক। কিন্তু আমরা এই পর্যায়ে এসে পৌঁছালাম কীভাবে? চলুন একটু পিছনে ফিরে দেখি। আমরা খবরের জন্য আগে নির্ভর করতাম দৈনিক পত্রিকার ওপর, অথবা তাৎক্ষণিক খবর পেতে টিভি চ্যানেলের ওপর। এই সিস্টেমটি কীভাবে কাজ করতো, এটি যদি বলি তাহলে কিছুটা বুঝতে সুবিধা হবে। নিউজপেপারে একটা খবর বিভিন্ন সম্পাদনার মধ্য দিয়ে আসে, এখানে দায়বদ্ধতা থাকে, এবং এটি আর্কাইভের একটা অংশ। আপনি যখন একটি নিউজপেপার কিনতেন, তখন আপনি টাকার বিনিময়ে খবর পেতেন। আপনি ছিলেন ‘গ্রাহক’। সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনি ‘গ্রাহক’ নন; এখানে আপনিই হচ্ছেন পণ্য। ফেসবুক, টুইটার, টিকটকের আসল গ্রাহক হলো বিজ্ঞাপনদাতারা।

    এই সিস্টেমটির লক্ষ্য আপনাকে জ্ঞানী (informed) করা নয়; সিস্টেমটির লক্ষ্য আপনাকে আসক্ত (hooked) রাখা। আপনার উদ্বেগ, আপনার ক্ষোভ, আপনার দ্বিধা—এগুলোই সেই ‘টোপ’ যা দিয়ে অ্যালগরিদম আপনাকে আটকে রাখে, যাতে পরবর্তী বিজ্ঞাপনটি আপনাকে দেখানো যায়। আপনার মানসিক অস্থিরতাই তাদের ব্যবসার মূলধন।

    এছাড়াও, একটি নিউজপেপার আপনাকে এমন খবরও পড়তে বাধ্য করতো যা আপনার ভালো লাগে না। আপনি খেলার পাতা অপছন্দ করলেও আপনাকে হয়তো আন্তর্জাতিক খবরের জন্য খেলার পাতা উল্টাতে হতো। এটি আপনাকে একটি ‘সাধারণ বাস্তবতা’ বা Shared Reality-তে রাখতো। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম আপনার জন্য একটি ‘ব্যক্তিগত নরক’ বা Personal Hell তৈরি করে। আপনি যা ঘৃণা করেন, তা সে আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলে; আপনি যা বিশ্বাস করেন, শুধু সেই ধরনের তথ্যই সে আপনাকে দেখায়। এতে করে আপনি নিজের অজান্তেই উগ্রপন্থী (radicalized) হয়ে উঠছেন। সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে আপনার সমমনাদের একটি বদ্ধ ঘরে (চেম্বার) আটকে ফেলে, যেখানে বাইরের কোনো আওয়াজ (প্রতিধ্বনি) আসে না। নিউজপেপার সমাজকে একটি সাধারণ বিতর্কের জায়গা দিত; সোশ্যাল মিডিয়া সেই সমাজকে লক্ষ লক্ষ খণ্ডে বিভক্ত করে ফেলেছে।

    আমরা যদি এই দুটি মাধ্যমের ডিজাইন খেয়াল করি, একটি নিউজপেপারের একটি শেষ পাতা আছে। আপনি পড়া শেষ করে পত্রিকাটি রেখে দিতেন। আপনার মস্তিষ্ক একটি ‘কাজ শেষ’ করার অনুভূতি পেত। সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো শেষ নেই। “ইনফিনিট স্ক্রল” (Infinite Scroll) ফিচারটি কোনো কারণ ছাড়াই তৈরি করা হয়নি। আপনি স্ক্রল করতেই থাকেন এই আশায় যে পরের পোস্টটি আপনাকে কিছু একটা আনন্দ (ডোপামিন) দেবে। নিউজপেপার ছিল ‘তথ্য’ (Information); সোশ্যাল মিডিয়া হলো একটি আচরণগত ‘আসক্তি’ (Behavioral Addiction)। আজকাল “ডুম স্ক্রলিং” (Doom Scrolling) শব্দটি আমরা এই পরিস্থিতি বর্ণনা করতে ব্যবহার করি।

    এই ব্যক্তিগত জায়গা থেকে বের হয়ে আমরা একটি সামগ্রিক অবস্থাটা দেখি। আমি এখন প্রাসঙ্গিক যে বিষয় নিয়ে আলাপ করবো, সেটি হচ্ছে The Globalization of Anxiety বা উদ্বেগের বিশ্বায়ন। এটি বোঝানোর জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড মহামারী কেন এভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল? এর কারণ আমরা অনেক গ্লোবাল এখন, দুদিনের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যেতে পারছি বিভিন্ন রোগ বহন করে। ঠিক এই ঘটনাটি খবরের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। এখন কী অপরাধ কম বা বেশি হচ্ছে? কিন্তু আগে আপনার উদ্বেগ আপনার ক্ষমতার পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আপনি আপনার প্রতিবেশীর বিপদে উদ্বিগ্ন হতেন, কারণ তাত্ত্বিকভাবে আপনি তাকে সাহায্য করতে পারতেন।

    কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া আপনার উদ্বেগের পরিধিকে অসীম করে দিয়েছে, অথচ আপনার ক্ষমতাকে এক বিন্দুও বাড়ায়নি। আগে ঢাকার কোনো ঘটনা হয়তো শুধু ঢাকার মানুষকেই উদ্বিগ্ন করতো। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সেই একই ঘটনা, একই তীব্রতায়, একই মুহূর্তে আমেরিকায় বসে থাকা একজন প্রবাসীকেও উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আপনি যখন আমেরিকায় বসে ঢাকার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, সেই উদ্বেগটি সম্পূর্ণ নিষ্ফল। এই “ক্ষমতাহীন উদ্বেগ” (Powerless Anxiety) হলো সবচেয়ে ভয়াবহ মানসিক চাপ। নিউজপেপার আপনাকে খবর দিত; সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে সেই খবরের সাথে জড়িত মানুষগুলোর রিয়েল-টাইম আতঙ্ক, কান্না এবং ক্ষোভের সরাসরি সম্প্রচার দেখাচ্ছে। আপনি অন্যের ট্রমাতে সরাসরি প্লাগ-ইন হয়ে যাচ্ছেন, যা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় সিস্টেম আপনাকে দিচ্ছে না।

    এতক্ষণ যা বললাম, তার কিছু পয়েন্ট যদি তুলে ধরি তাতে বোঝা যাবে মূল সমস্যা শুধু “ভুল তথ্য” বা “ফেক নিউজ” নয়। মূল সমস্যা হলো তথ্যের ধরণ, পরিমাণ এবং এর প্রতিক্রিয়ার চক্র। সমস্যাগুলো হলো:

    • ১. তথ্যের অতিবর্ষণ (Information Overload): আমাদের মস্তিষ্ক এত তথ্য একবারে প্রক্রিয়া করতে পারে না।
    • ২. আবেগের পুঁজি (Emotional Exploitation): সিস্টেমটি আমাদের ক্ষোভ, ভয় এবং উদ্বেগ থেকে লাভবান হয়।
    • ৩. নৈতিক পক্ষাঘাত: কোনো বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারার ক্লান্তি।
    • ৪. আসক্তির নকশা (Addictive Design): ইনফিনিট স্ক্রল এবং নোটিফিকেশন আমাদের এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ থেকে বের হতে দেয় না।

    এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ বা একক সমাধান নেই। তবে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে:

    • আত্মরক্ষা হিসেবে পরিত্যাগ বা সীমিতকরণ: যদি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব আপনার মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম বা কাজের ওপর পড়ে (যেমন হৃদরোগের উপসর্গ), তবে তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা বা কঠোরভাবে সীমিত করাই সবচেয়ে যৌক্তিক এবং সাহসী সিদ্ধান্ত।
    • সচেতন ব্যবহার: সোশ্যাল মিডিয়া “ব্রাউজ” করার জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট “ব্যবহার”-এর জন্য। অ্যালগরিদম আপনাকে যা খাওয়াতে চায় তা না দেখে, আপনি যা দেখতে চান তা সার্চ করে দেখুন। নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
    • “ধীর সংবাদ” গ্রহণ: বই পড়া, দীর্ঘ প্রবন্ধ বা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা। এই মাধ্যমগুলো আপনাকে চিন্তা করার সময় দেয়।
    • মানসিক সীমানা নির্ধারণ: এটিই সম্ভবত সবচেয়ে যৌক্তিক দিক যে এটা মেনে নেওয়া, আপনার পক্ষে পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধান করা বা সব বিষয়ে মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। নিজের মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া আপনার মূল বিষয় হওয়া উচিত।

    সবশেষে বলতে চাই, আমার এই বিশ্লেষণ কিন্তু কোনো খবরের বিশ্লেষণ নয়। এটি অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, এবং এর প্রভাব নিয়ে আলাপ করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের একটি সংযুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু প্রায়শই এটি আমাদের একটি বিভক্ত এবং ক্লান্ত সমাজ উপহার দিয়েছে। সংবাদপত্র আমাদের জানালার বাইরে পৃথিবী দেখাতো; সোশ্যাল মিডিয়া সেই জানালা দিয়ে পাথর ছুঁড়ে মারে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। দিনশেষে, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ, কিন্তু যে ব্যবসায়িক মডেলের ওপর এটি দাঁড়িয়ে আছে তা নয়। আমাদের এই সিস্টেমের কাছে পরাজিত হলে চলবে না। আমাদের সচেতনভাবে নিজেদের সময়, মনোযোগ এবং মানসিক শান্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—তথ্য গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু তথ্যের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলে চলবে না।

  • জীবন করচা

    নিউইয়র্কের আকাশটা একটা বিবর্ণ ধূসর চাদর। নভেম্বরের শেষ দিককার বাতাস স্কাইস্ক্র্যাপারের ফাঁক গলে ছুরির মতো ছুটে আসে, যা পথের ধারের সামান্য উষ্ণতাটুকুও কেড়ে নেয়। বহুদূর থেকে ভেসে আসা সাইরেনের একটানা শব্দ, ম্যানহোল থেকে ওঠা বাষ্পের মেঘ আর হলুদ ট্যাক্সির স্রোত—এইসব নিয়েই শহরের হৃদস্পন্দনটা চলে। এছাড়াও নিউইয়র্কের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রায় সব মহানগরীর মতো এখানে সাবওয়ে ট্রেন আছে। গৃহহীন আছে। এই শহর গৃহহীনদের জন্য অনুকূল নয়, কিন্তু তবু তারা আছে। তেমনি একজন শন। শন—নামের আগে-পিছে আর কিছু নেই। সরকারি কাগজপত্র ব্যবহার করতে হলে হয়তো কিছু থাকত। বয়স অনুমান করা যেতে পারে চল্লিশের ঘরে। তার পরিচয় সে একজন গৃহহীন। চাকচিক্যের এই শহরে একটু এদিক-ওদিক পা ফেলতে গেলেই আপনার পরিচয় হয়ে যাবে গৃহহীন।

    ‘পে-চেক-টু-পে-চেক’ বলে একটা কথা আছে। মানে আপনি সপ্তাহে যে চেক পাবেন, তা দিয়েই পরের সপ্তাহের খরচ চালাবেন। এই ব্যবস্থার কারণে মানুষ না থেমে খেটে যায়। থামলেই এরকম শনরা তৈরি হয়। শন বসবাস করে শহরের ব্যস্ততম একটা ম্যাকডোনাল্ডসের আউটলেটে। দৈনিক ২২ ঘণ্টা খোলা থাকা এই আউটলেট থেকে তাকে বের হয়ে যেতে হয় রাত ৩টায়। কারণ এই সময়ে দোকান পরবর্তী বাইশ ঘণ্টার জন্য প্রস্তুত হয়। মদ খেয়ে এতই মাতাল থাকে সে যে, এই সময়ে তাকে বের করতে দোকানের কর্মীদের কালঘাম ছুটে যায়। এক পর্যায়ে রুটিন মাফিক সে বের হয়।

    বছরের পর বছর ধরে তার এই এক রুটিন। তার কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আউটলেটের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, ক্রেতা এলে হাতে ধরা কাপ বাড়িয়ে দেয়। কেউ কাপে ভাঙতি পয়সা ছুড়ে দেয়। এই দিয়ে তার একটা হ্যামবার্গার হয়ে যায়, আর বাড়তি পয়সা দিয়ে এক ক্যান বিয়ার। অবশ্য গোসলের বালাই নেই। এমনকি প্রস্রাব-পায়খানা কোথায় করবে, তারও চিন্তা নেই। মানে নিজের কাপড়চোপড় তো আছেই। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। একটা চলমান গন্ধবোমা সে। বাড়তি টাকার দরকার হলেই সাবওয়ের কোনো একটা ট্রেনে উঠে পড়লেই হলো। মানুষজন ভয়ে এক ডলার বা কোয়ার্টার ছুড়ে দেয়। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলে জীবনের স্রোত। ব্যস্ত মানুষ, পর্যটকদের ঝাঁক, ছুটে চলা তরুণ-তরুণী। তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা, কাঁধে অদৃশ্য বোঝা। তারা শনকে দেখেও দেখে না, কারণ শন তাদের কাছে শুধু একজন মানুষ নয়, বরং তাদের নিজেদের গভীরতম ভয়ের প্রতিচ্ছবি। এই কারণেই তারা আরও দ্রুত হাঁটে, আরও জোরে কফি কাপে চুমুক দেয়—যেন গতিই তাদের পতনের হাত থেকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়।

    এসব দেখে তার মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি লেগে থাকে। যেন এই শহরকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টিকে আছে বছরের পর বছর। এই শহরে তার অবস্থান অচ্ছুত, একেবারে নিচের স্তরে। তার প্রেমের দরকার হলেই, তার চেয়ে এক স্তর ওপরে থাকা, ‘পে-চেক-টু-পে-চেকে’ চলা ম্যাকডোনাল্ডসের কর্মীরা আছে। ক্যাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে সে তার যা ইচ্ছে বলে দেয়। মেয়েগুলো মুখ বুজে থাকে। “কাস্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট”—এই কর্পোরেট পলিসিতে চলা কর্মীরা বেশি কিছু বলে না, পাছে কাস্টমারের মামলা খেয়ে না বসে। যারা অনেকদিনের পরিচিত, তারা মুখের ওপর কথা ছুড়ে দেয়। এভাবে এই মিথস্ক্রিয়ায় চলে যায় দিন, পার হয় রাত! হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত! ওহ, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। এই শহর কখনো ঘুমায় না!


    [শনকে নিয়ে আজকের নিষিদ্ধ ইশতেহার]

    এই শহরের কোনো বিরাম নেই, আছে শুধু দেয়াল আর দেয়াল,
    এখানে আকাশ দেখলে পাপ হয়, বাতাস ছুঁলে অসুখ।
    আমি সেই অসুখ বুকে নিয়ে হাঁটি, নিউইয়র্ক—
    তোমার স্টিলের শরীরে
    আমার এই অচ্ছুত অস্তিত্বই একমাত্র সত্য কবিতার সুখ।

    তোমাদের দরকার নিরাপদ ঘর, নরম বিছানা, সপ্তা শেষে মাইনে,
    আমার ওসব কিছু নেই, আছে শুধু ফুটপাত আর তীব্র স্বাধীনতা।
    একটু ভুলের দামে তোমরা কিনে নাও সুশৃঙ্খল দাসত্ব,
    আর আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস—এক একটি নিষিদ্ধ বিদ্রোহ।

    আমাকে তোমরা করুণা করো না, করুণা করার মতো কিছু রাখিনি।
    আমার এই নোংরা শরীর, দুর্গন্ধময় অবহেলা,
    আমার হাতে ধরা কাপ, তোমাদের সভ্যতার মুখে
    ছুঁড়ে দেওয়া একরাশ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন।

    ভালোবাসা? সে তো তোমাদের কাঁচের দেয়ালে সাজানো পুতুল,
    আমার প্রেম ওই ক্যাশ-কাউন্টারের মেয়েটির চোখে—
    এক ঝলক ঘৃণা অথবা ভয়। তা-ই সই,
    তবু তো নিখাদ, কোনো মেকি ভদ্রতার আড়ালে ঢাকা নয়।

    আমাকে স্পর্শ কোরো না, পুড়ে যাবে তোমাদের পরিপাটি অহংকার।
    এই শহর ঘুমায় না, আমিও ঘুমাই না—
    শুধু জেগে থেকে দেখি, পতনের শিল্প কতটা সুন্দর হতে পারে,
    যে পতনের তীব্র ভয় থেকে তোমরা আরও তীব্রতর হাঁটো।

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ৩রা অক্টোবর, ২০২৫ইং

  • দৈনিকের আত্মকথা

    দৈনিকের আত্মকথা

    কালো অক্ষরেরা কথা বলে,
    কখনো অভয়, কখনো ঘাতকের ছলে,
    কখনো সাদা সত্যের বেশে,
    কখনো বা বেদনার নীলে মেশে,
    কখনো হলুদে মোড়া কুটিল ইশারা,
    সত্যেরা পথ খুঁজে দিশেহারা।

    বত্রিশ পৃষ্ঠার এক বিশাল ক্যানভাসে,
    কারো স্বপ্ন, কারো দীর্ঘশ্বাসে,
    সাজানো বাগানের গল্প ফোটে,
    জোড়া খুনের গন্ধে পাঠক ছোটে।
    ভালোবাসা আর মনোবিকলন,
    কখনো ছাপা হয় নীরব কথন।

    শব্দেরা প্রতিদিন লাশ হয় এখানে,
    ধর্ষিত হয়, অথবা হলুদ হয় কোন ইশারায়!
    ভাষা পাল্টায় এখানে আদালতের রায়!

