Tag: Broken Window

  • ভাঙা জানালা –  শেষ পর্ব

    ভাঙা জানালা – শেষ পর্ব

    শৃঙ্খলা রক্ষায় সামাজিক অংশগ্রহণের দ্বিতীয় যে ঐতিহ্যটি রয়েছে, তা হলো “ভিজিলান্টি” বা স্বঘোষিত আইনরক্ষক গোষ্ঠীর। এটি প্রথম ঐতিহ্যের, অর্থাৎ “কমিউনিটি পাহারাদার”-এর সম্পূর্ণ বিপরীত। আমেরিকার পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীল এবং পুরোনো সম্প্রদায়গুলোতে এই ধরনের গোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রায় ছিলই না। এদের মূলত সেইসব সীমান্ত শহরগুলোতে খুঁজে পাওয়া যেত, যেগুলো সরকারি আইন-কানুন পৌঁছানোর আগেই দ্রুত গড়ে উঠেছিল। ইতিহাসে প্রায় ৩৫০টিরও বেশি ভিজিলান্টি গোষ্ঠীর কথা জানা যায়। তাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তারা আইনকে পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নিত। তারা নিজেরাই পুলিশ, বিচারক, জুরি এবং প্রায়শই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার দায়িত্বও পালন করত। যদিও আজকের দিনে নাগরিকরা প্রায়ই ভয় প্রকাশ করে যে পুরোনো শহরগুলো অপরাধের কারণে এক ধরনের “শহুরে সীমান্ত” হয়ে উঠছে, তবুও ভিজিলান্টি আন্দোলন এখন আর তেমন দেখা যায় না। তবে, কিছু কমিউনিটি পাহারাদার গোষ্ঠী এই বিপজ্জনক সীমানার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে এবং ভবিষ্যতে অন্যরাও সেই সীমা অতিক্রম করতে পারে। এর একটি অস্পষ্ট কিন্তু চিন্তার উদ্রেককারী উদাহরণ নিউ জার্সির বেলভিল শহরের সিলভার লেক এলাকার একটি নাগরিক টহলদারী দলের ঘটনা। দলের একজন নেতা সাংবাদিকদের জানান, “আমরা মূলত বাইরের লোক খুঁজি।” তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, যদি পাড়ার বাইরের কোনো কিশোর-কিশোরীকে এলাকায় ঘুরতে দেখা যায়, “আমরা তাদের জিজ্ঞাসা করি এখানে কী কাজ।” যদি তারা উত্তর দেয় যে তারা রাস্তার ওপারে মিসেস জোনসের বাড়িতে যাচ্ছে, তাহলে তাদের যেতে দেওয়া হয়। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দলটি এরপর তাদের পিছু পিছু গিয়ে নিশ্চিত করে যে তারা আসলেই মিসেস জোনসের বাড়িতে যাচ্ছে কি না। এই আচরণটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার না হলেও, এটি সন্দেহ, জেরা এবং নজরদারির মাধ্যমে এক ধরনের ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, যা ভিজিলান্টি মানসিকতারই একটি প্রাথমিক রূপ।

