গ্রামে চিকিৎসা করিতে করিতে হাতুড়ে ডাক্তার রিক্ত হইয়াছে, হয় রোগ নতুবা রোগী, উভয়েই তল্লাট ছাড়িয়াছে। অবশ্য সে পশুপালের চিকিৎসা আরম্ভ করিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু মর্ম না বুঝিয়া এক গোমাতা তাঁহার কর্ম সমাধা করিয়া দিয়াছে।
আর এই গ্রাম নহে, এইবার বিশ্ব-ধরণীকে হাতুড়ে চিকিৎসা কী বস্তু, তাহা বুঝাইতে মনস্থির করিয়া সে একটি ভূগোলক তুলিয়া লইল। সিদ্ধান্ত এই যে, ভূগোলক ঘুরাইয়া অনুমানে যে দেশে অঙ্গুলি পতিত হইবে, হাতুড়ে সেই দেশেই প্রস্থান করিবে। দুই হস্তে ভূগোলকটি আঁকড়াইয়া ধরিয়া এক ঘূর্ণি দিল, আর মনে মনে জপিতে লাগিল—চায়না, উগান্ডা, হনুলুলু। অঙ্গুলি তাক করিয়া লইল এই ভাবিয়া যে, অঙ্গুলি যে দেশে অবতরণ করিবে, সেই স্থানেই অবতরণ করিব। কয়েক ঘূর্ণি খাইয়া ভূগোলক থামিল; অঙ্গুলি যে দেশের নাম ইঙ্গিত করিল, বহু কষ্টে হাতুড়ে উচ্চারণ করিল—উচা।
এত দেশ থাকিতে এই ‘উচা’ আবার কোনো দেশ? নিদেনপক্ষে চীন হইত, নতুবা ভারত। এই দুইটি দেশ ইতিমধ্যেই চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত; তথায় তাঁহার অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি, নিমপ্যাথি উত্তমরূপেই চলিত। কিন্তু ‘উচা’ দেশে এই সকল কি চলিবে? কিন্তু হাতুড়ের এক বাক্য, অঙ্গুলি যেখানে পতিত হইয়াছে, সেই স্থানেই অবতরণ। তল্পিতল্পা গুটাইয়া সে প্ল্যানে বসিয়া গেল। উড়োজাহাজ নহে, স্বীয় পরিকল্পনা।
ভূগোলক অনুসারে ‘উচা’ দেশে যাইতে হইলে সাগর, বন, জঙ্গল পাড়ি দিয়া যাইতে হইবে। অথবা উড়োজাহাজে চড়িয়া যাওয়া যায়। গ্রামে মুরুব্বিস্থানীয়দের সহিত সলা পরামিশে বসিয়া জানা গেল যে, উত্তর পাড়ার মাকু ঐ দেশে থাকে। আরও জানা গেল, দেশটি আসলে ‘উচা’ নহে, উহা আমিরিকা। তবে মাকুর কথা মনে পড়ায় হাতুড়ে মনে মনে কিঞ্চিৎ দমিয়া গেল। এই মাকুকেই সে সেই শৈশবে ইঞ্জেকশন দিয়াছিল!