    এখানে প্রথম পাতায় কারো জীবনী,
    রাজনীতিকের জবানবন্দী, অথবা সারমেয় ঘেউ ঘেউ,
    অথবা হত্যাকারীর সাজাপ্রাপ্ত আত্মহত্যাকারী কেউ!
    রাত ঘুম শেষে চাকাপ হাতে কারো মৌনতা।
    এটি একটি দৈনিকের আত্মকথা।

  • জর্জ ওয়াশিংটন প্লাঙ্কিট: একজন প্র্যাকটিক্যাল রাজনীতিকের কথা – পর্ব ৭

    জর্জ ওয়াশিংটন প্লাঙ্কিট: একজন প্র্যাকটিক্যাল রাজনীতিকের কথা – পর্ব ৭


    অধ্যায় ১৮

    রাজনীতিতে অর্থের ব্যবহার প্রসঙ্গে

    সিভিল সার্ভিস দল সবসময় প্রার্থী এবং পদাধিকারীদের প্রচারণার জন্য টাকা দেওয়া এবং কর্পোরেশনগুলোর চাঁদা দেওয়া নিয়ে চিৎকার করে। তারা চার্চে চাঁদা দেওয়ার বিষয় নিয়েও একই রকম চিৎকার করতে পারে। একটি রাজনৈতিক সংগঠনেরও চার্চের মতোই তার ব্যবসার জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়, আর যারা সুযোগ-সুবিধা পায়, তাদের এর জন্য টাকা দেওয়ার অধিকার কার চেয়ে বেশি আছে? উদাহরণস্বরূপ, ট্যামানি হলের মতো একটি বিশাল রাজনৈতিক সংগঠনের কথা ধরো। এটা একটা চার্চের মতোই মিশনারি কাজ করে, এর অনেক খরচ আছে এবং অনুগতদের দ্বারা এর সমর্থন করা উচিত। যদি কোনো কর্পোরেশন ট্যামানি সোসাইটির ভালো কাজের জন্য একটা চেক পাঠায়, তাহলে কেন আমরা অন্য মিশনারি সোসাইটিগুলোর মতো তা নেব না? অবশ্যই, এমন দিন আসতে পারে যখন আমরা ধনীদের টাকা ‘কলুষিত’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করব, কিন্তু আজ সকাল ১১:২৫ মিনিটে আমি যখন ট্যামানি হল ছেড়ে এসেছি, তখনো সেই দিন আসেনি।

    কিছুদিন আগে কিছু সংবাদপত্র পাগল হয়ে গিয়েছিল কারণ আমার ডিস্ট্রিক্টের অ্যাসেম্বলিম্যান বলেছিলেন যে গত বছর অ্যাসেম্বলির জন্য মনোনীত হওয়ার সময় তিনি ৫০০ ডলার দিয়েছিলেন। শহরের সব রাজনীতিক এই সংবাদপত্রগুলোকে নিয়ে হাসাহাসি করেছিল। আমার মনে হয় না সিটিজেনস ইউনিয়নের কোনো সদস্যও ছিল যে জানত না যে দুই দলের প্রার্থীদেরই প্রচারণার খরচের জন্য চাঁদা দিতে হয়। তারা যে পরিমাণ টাকা দেয়, তা তাদের বেতন এবং নির্বাচিত হলে তাদের পদের মেয়াদের ওপর নির্ভর করে। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের প্রার্থীরাও এই নিয়মের মধ্যে পড়ে। নিউ ইয়র্ক কাউন্টিতে একজন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক বছরে ১৭,৫০০ ডলার বেতন পান, এবং যখন তিনি মনোনীত হন, তখন তার কাছ থেকে এক বছরের বেতন ভালো কাজের জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়ার আশা করা হয়। কেন নয়? তার সামনে চৌদ্দ বছর বিচারকের আসনে থাকার সুযোগ আছে, আর দশ হাজার অন্য আইনজীবী তার জুতোয় পা রাখার জন্য দ্বিগুণ টাকা দিতে রাজি থাকবে। এখন, আমি বলছি না যে আমরা মনোনয়ন বিক্রি করি। এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। এখানে কোনো নিলাম নেই বা নিয়মিত দর কষাকষি নেই। একজন লোককে বেছে নেওয়া হয় এবং কোনোভাবে সে বুঝতে পারে যে অনুদান হিসেবে তার কাছ থেকে কী আশা করা হচ্ছে, আর সে তা দিয়ে দেয়—সবটাই সেই সংগঠনের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে, যা তাকে সম্মান জানিয়েছে, বুঝলে?

    আমাকে একটা ঘটনা বলতে দাও যা মনোনয়ন বিক্রি করা এবং আমি যে পদ্ধতিতে মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলেছি, তার মধ্যে পার্থক্যটা দেখায়। কয়েক বছর আগে একজন রিপাবলিকান ডিস্ট্রিক্ট নেতা তার কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে কংগ্রেসের মনোনয়ন নিয়ন্ত্রণ করত। চারজন লোক এটা চেয়েছিল। প্রথমে নেতা ব্যক্তিগতভাবে দাম জানতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিল যে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো সেই চারজন লোককে একটা নির্দিষ্ট পানশালার পেছনের ঘরে একসাথে জড়ো করা এবং খোলা নিলাম করা। যখন সে তার লোকগুলোকে জড়ো করল, তখন একটা চেয়ারের উপর উঠে দাঁড়াল, বিক্রির জন্য থাকা জিনিসগুলোর মূল্য সম্পর্কে বলল, আর একজন নিলামকারীর মতো নিয়মিতভাবে দাম চাইতে শুরু করল। সবচেয়ে বেশি দাম দেওয়া ব্যক্তি ৫,০০০ ডলারে মনোনয়নটা পেয়েছিল। এখন, এটা মোটেও ঠিক ছিল না। এই কাজগুলো সবসময় সুন্দরভাবে এবং শান্তভাবে ঠিক করা উচিত।

    পদাধিকারীদের কথা বলি, যে সংগঠন তাদের পদে বসিয়েছে, যদি তারা সেই সংগঠনে চাঁদা না দেয়, তাহলে তারা অকৃতজ্ঞ হবে। তাদের ওপর কোনো কর বসানোর দরকার নেই। সেটা আইনের বিরুদ্ধে হবে। কিন্তু তারা জানে তাদের কাছ থেকে কী আশা করা হয়, আর যদি তারা ভুলে যায়, তাহলে তাদের নম্র এবং ভদ্রভাবে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে। ড্যান ডোনেগান, যিনি একসময় ট্যামানি সোসাইটির ‘উইসকিনকি’ ছিলেন, এবং যারা কৃতজ্ঞ পদাধিকারীদের কাছ থেকে চাঁদা গ্রহণ করতেন, তার মনে করিয়ে দেওয়ার একটা সুন্দর উপায় ছিল। যদি একজন মানুষ সেই সংগঠনের প্রতি তার কর্তব্যের কথা ভুলে যেত, যা তাকে তৈরি করেছে, তাহলে ড্যান সেই লোকটার কাছে গিয়ে হাসিমুখে বলত: “তুমি তো ইদানীং হলে আসছ না, তাই না?” যদি সেই লোকটা প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত, ড্যান তখন বলত: “আবহাওয়া খুব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।” তারপর সে কাঁপতে কাঁপতে সেখান থেকে চলে যেত। এর চেয়ে ভদ্র আর একই সাথে কার্যকরী আর কী হতে পারে? কোনো জোর নেই, কোনো হুমকি নেই—শুধু একটু কাঁপুনি যা গ্রীষ্মকালেও যেকোনো মানুষের হতে পারে।

    ঠিক এখানেই, আমি জঘন্য সিভিল সার্ভিস আইনের বিরুদ্ধে আরও একটি অপরাধের অভিযোগ আনতে চাই। এটা মানুষকে অকৃতজ্ঞ বানিয়ে দিয়েছে। এক ডজন বছর আগে, যখন শহরের সরকারে তেমন কোনো সিভিল সার্ভিস ছিল না, এবং যখন প্রশাসন পদধারী প্রায় যে কোনো মানুষকে বের করে দিতে পারত, তখন ড্যানের কাঁপুনি সব সময়ই কার্যকরী হতো আর শহরের দপ্তরগুলোতে কোনো অকৃতজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু যখন সিভিল সার্ভিস আইন এল আর সব কেরানিরা তাদের চাকরিতে স্থায়ী হয়ে গেল, তখন অকৃতজ্ঞতা খুব তাড়াতাড়িই ছড়িয়ে পড়ল। ড্যান কাঁপত আর কাঁপতে কাঁপতে তার হাড়গোড়ও নড়ে উঠত, কিন্তু শহরের অনেক কর্মী তাকে দেখে হাসত। আমার মনে আছে, একদিন সে পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের একজন কেরানিকে ধরেছিল, যে নিয়মিত চাঁদা দিত, আর স্বাভাবিক প্রশ্ন করার পর কাঁপতে শুরু করল। কেরানি হাসল। ড্যান কাঁপতে কাঁপতে তার টুপি পড়ে গেল। কেরানি তার পকেট থেকে দশ সেন্ট বের করে ড্যানের হাতে দিয়ে বলল: “বেচারা! যাও আর একটু কিছু পান করে নিজেকে গরম করো।” এটা কি লজ্জাজনক ছিল না? আর তবুও, যদি সিভিল সার্ভিস আইন না থাকত, তাহলে সেই কেরানি আজও নিয়মিত চাঁদা দিত।

    সিভিল সার্ভিস আইন অবশ্য সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে না। এর কব্জার বাইরে অনেক ভালো চাকরি আছে, আর যারা সেগুলো পায়, তারা সবসময়ই কৃতজ্ঞ থাকে। মনে রেখো, আমি শুধু ট্যামানি হলের কথা বলছি না! রিপাবলিকান ফেডারেল এবং স্টেট পদাধিকারীদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে, আর যে কোনো সংগঠন যাদের চাকরি দেওয়ার সুযোগ আছে বা ছিল—অবশ্যই সিটিজেনস ইউনিয়ন ছাড়া। সিটিজেনস-এর সদস্যরা মাত্র এক-দু বছর পদে ছিল, আর তারা জানত যে তারা আর কখনো ক্ষমতায় আসবে না, তাই প্রত্যেক সিটিজেনস পদাধিকারী তার কাছে আসা প্রতিটা ডলার আঁকড়ে ধরেছিল।

    কিছু মানুষ বলে যে তারা বুঝতে পারে না প্রচারণার জন্য সংগৃহীত সব টাকা কোথায় যায়। যদি তারা ডিস্ট্রিক্ট লিডার হতো, তাহলে তারা খুব তাড়াতাড়িই বুঝতে পারত। এখানে কখনো যথেষ্ট টাকা আসেনি। সভা, ব্যান্ড এবং এসবের খরচের পাশাপাশি, ভোটারদের বুথে আনার জন্য ডিস্ট্রিক্ট কর্মীদের জন্য আরও বড় বিল থাকে। এই কর্মীরা বেশিরভাগই এমন মানুষ যারা তাদের দেশকে সেবা করতে চায় কিন্তু সিভিল সার্ভিস আইনের কারণে শহরের দপ্তরে চাকরি পায় না। তারা পরের সবচেয়ে ভালো কাজটা করে—ভোটারদের ওপর নজর রাখে আর নিশ্চিত করে যে তারা যেন বুথে আসে এবং সঠিক পথে ভোট দেয়। এই যোগ্য নাগরিকদের কিছু অংশকে সারা বছর চলার জন্য নিবন্ধন এবং নির্বাচনের দিনে যথেষ্ট টাকা রোজগার করতে হয়। তাহলে কি এটা ঠিক নয় যে তারা প্রচারণার টাকার একটা ভাগ পাবে?

    শুধু মনে রেখো যে নিউ ইয়র্ক কাউন্টিতে পঁয়ত্রিশটা অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট আছে, আর পঁয়ত্রিশজন ডিস্ট্রিক্ট লিডার আছে যারা দশ হাজার কর্মীর দেশপ্রেম ধরে রাখার জন্য ট্যামানির টাকার ঝুলি থেকে কিছু পাওয়ার জন্য হাত বাড়ায়, আর তাহলে তুমি অবাক হবে না যে “আরও, আরও”-র জন্য চিৎকার এখন এবং চিরকাল প্রতিটি ডিস্ট্রিক্ট সংগঠন থেকে উঠবে। আমিন।


    অধ্যায় ১৯

    সফল রাজনীতিবিদ মদ পান করে না

    আমি রাজনীতিতে সফল হওয়ার উপায় ব্যাখ্যা করেছি। আমি আরও বলতে চাই যে তুমি যত ভালোভাবে রাজনৈতিক খেলা খেলতে পারো না কেন, যদি তুমি একজন মদ্যপায়ী হও, তাহলে তাতে দীর্ঘস্থায়ী সফলতা পাবে না। আমি কোনো ধরনের নেশাজাতীয় পানীয়ের এক ফোঁটাও পান করি না। আমি কোনো গোঁড়া ব্যক্তি নই। কিছু মদের দোকানের মালিক আমার সেরা বন্ধু, আর আমি যেকোনো দিন আমার বন্ধুদের সাথে মদের দোকানে যেতে আপত্তি করি না। কিন্তু ব্যবসার খাতিরে আমি হুইস্কি, বিয়ার এবং অন্য সব জিনিস থেকে দূরে থাকি। ব্যবসার খাতিরে, আমি আমার ডিস্ট্রিক্টের জন্য সেইসব মানুষদের আমার লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিই যারা পান করে না। আমি কয়েক বছর ধরে অন্য ধরনের লোকদের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। তাদের খরচ খুব বেশি। উদাহরণস্বরূপ, আমার একজন তরুণ ছিল যে শহরের অন্যতম সেরা কর্মঠ ব্যক্তি ছিল। সে ডিস্ট্রিক্টের প্রতিটি মানুষকে চিনত, সব জায়গায় জনপ্রিয় ছিল এবং নির্বাচনের দিন একজন প্রায়-মৃত মানুষকেও বুথে আনতে পারত। কিন্তু, নিয়মিতভাবে, নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে সে মদ্যপান শুরু করত, আর আমাকে তাকে দিন-রাত পাহারা দেওয়ার জন্য দুজন লোক ভাড়া করতে হতো, যাতে সে তার কাজ করার জন্য যথেষ্ট স্বাভাবিক থাকে। তাতে অনেক টাকা খরচ হতো, আর তাই আমি কিছুদিন পর সেই তরুণকে বাদ দিয়ে দিই।

    তুমি হয়তো ভাবছ আমি মদ পান করি না বলে মদের দোকানের মালিকদের কাছে আমি অপ্রিয়। তুমি ভুল করছ। সবচেয়ে সফল মদের দোকানের মালিকরাও নিজে পান করে না, আর তারা বোঝে যে আমার মদ্যপান না করাটা একটা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, ঠিক যেমন তাদের নিজেদেরটা। আমার সদর দপ্তরের নিচে একটা মদের দোকান আছে। যদি কোনো মদের দোকানের মালিক কোনো ঝামেলায় পড়ে, সে সবসময় জানে যে সিনেটর প্লাঙ্কিটই সেই মানুষ যে তাকে সাহায্য করবে। যদি আইনসভায় মদের বিক্রেতাদের জন্য কোনো বিল আসে, আমি সবসময় তার পক্ষে থাকি। আমি মদের দোকানের লোকদের সেরা বন্ধুদের একজন—কিন্তু আমি তাদের হুইস্কি পান করি না। আমি মদ্যপান না করার বিষয়ে বক্তৃতা দিয়ে তোমাকে এটা বলব না যে আমি কত উজ্জ্বল তরুণকে মদ্যপানের শিকার হতে দেখেছি, কিন্তু আমি তোমাকে বলতে পারি যে আমি ডজন ডজন নাম বলতে পারি—তরুণ যারা রাজনীতিবিদের পথে যাত্রা শুরু করেছিল, যারা সবসময় তাদের ডিস্ট্রিক্টে জয়ী হতে পারত, এবং যারা প্রাইমারিতে তুমি যে পরিমাণ ভোট চাও, তা জোগাড় করতে পারত। আমি সত্যি বিশ্বাস করি যে মদ হলো আজকের দিনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ, অবশ্যই সিভিল সার্ভিস ছাড়া, এবং এটা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ছাড়া অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি তরুণকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

    ট্যামানি হলের মহান নেতাদের দিকে তাকাও! তাদের মধ্যে কেউই নিয়মিত পানকারী নয়। রিচার্ড ক্রোকারের সবচেয়ে শক্তিশালী পানীয় ছিল ‘ভিচি’। চার্লি মারফি কখনো রাতের খাবারের সময় এক গ্লাস ওয়াইন নেন, কিন্তু এর বেশি কিছু করেন না। একজন মদ্যপায়ী মানুষ ট্যামানি হলের নেতা হিসেবে দুই সপ্তাহও টিকতে পারবে না। একজন মানুষ যদি পান করে, তাহলে সে দীর্ঘ দিন একটা অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট পরিচালনা করতে পারবে না। তাকে সবসময় পরিষ্কার মাথার হতে হবে। আমি এমন দশজনের নাম বলতে পারি, যারা গত কয়েক বছরে পান করা শুরু করার কারণে তাদের ডিস্ট্রিক্টে কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে। এখন ট্যামানি হলে ছত্রিশজন ডিস্ট্রিক্ট নেতা আছে, আর আমার বিশ্বাস হয় না তাদের মধ্যে আধ ডজন লোকও খাবারের সময় ছাড়া অন্য কোনো সময় কিছু পান করে। মানুষের একটা ধারণা আছে যে যেহেতু মদের ব্যবসায়ীরা আমাদের সাথে প্রচারাভিযানে থাকে, তাই আমাদের ডিস্ট্রিক্ট নেতারা তাদের বেশিরভাগ সময় বারের পাশে হেলান দিয়ে কাটায়। এর চেয়ে ভুল ধারণা আর হতে পারে না। একজন ডিস্ট্রিক্ট নেতা রাজনীতিকে একটি ব্যবসা হিসেবে দেখে, তা থেকে তার জীবিকা অর্জন করে, আর সফল হওয়ার জন্য তাকে অন্য যেকোনো ব্যবসার মতোই সংযত থাকতে হয়।