    যদিও সাধারণ নাগরিকরা শৃঙ্খলা রক্ষায় অনেক ভূমিকা রাখতে পারে, এটা পরিষ্কার যে এই কাজের আসল চাবিকাঠি পুলিশের হাতেই রয়েছে। এর একাধিক কারণ আছে। প্রথমত, রবার্ট টেইলর হোমস-এর মতো কিছু এলাকা এতটাই অপরাধ আর হতাশায় নিমজ্জিত যে, সেখানকার বাসিন্দাদের পক্ষে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, একজন সাধারণ নাগরিক, এমনকি তিনি যদি কোনো সংগঠিত দলের সদস্যও হন, তার পক্ষে পুলিশের ব্যাজ পরার সাথে যে গভীর দায়িত্ববোধ আসে, তা অনুভব করা প্রায় অসম্ভব। মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, কোনো বিপদে পড়া ব্যক্তিকে সাহায্য করার জন্য সাধারণ মানুষ কেন এগিয়ে আসে না। এর কারণ তাদের “উদাসীনতা” বা “স্বার্থপরতা” নয়, বরং এর কারণ হলো, সেই মুহূর্তে ব্যক্তিগতভাবে দায়িত্ব নেওয়ার মতো কোনো জোরালো ভিত্তি তারা খুঁজে পায় না। অদ্ভুতভাবে, যখন চারপাশে অনেক লোক উপস্থিত থাকে, তখন দায়িত্ব এড়ানো আরও সহজ হয়ে যায়, কারণ প্রত্যেকে ভাবে অন্য কেউ হয়তো এগিয়ে আসবে। একে “দায়িত্বের বিভাজন” (diffusion of responsibility) বলা হয়। রাস্তাঘাট বা প্রকাশ্য স্থানে, যেখানে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সবচেয়ে জরুরি, সেখানে সাধারণত অনেক মানুষ থাকে। আর এই ভিড়ের কারণেই কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে পুরো সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হয়ে এগিয়ে আসার সম্ভাবনা কমে যায়। এখানেই পুলিশ অফিসারের ইউনিফর্ম একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ওই ইউনিফর্মটি তাকে ভিড়ের মধ্যে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে দেয়, যার উপর দায়িত্ব অর্পিত আছে এবং যাকে সাহায্য করতে বললে তিনি তা করতে বাধ্য। এছাড়া, একজন সাধারণ নাগরিকের তুলনায় একজন প্রশিক্ষিত পুলিশ অফিসার অনেক সহজে আবেগবর্জিত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। রাস্তার নিরাপত্তা রক্ষার জন্য কোনটি জরুরি এবং কোনটি কেবল একটি এলাকার জাতিগত অহংকার বা বিশুদ্ধতা রক্ষা করার চেষ্টা—এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করার মতো মানসিকতা তাদের থাকার কথা, যা সিলভার লেকের মতো নাগরিক টহলদারদের নাও থাকতে পারে।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমেরিকার পুলিশ বাহিনীতে সদস্য সংখ্যা বাড়ার বদলে কমছে। অনেক বড় বড় শহরে কর্মরত পুলিশ অফিসারের সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই ঘাটতি পূরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে, প্রতিটি পুলিশ বিভাগকে তাদের সীমিত সংখ্যক অফিসারদের অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করতে হচ্ছে। কিছু এলাকা এতটাই অপরাধপ্রবণ এবং সেখানকার বাসিন্দারা এতটাই হতাশ যে, সেখানে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার মতো সাধারণ পুলিশি ব্যবস্থা একেবারেই অকার্যকর। সীমিত সম্পদ দিয়ে পুলিশ সেখানে বড়জোর একের পর এক আসতে থাকা জরুরি কলের ভিত্তিতে সাড়া দিতে পারে। আবার, অন্য কিছু এলাকা এতটাই শান্ত ও স্থিতিশীল যে সেখানে বাড়তি টহলদারির কোনো প্রয়োজনই নেই। তাই, সফল কৌশল হলো সেইসব এলাকাকে চিহ্নিত করা, যেগুলো “টিপিং পয়েন্ট” বা পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। অর্থাৎ, এমন এলাকা যেখানে জনশৃঙ্খলা ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে কিন্তু পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি; যেখানে মানুষ ভয়ে ভয়ে রাস্তাঘাট ব্যবহার করে; যেখানে যেকোনো মুহূর্তে একটি জানালা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং যদি পুরো এলাকাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হয়, তবে সেই প্রথম ভাঙা জানালাটি খুব দ্রুত মেরামত করা আবশ্যক। এখানেই একজন পুলিশ অফিসারের উপস্থিতি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

    দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ পুলিশ বিভাগের কাছে এই ধরনের “টিপিং পয়েন্ট” এলাকাগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার এবং সেখানে বিচক্ষণতার সাথে অফিসার নিয়োগ করার মতো কোনো পদ্ধতিগত ব্যবস্থা নেই। পুলিশ মোতায়েন করা হয় মূলত দুটি ভুল পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে। প্রথমত, অপরাধের হারের ভিত্তিতে, যার ফলে একটি মারাত্মক সমস্যা তৈরি হয়: যেসব এলাকা সবেমাত্র খারাপ হতে শুরু করেছে, সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে সেইসব এলাকায় পাঠানো হয়, যেখানে অপরাধ পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। অর্থাৎ, যেখানে রোগ প্রতিরোধ করা যেত, সেখান থেকে ডাক্তার সরিয়ে মুমূর্ষু রোগীর কাছে পাঠানো হয়। দ্বিতীয়ত, পরিষেবা দেওয়ার জন্য আসা কলের সংখ্যার ভিত্তিতে পুলিশ পাঠানো হয়। কিন্তু এই পদ্ধতিও ত্রুটিপূর্ণ, কারণ বেশিরভাগ সাধারণ নাগরিক কেবল ভয় পেলে, বিরক্ত হলে বা কোনো ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দেখলে পুলিশকে ফোন করে না; তারা ফোন করে যখন কোনো বড় অপরাধ ঘটে যায়। তাই বিচক্ষণতার সাথে টহল ব্যবস্থা সাজাতে হলে, পুলিশ বিভাগকে পরিসংখ্যানের বাইরে গিয়ে সরাসরি এলাকাগুলো পরিদর্শন করতে হবে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তাদের বুঝতে হবে, ঠিক কোন এলাকায় একজন অতিরিক্ত পুলিশ অফিসারের উপস্থিতি মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারবে।

    পুলিশের এই সীমিত সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করার একটি নতুন উপায় কিছু সরকারি আবাসন প্রকল্পে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এইসব প্রকল্পে ভাড়াটিয়াদের সংগঠনগুলো তাদের ভবনে টহলের জন্য ডিউটির বাইরে থাকা পুলিশ অফিসারদের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ করছে। এই ব্যবস্থার একাধিক সুবিধা রয়েছে। জনপ্রতি খরচের পরিমাণ খুব বেশি নয়, ডিউটির বাইরে থাকা অফিসারটি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, বাসিন্দারা নিজেদের অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করে। এই ব্যবস্থাটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী বা প্রাইভেট গার্ড নিয়োগের চেয়ে সম্ভবত অনেক বেশি সফল। নিউয়ার্কের পরীক্ষাটি আমাদের বুঝতে সাহায্য করে, কেন এটি বেশি কার্যকর। একজন প্রাইভেট গার্ড তার উপস্থিতির মাধ্যমে হয়তো অপরাধীদের ভয় দেখাতে পারে বা বিপদে পড়া মানুষকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যে ব্যক্তি কোনো অপরাধ করছে না, অথচ সমাজের বা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত নিয়মকানুনকে (যেমন, ভবনের ভেতরে গোলমাল করা বা বহিরাগতদের নিয়ে এসে উৎপাত করা) তোয়াক্কা করছে না, তাকে বাধা দেওয়ার বা নিয়ন্ত্রণ করার সম্ভাবনা তার কম। কারণ তার সেই আইনি বা মানসিক অধিকার নেই। অন্যদিকে, একজন শপথবদ্ধ অফিসার—অর্থাৎ একজন “আসল পুলিশ”—হওয়ার কারণে তার মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস, কর্তব্যের অনুভূতি এবং ক্ষমতার একটি আবহ বা “aura of authority” থাকে, যা এই ধরনের কঠিন কিন্তু জরুরি কাজগুলো করার জন্য অপরিহার্য।

    এর পাশাপাশি আরও কিছু ছোট কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, টহলরত অফিসারদের তাদের কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার সময় বাস বা সাবওয়ের মতো গণপরিবহন ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। গণপরিবহনে থাকাকালীন তারা এর নিয়মকানুন, যেমন—ধূমপান, মদ্যপান বা বিশৃঙ্খল আচরণ করা—ইত্যাদি বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারেন। এই নিয়ম প্রয়োগ করার জন্য অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার মতো জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন নেই; কেবল তাকে বাস বা ট্রেন থেকে নামিয়ে দিলেই যথেষ্ট। কারণ এই ধরনের ছোটখাটো অপরাধ নিয়ে পুলিশ স্টেশন বা আদালত মাথা ঘামাতে চায় না। সম্ভবত, বাসে এইভাবে এলোমেলো কিন্তু নিরলসভাবে নিয়মকানুন প্রয়োগ করতে থাকলে গণপরিবহনেও এমন একটি সভ্য ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হতে পারে, যা আমরা এখন বিমানে ভ্রমণ করার সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নিই।