যেহেতু যাওয়াই মনস্থির, অগত্যা কিছু সলা পরামিশ কাজে লাগাইবার নিমিত্ত মাকুর গৃহে যাওয়াই স্থির হইল। অপরাহ্ণে কোবতের পুস্তক রাখিয়া ছাতা বগলে চাপিয়া হাতুড়ে মাকুর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিল।
মাকুর প্রাঙ্গণে বৈঠক জমিয়া থাকে। মাকুর পিতা আলিসান কেদারায় বসিয়া বিভিন্ন বিষয়ে বক্তিমা দেন। আর কেমন করিয়া যেন তিনি সকল বিষয়েই আমিরিকা টানিয়া আনিতে পারেন। কোনো বিষয় না থাকিলেও আমিরিকা, প্রসঙ্গ না থাকিলেও আমিরিকা। বেশ জবরদোস্ত ব্যাপার। আমিরিকার প্রধান খাদ্য বার্গার, রাস্তায় ফেলিয়া ভাত খাওয়া যায়, আর বাতাসে কেবল ডলার উড়িতে থাকে। সপ্তাহে মাত্র পাঁচ দিন কার্য করিলে চলে, এদেশের ন্যায় ত্রিশ দিন নহে— ইত্যাকার নানা আলাপ চলিতে চলিতে রাত্রি হয়। হাতুড়ে আমিরিকা যাইতে ইচ্ছুক, এবং মাকুর পিতার মতে ইহা কোনো ব্যাপারই নহে।
প্রাত্যহিক নিয়ম ভঙ্গ করিয়া হাতুড়ে আরও তথ্য পাইবার আশায় মাকুর বাসাতেই রাত্রিযাপন করিবার সিদ্ধান্ত লইল। সে আরও জানিতে পারিল যে, পাসপোর্ট ও ভিসা আবশ্যক। মাকুর পিতা পান চর্বণ করিতে করিতে একে একে নানা প্রকার ভিসার ব্যাখ্যা দিতে লাগিলেন—আঁচল ভিসা, পেটিকোট ভিসা, টারজান ভিসা—ইত্যাকার নানা প্রকার ভিসায় যে আমিরিকা যাওয়া যায়, তাহার বিরাম নাই। তবে টারজান ভিসাটি তাহার মনে ধরিল। এই ভিসা তুলনামূলক সহজ বলিয়া মনে হইতেছিল। বস্তুত, ইহা ব্যতীত তাহার আর কোনো উপায় খোলা ছিল না। কিন্তু ইহা করিতে হইলে তাহার পাসপোর্ট থাকা লাগিবে, যাহা ইতিমধ্যে তাহার ছিল না। আর পাসপোর্ট বানাইতে হইলে তাহাকে গঞ্জে যাইতে হইবে। তবে মাকুর পিতার একজনের সহিত কিঞ্চিৎ পরিচয় আছে। একটি চুক্তি করিলে হাতুড়ের কোনো কিছুই করিতে হইবে না, সে গৃহে বসিয়াই পাসপোর্ট হস্তে পাইবে। শৈশবে গলাকাটা পাসপোর্ট পাওয়া যাইত, এখন নাকি এসকল আর পাওয়া যায় না। যাহা হউক, হাতুড়ের কিছু জমিজিরাত ছিল, তাহা বিক্রয় করিবার মনস্থির করিল, আমিরিকা তাহাকে যাইতেই হইবে।
নানা বৃত্তান্তের পর অবশেষে সে পাসপোর্ট হস্তে পাইল। আপনারা বিদ্যান ব্যক্তি, পাসপোর্ট পাওয়া যে সহজ, তাহা আপনারা জানেনই, তাই আর বৃত্তান্ত লিখিলাম না। দশজনের যে গতি, হাতুড়েরও সেই গতি। চাহিলে সে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, দুর্বাল আন্দোলন করিয়া কঠিনভাবে পাসপোর্ট লাভ করিতে পারিত, কিন্তু সেই তেজ সে আমিরিকা যাইবার পশ্চাতে ব্যয় করিবে বলিয়া মনস্থির করিয়াছিল বলিয়াই সহজ পথে পাসপোর্ট হস্তে পাইল। ছবিতে ইঞ্জেকশন হস্তে তুলিতে পারিলে যে সে চিকিৎসা করিতে পারে, ইহা বুঝানো সহজ হইত, কিন্তু কোনোমতেই তাহা দফতরে বুঝানো গেল না।