    “বিগ টিম” এবং “লিটল টিম” সুলিভানের উদাহরণ নাও। তারা বোয়ারি নেতা হিসেবে সারা দেশে পরিচিত, আর যেহেতু বোয়ারিতে মদের দোকান ছাড়া আর কিছুই নেই, তাই মানুষজন ভাবতে পারে যে তারা খুব বেশি মদ্যপানকারী। আসল কথা হলো, তাদের কেউই জীবনে এক ফোঁটা মদও পান করেনি বা একটা সিগারও ফোটায়নি। তবুও তারা নিজেদের অন্যদের চেয়ে ভালো দেখানোর ভান করে না, আর তারা মদ্যপান না করার বিষয়ে বক্তৃতা দিতে ঘুরে বেড়ায় না। বিগ টিম মদ থেকে টাকা কামিয়েছে—অন্যান্য মানুষের কাছে বিক্রি করে। মদ থেকে এটাই একমাত্র ভালো জিনিস পাওয়া যায়।

    শহরের দপ্তরগুলোর সব ট্যামানি প্রধানদের দিকে তাকাও? তাদের মধ্যে একজনও আসল মদ্যপায়ী নেই। ওহ, হ্যাঁ, সংগঠনে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তি আছেন যারা মাঝে মাঝে পান করেন, কিন্তু তারা সেইসব মানুষ নয় যাদের ক্ষমতা আছে। তারা শুধু শোভার জন্য, ভালো বক্তা এবং এমন সব কিছু, যারা লাইটের পেছনে সুন্দর একটা শো দেখাতে পারে, কিন্তু যখন শহরের সরকার এবং ট্যামানি সংগঠন পরিচালনা করার কথা আসে, তখন তারা কি কাজে আসে? সেইসব মানুষ যারা ট্যামানি হলের কার্যনির্বাহী কমিটির কক্ষে বসে সবকিছু পরিচালনা করে, তারা এমন মানুষ যারা ‘অ্যাপোলিনারিস’ বা ‘ভিচি’ পান করে উদযাপন করে। আমি তোমাকে বলি ১৯৯৭ সালের নির্বাচনের রাতে আমি কী দেখেছিলাম, যখন ট্যামানি টিকিট পুরো শহরে জয়ী হয়েছিল: রাত ১০টা পর্যন্ত ক্রোকার, জন এফ. ক্যারল, টিম সুলিভান, চার্লি মারফি এবং আমি কমিটির কক্ষে বসে ফলাফল নিচ্ছিলাম। যখন প্রায় পুরো শহরের ফলাফল পাওয়া গেল এবং আমরা দেখলাম যে ভ্যান উইক একটা বিশাল ব্যবধানে নির্বাচিত হয়েছে, আমি সবাইকে একটু উদযাপনের জন্য রাস্তা পার হয়ে ওপারে যেতে আমন্ত্রণ জানালাম। অনেক ছোট ছোট রাজনীতিক আমাদের পেছনে গেল, যারা শ্যাম্পেনের বোতল খোলা হবে বলে আশা করছিল। রেস্টুরেন্টের ওয়েটাররাও তাই আশা করছিল, আর যখন তারা আমাদের অর্ডার পেল, তখন এর চেয়ে বিরক্ত ওয়েটার তুমি আর দেখনি। আমাদের অর্ডার ছিল এই: ক্রোকার, ভিচি আর বাইকার্বোনেট অফ সোডা; ক্যারল, সেল্টজার লেমনেড; সুলিভান, অ্যাপোলিনারিস; মারফি, ভিচি; প্লাঙ্কিট, একই। মধ্যরাতের আগেই আমরা সবাই বিছানায় ছিলাম, আর পরের দিন সকালে আমরা তাজা আর তাড়াতাড়ি উঠে কাজে লেগে গিয়েছিলাম, যখন অন্য মানুষেরা মাথা ব্যথায় ভুগছিল। একটা নিছক ব্যবসায়িক প্রস্তাব হিসেবে মদ্যপান না করার মধ্যে কি কোনো সমস্যা আছে?


    অধ্যায় ২০

    বস’রা জাতিকে রক্ষা করে

    যখন আমি সিনেট থেকে অবসর নিলাম, তখন আমি ভেবেছিলাম একটি ভালো, দীর্ঘ বিশ্রাম নেব, একজন মানুষের জন্য যেমন বিশ্রাম প্রয়োজন যে প্রায় চল্লিশ বছর ধরে সরকারি পদে ছিল এবং এক বছরে চারটি ভিন্ন পদে থেকে তিনটির বেতন একই সাথে তুলেছে। এতগুলো বেতন তোলা বেশ ক্লান্তিকর, তুমি তো জানো, আর যেমনটা আমি বলেছিলাম, আমি বিশ্রামের জন্য শুরু করেছিলাম; কিন্তু যখন আমি দেখলাম যে নিউ ইয়র্ক রাজ্যে কী ঘটছে, এবং কীভাবে একটা বিশাল কালো ছায়া আমাদের ওপর ঝুলছে, তখন আমি নিজেকে বললাম: “তোমার জন্য কোনো বিশ্রাম নেই, জর্জ। তোমার কাজ এখনো শেষ হয়নি। তোমার দেশকে এখনো তোমার প্রয়োজন আর তুমি এখনো থামতে পারো না।”

    সেই বিশাল কালো ছায়াটা কী ছিল? এটা ছিল প্রাথমিক নির্বাচনী আইন (primary election law), যাকে এমনভাবে সংশোধন করা হয়েছে যাতে তথাকথিত দলীয় বসদের কোণঠাসা করা যায়, প্রাথমিক নির্বাচনে সবাইকে ঢুকতে দিয়ে এবং সেগুলোর ওপর রাজ্য কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ দিয়ে। ওহ, হ্যাঁ, তথাকথিত বসদের শেষ করার জন্য এটা একটা ভালো উপায়, কিন্তু তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছ যে যদি বসদের কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং তাদের জায়গা একদল ভ্রাম্যমাণ বাগ্মী আর কলেজ স্নাতকদের দ্বারা দখল হয়, তাহলে দেশের কী হবে? এর মানে হবে বিশৃঙ্খলা। এটা অনেকটা একদল কাপড়ের দোকানের কেরানিকে নিউ ইয়র্ক সেন্ট্রাল রেলরোডে এক্সপ্রেস ট্রেন চালানোর জন্য বসিয়ে দেওয়ার মতো। এটা ভাবলে আমার মনটা কেঁদে ওঠে। অজ্ঞ মানুষরা সবসময় দলীয় বসদের বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু বসরা চলে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করো! তখন, এবং শুধুমাত্র তখনই, তারা সঠিক ধরনের সমাধিলিপি পাবে, যেমনটা প্যাট্রিক হেনরি বা রবার্ট এমমেট বলেছিলেন।

    গত বিশ বছরে ট্যামানি হলের বসদের দিকে দেখো। কী অসাধারণ মানুষ! নিউ ইয়র্ক সিটি আজ যা কিছু, তার প্রায় সবকিছুর জন্য তাদের কাছে ঋণী। জন কেলি, রিচার্ড ক্রোকার এবং চার্লস এফ. মারফি—আমেরিকান ইতিহাসে কোন নাম তাদের সাথে তুলনা করা যায়, ওয়াশিংটন এবং লিংকন ছাড়া? তারাই মহান ট্যামানি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন, আর সংগঠন নিউ ইয়র্ককে গড়ে তুলেছে। যদি শহরটাকে গত বিশ বছর ধরে সিটিজেনস ইউনিয়নের মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো, তাহলে এখন তার কী অবস্থা হতো? তুমি একটা ভালো অনুমান করতে পারো যদি স্ট্রং এবং লো-এর প্রশাসনগুলোর কথা মনে করো, যখন কোনো বস ছিল না, আর দপ্তরের প্রধানরা সবসময় একে অপরের সাথে মতবিরোধে লিপ্ত থাকত, আর মেয়র তাদের সবার সাথে মতবিরোধ করত। তারা তর্ক-বিতর্ক আর লোক দেখানো কাজে এত বেশি সময় ব্যয় করত যে শহরের স্বার্থ ভুলে গিয়েছিল। এমন আরেকটা প্রশাসন নিউ ইয়র্ককে এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পিছিয়ে দেবে।

    তারপর দেখো একটা ট্যামানি সিটি সরকার তথাকথিত বসদের তত্ত্বাবধানে কত সুন্দরভাবে চলে! যন্ত্রটা এত নিঃশব্দে চলে যে তুমি ভাববে সেখানে কোনো যন্ত্র নেই। যদি কোনো মতপার্থক্য থাকে, ট্যামানি নেতা সেগুলো শান্তভাবে মিটিয়ে দেন আর তার নির্দেশ সবসময় কার্যকর হয়। মানুষ যখন সকালে ঘুম থেকে উঠে এই ভয় না নিয়ে থাকতে পারে যে সংবাদপত্রে দেখতে হবে ওয়াটার সাপ্লাইয়ের কমিশনার ডক কমিশনারকে ‘স্যান্ডব্যাগ’ দিয়ে আঘাত করেছে, এবং মেয়র ও দপ্তরের প্রধানদের সাক্ষী হিসেবে পুলিশ কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তখন এটা তাদের জন্য কত ভালো একটা অনুভূতি! এটা কোনো ঠাট্টা নয়। আমার মনে আছে, স্ট্রংয়ের অধীনে কিছু কমিশনার প্রায় একে অপরকে স্যান্ডব্যাগ দিয়ে আঘাত করার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।

    অবশ্যই, সংবাদপত্রগুলো সংস্কারবাদী প্রশাসন পছন্দ করে। কেন? কারণ এই প্রশাসনগুলো, তাদের প্রতিদিনের ঝগড়া-বিবাদ দিয়ে, বক্সিং বা বিবাহবিচ্ছেদের মামলার মতোই আকর্ষণীয় খবর জোগায়। ট্যামানি সংবাদপত্রে আসতে চায় না। এটা তার কাজ শান্তভাবে করে চলে আর শুধু চায় যে তাকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া হোক। এটাই একটা কারণ যে কেন সংবাদপত্রগুলো আমাদের বিরুদ্ধে থাকে।

    কিছু সংবাদপত্র অভিযোগ করে যে বসরা শহরের স্বার্থে তাদের জীবন উৎসর্গ করেও ধনী হয়। তাতে কী? যদি সৎ উপায়ে টাকা কামানোর সুযোগ তাদের সামনে আসে, তাহলে তারা কেন সেগুলোর সদ্ব্যবহার করবে না, যেমনটা আমি করেছি? যেমনটা আমি অন্য একটি আলাপে বলেছিলাম, সৎ চুরি এবং অসৎ চুরি বলে একটা জিনিস আছে। বসরা আগেরটার দিকে যায়। এই বিশাল শহরে এর এত সুযোগ আছে যে অসৎ চুরির দিকে গেলে তারা বোকা হয়ে যেত।

    এখন, প্রাথমিক নির্বাচনী আইন বসকে বাতিল করার এবং শহরের সরকারকে একটি চিড়িয়াখানায় পরিণত করার হুমকি দিচ্ছে। এই কারণেই আমি আমার পরিকল্পিত বিশ্রাম নিতে পারছি না। আমি আইনসভার পরবর্তী অধিবেশনের জন্য একটি বিল প্রস্তাব করতে যাচ্ছি, যা এই বিপজ্জনক আইনটি বাতিল করবে, এবং প্রাথমিক নির্বাচনগুলো সম্পূর্ণরূপে সংগঠনগুলোর হাতেই ছেড়ে দেবে, যেমনটা আগে ছিল। তখন সেই ভালো পুরোনো সময়গুলো ফিরে আসবে, যখন আমাদের ডিস্ট্রিক্ট নেতারা তাদের নিজেদের পছন্দ মতো কোনো জায়গায় সুন্দর, আরামদায়ক প্রাথমিক নির্বাচন করতে পারতেন এবং শুধু সেইসব মানুষকে ঢুকতে দিতেন যাদের তারা ভালো ডেমোক্র্যাট হিসেবে অনুমোদন করত। একজন মানুষ যে ভোট দিতে আসে, তার গণতন্ত্র সম্পর্কে ডিস্ট্রিক্টের নেতার চেয়ে ভালো বিচারক আর কে আছে? অবাঞ্ছিত ভোটারদের দূরে রাখার জন্য কার চেয়ে ভালো ব্যবস্থা আছে?

    যারা প্রাথমিক নির্বাচনী আইনটি পাস করিয়েছে, তারা সেই একই দল যারা সিভিল সার্ভিসের অভিশাপের পক্ষে থাকে, আর তাদের একই উদ্দেশ্য আছে—দলীয় সরকারগুলোর ধ্বংস, সংবিধানের পতন এবং সাধারণভাবে বিশৃঙ্খলা।

  • জর্জ ওয়াশিংটন প্লাঙ্কিট: একজন প্র্যাকটিক্যাল রাজনীতিকের কথা – পর্ব ৫


    অধ্যায় ১২

    রাজনীতিতে ‘ড্রেস সুট’ পরায় বিপদ

    রাজনীতিতে স্টাইল করা লাভজনক নয়। মানুষ এটা সহ্য করবে না। যদি তোমার স্টাইলের জন্য খুব বেশি আগ্রহ থাকে, তাহলে সেটা চেপে রাখো যতক্ষণ না তুমি টাকা কামিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে ১৪ বছরের জন্য বছরে ১৭,০০০ ডলারের চাকরি বা এই ধরনের কোনো চাকরি পাচ্ছ। তখন তুমি রাজনীতি থেকে যতটা পেতে পারো, তার সবই পেয়ে যাবে, আর তুমি চাইলে সারাদিন ড্রেস সুট পরতে পারো এবং রাতে তা পরেই ঘুমাতে পারো। কিন্তু, যতক্ষণ না তুমি জীবনের ‘লাইফ মিল টিকিট’ (জীবনের খাবার জোগাড় করার টিকিট) হাতে পাচ্ছ, ততক্ষণ সাধারণ থেকো। তোমার প্রতিবেশীদের মতোই জীবনযাপন করো, এমনকি যদি তোমার তার চেয়ে ভালো থাকার সামর্থ্যও থাকে। তোমার ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে গরিব মানুষটাকেও এমন অনুভব করতে দাও যে সে তোমার সমান, এমনকি তোমার চেয়ে একটু বেশিই ভালো।

    সবকিছুর ওপরে, ড্রেস সুট এড়িয়ে চলো। রাজনীতিতে ড্রেস সুট কী পরিমাণ ক্ষতি করেছে, তা তোমার কোনো ধারণাই নেই। সিভিল সার্ভিস সংস্কার বা মদের মতো এটি তরুণ রাজনীতিকদের জন্য এতটা মারাত্মক নয়, কিন্তু এর শিকার অনেকেই। আমি একটা দুঃখজনক ঘটনার কথা বলব। ১৮৯৭ সালে ট্যামানির বড় জয়ের পর, রিচার্ড ক্রোকার মেয়র ভ্যান উইকের জন্য পদের তালিকা তৈরি করতে লেকউডে গিয়েছিলেন। সব ডিস্ট্রিক্ট নেতা এবং আরও অনেক ট্যামানি লোকও সেখানে গিয়েছিল, যাতে তারা যা কিছু ভালো পাওয়ার মতো আছে, তা নিতে পারে। লেকউডে রাতের খাবারের সময় শুধু ড্রেস সুট ছিল, আর ক্রোকার কোনো ট্যামানি লোককে ড্রেস সুট ছাড়া রাতের খাবারে যেতে দিত না। যাই হোক, ওয়েস্ট সাইডের একজন উজ্জ্বল তরুণ রাজনীতিক, যিনি একটি দপ্তরে তিন হাজার ডলারের চাকরি করতেন, ক্রোকারের কাছে আরও ভালো কিছু চাওয়ার জন্য লেকউডে গিয়েছিল। সে তার জীবনে প্রথমবারের মতো ড্রেস সুট পরেছিল। এটাই তার পতনের কারণ হলো। সে নিজের ওপর মুগ্ধ হয়ে গেল। তার মনে হচ্ছিল সে দেখতে অবিশ্বাস্য সুন্দর, আর যখন সে বাড়িতে ফিরে এল, তখন সে একজন অন্য মানুষ। সে প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে এসেই সেই ড্রেস সুট পরত আর ঘুমানোর সময় পর্যন্ত ওটা পরেই বসে থাকত। এটা তাকে বেশি দিন সন্তুষ্ট রাখতে পারল না। সে চাইত অন্যরাও দেখুক যে ড্রেস সুটে তাকে কতটা সুন্দর লাগে; তাই সে নাচের ক্লাবে যোগ দিল এবং শহরে যত বল ডান্সের আয়োজন হতো, সবগুলোতে যাওয়া শুরু করল। খুব তাড়াতাড়িই সে তার পরিবারকে অবহেলা করতে লাগল। এরপর সে মদ খাওয়া শুরু করল, আর ডিস্ট্রিক্টে তার রাজনৈতিক কাজের দিকে কোনো মনোযোগ দিল না। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তার পতন হলো। তাকে দপ্তর থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল এবং সে উচ্ছন্নে চলে গেল। সেদিন তাকে প্রায় ভবঘুরের মতো পোশাকে দেখলাম, কিন্তু তার শরীরে তখনও একটা ড্রেস সুটের ভেস্ট ছিল। যখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম সে কী করছে, সে বলল: “এখন কিছুই করছি না, কিন্তু সিটিজেনস ইউনিয়নের সদর দফতরে ভোটার তালিকাভুক্ত করার একটা কাজের প্রতিশ্রুতি পেয়েছি।” হ্যাঁ, একটা ড্রেস সুট তাকে এত নিচে নামিয়ে এনেছিল!