    তবে, এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন হলো মানসিকতার পরিবর্তন। আমাদের সবাইকে—পুলিশ, প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষ—এটা বুঝতে হবে যে, ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা পুলিশের একটি অত্যন্ত জরুরি এবং মৌলিক কাজ। পুলিশ বিভাগ জানে যে এটি তাদের দায়িত্বগুলোর মধ্যে একটি। তারা এটাও সঠিকভাবে বিশ্বাস করে যে, অপরাধ তদন্ত করা বা জরুরি কলে সাড়া দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাদ দিয়ে কেবল শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা— অর্থাৎ সমাজ এবং নীতিনির্ধারকরা—গুরুতর এবং সহিংস অপরাধ নিয়ে এত বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছি যে, আমরা হয়তো পরোক্ষভাবে পুলিশকে এটা ভাবতে উৎসাহিত করেছি যে, তাদের কাজের বিচার হবে কেবল বড় বড় অপরাধী ধরার ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। পুলিশ প্রশাসকরা তাদের লোকবল সেইসব এলাকায় পাঠান যেখানে অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি (যদিও সেই এলাকাগুলো অপরাধমূলক আক্রমণের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ না-ও হতে পারে)। তারা পুলিশি প্রশিক্ষণে আইন এবং অপরাধী ধরার কৌশলের উপর জোর দেন, কিন্তু রাস্তার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কীভাবে শান্তিপূর্ণ রাখা যায়, সেই ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণে জোর দেন না। এবং তারা প্রায়শই “নিরীহ” বলে বিবেচিত আচরণগুলোকে (যেমন, প্রকাশ্য মদ্যপান, রাস্তায় পতিতাবৃত্তি, বা অশ্লীল পোস্টার প্রদর্শন) অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে খুব দ্রুত সায় দেন। অথচ তারা ভুলে যান যে, এই “নিরীহ” আচরণগুলোই একটি পেশাদার চোরের দলের চেয়েও অনেক দ্রুত একটি সুন্দর সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে দিতে পারে।

    সর্বোপরি, আমাদের সেই পুরোনো কিন্তু এখন প্রায় পরিত্যক্ত একটি ধারণায় ফিরে আসতে হবে: পুলিশের দায়িত্ব শুধু ব্যক্তিবিশেষকে রক্ষা করা নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়কে রক্ষা করা। আমাদের বর্তমান অপরাধের পরিসংখ্যান বা সমীক্ষাগুলো কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতির হিসাব রাখে—যেমন, কার গাড়ি চুরি হলো বা কার বাড়ি ডাকাতি হলো। কিন্তু এগুলো কখনোই সাম্প্রদায়িক ক্ষতি পরিমাপ করে না—যেমন, একটি পার্ক শিশুদের জন্য অনিরাপদ হয়ে যাওয়া বা প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হয়ে যাওয়া। ঠিক যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন কেবল রোগের চিকিৎসার পরিবর্তে সামগ্রিক স্বাস্থ্য গড়ে তোলার উপর জোর দিচ্ছে, যা একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা; তেমনি পুলিশ এবং আমাদের সমাজের বাকি সবারও এটা স্বীকার করা উচিত যে, রোগের চিকিৎসার মতো করে অপরাধ দমনের পাশাপাশি, ভাঙা জানালাবিহীন একটি সুস্থ ও অক্ষত সম্প্রদায় বজায় রাখা—যা একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল—কতটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৮