হাতুড়ের দুর্বার মনোবল দেখিয়া মাকুর পিতার ইচ্ছা হইল যে, সে-ও তাহার সহিত যাত্রা করিবে। মাকুর মুখ হইতে আমিরিকার কেচ্ছা শুনিয়া সেই ইচ্ছা তীব্র হইতে তীব্রতর হইয়াছে মাত্র। তদ্ব্যতীত, বাতাসে টাকা উড়া দেখিতে কেমন, তাহাও একটি দর্শনীয় বস্তু বটে। মাকু যেহেতু বহু পূর্বে টারজান ভিসায় চলিয়া গিয়াছে, মাকুর বাপও সিদ্ধান্ত লইল যে, সে আর হাতুড়ে মিলিয়া একই পদ্ধতি অবলম্বন করিয়া যাইবে, জীবনে আর কী আছে! সে সবিস্তারে হাতুড়ের নিকট পরিকল্পনা বর্ণনা করিল, যাহা শুনিয়া হাতুড়ে পাসপোর্ট বানাইবার পেছনে এতগুলো পয়সা ব্যয় করিয়াছে ভাবিয়া আফসোস করিল।
পরদিন দুইজন মিলিয়া টেকনাফ চলিয়া গেল এবং ‘সামুদ্রিক অভিজ্ঞতা অর্জনে আগ্রহী শিক্ষানবিশ’ হিসাবে মাঝিদের সহিত যোগ দিল। দিনভর জাল নিক্ষেপ ও নৌকা বাহিবার কঠোর পরিশ্রমের বিনিময়ে তাহাদের রাত্রির আহার জুটিত সমুদ্রের টাটকা মৎস্যের ঝোল আর গরম ভাত। উদ্দেশ্য ছিল ভংভাং দিয়া মাঝিদের বার্মা-থাইল্যান্ড উপকূল পর্যন্ত লইয়া যাওয়া। যদিও তাহাদের আলাপের ঢং শুনিয়া কানের নিচে দুইটা দিতে কেবল বাকি রাখিয়াছিল মাঝিরা।
ট্রলার সাগরবক্ষে দুলিতে আরম্ভ করিবার অর্ধ ঘণ্টার মধ্যেই মাকুর বাপের বদনমণ্ডল সবুজ বর্ণ ধারণ করিল এবং সে ট্রলারের এক কোণে গিয়া আশ্রয় লইল। তাহার একমাত্র কার্য ছিল, মস্তক ঘূর্ণনপূর্বক ভূপতিত হইবার পূর্বেই বমন করা। অন্যদিকে, হাতুড়ে প্রবল উৎসাহে কার্যে নামিয়া পড়িল। কিন্তু “টাটকা মৎস্যের ঘ্রাণ” আর “মৎস্যের আঁশটে গন্ধের” মধ্যে যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, তাহা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিল। দিবসের অন্তে তাহার সর্বাঙ্গ হইতে এমন এক গন্ধ নির্গত হইতেছিল যে, তাহার নিজেরই বমনোদ্রেক হইবার উপক্রম হইল!
হাতুড়ে অবশ্য মাকুর বাপকে সান্ত্বনা প্রদান করিবার চেষ্টা করিল। কিন্তু মাকুর বাপের অবস্থা তখন শোচনীয়। সে কেবল কোনোমতে উত্তর দিল যে, তাহার আত্মা দেহত্যাগ করিবার উপক্রম হইয়াছে এবং সে স্থলে অবতরণ করিতে চায়। তাহাদের “টাটকা মৎস্যের ঝোল” পাইবার স্বপ্নও ভগ্ন হইল, কারণ নাবিকদের আহার্য ছিল কেবল লবণ সহযোগে সিদ্ধ মৎস্য ও ভাত।
ট্রলারের মাঝি হাতুড়ের অতিরিক্ত উৎসাহ এবং মাকুর বাপের পীড়ায় বিরক্ত হইয়া তাহাদিগকে থাইল্যান্ডের এক অপরিচিত জেলেপাড়ায় নামাইয়া দিল। আগেই বলিয়াছিলাম মাঝি কানের নিচে দুইটা দিতে বাকি রেখেছে, তবে পারিশ্রমিকস্বরূপ তাহাদের হস্তে দুইটি মাঝারি আকারের রুপচাঁদা মৎস্য ধরাইয়া দেওয়া হইল।