    আমার নিজের অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্টে আরও একটা ঘটনা বলি। কয়েক বছর আগে আমার একজন লেফটেন্যান্ট ছিল, যার নাম ছিল জিক থম্পসন। সে আমার জন্য দারুণ কাজ করত আর আমি ভেবেছিলাম তার একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। একদিন সে আমার কাছে এসে বলল যে সে একটা বাড়ি কেনার জন্য একটা অপশন (চুক্তি) কিনতে চায়, আর আমাকে সাহায্য করতে বলল। আমি একজন তরুণকে সম্পত্তি অর্জন করতে দেখলে খুশি হই, আর জিকের ওপর আমার এত বিশ্বাস ছিল যে আমি তার জন্য বাড়িটার টাকা দিয়ে দিলাম।

    এক মাস বা তারও বেশি সময় পর আমি কিছু অদ্ভুত গুজব শুনলাম। লোকজন আমাকে বলল যে জিক স্টাইল করতে শুরু করেছে। তারা বলল যে তার বাড়িতে একটা বিলিয়ার্ড টেবিল আছে আর সে জাপানি চাকর রেখেছে। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একজন ডেমোক্র্যাট, ফিফটিন্থ অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্টের জর্জ ওয়াশিংটন প্লাঙ্কিটের একজন অনুসারী—তার বাড়িতে বিলিয়ার্ড টেবিল আর জাপানি চাকর থাকবে, এমনটা ভাবতেই পারছিলাম না! একদিন সকালে আমি জিককে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়ার জন্য তার বাড়িতে গেলাম। একজন জাপানি আমার জন্য দরজা খুলল। আমি বিলিয়ার্ড টেবিল দেখলাম—জিক দোষী ছিল! এই ধাক্কা সামলে আমি জিককে বললাম: “তুমি হাতে-নাতে ধরা পড়েছ। কোনো অজুহাত চলবে না। এই ডিস্ট্রিক্টের ডেমোক্র্যাটরা ডিউক আর প্রিন্সদের সাথে অভ্যস্ত নয়, আর আমরা তোমার সঙ্গ পেলে অস্বস্তি বোধ করব। তুমি আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে। তোমার উনিশতম বা সাতাশতম ডিস্ট্রিক্টে চলে যাওয়া উচিত, আর তোমার দরজায় একটা সিল্কের মোজা ঝুলিয়ে দেওয়া উচিত।” সে উনিশতম ডিস্ট্রিক্টে চলে গেল, রিপাবলিকান হয়ে গেল, আর তার সম্পর্কে শেষ যা শুনেছিলাম তা হলো, সে আলবানিতে একটা চাকরির খোঁজ করছিল।

    এখন, কেউ আমাকে কখনো স্টাইল করতে দেখেনি। ৪০ বছর আগে রাজনীতিতে যখন আমি নেমেছিলাম, তখন আমি যেমন প্লাঙ্কিট ছিলাম, আজও তেমনই আছি। এই কারণেই ডিস্ট্রিক্টের মানুষেরা আমার ওপর ভরসা রাখে। যদি আমি স্টাইলিশ হতে শুরু করি, তাহলে আমি, প্লাঙ্কিটও, হয়তো ডিস্ট্রিক্টে পরাজিত হতে পারতাম। গত বছরের সেনেট নির্বাচনে এটা বেশ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনের একদিন আগে, আমার শত্রুরা একটা গুজব ছড়িয়েছিল যে আমি একটা ১০,০০০ ডলারের গাড়ি এবং একটা ১২৫ ডলারের ড্রেস সুট অর্ডার করেছি। আমি যত দ্রুত সম্ভব এর বিরোধিতা করলাম, কিন্তু ভোট শেষ হওয়ার আগে আমি এই জঘন্য কুৎসা দূর করতে পারিনি, আর তাই আমি ভোটে কিছুটা খারাপ ফল করেছিলাম। আমি শহরের কোষাগার লুট করার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে মানুষ খুব বেশি কিছু মনে করত না, কারণ তারা এই ধরনের কুৎসার সাথে প্রচারাভিযানে অভ্যস্ত, কিন্তু গাড়ি আর ড্রেস সুট তাদের জন্য অতিরিক্ত ছিল।

    আরেকটা জিনিস যা মানুষ সহ্য করবে না, তা হলো তোমার বিদ্যা জাহির করা। এটা অন্যভাবে স্টাইল করা ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি তুমি কোনো প্রচারাভিযানে বক্তৃতা দাও, তাহলে মানুষের ভাষায় কথা বলো। শেক্সপিয়ারের উদ্ধৃতি দিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করো না। শেক্সপিয়ার তার মতো ঠিক ছিলেন, কিন্তু তিনি ফিফটিন্থ ডিস্ট্রিক্টের রাজনীতি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। যদি তুমি লাতিন আর গ্রিক জানো আর কাউকে সেগুলো শোনানোর ইচ্ছা থাকে, তাহলে একজন অচেনা মানুষকে ভাড়া করে তোমার বাড়িতে এনে কয়েক ঘণ্টা তাকে শোনানোর জন্য রাখো; এরপর বাইরে গিয়ে মানুষের সাথে ফিফটিন্থের ভাষায় কথা বলো। আমি জানি, নিজের বিদ্যা জাহির করার লোভটা খুবই মারাত্মক। আমিও এটা অনুভব করেছি, কিন্তু আমি সবসময় এটাকে প্রতিরোধ করি। আমি এর ভয়ংকর পরিণতি জানি।


    অধ্যায় ১৩

    পৌরসভা মালিকানা প্রসঙ্গে

    আমি একটি শর্তে পৌরসভা মালিকানার (Municipal ownership) পক্ষে: যদি সিভিল সার্ভিস আইন বাতিল করা হয়। এটা একটা দারুণ ধারণা—শহরই রেলওয়ে, গ্যাস প্ল্যান্ট এবং এমন সবকিছুর মালিক হবে। শুধু একবার ভেবে দেখো, ট্যামানির কর্মীদের জন্য কত হাজার নতুন পদ তৈরি হবে। আরে, যদি কোনো সিভিল সার্ভিস আইন পথে বাধা না দিত, তাহলে তো প্রায় সবার জন্য পর্যাপ্ত চাকরি থাকত। আমার পরিকল্পনাটা এরকম: প্রথমে সেই জঘন্য আইনটা বাতিল করা, আর তারপর আস্তে আস্তে পৌরসভা মালিকানার দিকে এগিয়ে যাওয়া।

    কিছু সংস্কারক বলছে যে পৌরসভা মালিকানা কাজ করবে না, কারণ এটা রাজনীতিকদের অনেক পৃষ্ঠপোষকতা দেবে। এই লোকগুলো যখন যুক্তি দেয়, তখন তারা সবকিছু কেমন গুলিয়ে ফেলে! যখন তারা এই কথাটা বলে, তখন তারা আসলে পৌরসভা মালিকানার পক্ষে সবচেয়ে জোরালো যুক্তিটা দেয়। রেলওয়ে, গ্যাস প্ল্যান্ট আর ফেরিগুলো চালানোর জন্য এমন মানুষের চেয়ে ভালো আর কে আছে, যারা শহরের স্বার্থ দেখার ব্যবসাটা করে? শহরের সেবা করতে কে বেশি আগ্রহী? কার চাকরির বেশি দরকার?

    ডক ডিপার্টমেন্টের দিকে দেখো! শহরই ডকগুলোর মালিক, আর ট্যামানি সেগুলোকে কত সুন্দরভাবে পরিচালনা করে! আমাদের কর্মীদের জন্য তারা কতগুলো পদ তৈরি করে, তা আমি তোমাকে বলতে পারব না। আমি জানি ডকের দুর্নীতি (graft) নিয়ে অনেক কথা হয়, কিন্তু সেই কথাগুলো আসে যারা ক্ষমতার বাইরে থাকে তাদের কাছ থেকে। যখন রিপাবলিকানরা লো এবং স্ট্রংয়ের অধীনে ডকগুলো চালাত, তখন তুমি তাদের দুর্নীতি নিয়ে কিছু বলতে শুনেছ কি? না; তারা শুধু সুযোগ বুঝে লুটপাট করত। এমনটাই সবসময় হয়। যখন সংস্কারকরা বাইরে থাকে, তখন তারা চিৎকার করে বলে যে ট্যামানি লোকদের জেলে পাঠানো উচিত। আর যখন তারা ক্ষমতায় আসে, তখন নিজেরা কীভাবে জেলে না যায়, তা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে ট্যামানিকে আক্রমণ করার কোনো সময়ই পায় না।

    আমি শুধু চাই পৌরসভা মালিকানা ততক্ষণ পর্যন্ত স্থগিত থাকুক, যতক্ষণ না আমি সিভিল সার্ভিস আইন বাতিলের জন্য আমার বিলটা পরবর্তী আইনসভায় পেশ করতে পারছি। যদি চাকরিপ্রার্থী প্রতিটি লোককে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সবকিছু জগাখিচুড়ি হয়ে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন মানুষ সারফেস কারে মোটরচালক হিসেবে চাকরি চায়, তাহলে দশটার মধ্যে নয়বারই তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: “ল্যাটিন ব্যাকরণ কে লিখেছিলেন, আর যদি লিখে থাকেন, তাহলে কেন লিখেছিলেন? তুমি কলেজে কত বছর ছিলে? গ্রিক ভাষার এমন কোনো অংশ আছে কি যা তুমি জানো না? তুমি যা কিছু জানো না, তার একটা তালিকা দাও এবং কেন জানো না তার কারণ বলো। ইউনাইটেড স্টেটস সুপ্রিম কোর্টের শেষ দশটি সিদ্ধান্তের হুবহু প্রতিটা শব্দ লিখে দাও এবং দেখাও যে সেগুলো নিউ ইয়র্ক সিটির পুলিশ আদালতের শেষ দশটি সিদ্ধান্তের সাথে কোনোভাবে সাংঘর্ষিক কি না।”

    সেই সম্ভাব্য মোটরচালক সিভিল সার্ভিস রুম থেকে বের হওয়ার আগেই সে হয়তো পাগল হয়ে যাবে। যাই হোক, আমি তার গাড়িতে চড়তে পছন্দ করব না। ঠিক এই মুহূর্তে আমি সিভিল সার্ভিস সম্পর্কে একটি চূড়ান্ত কথা বলতে চাই। গত দশ বছরে আমি একটি তদন্ত করেছি যা আমি এই পর্যন্ত গোপন রেখেছিলাম। এখন আমার কাছে সব পরিসংখ্যান একসাথে আছে, এবং আমি ফলাফল ঘোষণা করতে প্রস্তুত। আমার তদন্ত ছিল কতজন সিভিল সার্ভিস সংস্কারক এবং কতজন রাজনীতিক রাজ্য কারাগারে আছে, তা খুঁজে বের করা। আমি আবিষ্কার করেছি যে কারাবন্দিদের মধ্যে ৪০ শতাংশ বেশি সিভিল সার্ভিস সংস্কারক ছিল। যদি কোনো আইনসভা কমিটি বিস্তারিত পরিসংখ্যান চায়, আমি যা বলি তা প্রমাণ করে দেব। আমি এখন পরিসংখ্যানগুলো দিতে চাই না, কারণ আমি যখন সিভিল সার্ভিস আইন বাতিলের জন্য আলবানি যাব, তখন সেগুলোকে আমার পক্ষে সমর্থন হিসেবে রাখতে চাই। তুমি কি মনে করো না যে যখন আমার পালা আসবে, তখন সিভিল সার্ভিস আইন বাতিল হয়ে যাবে, আর মানুষ দেখবে যে রাজনীতিকরা ঠিক আছে এবং পৌরসভা মালিকানা আসার পর তাদেরই সবকিছুর দায়িত্ব নেওয়া উচিত?

    পৌরসভা মালিকানা সম্পর্কে আরও একটি কথা। যদি শহরের রেলওয়ে ইত্যাদির মালিকানা থাকত, তাহলে বেতন নিশ্চিতভাবে বেড়ে যেত। বেশি বেতনই হলো আজকের দিনের সবচেয়ে বড় চাহিদা। পৌরসভা মালিকানা সব জায়গায় বেতন বৃদ্ধি করবে এবং এমন দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলবে যা নিউ ইয়র্ক সিটি এর আগে কখনো দেখেনি। যে বেতন দিয়ে কোনোমতে জীবন চলে, সেই বেতনে তুমি দেশপ্রেমিক হতে পারো না। যে কোনো মানুষ এমন ভান করবে, তার ওপর নজর রাখা উচিত। তার আশেপাশে থাকলে তোমার হাত তোমার ঘড়ি আর মানিব্যাগের ওপর রেখো। কিন্তু, যখন একজন মানুষের একটা ভালো, মোটা বেতন থাকে, তখন সে অজান্তেই “হেইল কলাম্বিয়া” গুনগুন করতে থাকে, আর সে যখন ট্রলিকারের মধ্যে থাকে, তখন তার মনে হয় চাকাগুলো সবসময় বলছে: “ইয়াঙ্কি ডুডল শহরে এল।” আমি নিজেও এটা বুঝি। যখন আমি শহর থেকে আমার প্রথম ভালো চাকরিটা পেলাম, তখন এই গৌরবময় দেশকে অভিবাদন জানানোর জন্য আমার ডিস্ট্রিক্টের সব পটকা আমি কিনে নিয়েছিলাম। আমি ফোর্থ জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারিনি। আমি ব্লকের ছেলেদের দিয়ে সেগুলো ফোটাই, আর আমি একজন আমেরিকান হতে পেরে গর্বিত অনুভব করি। তার অনেক দিন পর পর্যন্ত আমি রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে “দ্য স্টার-স্প্যাঙ্গলড ব্যানার” [আমেরিকার জাতীয় সংগীত] গাইতাম।


    অধ্যায় ১৪

    ট্যামানিই একমাত্র দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্র

    গত পঁচিশ বছরে আমি নিউ ইয়র্ক সিটিতে একশোর বেশি “গণতন্ত্র” (Democracies) উদয় হতে এবং বিলীন হতে দেখেছি। প্রতি বছর অন্তত ছয়টি নতুন তথাকথিত গণতান্ত্রিক সংগঠন গঠিত হয়। তাদের সবার উদ্দেশ্য থাকে ট্যামানিকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং তার জায়গা দখল করা, কিন্তু তারা খুব কমই এক বা দুই বছরের বেশি টিকে থাকে। অন্যদিকে, ট্যামানি যেন চিরস্থায়ী শিলা, চিরন্তন পাহাড় এবং এলিভেটেড রোডের ব্লকেডের মতো—এটা চিরকাল ধরে চলে।

    আমার মনে পড়ছে সেই ‘কাউন্টি ডেমোক্র্যাসি’র কথা, যা আমার সময়ে ট্যামানির একমাত্র সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, ‘ইর্ভিং হল ডেমোক্র্যাসি’, ‘নিউ ইয়র্ক স্টেট ডেমোক্র্যাসি’, ‘জার্মান-আমেরিকান ডেমোক্র্যাসি’, ‘প্রোটেকশন ডেমোক্র্যাসি’, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট কাউন্টি ডেমোক্র্যাসি’, ‘গ্রেটার নিউ ইয়র্ক ডেমোক্র্যাসি’, ‘জিমি ও’ব্রায়েন ডেমোক্র্যাসি’, ‘ডিলিক্যাটেসেন ডিলার্স’ ডেমোক্র্যাসি, ‘সিলভার ডেমোক্র্যাসি’ এবং ‘ইতালিয়ান ডেমোক্র্যাসি’। তাদের মধ্যে একটিও আজ জীবিত নেই, যদিও আমি শুনেছি যে ‘গ্রেটার নিউ ইয়র্ক ডেমোক্র্যাসি’-র ভূত নাকি বছরে একবার বা দু’বার ব্রডওয়েতে দেখা যায়।

    আগেকার দিনে যখন ‘কাউন্টি ডেমোক্র্যাসি’ ছিল, তখন একটা নতুন গণতান্ত্রিক সংগঠন ট্যামানির জন্য কিছুটা ঝামেলা তৈরি করত—তবে সেটা সাময়িকভাবে। আজকাল একটা নতুন ‘গণতন্ত্র’র অর্থ আর কিছুই নয়, শুধু এইটুকুই বোঝায় যে প্রায় এক ডজন সুযোগসন্ধানী শুধুমাত্র একটি প্রচারণার জন্য একত্রিত হয়েছে যাতে ট্যামানিকে প্রভাবিত করে তাদের জন্য এক-দুটি চাকরি জোগাড় করা যায়, অথবা একই উদ্দেশ্যে সংস্কারকদের সাথে মিশে যাওয়ার জন্য। তুমি হয়তো ভাবতে পারো যে এই ধরনের সংগঠন তৈরি করতে এবং একটি প্রচারণার জন্যও তা চালিয়ে যেতে অনেক টাকা লাগে, কিন্তু হে ভগবান! এর খরচ প্রায় কিছুই না। জিমি ও’ব্রায়েন “গণতন্ত্র” তৈরির শিল্পকে একটা নিখুঁত বিজ্ঞানে পরিণত করেছিল এবং উৎপাদনের খরচ এতটাই কমিয়ে এনেছিল যে তা সবার নাগালের মধ্যে চলে এসেছিল। এখন যে কোনো মানুষ মাত্র ৫০ ডলার দিয়ে নিজের একটা “গণতন্ত্র” তৈরি করতে পারে।