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৮

    অনেক সময় দেখা যায়, ছোট শহরের বাসিন্দারা বড় শহরের একই রকম এলাকার বাসিন্দাদের তুলনায় তাদের পুলিশের কাজে বেশি সন্তুষ্ট থাকে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে তাদের মানসিকতা। তারা হয়তো ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার চেয়েও একটি গোষ্ঠীর বা সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির গবেষক এলিনর অস্ট্রোম এবং তার সহকর্মীরা এই বিষয়টি নিয়ে একটি চমৎকার গবেষণা করেন। তারা ইলিনয় রাজ্যের দুটি দরিদ্র ও সম্পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত ছোট শহর (ফিনিক্স এবং ইস্ট শিকাগো হাইটস)-এর সাথে শিকাগো শহরের তিনটি একই ধরনের কৃষ্ণাঙ্গ পাড়ার তুলনা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধের হার কিংবা পুলিশ ও নাগরিকদের মধ্যেকার সাধারণ সম্পর্ক— উভয় ক্ষেত্রেই ছোট শহর এবং বড় শহরের পাড়াগুলোর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। কিন্তু মানসিকতার দিক থেকে একটি বড় পার্থক্য ছিল। ছোট শহরের বাসিন্দারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলত যে, তারা অপরাধের ভয়ে নিজেদের ঘরে গুটিয়ে রাখেন না। তারা পুলিশকে অনেক বেশি ক্ষমতা দিতেও রাজি ছিল; তারা মনে করত, এলাকার সমস্যা সমাধানের জন্য পুলিশের “যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আছে”। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা বিশ্বাস করত যে পুলিশ “সাধারণ নাগরিকদের ভালো-মন্দের দিকে খেয়াল রাখে”।

    এর থেকে গবেষকরা একটি সিদ্ধান্তে আসেন: সম্ভবত ছোট শহরগুলোর বাসিন্দা এবং পুলিশ—উভয়েই নিজেদেরকে একটি দলের সদস্য হিসেবে দেখে। তাদের লক্ষ্য অভিন্ন: একসঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের এলাকার জীবনযাত্রার একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা। অন্যদিকে, বড় শহরের বাসিন্দারা পুলিশকে একটি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে দেখে। তাদের সম্পর্কটা অনেকটা লেনদেনমূলক: আমার সমস্যা হয়েছে, আমি ফোন করে পুলিশকে জানিয়েছি, পুলিশ এসে পরিষেবা দিয়ে চলে গেছে। এখানে কোনো সমষ্টিগত অনুভূতির স্থান নেই।

    যদি উপরের কথাগুলো সত্যি হয়, তাহলে একজন বিচক্ষণ পুলিশ প্রধান তার সীমিত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে কী কৌশল অবলম্বন করবেন? এর কোনো সহজ বা একমাত্র উত্তর নেই।

    • প্রথম উত্তর: সত্যি কথা হলো, কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না কোনটি সেরা উপায়। তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো। যেমন, নিউয়ার্কে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই বিভিন্ন পাড়ায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে দেখা উচিত যে কোনটি কোথায় সবচেয়ে ভালো কাজ করে। কারণ সব এলাকার চরিত্র এক নয়।
    • দ্বিতীয় উত্তর: এটিও একটি সতর্কতামূলক জবাব। পাড়া-মহল্লায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনই হয় না। পুলিশের অংশগ্রহণ খুব সামান্য রেখে, বা ক্ষেত্রবিশেষে একেবারেই না রেখেও অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। যেমন, একটি ব্যস্ত শপিং সেন্টার যেখানে সারাদিন প্রচুর মানুষ যাতায়াত করে, অথবা একটি শান্ত ও গোছানো শহরতলি—এই জায়গাগুলোতে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির প্রায় কোনো দরকারই পড়ে না। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই, ভালো ও আইন মেনে চলা মানুষের সংখ্যা এতটাই বেশি থাকে যে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা এমনিতেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একেই “অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ” (informal social control) বলা হয়, যেখানে সমাজ নিজেই নিজেকে ঠিক রাখে।

    এমনকি যেসব এলাকায় অপরাধমূলক কার্যকলাপের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানেও অনেক সময় পুলিশের বড় ধরনের ভূমিকা ছাড়াই শুধুমাত্র নাগরিকদের উদ্যোগই যথেষ্ট হতে পারে।