হাতুড়ে কিঞ্চিৎও হতাশ হইল না। সে মাকুর বাপকে বুঝাইল যে, ইহাই হইল বিনিময় প্রথা এবং তাহারা মৎস্যের বিনিময়ে তণ্ডুল-ডাল সংগ্রহ করিয়া ফেলিবে। কিন্তু মাকুর বাপ তাহার এই উদ্ভট পরিকল্পনায় সায় দিতে পারিল না। সে স্মরণ করাইয়া দিল যে, জেলেপাড়ায় কেহ মৎস্য ক্রয় করিতে আসিবে না। মাকুর বাপের কথাই সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইল।
কয়েক ঘণ্টা পর, এক দয়ালু বৃদ্ধা তাহাদের দুরবস্থা দেখিয়া এক বাটি টম ইয়াম স্যুপ ও ভাত দিয়া গেল। সুরুয়ার প্রথম চামচ মুখে দিতেই মাকুর বাপের কর্ণ দিয়ে ধুঁয়া নির্গত হইবার উপক্রম হইল। অগ্নিবৎ ঝাল সেই স্যুপ খাইতে খাইতে তাহার মনে হইতেছিল, ইহার অপেক্ষা সাগরের লবণাক্ত জলও শ্রেয় ছিল। কিন্তু হাতুড়ে সগর্বে ঘোষণা করিল যে, তাহাদের মৎস্য বিক্রয়ের পরিকল্পনা সফল হইয়াছে এবং এই স্যুপ হইল তাহাদের লভ্যাংশ! তাছাড়া নোনা মাছ খাইতে খাইতে জিব পঁচিয়া গিয়াছে প্রায়।
তাহারা উপকূল ধরিয়া উত্তর দিকে হাঁটিতে শুরু করিলে পথে এক বিশাল ফলের উদ্যান পড়িল। হাতুড়ের মাথায় তৎক্ষণাৎ নূতন চাকুরির বুদ্ধি খেলিয়া গেল। সে একটি পেঁপে বাগানের মালিকের নিকট গিয়া ইঙ্গিতে বুঝাইবার চেষ্টা করিল যে, তাহারা দুইজন উদ্যানে দণ্ডায়মান থাকিলে কোনো পক্ষী আসিবে না। হাতুড়ে হস্তদ্বয় পক্ষীর ডানার ন্যায় ঝাপটাইয়া “কা কা” শব্দ করিতে লাগিল, আর মাকুর বাপ বিষণ্ণবদনে একটি বৃক্ষের ন্যায় দাঁড়াইয়া রহিল। উদ্যানের মালিক তাহাদের অদ্ভুত কাণ্ড দেখিয়া এতই আমোদ পাইলেন যে, তিনি তাহাদিগকে তাড়াইয়া না দিয়া উদরপূর্তি করিয়া পেঁপে ও কলা খাইতে দিলেন। পেঁপে খাইতে খাইতে হাতুড়ে মাকুর বাপকে বলিল যে, তাহাদের মেধা মোটেও নষ্ট হইতেছে না।
তাহার কিছুদিন পর তাহারা দেখিল, এক কৃষক তাহার পুরাতন পিকআপ ট্রাকে বাঁধাকপি ও লাউ বোঝাই করিতেছে। হাতুড়ে ছুটিয়া গিয়া কৃষককে ইঙ্গিতে বুঝাইল যে, তাহারা এই সবজির ট্রাকের উপরে বসিয়া মালামাল পাহারা দিবে। ইহার পর আরম্ভ হইল তাহাদের জীবনের সর্বাপেক্ষা স্মরণীয় যাত্রা। পথের ঝাঁকুনিতে তাহারা একবার বাঁধাকপির স্তূপের উপর উঠিয়া যায়, তো পরক্ষণেই লাউয়ের উপর গিয়া আছড়াইয়া পড়ে। মাকুর বাপ দৃঢ়ভাবে একটি লাউ জড়াইয়া ধরিয়া চক্ষু মুদিত করিয়া বসিয়া রহিল।
ট্রাকটি তাহাদিগকে একটি বৃহৎ শহরের নিকটে নামাইয়া দিয়া গেল। ধূলি ও সবজির রসে সর্বাঙ্গ শিক্ত অবস্থায় অবতরণের পর মাকুর বাপের মনে হইতেছিল, যেন তাহার শরীরের সকল অস্থি সবজিতে পরিণত হইয়া গিয়াছে। কিন্তু তাহারা সফলভাবে এশিয়ার উপকূল পাড়ি দিয়াছে। এক্ষণে সম্মুখে চীনের সীমান্ত।