    আমি এই শিল্পটা নিয়ে খোঁজখবর নিয়েছি, আর আমি তোমাকে সঠিক খরচের হিসাব দিতে পারি। একটা নতুন “গণতন্ত্র”র খরচের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:

    • বারো জন সুযোগসন্ধানীর জন্য একটি নৈশভোজ: ১২.০০ ডলার
    • জেফারসনীয় গণতন্ত্র নিয়ে একটি বক্তৃতা: ০০.০০ ডলার
    • নীতিমালার ঘোষণা (টাইপরাইটিং): ২.০০ ডলার
    • সদর দপ্তরের জন্য একটি ছোট কক্ষের এক মাসের ভাড়া: ১২.০০ ডলার
    • স্টেশনারি: ২.০০ ডলার
    • বারোটি পুরোনো চেয়ার: ৬.০০ ডলার
    • একটি পুরোনো টেবিল: ২.০০ ডলার
    • উনত্রিশটি থুতু ফেলার পাত্র: ৯.০০ ডলার
    • সাইন পেইন্টিং: ৫.০০ ডলার
    • মোট: ৫০.০০ ডলার

    তাহলে কি এটা অবাক হওয়ার কোনো কারণ আছে যে পৌরসভা প্রচারাভিযান যখন শুরু হয়, তখন চারপাশে “গণতন্ত্র” গজিয়ে ওঠে? যদি তুমি অন্তত একটা ছোট চাকরিও পাও, তাহলে তোমার বিনিয়োগের ওপর একটা বড় লাভ আসে। তোমাকে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের জন্য টাকা দিতে হয় না। নিউ ইয়র্কের সংবাদপত্রগুলো ট্যামানির বিরুদ্ধে আসা যে কোনো নতুন সংগঠনকে পাতায় পাতায় খবর দেওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ৫০ ডলারের ভিত্তিতে একটি “গণতন্ত্র” গঠনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সংবাদপত্রগুলো হয়তো এমন কিছু লিখবে: “গত রাতে ‘ডিলিক্যাটেসেন ডেমোক্র্যাসি’-র সংগঠন ট্যামানি হলের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এটা এই শহরে একটি নতুন এবং বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের জন্য একটি মহান পদক্ষেপ। ট্যামানির নেতারা সম্ভবত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন; ফোর্থিন্থ স্ট্রিটে ইতিমধ্যেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন সংগঠনের উদ্বোধনে জড়ো হওয়া বিশাল জনতা, উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা এবং নীতিমালার ঘোষণা বোঝায় যে, অবশেষে এমন একটি জাগরণ এসেছে যা ট্যামানির দুর্নীতির পথের অবসান ঘটাবে। ডিলিক্যাটেসেন ডেমোক্র্যাসি কয়েক দিনের মধ্যে প্রশস্ত সদর দপ্তর খুলবে যেখানে সব সত্যিকারের ডেমোক্র্যাটরা একত্রিত হয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবে।”

    শোনো, কিছু সংবাদপত্র রাজনীতি নিয়ে কত সহজে বিশ্বাস করে, তা দেখে অবাক লাগে, তাই না? আইওয়া বা টেক্সাসের আনাড়িদের কথা আর বলো না, তাদের সরলতা এই সংবাদপত্রগুলোর শিশুসুলভ সারল্যের কাছে কিছুই না।

    এটা আমার কাছে একটা বিস্ময় যে কেন আরও বেশি মানুষ এই ধরনের উৎপাদন শিল্পে আসে না। সাধারণত এতে ‘গ্রিন-গুডস’ (নকল টাকার ব্যবসা) ব্যবসার চেয়ে বেশি লাভ থাকে এবং কোনো ঝুঁকিও থাকে না। আর তোমাকে গ্রিন-গুডসের লোকদের মতো বেশি বিনিয়োগ করতে হয় না। গত কয়েক বছরে এই “গণতন্ত্র”গুলো কত ভালো জিনিস পেয়েছে, শুধু দেখো! ‘নিউ ইয়র্ক স্টেট ডেমোক্র্যাসি’ ১৮৯৭ সালে তাদের সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতার জন্য একটি সুপ্রিম কোর্ট বিচারকের পদ পেয়েছিল—১৪ বছরের মেয়াদ, বছরে ১৭,৫০০ ডলার, অর্থাৎ মোট ২,৪৫,০০০ ডলার। দেখো, ট্যামানি সেই বছর কিছুটা ভয় পেয়েছিল এবং রাজ্য গণতন্ত্রের সমর্থন পাওয়ার জন্য এই চাকরিটা দিতে বাধ্য হয়েছিল, যা, এই বড় জিনিসটা পাওয়ার পরের দিনই দ্রুত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরের বছর ‘জার্মান ডেমোক্র্যাসি’ একই ধরনের একটি পদ পেয়েছিল। আর তারপর দেখো, ‘গ্রেটার নিউ ইয়র্ক ডেমোক্র্যাসি’ ২০০১ সালে সংস্কারকদের সাথে কীভাবে খেলা খেলেছিল! যারা এই সংস্থাটি চালাত, তারা ছিল প্রাক্তন ট্যামানি লোক, যারা তাদের ক্ষমতা হারিয়েছিল; তবুও তারা ‘সিটিজেনস ইউনিয়ন’-এর নিরীহ সদস্যদের বিশ্বাস করাতে পেরেছিল যে তারা সংস্কারকদের আসল জিনিস, আর তাদের পেছনে ১,০০,০০০ ভোটার আছে। তারা ম্যানহাটনের বরো প্রেসিডেন্ট, বোর্ড অব অ্যালডারমেন-এর প্রেসিডেন্ট, রেজিস্ট্রার এবং আরও অনেক ছোট ছোট পদ পেয়েছিল, যা আধুনিক সময়ের সবচেয়ে বড় প্রতারণার খেলা ছিল।

    আর তারপর, ১৮৯৪ সালে, যখন স্ট্রং মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল, তখন সেই বছর তৈরি হওয়া সব ছোট ছোট “গণতন্ত্র”গুলোর জন্য কী দারুণ ফসল ছিল! তাদের প্রত্যেকেই ভালো কিছু পেয়েছিল। একটা ক্ষেত্রে, একটি সংগঠনের নয়জন সদস্যের প্রত্যেকেই ২,০০০ থেকে ৫,০০০ ডলারের চাকরি পেয়েছিল। আমি ঠিক জানি যে সেই সংগঠনটি তৈরি করতে কত খরচ হয়েছিল। সেটা ছিল ৪২.০৪ ডলার। তারা স্টেশনারি বাদ দিয়েছিল, আর মাত্র তেইশটা থুতু ফেলার পাত্র নিয়েছিল। অতিরিক্ত চার সেন্ট ছিল দুটো ডাকটিকিটের জন্য।

    আমার মনে হয় কেন আরও বেশি মানুষ এই শিল্পে আসে না তার একমাত্র কারণ হলো, তারা এটা সম্পর্কে জানে না। আর এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে যে আমি যা বলেছি, তা হয়তো প্রকাশ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সম্ভবত যদি এটা জানা যায় যে “গণতন্ত্র” তৈরি করা কতটা সহজ, তাহলে সব গ্রিন-গুডসের লোক, প্রতারকরা, এবং তরুণ আর্থিক নেপোলিয়নরা এতে যোগ দেবে আর জনগণ আগে যা প্রতারণার শিকার হয়েছে তার চেয়েও বেশি হবে। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত, এতে কী-ই বা যায় আসে? সবসময়ই একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক বোকা থাকে আর একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক লোক থাকে যারা তাদের ফাঁসানোর সুযোগ খোঁজে, আর বোকারা নিশ্চিতভাবেই কোনো না কোনোভাবে ধরা পড়ে। এটা হলো চাহিদা এবং সরবরাহের চিরন্তন আইন।

  • জর্জ ওয়াশিংটন প্লাঙ্কিট: একজন প্র্যাকটিক্যাল রাজনীতিকের কথা – পর্ব ৩


    অধ্যায় ৫

    নিউ ইয়র্ক সিটি হলো ‘হেসিড’দের জন্য একটা কেকের টুকরা

    এই শহরটা সম্পূর্ণরূপে অ্যালবানির ‘হেসিড’ (গ্রাম্য, আনাড়ি) আইনপ্রণেতাদের দ্বারা শাসিত হয়। আমি আমার দীর্ঘ আইনসভা জীবনে একজনও এমন আপস্টেট রিপাবলিকানকে দেখিনি যে এখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায়নি। এই গ্রাম্য লোকেরা ভাবে আমরা যেন জাতীয় সরকারের কাছে থাকা আমেরিকান আদিবাসীদের মতো—অর্থাৎ, রাজ্যের এক ধরনের আশ্রিত যারা নিজেদের খেয়াল রাখতে পারে না এবং সেন্ট লরেন্স, অন্টারিও এবং অন্যান্য গ্রামের কাউন্টিগুলোর রিপাবলিকানদের দ্বারা তাদের খেয়াল রাখা উচিত। প্রাক্তন গভর্নর ওডেল কেন এখানে এসে রিপাবলিকান মেশিন পরিচালনা করবেন, তা নিয়ে কেন কেউ অবাক হবে? নিউবার্গ তার জন্য যথেষ্ট বড় নয়। সে অন্য সব আপস্টেট রিপাবলিকানের মতোই নিউ ইয়র্ক সিটি দখল করতে চায়। নিউ ইয়র্ক হলো তাদের কেকের টুকরা।

    শোনো, তোমরা আয়ারল্যান্ডের নিপীড়িত জনগণ, রাশিয়ার কৃষক এবং অত্যাচারিত বোয়ারদের সম্পর্কে অনেক কথা শোনো। এবার আমি তোমাকে বলি যে এই মহান ও রাজকীয় শহরের মানুষের চেয়ে তাদের সত্যিকারের স্বাধীনতা এবং স্ব-শাসন অনেক বেশি। উদাহরণস্বরূপ, ইংল্যান্ডে তারা আইরিশদের কিছু স্ব-শাসন দেওয়ার ভান করে। এই রাজ্যে রিপাবলিকান সরকার কোনো ভানই করে না। তারা সরাসরি বলে: “নিউ ইয়র্ক সিটি একটা সুন্দর, বড়, মোটাতাজা রাজহাঁস। তোমাদের ছুরি নিয়ে এসো আর একটা টুকরা কেটে নাও।” তারা রাজহাঁসের সম্মতি নেওয়ার ভানটুকুও করে না।

    আমাদের নিজস্ব রাস্তা, ডক, জলসীমা বা অন্য কোনো কিছুই আমাদের নিজেদের নয়। রিপাবলিকান আইনসভা এবং গভর্নর পুরো ব্যাপারটাই চালান। তারা আমাদের যা খেতে এবং পান করতে বলে, আমাদের তা-ই খেতে ও পান করতে হয়। এমনকি আমাদের নিজেদের খাওয়া এবং পান করার সময়টাও তাদের সুবিধার জন্য ঠিক করতে হয়। যদি তাদের রবিবার বিয়ার পান করতে ভালো না লাগে, তাহলে আমাদেরকেও বিরত থাকতে হবে। যদি তাদের গ্রামে কোনো বিনোদন না থাকে, তাহলে আমাদেরও কোনো বিনোদন থাকতে পারবে না। আমাদের পুরো জীবন তাদের সুবিধার জন্য নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর এর ওপর আমাদের তাদের করও দিতে হয়।

    তুমি কি কখনো আইনসভার কাছ থেকে কিছু চাইতে প্রতিনিধি দল নিয়ে এই শহর থেকে আলবানিতে গিয়েছিলে? না? তাহলে যেও না। যে গ্রাম্য লোকেরা সব কমিটি চালায়, তারা তোমাকে এমনভাবে দেখবে যেন তুমি একটা শিশু, যে জানে না সে কী চায়। আর তারা তোমাকে অনেক কথায় বলবে যে বাড়ি যাও আর ভালো ছেলে হয়ে থাকো, আইনসভা তোমার জন্য যা ভালো মনে করে, তা-ই দেবে। তারা এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার ভাব দেখায়, যেন বলছে, “এই ছেলেমেয়েরা খুব ঝামেলা করে। তারা সবসময় লজেন্স চায়, আর তারা জানে যে সেটা খেলে তাদের শরীর খারাপ হবে। তাদের ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত যে আমরা তাদের খেয়াল রাখার জন্য আছি।” আর যদি তুমি তাদের সাথে তর্ক করার চেষ্টা করো, তারা করুণার হাসি হেসে এমনভাবে দেখাবে যেন তারা একটা নষ্ট হওয়া শিশুকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

    কিন্তু কেমুং, ওয়েন বা টায়োগা থেকে একজন রিপাবলিকান কৃষককে ক্যাপিটলে আসতে দাও। রিপাবলিকান আইনসভা তার দিকে ছুটে যাবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করবে সে কী চায় আর বলবে যদি সে যা চায় তা দেখতে না পায়, তাহলে যেন চেয়ে নেয়। যদি সে বলে তার কর খুব বেশি, তারা তাকে উত্তর দেবে: “ঠিক আছে, বুড়ো, এটা নিয়ে চিন্তা করো না। আমরা তোমার কতটুকু ছাড় দেব?”

    “আমার মনে হয় আপাতত প্রায় ৫০ শতাংশ হলেই হবে,” লোকটি বলল। “এটা কি করে দিতে পারবেন?”

    “অবশ্যই,” আইনসভা রাজি হয়। “আমাদের আরও কিছু দাও, ‘নিউ ইয়র্ক সিটি গ্রাম্যদের জন্য কেকের টুকরা’, আরও চেষ্টা করো, লজ্জা পেও না। তুমি চাইলে আমরা ৬০ শতাংশও ছাড় দেব। আমরা এই জন্যই এখানে এসেছি।”

    এরপর আইনসভা নিউ ইয়র্ক সিটিতে মদের ওপর কর বা অন্য কোনো কর বাড়ানোর আইন পাস করে, আয়ের অর্ধেক রাজ্য কোষাগারের জন্য নেয় এবং কৃষকদের কর তাদের ইচ্ছেমতো কমিয়ে দেয়। এটা একটা গাছের গুঁড়ি থেকে গড়িয়ে পড়ার মতোই সহজ—যখন তোমার কাছে একটা ভালো কার্যকরী সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে আর বিবেকের কোনো বালাই থাকে না।

    আমাকে তোমাকে আরেকটা উদাহরণ দিতে দাও। এটা আমাকে প্রচণ্ড রাগান্বিত করে। গত বছর হাডসন নদীর ধারে কিছু গ্রাম্য লোক, বেশিরভাগই ওডেলের আশেপাশের এলাকার, তাদের ডকগুলো নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছিল, যেখানে তারা তাদের সবজি, ইট এবং তাদের উৎপাদিত অন্যান্য জিনিসপত্র তুলত। তারা একসাথে হয়ে বলল: “চলো নিউ ইয়র্কে একটা ট্রিপ দিই আর সবচেয়ে ভালো ডকটা বেছে নিই। বাকিটা ওডেল আর আইনসভা করে দেবে।” তারা সত্যিই এখানে এসেছিল, আর কী মনে করো তারা বেছে নিয়েছিল? আমার ডিস্ট্রিক্টের সবচেয়ে ভালো ডকটা! জর্জ ডব্লিউ. প্লাঙ্কিটের ডিস্ট্রিক্টে অনুমতি না নিয়েই ঢুকে পড়ল। এরপর তারা ওডেলকে একটি বিল পাস করিয়ে দিতে বলল, যাতে সেই ডকটা তাদের দেওয়া হয়, আর সে তা-ই করল।

    যখন বিলটি মেয়র লো-এর সামনে এল, তখন আমি আমার জীবনের সেরা বক্তৃতাটি দিয়েছিলাম। আমি তুলে ধরেছিলাম কীভাবে আইনসভা ডক কমিশনারকে পাশ কাটিয়ে পুরো জলসীমাটা গ্রাম্য লোকদের দিয়ে দিতে পারে, এবং মেয়রকে সতর্ক করে বলেছিলাম যে জাতিগুলো এর চেয়ে কম কারণেও তাদের সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ওডেল আর লো ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর—যাই হোক, আমার ডকটা চুরি হয়ে গেল।

    রাজ্যের প্রচারণায় তোমরা ওডেলের রাজ্য কর প্রায় কিছুই না করে দেওয়ার মহান কাজ সম্পর্কে অনেক শুনেছ, আর আগামী বছরের প্রচারণায় আরও অনেক কিছু শুনবে। সে কীভাবে এটা করল? রাজ্যের সরকারের খরচ কমিয়ে? ওহ, না! খরচ বরং বেড়েছিল। সে শুধু নিউ ইয়র্ক সিটিকে শোষণ করার পুরোনো রিপাবলিকান কাজটি করেছিল। পার্থক্য শুধু এই ছিল যে সে প্রায় শহরটাকে একদম শুকিয়ে ফেলেছিল। সে কেবল মদের করই বাড়ায়নি, বরং কর্পোরেশন, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি এবং তার চোখে যা কিছু ছিল, তার উপর সব ধরনের কর বসিয়েছিল। অবশ্যই, প্রায় পুরো করটাই শহরের ওপর পড়েছিল। এরপর ওডেল গ্রামের ডিস্ট্রিক্টগুলোতে গিয়ে বলল: “দেখো আমি তোমাদের জন্য কী করেছি। তোমাদের আর রাজ্যের কোনো কর দিতে হবে না। আমি কি একজন ভালো মানুষ নই?”

    একবার অরেঞ্জ কাউন্টির একজন কৃষক তাকে জিজ্ঞেস করল: “বেন, তুমি এটা কীভাবে করলে?”