    • আলোচনা ও বোঝাপড়া: যেমন, ধরা যাক পাড়ার একটি নির্দিষ্ট মোড়ে কিছু কিশোর-তরুণ আড্ডা দিতে ভালোবাসে, কিন্তু এলাকার প্রাপ্তবয়স্কদের তাতে অসুবিধা হয়। এক্ষেত্রে পুলিশ ডাকার পরিবর্তে, উভয় পক্ষ আলোচনায় বসতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে তারা কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে পারে—যেমন, কতজন একসঙ্গে আড্ডা দিতে পারবে, ঠিক কোন জায়গায় তারা বসবে এবং কতক্ষণ থাকবে। একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বোঝাপড়া প্রায়শই পুলিশি হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়।
    • নাগরিকদের টহল (Citizen Patrols): যখন আলোচনা বা বোঝাপড়া সম্ভব হয় না, বা নিয়ম তৈরি হলেও তা কেউ মানে না, তখন নাগরিকরাই নিজেদের উদ্যোগে টহলদারির ব্যবস্থা করতে পারে। এই ধারণাটি মোটেও নতুন নয়। আমেরিকায় এর দুটি পুরনো ঐতিহ্য রয়েছে। একটি হলো “কমিউনিটির পাহারাদার” (community watchmen)-এর ধারণা, যা আমেরিকার প্রথম বসতি স্থাপনের সময় থেকেই চলে আসছে। উনিশ শতক পর্যন্ত পুলিশ নয়, বরং এলাকার স্বেচ্ছাসেবকরাই পালা করে নিজেদের এলাকা পাহারা দিত। তাদের মূল কাজ ছিল শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কিন্তু তারা কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নিত না। অর্থাৎ, তারা কাউকে শাস্তি দিত না বা গায়ে হাত তুলত না। তাদের উপস্থিতিই অপরাধীদের মনে ভয় জাগাতো এবং কোনো গোলমাল শুরু হলে তারা বাকিদের সতর্ক করে দিত।
      • আধুনিক উদাহরণ: বর্তমানেও এই ধরনের শত শত উদ্যোগ সারা দেশে চালু আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো “গার্জিয়ান অ্যাঞ্জেলস” নামের একটি দল। এই দলের সদস্যরা হলো নিরস্ত্র তরুণ-তরুণী, যারা একটি বিশেষ ধরনের টুপি ও টি-শার্ট পরে। নিউ ইয়র্ক শহরের পাতাল রেলে (subway) টহল দেওয়ার মাধ্যমে তারা প্রথম পরিচিতি লাভ করে। এখন আমেরিকার ৩০টিরও বেশি শহরে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।

    দুর্ভাগ্যবশত, এই ধরনের নাগরিক উদ্যোগগুলো আদতে অপরাধ কমাতে কতটা সক্ষম, সে বিষয়ে আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা পরিসংখ্যান খুব কম। কিন্তু একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: অপরাধের সংখ্যা কমুক বা না কমুক, এই দলগুলোর উপস্থিতি এলাকার সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আস্থা ও সাহস জোগায়। মানুষ নিজেদের নিরাপদ বোধ করে। আর এই অনুভূতিটাই একটি এলাকার শৃঙ্খলা এবং সভ্য পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ, অপরাধ কমানোর পাশাপাশি “ভয় কমানো” ও একটি বড় সাফল্য।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৭

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৭

    সমাজের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আমাদের সামনে আসে, কিন্তু এর কোনো সম্পূর্ণ সন্তোষজনক উত্তর আমরা দিতে পারি না। সত্যি বলতে, এই জটিলতার কোনো নিখুঁত সমাধান আছে কি না, সে বিষয়ে আমরা নিজেরাই নিশ্চিত নই। আমরা কেবল একটি বিষয়ে আশা রাখতে পারি: যদি পুলিশ সদস্যদের সঠিকভাবে নির্বাচন করা হয়, তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং তাদের কাজের যথাযথ তত্ত্বাবধান করা হয়, তবেই হয়তো তাদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ধারণা গেঁথে দেওয়া সম্ভব হবে। সেই ধারণাটি হলো তাদের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার (অর্থাৎ, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা) একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। সেই সীমাটি সহজ ভাষায় বললে এইরকম— পুলিশের মূল কাজ হলো সমাজে মানুষের আচরণকে নিয়মকানুনের মধ্যে রাখতে সাহায্য করা, কোনো নির্দিষ্ট এলাকার জাতিগত বা বর্ণগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করা নয়। অর্থাৎ, কে কোন এলাকায় থাকবে বা থাকবে না, তা তাদের বর্ণ বা জাতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা পুলিশের কাজ হতে পারে না।