    “একদম সহজ,” সে উত্তর দিল। “যখনই আমার রাজ্য কোষাগারের জন্য টাকার দরকার হয়, আমি জানি কোথায় তা পাব,” আর সে নিউ ইয়র্ক সিটির দিকে আঙুল দেখাল।

    আর তারপর নিউ ইয়র্ক সিটির সনদ নিয়ে সব রিপাবলিকানদের tinkering। কেউ এর সাথে তাল মেলাতে পারে না। যখন একজন রিপাবলিকান মেয়র থাকে, তখন তারা তাকে সব ধরনের ক্ষমতা দেয়। যদি আগামী শরৎকালে একজন ট্যামানি মেয়র নির্বাচিত হয়, আমি অবাক হব না যদি তারা পুরো ব্যবস্থাটাই বদলে দেয় এবং এমনভাবে সাজায় যেন প্রতিটি শহরের দপ্তরের চারজন প্রধান থাকে, যাদের মধ্যে দুজন হবে রিপাবলিকান। যদি আমরা প্রতিবাদ করি, তারা বলবে: “তোমরা জানো না তোমাদের জন্য কী ভালো। আমাদের উপর ছেড়ে দাও। এটা আমাদের কাজ।”


    অধ্যায় ৬

    তোমার ডিস্ট্রিক্ট ধরে রাখার উপায়: মানুষের প্রকৃতি বোঝো এবং সেই অনুযায়ী কাজ করো

    একটা ডিস্ট্রিক্ট ধরে রাখার একটাই উপায় আছে: তোমাকে মানুষের প্রকৃতি বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে হবে। তুমি বই পড়ে মানুষের প্রকৃতি শিখতে পারবে না। বই বরং একটা বাধা ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি তুমি কলেজে গিয়ে থাকো, তাহলে সেটা তোমার জন্য আরও খারাপ। মানুষের প্রকৃতি সঠিকভাবে বোঝার আগে তোমাকে যা শিখেছ, তার সবই ভুলে যেতে হবে, আর ভুলে যেতে অনেক সময় লাগে। কিছু মানুষ যা কলেজে শিখেছে, তা কখনোই ভুলতে পারে না। এমন মানুষরা হয়তো কোনো কারণে ডিস্ট্রিক্ট লিডার হতে পারে, কিন্তু তারা কখনোই টিকে থাকে না।

    প্রকৃত মানুষের প্রকৃতি শিখতে হলে তোমাকে মানুষের মাঝে যেতে হবে, তাদের দেখতে হবে এবং তাদের কাছে নিজেকে দেখাতে হবে। ফিফটিন্থ ডিস্ট্রিক্টের প্রতিটি পুরুষ, মহিলা এবং শিশুকে আমি চিনি, শুধু যারা এই গরমে জন্মেছে তারা বাদে—আর আমি তাদের কয়েকটাকেও চিনি। আমি জানি তারা কী পছন্দ করে আর কী করে না, তারা কীসে পারদর্শী আর কীসে দুর্বল, আর আমি তাদের সঠিক দিক থেকে কাছে আসার চেষ্টা করি।

    উদাহরণস্বরূপ, আমি কীভাবে তরুণদের জড়ো করি, তা বলছি। আমি শুনি যে একজন তরুণ তার কণ্ঠস্বর নিয়ে গর্বিত, ভাবে যে সে ভালো গান গাইতে পারে। আমি তাকে ওয়াশিংটন হলে এসে আমাদের গ্লি ক্লাবে যোগ দিতে বলি। সে আসে এবং গান গায়, আর সে সারা জীবনের জন্য প্লাঙ্কিটের অনুসারী হয়ে যায়। আরেকজন তরুণ একটা খালি জমিতে বেসবল খেলোয়াড় হিসেবে সুনাম অর্জন করে। আমি তাকে আমাদের বেসবল ক্লাবে নিয়ে আসি। এতেই তার কাজ হয়ে যায়। তুমি দেখবে, আগামী নির্বাচনের দিন সে আমার টিকিটের জন্য বুথে কাজ করছে। এরপর আরও আছে যে নদীতে নৌকা চালাতে পছন্দ করে, যে তরুণ তার ব্লকে ওয়াল্টজ নাচে সুনাম অর্জন করে, যে তরুণ হাতে খুব শক্তিশালী—আমি তাদের সবাইকে তাদের নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ দিয়ে আমার দলে টেনে নিই। আমি তাদের রাজনৈতিক যুক্তি দিয়ে বিরক্ত করি না। আমি শুধু মানুষের প্রকৃতি বুঝি আর সেই অনুযায়ী কাজ করি।

    কিন্তু তুমি হয়তো বলবে যে এই খেলাটা ‘হাই-টোনড’ লোকগুলোর সাথে কাজ করবে না, যারা কলেজ থেকে পাশ করে আর সিটিজেনস ইউনিয়নে যোগ দেয়। অবশ্যই তাদের সাথে এটা কাজ করবে না। তাদের জন্য আমার আলাদা চিকিৎসা আছে। আমি সেই পেটেন্ট ওষুধের বিক্রেতার মতো নই যে সব রোগের জন্য একই ওষুধ দেয়। সিটিজেনস ইউনিয়নের মতো তরুণ! আমি তাকে ভালোবাসি! সে হলো সবচেয়ে লোভনীয় খাবার, আর সে সহজে আমার হাত থেকে পালায় না।

    আমি তাকে কীভাবে ধরি, তা বলার আগে আমাকে বলতে দাও যে গত বছরের নির্বাচনের আগে সিটিজেনস ইউনিয়ন বলেছিল যে আমার ডিস্ট্রিক্টে তাদের চারশো বা পাঁচশো নিবন্ধিত ভোটার আছে। তাদের একটা সুন্দর সদর দপ্তরও ছিল, সুন্দর রো-টপ ডেস্ক আর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর কার্পেট ছিল। যদি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয় যে আমি তাদের জন্য সেই বাসা তৈরি করতে সাহায্য করেছি, তাহলে আমি শপথ করে সেটা অস্বীকার করব না। আমি এর মাধ্যমে কী বলতে চাই? কিছু মনে করো না। যদি তুমি চালাক হও, তাহলে পরের ঘটনা থেকে অনুমান করতে পারবে।

    যাই হোক, নির্বাচনের দিন এল। সিনেটর পদের জন্য সিটিজেনস ইউনিয়নের যে প্রার্থী আমার বিরুদ্ধে লড়েছিল, সে এই ডিস্ট্রিক্টে মাত্র পাঁচটি ভোট পেয়েছিল, আর আমি পেয়েছিলাম ১৪,০০০-এর বেশি ভোট। আমার ডিস্ট্রিক্টে সেই চারশো বা পাঁচশো সিটিজেনস ইউনিয়নের নিবন্ধিত ভোটারদের কী হয়েছিল? কিছু মানুষ অনুমান করে যে তাদের মধ্যে অনেকেই আসলে শুরু থেকেই ভালো প্লাঙ্কিট লোক ছিল এবং তারা সিটিজেনস ইউনিয়নের সাথে শুধু এই কারণে কাজ করেছিল, যাতে নির্বাচনের দিনের মধ্যে তাদের প্লাঙ্কিটের দলে নিয়ে আসা যায়। তুমিও চাইলে এই ধরনের অনুমান করতে পারো। আমি আমার সম্পর্কে কোনো গল্পে বাধা দিই না, বিশেষ করে গরম আবহাওয়ায়। আমি শুধু তোমার মনোযোগ এই তথ্যের দিকে আকর্ষণ করছি যে গত নির্বাচনের দিন আমার ডিস্ট্রিক্টে ৩৯৫ জন সিটিজেনস ইউনিয়নের নিবন্ধিত ভোটার নিখোঁজ ছিল আর তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

    তবে আমি তোমাকে সত্যি সত্যি বলছি, আমি কীভাবে সিটিজেনস ইউনিয়নের কিছু তরুণকে কব্জা করেছি। আমার একটা পরিকল্পনা আছে যা কখনো ব্যর্থ হয় না। আমি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিজ্ঞাপন দেখার জন্য সিটি রেকর্ড খেয়াল করি। এরপর আমি আমার তরুণ ‘সিট’কে (Cit) হাতে নিই, তাকে ভালো জিনিসগুলো সম্পর্কে সব বলি এবং তাকে উত্তেজিত করি যতক্ষণ না সে গিয়ে পরীক্ষা দেয়। এরপর আমি আর তাকে নিয়ে মাথা ঘামাই না। এটা নিশ্চিত যে সে কয়েক দিনের মধ্যে আমার কাছে ফিরে আসে এবং ট্যামানি হলে যোগ দিতে চায়। কোনো এক রাতে ওয়াশিংটন হলে এসো, আমি তোমাকে আমাদের তালিকায় থাকা এমন সব নামের একটি তালিকা দেখাব, যেখানে “সি.এস.” (C.S.) লেখা আছে, যার অর্থ, “সিভিল সার্ভিসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হেরে গেছে।”

    বয়স্ক ভোটারদেরও আমি কাছে টানি। না, আমি তাদের প্রচারণার সাহিত্য পাঠাই না। ওটা বাজে জিনিস। মানুষ কাগজে যথেষ্ট রাজনৈতিক জিনিসপত্র পায়—আর তার চেয়েও বেশি—পড়তে পারে। আজকাল কে-ই বা বক্তৃতা পড়ে? সেগুলো শোনাটাই যথেষ্ট খারাপ। প্রচারণার কাগজপত্র দিয়ে লেটার বক্স ভরে তুমি কোনো ভোট পাবে না। বরং এতে করে তুমি ভোট হারাতেও পারো, কারণ একজন মানুষ তার লেটার বক্সের ঘণ্টা বাজতে শুনে যতটা চিঠি পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে, ততটা আর কিছুতে ঘৃণা করে না, আর সেখানে শুধু একগাদা ছাপানো রাজনৈতিক কাগজ পায়। আমি আজ সকালেই এমন একজনের সাথে দেখা করেছি যে আমাকে বলল যে সে গত বছর ডেমোক্র্যাট স্টেট টিকিটে ভোট দিয়েছে, কারণ রিপাবলিকানরা তার লেটার বক্স প্রচারণার কাগজপত্রে ভরে রেখেছিল।

    তোমার ডিস্ট্রিক্টে তোমার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে হলে দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে সরাসরি যেতে হবে এবং তাদের বিভিন্ন উপায়ে সাহায্য করতে হবে। এর জন্য আমার একটা নির্দিষ্ট ব্যবস্থা আছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি নবম, দশম বা একাদশ অ্যাভিনিউতে দিনের বা রাতের যেকোনো সময় আগুন লাগে, আমি সাধারণত আমার কিছু নির্বাচনী এলাকার ক্যাপটেনদের নিয়ে ফায়ার ইঞ্জিনের মতোই দ্রুত সেখানে পৌঁছে যাই। যদি কোনো পরিবার আগুনে পুড়ে গৃহহীন হয়, আমি জিজ্ঞেস করি না তারা রিপাবলিকান নাকি ডেমোক্র্যাট। আমি তাদের দাতব্য সংস্থায় যেতেও বলি না, যারা এক-দু মাসে তাদের বিষয় তদন্ত করে সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা সাহায্যের যোগ্য কি না, আর ততক্ষণে হয়তো তারা অনাহারে মারা যাবে। আমি শুধু তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিই, যদি তাদের জামাকাপড় পুড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো কিনে দিই এবং তারা আবার নিজেদের সামলে না নেওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে দিই। এটা মানবপ্রেম, তবে এটাও রাজনীতি—খুবই ভালো রাজনীতি। কে বলতে পারে, এমন একটা আগুন আমাকে কত ভোট এনে দেয়? দরিদ্ররা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে কৃতজ্ঞ মানুষ, আর আমাকে বলতে দাও, তাদের প্রতিবেশীদের মধ্যে যত বন্ধু আছে, ধনীদের তত বন্ধু নেই।

    যদি আমার ডিস্ট্রিক্টে কোনো পরিবার অভাবে থাকে, আমি দাতব্য সংস্থাগুলোর আগেই তা জানতে পারি এবং আমার লোকজন নিয়ে সবার আগে সেখানে পৌঁছে যাই। এমন ঘটনাগুলো খুঁজে বের করার জন্য আমার একটি বিশেষ দল আছে। এর ফলস্বরূপ, দরিদ্ররা জর্জ ডব্লিউ. প্লাঙ্কিটকে একজন পিতার মতো দেখে, বিপদে তার কাছে আসে—আর নির্বাচনের দিন তাকে ভোলে না।

    আরেকটা বিষয়, আমি সবসময় একজন যোগ্য মানুষের জন্য চাকরি জোগাড় করতে পারি। আমি চাকরির খোঁজ রাখার জন্য সবসময় সতর্ক থাকি, আর এমন খুব কমই হয় যে আমার হাতে ব্যবহারের জন্য কিছু থাকে না। আমি ডিস্ট্রিক্টের এবং পুরো শহরের সব বড় বড় নিয়োগকর্তাকে চিনি, আর যখন আমি তাদের কাছে কোনো চাকরির জন্য বলি, তখন তারা সাধারণত ‘না’ বলে না।

    আর শিশুরা—ডিস্ট্রিক্টের ছোট ছোট গোলাপগুলো! আমি কি তাদের ভুলে যাই? ওহ, না! তারা সবাই আমাকে চেনে, আর তারা জানে যে আঙ্কল জর্জকে দেখা আর ক্যান্ডি পাওয়া একই জিনিস। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেরা ভোট সংগ্রাহক। তোমাকে একটা ঘটনা বলি। গত বছর একাদশ অ্যাভিনিউর একটা ছোট্ট গোলাপ, যার বাবা একজন রিপাবলিকান, নির্বাচনের দিন তার বাবার দাড়ি ধরে বলেছিল যে সে ততক্ষণ পর্যন্ত ছাড়বে না, যতক্ষণ না তিনি আমাকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। আর সে ছাড়েনিও।


    অধ্যায় ৭

    শহরের লজ্জা নিয়ে

    আমি লিঙ্কন স্টেফেন্সের একটা বই পড়ছিলাম, যার নাম ‘দ্য শেইম অফ দ্য সিটিস’। স্টেফেন্সের উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু সব সংস্কারকের মতো সে পার্থক্য করতে পারে না। সে সৎ চুরি আর অসৎ চুরির মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পায় না এবং ফলস্বরূপ, সবকিছুকে গুলিয়ে ফেলে। রাজনৈতিক লুটেরা আর সেইসব রাজনীতিকদের মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে, যারা চোখ খোলা রেখে রাজনীতি থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। লুটেরা কেবল নিজের জন্য কাজ করে, তার সংগঠন বা শহরের কথা ভাবে না। একজন রাজনীতিক একই সাথে নিজের স্বার্থ, সংগঠনের স্বার্থ এবং শহরের স্বার্থ দেখেন। পার্থক্যটা ধরতে পারছ? উদাহরণস্বরূপ, আমি কোনো লুটেরা নই। লুটেরা সবকিছু একা হজম করে। আমি কখনোই তা করিনি। আমি রাজনীতি থেকে টাকা কামিয়েছি, কিন্তু একই সাথে আমি সংগঠনকে সেবা দিয়েছি এবং অন্য যে কোনো জীবিত মানুষের চেয়ে নিউ ইয়র্ক সিটির জন্য বেশি বড় উন্নতি এনেছি। আর আমি কখনোই কোনো ফৌজদারি আইন ভঙ্গ করিনি।

    একজন লুটেরা আর একজন প্র্যাকটিক্যাল রাজনীতিকের মধ্যে পার্থক্যটা হলো ফিলাডেলফিয়ার রিপাবলিকান গ্যাং আর ট্যামানি হলের মধ্যেকার পার্থক্যের মতো। স্টেফেন্স মনে করে তারা প্রায় একই; কিন্তু সে পুরোপুরি ভুল। ফিলাডেলফিয়ার দলটা ফৌজদারি আইনের বিরুদ্ধে যায়। ট্যামানি তা করে না। ফিলাডেলফিয়ানরা শুধু ব্যাংক থেকে সব সোনা আর কাগজের টাকা চুরি করেই সন্তুষ্ট নয়। তারা সেখানে থেকে নিকি আর পেনিসও কুড়াতে থাকে, আর পুলিশ এসে তাদের ধরে ফেলে। ট্যামানি এমন বোকা নয়। আরে, আমার মনে আছে, প্রায় পনের বা বিশ বছর আগে, ফিলাডেলফিয়ার এ্যালমহাউসের (গরিবদের আশ্রয়কেন্দ্র) একজন রিপাবলিকান সুপারিনটেনডেন্ট বিল্ডিংয়ের জিঙ্কের ছাদ চুরি করে স্ক্র্যাপ হিসাবে বিক্রি করে দিয়েছিল। এটা বাড়াবাড়ি ছিল। সবকিছুরই একটা সীমা থাকে, আর ফিলাডেলফিয়ার রিপাবলিকানরা সেই সীমা পার করে ফেলে। মনে হয় তারা সত্যিকারের রাজনীতিকদের মতো শান্ত এবং সংযত হতে পারে না। তাই, ট্যামানি দলীয় লোকদের ফিলাডেলফিয়ার গ্যাং-এর সাথে একই কাতারে ফেলা ঠিক নয়। যে কোনো মানুষ যে রাজনৈতিক বই লেখার উদ্যোগ নেয়, তার কখনোই সৎ চুরি আর অসৎ চুরির মধ্যেকার পার্থক্যটা ভুলে যাওয়া উচিত নয়, যা আমি অন্য একটা আলাপে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করেছি। যদি সে সব ধরনের চুরিকে একই স্তরে রাখে, তাহলে সে স্টেফেন্সের মতো মারাত্মক ভুল করবে এবং তার বইটি নষ্ট করে ফেলবে।

    নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া বা শিকাগোর মতো একটা বড় শহরকে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এক ধরনের ইডেন গার্ডেনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এটা সুন্দর আপেল গাছে ভরা একটি বাগান। গাছগুলোর একটিতে বড় করে একটা সাইন লাগানো আছে, যেখানে লেখা: “ফৌজদারি আইনের গাছ—বিষ।” অন্য গাছগুলোতে সবার জন্য প্রচুর আপেল আছে। তবুও বোকারা ফৌজদারি আইনের গাছের দিকে যায়। কেন? আমার মনে হয় এর কারণ হলো, একটা খামখেয়ালি শিশু যেমন ভালো খাবার খেতে চায় না, কিন্তু আগ্রহ নিয়ে ম্যাচের বাক্স চিবায়, তেমন। ফৌজদারি আইনের গাছে হাত দেওয়ার লোভ আমার কখনোই হয়নি। অন্য আপেলগুলো আমার জন্য যথেষ্ট ভালো, আর হে ভগবান! একটা বড় শহরে কত আপেলই না আছে!

    স্টেফেন্স তার বইয়ে একটা ভালো পয়েন্ট তুলে ধরেছিল। সে বলেছিল যে সে দেখেছে ফিলাডেলফিয়া, যেখানে প্রায় সবাই আমেরিকান, তা নিউ ইয়র্কের চেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত, যেখানে আইরিশরা প্রায় পুরো শাসনকার্য পরিচালনা করে। সে কোনো তদন্ত করার আগেই যদি আমার কাছে আসত, আমি তাকে এটা বলতে পারতাম। আইরিশরা শাসন করার জন্য জন্ম নিয়েছে, আর তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সৎ মানুষ। আমাকে এমন একজন আইরিশম্যান দেখাও যে একটি এ্যালমহাউসের ছাদ চুরি করবে! তার কোনো অস্তিত্ব নেই। অবশ্যই, যদি একজন আইরিশম্যানের রাজনৈতিক প্রভাব থাকে আর ছাদটা খুব পুরোনো হয়, তাহলে সে শহর কর্তৃপক্ষকে একটি নতুন ছাদ লাগানোর জন্য রাজি করাতে পারে এবং সেই কাজের চুক্তি নিজে পেতে পারে, আর পুরোনো ছাদটা কম দামে কিনে নিতে পারে—কিন্তু সেটা সৎ চুরি। এটা একজন ভদ্রলোকের মতো কাজ করা, আর এতে পুরোনো ছাদ ভেঙে স্ক্র্যাপম্যানের কাছে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি টাকা আছে—বেশি টাকা আর কোনো ফৌজদারি আইন ভঙ্গের ভয় নেই।

    আইরিশম্যানরা কেন অনেক ‘সন্স অব দ্য রেভল্যুশন’-এর চেয়ে রাজনীতিতে বেশি সৎ, তার একটা কারণ হলো, যখন তাদের নিপীড়নের কারণে পান্না দ্বীপ (আয়ারল্যান্ড) থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন এই দেশ আর এই শহর তাদের আশ্রয় ও সমৃদ্ধি দিয়েছিল, আর তারা এর প্রতি কৃতজ্ঞ। শোনো, এই বাক্যটা দারুণ, তাই না? আমি কোনো সাহিত্যিককে দিয়ে এটা পরের সেন্ট প্যাট্রিক’স ডে-এর ডিনারের জন্য কবিতায় রূপান্তর করাব।

    হ্যাঁ, আইরিশম্যান কৃতজ্ঞ। তার একমাত্র চিন্তা হলো সেই শহরকে সেবা করা, যা তাকে একটি বাড়ি দিয়েছে। এই চিন্তা তার নিউ ইয়র্কে নামার আগেও থাকে, কারণ তার এখানকার বন্ধুরা প্রায়শই তার জন্য শহরের কোনো একটা দপ্তরে ভালো একটা জায়গা ঠিক করে রাখে, যখন সে এখনো পুরোনো দেশে থাকে। সে নিউ ইয়র্কে নামার পরের দিনই যখন এর বেতনভোগীর তালিকায় থাকে, তখন তার হৃদয়ে পুরোনো নিউ ইয়র্কের জন্য একটা কোমল জায়গা থাকবে—এতে কি কোনো অবাক হওয়ার কিছু আছে?

    এবার তথাকথিত ‘শহরের লজ্জা’র সাধারণ বিষয়টা নিয়ে কিছু কথা বলি। আমি বিশ্বাস করি না যে আমাদের শহরগুলোর সরকার পঞ্চাশ বছর আগের চেয়ে সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী কোনো অংশে খারাপ। “সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী” বলতে আমি কী বোঝাতে চেয়েছি, তা আমি ব্যাখ্যা করব। অর্ধ শতাব্দী আগে, আমাদের শহরগুলো ছিল ছোট এবং গরিব। রাজনীতিকদের জন্য তেমন কোনো লোভনীয় জিনিস ছিল না। চুরি করার মতো কিছুই ছিল না, এমনকি সৎ চুরিরও তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। একটি শহর ঘুমাতে যাওয়ার আগে প্রতিদিন রাতে তার টাকা গুনতে পারত, আর যদি তিন সেন্টও কম থাকত, তাহলে সব ফায়ার বেল বাজানো হতো। সেই পরিস্থিতিতে সৎ হওয়ার কী কৃতিত্ব ছিল? আমি যখন শুনি যে ত্রিশ বা চল্লিশের দশকের পুরোনো বুড়োরা গর্ব করে বলে যে তারা তাদের পেশা বা ব্যবসা থেকে যা উপার্জন করেছে, তা ছাড়া এক ডলারও না নিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর নিয়েছে, তখন আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি। যদি তারা আজ বেঁচে থাকত, বর্তমানের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে, তাহলে তারাও বিংশ শতাব্দীর রাজনীতিকদের মতোই হত। এখনকার দিনে সিঙ্গ সিংয়ের (Sing Sing) বন্দিদের চেয়ে বেশি সৎ মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তাদের মধ্যে একজনও কিছু চুরি করে না। কেন? কারণ তারা পারে না। ব্যাপারটা বুঝতে পারছ?

    বুঝতে পারো, আমি আজকের সেইসব রাজনীতিকদের পক্ষে কথা বলছি না যারা চুরি করে। যে রাজনীতিক চুরি করে, সে একজন চোরের চেয়েও খারাপ। সে একজন বোকা। একজন রাজনৈতিক প্রভাব আছে এমন মানুষের জন্য চারপাশে এত চমৎকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, একটি সেন্টও চুরি করার কোনো অজুহাত নেই। আমি যে কথাটা বলতে চাই, তা হলো, যদি রাজনীতিতে কিছু চুরি হয়ে থাকে, তার মানে এই নয় যে ১৯০৫ সালের রাজনীতিকরা, একটা শ্রেণি হিসেবে, ১৮৩৫ সালের রাজনীতিকদের চেয়ে খারাপ। এর মানে শুধু এই যে, পুরোনোদের চুরি করার মতো কিছুই ছিল না, যখন বর্তমানের রাজনীতিকরা সব ধরনের প্রলোভনে ঘেরা, আর তাদের মধ্যে কিছু—বোকাগুলো—স্বাভাবিকভাবেই ফৌজদারি আইনের বিরুদ্ধে যায়।


    অধ্যায় ৮

    রাজনীতিতে অকৃতজ্ঞতা

    রাজনীতিতে অকৃতজ্ঞতার চেয়ে জঘন্য অপরাধ আর কিছু নেই, কিন্তু পৃথিবীর শুরু থেকে সব মহান রাজনীতিককে এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। সিজারের ছিল তার ব্রুটাস; শেক্সপিয়ারের সেই রাজা—আমার মনে হয় তোমরা তাকে লিয়ারি বলো—তার নিজের মেয়েরাই তার বিরুদ্ধে গিয়েছিল; প্লাটের ছিল তার ওডেল, আর আমার আছে আমার “দ্য” ম্যাকম্যানাস। এটা একটা সত্যিকারের প্রমাণ যে একজন মানুষ মহান যখন সে রাজনৈতিক অকৃতজ্ঞতার শিকার হয়। মহান মানুষেরা কোমল, বিশ্বাসী প্রকৃতির হয়। আমারও তাই, ঠিকাদারি আর রিয়েল এস্টেট ব্যবসার বাইরে। রাজনীতিতে আমি সেইসব মানুষকে বিশ্বাস করেছি যারা আমাকে বলেছে তারা আমার বন্ধু। আর যদি আমার শিবিরে বিশ্বাসঘাতকেরা এসে থাকে—যাই হোক, আমার একই অভিজ্ঞতা হয়েছে যা সিজার, লিয়ারি এবং অন্যদের হয়েছিল।

    আমার ব্রুটাস সম্পর্কে বলি। ম্যাকম্যানাসের, তুমি তো জানো, সাত ভাই আছে আর তারা তাকে “দ্য” বলে ডাকে কারণ সে তাদের সবার নেতা, আর তাকে অন্য সব ম্যাকম্যানাসের থেকে আলাদা করার জন্য। কয়েক বছর ধরে সে একজন রাজনৈতিক গুপ্তচর ছিল। প্রচারাভিযানে সে কখনো নিরপেক্ষ থাকত, কখনো দুই দলের পক্ষে থাকত, আর কখনো নিরপেক্ষতার আড়ালে থাকত। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে তাকে কোথায় পাওয়া যাবে, তা কেউ জানত না, আর কেউই তাকে বিশ্বাস করত না—অর্থাৎ, আমি ছাড়া কেউই না। আমি ভেবেছিলাম তার মধ্যে ভালো কিছু আছে এবং আমি যদি তাকে হাতে ধরি, তাহলে আমি তাকে একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।

    আমি তাকে কয়েক বছর আগে হাতে ধরেছিলাম। আমার বন্ধুরা আমাকে বলেছিল এটা আবার ব্রুটাস-লিয়ারি ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে, কিন্তু আমি তাদের কথা বিশ্বাস করিনি। আমি “দ্য”-এর ওপর ভরসা রেখেছিলাম। আমি তাকে অ্যাসেম্বলির জন্য মনোনীত করেছিলাম, এবং সে নির্বাচিত হয়েছিল। এক বছর পর, যখন আমি সিনেটর হিসেবে পুনর্নির্বাচনের জন্য লড়ছিলাম, আমি তাকে আমার টিকিটে আবার অ্যাসেম্বলির জন্য মনোনীত করেছিলাম। তুমি কী মনে করো, কী ঘটল? আমরা দুজনেই ফিফটিন্থ অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্টে জিতেছিলাম, কিন্তু সে আমার চেয়ে অনেক বেশি ভোট পেয়েছিল। শুধু ভেবে দেখো! আমার নিজের ডিস্ট্রিক্টে আমার চেয়ে এগিয়ে! আমি তো হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যখন আমি কিছুটা সামলে উঠলাম, তখন আমার নির্বাচনী এলাকার ক্যাপটেনরা আমার কাছে এসে বলল যে ম্যাকম্যানাস আমাকে বিক্রি করে দিয়েছে যাতে আমাকে সিনেটর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়, আর তারপর সে ডিস্ট্রিক্টের নেতৃত্ব দখল করার চেষ্টা করবে। আমি এটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার বিশ্বাসী প্রকৃতি এমন বিশ্বাসঘাতকতা কল্পনা করতে পারছিল না।

    আমি ম্যাকম্যানাসকে ডেকে পাঠালাম আর আমার গলা আবেগে কাঁপছিল: “তারা বলছে তুমি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ, ‘দ্য’। এটা সত্যি হতে পারে না। আমাকে বলো এটা সত্যি নয়।”

    “দ্য” প্রায় কেঁদে ফেলল যখন সে বলল যে সে নির্দোষ।

    “আমি তোমার সাথে কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, জর্জ,” সে বলল। “কিছু দুষ্ট বিশ্বাসঘাতক তোমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে। আমি এখনো জানি না তারা ঠিক কারা, কিন্তু আমি তাদের পিছু নিয়েছি, আর আমি তাদের খুঁজে বের করব, না হলে ‘দ্য’ ম্যাকম্যানাস নাম ত্যাগ করব। আমি এখনই তাদের খুঁজতে যাচ্ছি।”

    যাই হোক, বিশ্বাসঘাতকদের খুঁজে বের করার ব্যাপারে “দ্য” তার কথা রেখেছিল। সে তাদের ঠিকই খুঁজে বের করেছিল—এবং তাদের নেতৃত্ব নিজেই হাতে নিয়েছিল। ওহ, না! তাকে তাদের খুঁজতে বেশি দূরে যেতে হয়নি। সে তাদের এখন তার ক্লাবরুমে জড়ো করেছে, আর সে সেই মানুষটার কাছ থেকে নেতৃত্ব কেড়ে নেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে, যে মানুষটা তাকে তৈরি করেছিল। সুতরাং তুমি দেখছ যে সিজার আর লিয়ারি আর আমি একই নৌকায় আছি, শুধু পার্থক্য হলো আমি সফল হয়েছি, আর সিজার ও লিয়ারি হেরে গিয়েছিল।

    এখন আমাকে বলতে দাও যে রাজনীতিতে অকৃতজ্ঞ ব্যক্তি বেশিদিন উন্নতি করতে পারে না। আমি তোমাকে অনেক উদাহরণ দিতে পারি। সেইসব লোকদের দিকে তাকাও যারা রসকো কনক্লিংকে পরাজিত করেছিল, যখন সে ইউনাইটেড স্টেটস সিনেট থেকে পদত্যাগ করে পুনর্নির্বাচনের জন্য আলবানিতে গিয়েছিল! তাদের কী হয়েছে? চলন্ত ছবির মতো তারা অদৃশ্য হয়ে গেছে। কে কনক্লিংয়ের জায়গা নিয়েছিল সিনেটে? বিশ ডলার বাজি ধরতে পারো যে তুমি পঞ্জিকা না দেখে তার নাম মনে করতে পারবে না। আর বেচারা পুরোনো প্ল্যাট! সে এখন ক্ষমতা থেকে নেমে গেছে আর ওডেল ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে সে সবসময়ই ক্ষমতায় থাকবে। তার শত্রুরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সবসময় কঠোর পরিশ্রম করছে, আর আমি একটুও অবাক হব না যদি সে পরের রাজ্য প্রচারণার আগেই সরে যায়।

    যেসব রাজনীতিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী সফলতা অর্জন করে, তারা হলো সেইসব মানুষ যারা সবসময় তাদের বন্ধুদের প্রতি অনুগত থাকে, প্রয়োজনে এমনকি স্টেট প্রিজন পর্যন্ত; যেসব মানুষ তাদের প্রতিশ্রুতি রাখে এবং কখনোই মিথ্যা বলে না। রিচার্ড ক্রোকার বলতেন যে সত্য কথা বলা এবং বন্ধুদের পাশে থাকা একজন রাজনৈতিক নেতার প্রধান সম্পদ। এর চেয়ে সত্যি কথা আর কেউ বলেনি, আর ক্রোকারের চেয়ে ভালো করে কেউই এর চর্চা করেনি। এই কারণেই সে যতদিন চেয়েছিল, ততদিন ট্যামানি হলের নেতা হিসেবে ছিল। সংগঠনের প্রতিটি মানুষ তাকে বিশ্বাস করত। কখনও কখনও সে এমন ভুল করত যা প্রচারণায় ক্ষতি করত, কিন্তু সেগুলো সবসময়ই তার বন্ধুদের সেবা করার পক্ষেই থাকত।

    চার্লস এফ. মারফির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সে সবসময় তার বন্ধুদের পাশে থেকেছে, এমনকি যখন মনে হয়েছে যে এটা করার জন্য সে ক্ষমতা হারাবে। মনে আছে কীভাবে সে ২০০৩ সালে ম্যাকক্লেলানের পাশে ছিল যখন ব্রুকলিনের সব নেতা তার বিরুদ্ধে ছিল, আর মনে হচ্ছিল যেন ট্যামানির একটা বড় পরাজয় আসন্ন! ক্রোকার এবং মারফির মতো লোকেরাই যতদিন বেঁচে থাকে, ততদিন নেতা হিসেবে থাকে; ব্রুটাস আর ম্যাকম্যানাসের মতো লোক নয়।

    এখন আমি তোমাকে বলতে চাই, কেন রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকদের, বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক সিটিতে, দ্রুত শাস্তি দেওয়া হয়। এর কারণ হলো এখানে আইরিশরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আইরিশরা, পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে, একজন বিশ্বাসঘাতককে ঘৃণা করে। যখন কোনো ধরনের বিশ্বাসঘাতক তাদের সামনে আসে, তখন তুমি তাদের আটকে রাখতে পারবে না, আর পুরোনো আয়ারল্যান্ডের কথা মনে করে, তারা একজন রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতককে পরাজিত করতে বিশেষ আনন্দ পায়। আমার ডিস্ট্রিক্টের বেশিরভাগ ভোটারই আইরিশ বা আইরিশ বংশোদ্ভূত; তারা “দ্য” ম্যাকম্যানাসকে চিনে ফেলেছে, আর পরের বার যখন তারা তাকে ভোটে সুযোগ পাবে, তখন তারা তাকে উচিত শিক্ষা দেবে।

    একটা প্রশ্ন করা হয়েছে: একজন রাজনীতিক কি কখনো তার ডিস্ট্রিক্ট লিডারের বিরুদ্ধে যেতে পারেন? আমি উত্তর দিই: “না; যতক্ষণ পর্যন্ত নেতা তার ভোটারদের জন্য সম্ভব সব চাকরি জোগাড় করার জন্য ছোটাছুটি করে।” যখন ভোটাররা একজন লোককে নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে, তখন তারা তার সাথে এক ধরনের চুক্তি করে। যদিও এটা লেখা থাকে না, তারা বলে: “আমরা তোমাকে আমাদের স্বার্থ দেখার জন্য এখানে বসিয়েছি। তুমি দেখবে এই ডিস্ট্রিক্ট যেন সব চাকরি পায় যা তার প্রাপ্য। তুমি আমাদের প্রতি অনুগত থেকো, আর আমরা তোমার প্রতি অনুগত থাকব।”

    ডিস্ট্রিক্ট লিডার প্রতিশ্রুতি দেয় এবং এটা একটা গুরুতর চুক্তি হয়ে যায়। যদি সে সেই চুক্তি মেনে চলে, তার বেশিরভাগ সময় বিভিন্ন দপ্তরের চাকরির পেছনে ছোটাছুটি করে, তার অনুসারীদের জন্য রেলপথ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে চাকরি জোগাড় করে, এবং সব দিক থেকে নিজেকে একজন সত্যিকারের রাজনীতিক হিসেবে প্রমাণ করে, তাহলে তার অনুসারীরা তাকে সম্মান করে সমর্থন করতে বাধ্য, ঠিক যেমন তারা ইউনাইটেড স্টেটস সংবিধানকে সমর্থন করতে বাধ্য। কিন্তু যদি সে শুধু নিজের স্বার্থ দেখে বা চাকরি খুঁজে বের করার প্রতিভা না দেখায় বা ভালো কিছু পাওয়ার জন্য দাবি করার এবং আদায় করার সাহস না থাকে, তাহলে তার অনুসারীদের তার প্রতি আনুগত্য থেকে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে এবং তারা তাকে আঘাত করতে পারে, আর তাতে তাদের রাজনৈতিক অকৃতজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হবে না।

  • গোলাপী যখন ট্রেনে, হাতুড়ে তখন আমিরিকায়

    গোলাপী যখন ট্রেনে, হাতুড়ে তখন আমিরিকায়

    ​গ্রামে চিকিৎসা করিতে করিতে হাতুড়ে ডাক্তার রিক্ত হইয়াছে, হয় রোগ নতুবা রোগী, উভয়েই তল্লাট ছাড়িয়াছে। অবশ্য সে পশুপালের চিকিৎসা আরম্ভ করিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু মর্ম না বুঝিয়া এক গোমাতা তাঁহার কর্ম সমাধা করিয়া দিয়াছে।

    ​আর এই গ্রাম নহে, এইবার বিশ্ব-ধরণীকে হাতুড়ে চিকিৎসা কী বস্তু, তাহা বুঝাইতে মনস্থির করিয়া সে একটি ভূগোলক তুলিয়া লইল। সিদ্ধান্ত এই যে, ভূগোলক ঘুরাইয়া অনুমানে যে দেশে অঙ্গুলি পতিত হইবে, হাতুড়ে সেই দেশেই প্রস্থান করিবে। দুই হস্তে ভূগোলকটি আঁকড়াইয়া ধরিয়া এক ঘূর্ণি দিল, আর মনে মনে জপিতে লাগিল—চায়না, উগান্ডা, হনুলুলু। অঙ্গুলি তাক করিয়া লইল এই ভাবিয়া যে, অঙ্গুলি যে দেশে অবতরণ করিবে, সেই স্থানেই অবতরণ করিব। কয়েক ঘূর্ণি খাইয়া ভূগোলক থামিল; অঙ্গুলি যে দেশের নাম ইঙ্গিত করিল, বহু কষ্টে হাতুড়ে উচ্চারণ করিল—উচা।

    ​এত দেশ থাকিতে এই ‘উচা’ আবার কোনো দেশ? নিদেনপক্ষে চীন হইত, নতুবা ভারত। এই দুইটি দেশ ইতিমধ্যেই চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত; তথায় তাঁহার অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, নিমপ্যাথি উত্তমরূপেই চলিত। কিন্তু ‘উচা’ দেশে এই সকল কি চলিবে? কিন্তু হাতুড়ের এক বাক্য, অঙ্গুলি যেখানে পতিত হইয়াছে, সেই স্থানেই অবতরণ। তল্পিতল্পা গুটাইয়া সে প্ল্যানে বসিয়া গেল। উড়োজাহাজ নহে, স্বীয় পরিকল্পনা।

    ভূগোলক অনুসারে ‘উচা’ দেশে যাইতে হইলে সাগর, বন, জঙ্গল পাড়ি দিয়া যাইতে হইবে। অথবা উড়োজাহাজে চড়িয়া যাওয়া যায়। গ্রামে মুরুব্বিস্থানীয়দের সহিত সলা পরামিশে বসিয়া জানা গেল যে, উত্তর পাড়ার মাকু ঐ দেশে থাকে। আরও জানা গেল, দেশটি আসলে ‘উচা’ নহে, উহা আমিরিকা। তবে মাকুর কথা মনে পড়ায় হাতুড়ে মনে মনে কিঞ্চিৎ দমিয়া গেল। এই মাকুকেই সে সেই শৈশবে ইঞ্জেকশন দিয়াছিল!

    ​যেহেতু যাওয়াই মনস্থির, অগত্যা কিছু সলা পরামিশ কাজে লাগাইবার নিমিত্ত মাকুর গৃহে যাওয়াই স্থির হইল। অপরাহ্ণে কোবতের পুস্তক রাখিয়া ছাতা বগলে চাপিয়া হাতুড়ে মাকুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।

    ​মাকুর প্রাঙ্গণে বৈঠক জমিয়া থাকে। মাকুর পিতা আলিসান কেদারায় বসিয়া বিভিন্ন বিষয়ে বক্তিমা দেন। আর কেমন করিয়া যেন তিনি সকল বিষয়েই আমিরিকা টানিয়া আনিতে পারেন। কোনো বিষয় না থাকিলেও আমিরিকা, প্রসঙ্গ না থাকিলেও আমিরিকা। বেশ জবরদোস্ত ব্যাপার। আমিরিকার প্রধান খাদ্য বার্গার, রাস্তায় ফেলিয়া ভাত খাওয়া যায়, আর বাতাসে কেবল ডলার উড়িতে থাকে। সপ্তাহে মাত্র পাঁচ দিন কার্য করিলে চলে, এদেশের ন্যায় ত্রিশ দিন নহে— ইত্যাকার নানা আলাপ চলিতে চলিতে রাত্রি হয়। হাতুড়ে আমিরিকা যাইতে ইচ্ছুক, এবং মাকুর পিতার মতে ইহা কোনো ব্যাপারই নহে।

    প্রাত্যহিক নিয়ম ভঙ্গ করিয়া হাতুড়ে আরও তথ্য পাইবার আশায় মাকুর বাসাতেই রাত্রিযাপন করিবার সিদ্ধান্ত লইল। সে আরও জানিতে পারিল যে, পাসপোর্ট ও ভিসা আবশ্যক। মাকুর পিতা পান চর্বণ করিতে করিতে একে একে নানা প্রকার ভিসার ব্যাখ্যা দিতে লাগিলেন—আঁচল ভিসা, পেটিকোট ভিসা, টারজান ভিসা—ইত্যাকার নানা প্রকার ভিসায় যে আমিরিকা যাওয়া যায়, তাহার বিরাম নাই। তবে টারজান ভিসাটি তাহার মনে ধরিল। এই ভিসা তুলনামূলক সহজ বলিয়া মনে হইতেছিল। বস্তুত, ইহা ব্যতীত তাহার আর কোনো উপায় খোলা ছিল না। কিন্তু ইহা করিতে হইলে তাহার পাসপোর্ট থাকা লাগিবে, যাহা ইতিমধ্যে তাহার ছিল না। আর পাসপোর্ট বানাইতে হইলে তাহাকে গঞ্জে যাইতে হইবে। তবে মাকুর পিতার একজনের সহিত কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে। একটি চুক্তি করিলে হাতুড়ের কোনো কিছুই করিতে হইবে না, সে গৃহে বসিয়াই পাসপোর্ট হস্তে পাইবে। শৈশবে গলাকাটা পাসপোর্ট পাওয়া যাইত, এখন নাকি এসকল আর পাওয়া যায় না। যাহা হউক, হাতুড়ের কিছু জমিজিরাত ছিল, তাহা বিক্রয় করিবার মনস্থির করিল, আমিরিকা তাহাকে যাইতেই হইবে।

    নানা বৃত্তান্তের পর অবশেষে সে পাসপোর্ট হস্তে পাইল। আপনারা বিদ্যান ব্যক্তি, পাসপোর্ট পাওয়া যে সহজ, তাহা আপনারা জানেনই, তাই আর বৃত্তান্ত লিখিলাম না। দশজনের যে গতি, হাতুড়েরও সেই গতি। চাহিলে সে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, দুর্বাল আন্দোলন করিয়া কঠিনভাবে পাসপোর্ট লাভ করিতে পারিত, কিন্তু সেই তেজ সে আমিরিকা যাইবার পশ্চাতে ব্যয় করিবে বলিয়া মনস্থির করিয়াছিল বলিয়াই সহজ পথে পাসপোর্ট হস্তে পাইল। ছবিতে ইঞ্জেকশন হস্তে তুলিতে পারিলে যে সে চিকিৎসা করিতে পারে, ইহা বুঝানো সহজ হইত, কিন্তু কোনোমতেই তাহা দফতরে বুঝানো গেল না।

    হাতুড়ের দুর্বার মনোবল দেখিয়া মাকুর পিতার ইচ্ছা হইল যে, সে-ও তাহার সহিত যাত্রা করিবে। মাকুর মুখ হইতে আমিরিকার কেচ্ছা শুনিয়া সেই ইচ্ছা তীব্র হইতে তীব্রতর হইয়াছে মাত্র। তদ্ব্যতীত, বাতাসে টাকা উড়া দেখিতে কেমন, তাহাও একটি দর্শনীয় বস্তু বটে। মাকু যেহেতু বহু পূর্বে টারজান ভিসায় চলিয়া গিয়াছে, মাকুর বাপও সিদ্ধান্ত লইল যে, সে আর হাতুড়ে মিলিয়া একই পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া যাইবে, জীবনে আর কী আছে! সে সবিস্তারে হাতুড়ের নিকট পরিকল্পনা বর্ণনা করিল, যাহা শুনিয়া হাতুড়ে পাসপোর্ট বানাইবার পেছনে এতগুলো পয়সা ব্যয় করিয়াছে ভাবিয়া আফসোস করিল।

    পরদিন দুইজন মিলিয়া টেকনাফ চলিয়া গেল এবং ‘সামুদ্রিক অভিজ্ঞতা অর্জনে আগ্রহী শিক্ষানবিশ’ হিসাবে মাঝিদের সহিত যোগ দিল। দিনভর জাল নিক্ষেপ ও নৌকা বাহিবার কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তাহাদের রাত্রির আহার জুটিত সমুদ্রের টাটকা মৎস্যের ঝোল আর গরম ভাত। উদ্দেশ্য ছিল ভংভাং দিয়া মাঝিদের বার্মা-থাইল্যান্ড উপকূল পর্যন্ত লইয়া যাওয়া। যদিও তাহাদের আলাপের ঢং শুনিয়া কানের নিচে দুইটা দিতে কেবল বাকি রাখিয়াছিল মাঝিরা।

    ট্রলার সাগরবক্ষে দুলিতে আরম্ভ করিবার অর্ধ ঘণ্টার মধ্যেই মাকুর বাপের বদনমণ্ডল সবুজ বর্ণ ধারণ করিল এবং সে ট্রলারের এক কোণে গিয়া আশ্রয় লইল। তাহার একমাত্র কার্য ছিল, মস্তক ঘূর্ণনপূর্বক ভূপতিত হইবার পূর্বেই বমন করা। অন্যদিকে, হাতুড়ে প্রবল উৎসাহে কার্যে নামিয়া পড়িল। কিন্তু “টাটকা মৎস্যের ঘ্রাণ” আর “মৎস্যের আঁশটে গন্ধের” মধ্যে যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, তাহা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিল। দিবসের অন্তে তাহার সর্বাঙ্গ হইতে এমন এক গন্ধ নির্গত হইতেছিল যে, তাহার নিজেরই বমনোদ্রেক হইবার উপক্রম হইল!

    ​হাতুড়ে অবশ্য মাকুর বাপকে সান্ত্বনা প্রদান করিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু মাকুর বাপের অবস্থা তখন শোচনীয়। সে কেবল কোনোমতে উত্তর দিল যে, তাহার আত্মা দেহত্যাগ করিবার উপক্রম হইয়াছে এবং সে স্থলে অবতরণ করিতে চায়। তাহাদের “টাটকা মৎস্যের ঝোল” পাইবার স্বপ্নও ভগ্ন হইল, কারণ নাবিকদের আহার্য ছিল কেবল লবণ সহযোগে সিদ্ধ মৎস্য ও ভাত।

    ​ট্রলারের মাঝি হাতুড়ের অতিরিক্ত উৎসাহ এবং মাকুর বাপের পীড়ায় বিরক্ত হইয়া তাহাদিগকে থাইল্যান্ডের এক অপরিচিত জেলেপাড়ায় নামাইয়া দিল। আগেই বলিয়াছিলাম মাঝি কানের নিচে দুইটা দিতে বাকি রেখেছে, তবে পারিশ্রমিকস্বরূপ তাহাদের হস্তে দুইটি মাঝারি আকারের রুপচাঁদা মৎস্য ধরাইয়া দেওয়া হইল।

    ​হাতুড়ে কিঞ্চিৎও হতাশ হইল না। সে মাকুর বাপকে বুঝাইল যে, ইহাই হইল বিনিময় প্রথা এবং তাহারা মৎস্যের বিনিময়ে তণ্ডুল-ডাল সংগ্রহ করিয়া ফেলিবে। কিন্তু মাকুর বাপ তাহার এই উদ্ভট পরিকল্পনায় সায় দিতে পারিল না। সে স্মরণ করাইয়া দিল যে, জেলেপাড়ায় কেহ মৎস্য ক্রয় করিতে আসিবে না। মাকুর বাপের কথাই সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইল।

    ​কয়েক ঘণ্টা পর, এক দয়ালু বৃদ্ধা তাহাদের দুরবস্থা দেখিয়া এক বাটি টম ইয়াম স্যুপ ও ভাত দিয়া গেল। সুরুয়ার প্রথম চামচ মুখে দিতেই মাকুর বাপের কর্ণ দিয়ে ধুঁয়া নির্গত হইবার উপক্রম হইল। অগ্নিবৎ ঝাল সেই স্যুপ খাইতে খাইতে তাহার মনে হইতেছিল, ইহার অপেক্ষা সাগরের লবণাক্ত জলও শ্রেয় ছিল। কিন্তু হাতুড়ে সগর্বে ঘোষণা করিল যে, তাহাদের মৎস্য বিক্রয়ের পরিকল্পনা সফল হইয়াছে এবং এই স্যুপ হইল তাহাদের লভ্যাংশ! তাছাড়া নোনা মাছ খাইতে খাইতে জিব পঁচিয়া গিয়াছে প্রায়।

    ​তাহারা উপকূল ধরিয়া উত্তর দিকে হাঁটিতে শুরু করিলে পথে এক বিশাল ফলের উদ্যান পড়িল। হাতুড়ের মাথায় তৎক্ষণাৎ নূতন চাকুরির বুদ্ধি খেলিয়া গেল। সে একটি পেঁপে বাগানের মালিকের নিকট গিয়া ইঙ্গিতে বুঝাইবার চেষ্টা করিল যে, তাহারা দুইজন উদ্যানে দণ্ডায়মান থাকিলে কোনো পক্ষী আসিবে না। হাতুড়ে হস্তদ্বয় পক্ষীর ডানার ন্যায় ঝাপটাইয়া “কা কা” শব্দ করিতে লাগিল, আর মাকুর বাপ বিষণ্ণবদনে একটি বৃক্ষের ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিল। উদ্যানের মালিক তাহাদের অদ্ভুত কাণ্ড দেখিয়া এতই আমোদ পাইলেন যে, তিনি তাহাদিগকে তাড়াইয়া না দিয়া উদরপূর্তি করিয়া পেঁপে ও কলা খাইতে দিলেন। পেঁপে খাইতে খাইতে হাতুড়ে মাকুর বাপকে বলিল যে, তাহাদের মেধা মোটেও নষ্ট হইতেছে না।

    ​তাহার কিছুদিন পর তাহারা দেখিল, এক কৃষক তাহার পুরাতন পিকআপ ট্রাকে বাঁধাকপি ও লাউ বোঝাই করিতেছে। হাতুড়ে ছুটিয়া গিয়া কৃষককে ইঙ্গিতে বুঝাইল যে, তাহারা এই সবজির ট্রাকের উপরে বসিয়া মালামাল পাহারা দিবে। ইহার পর আরম্ভ হইল তাহাদের জীবনের সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় যাত্রা। পথের ঝাঁকুনিতে তাহারা একবার বাঁধাকপির স্তূপের উপর উঠিয়া যায়, তো পরক্ষণেই লাউয়ের উপর গিয়া আছড়াইয়া পড়ে। মাকুর বাপ দৃঢ়ভাবে একটি লাউ জড়াইয়া ধরিয়া চক্ষু মুদিত করিয়া বসিয়া রহিল।

    ​ট্রাকটি তাহাদিগকে একটি বৃহৎ শহরের নিকটে নামাইয়া দিয়া গেল। ধূলি ও সবজির রসে সর্বাঙ্গ শিক্ত অবস্থায় অবতরণের পর মাকুর বাপের মনে হইতেছিল, যেন তাহার শরীরের সকল অস্থি সবজিতে পরিণত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহারা সফলভাবে এশিয়ার উপকূল পাড়ি দিয়াছে। এক্ষণে সম্মুখে চীনের সীমান্ত।