    এই বিষয়টি বোঝার জন্য আসুন আমরা শিকাগোর ‘রবার্ট টেইলর হোমস’-এর উদাহরণটি বিবেচনা করি। এটি আমেরিকার অন্যতম বৃহত্তম সরকারি আবাসন প্রকল্প। প্রায় ২০,০০০ কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ এখানে বসবাস করেন এবং প্রকল্পটি সাউথ স্টেট স্ট্রিট বরাবর প্রায় ৯২ একর বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এর নামকরণ করা হয়েছিল ১৯৪০-এর দশকে শিকাগো হাউজিং অথরিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এক বিশিষ্ট কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির নামে। কিন্তু ১৯৬২ সালে এই প্রকল্পটি চালু হওয়ার কিছুদিন পরেই, এখানকার বাসিন্দা এবং পুলিশের মধ্যেকার সম্পর্ক মারাত্মকভাবে খারাপ হতে শুরু করে।অবিশ্বাসের এক চক্র তৈরি হয়। বাসিন্দারা মনে করত, পুলিশ তাদের প্রতি সহানুভূতিহীন এবং প্রায়শই নৃশংস আচরণ করে। অন্যদিকে, পুলিশ অভিযোগ করত যে, কোনো উস্কানি ছাড়াই বাসিন্দারা তাদের ওপর হামলা চালায়। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের ফল হয়েছিল ভয়াবহ। শিকাগোর কিছু পুলিশ অফিসার এমন সময়ের কথা বলেন, যখন তারা ওই আবাসন প্রকল্পে দিনের বেলাতেও প্রবেশ করতে ভয় পেতেন। স্বাভাবিকভাবেই, যেখানে আইন প্রয়োগকারী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকে না, সেখানে অপরাধের হার আকাশ ছুঁয়েছিল।

    তবে আজ সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। পুলিশ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেকার সম্পর্ক আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে উভয় পক্ষই শিক্ষা নিয়েছে। বাসিন্দারা বুঝেছে যে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের প্রয়োজন, এবং পুলিশও উপলব্ধি করেছে যে কমিউনিটির আস্থা ছাড়া কার্যকরভাবে কাজ করা অসম্ভব। এই পরিবর্তনের একটি চমৎকার উদাহরণ সম্প্রতি দেখা গেছে: একটি ছেলে এক মহিলার পার্স চুরি করে পালিয়ে যাওয়ার সময় বেশ কয়েকজন তরুণ ঘটনাটি দেখতে পায়। অতীতে হয়তো তারা চুপ থাকত, কিন্তু এবার তারা স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে চোরের পরিচয় এবং সে কোথায় থাকে, তা পুলিশকে জানিয়ে দেয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারা এই কাজটি প্রকাশ্যে, তাদের বন্ধু ও প্রতিবেশীদের সামনেই করেছিল, যা প্রমাণ করে যে পুলিশকে সাহায্য করাটা এখন আর লজ্জার বা ভয়ের বিষয় নয়।

    কিন্তু এত কিছুর পরেও কিছু গভীর সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো উঠতি সন্ত্রাসী গ্যাং বা দলগুলোর উপস্থিতি। এই দলগুলো বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত ভয় দেখায়, আতঙ্কিত করে রাখে এবং অল্পবয়সী ছেলেদের নিজেদের দলে যোগ দিতে বাধ্য করে। স্বাভাবিকভাবেই, সাধারণ মানুষ আশা করে যে পুলিশ এই বিষয়ে “কিছু একটা করুক” এবং তাদের জীবনকে নিরাপদ করুক। পুলিশও এই গ্যাংগুলোর দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর।

    কিন্তু প্রশ্ন হলো, পুলিশ ঠিক কী করতে পারে? সমস্যাটা যতটা সহজ মনে হয়, ততটা নয়। যদি গ্যাং-এর কোনো সদস্য সরাসরি কোনো আইন ভাঙে— যেমন চুরি, ডাকাতি বা হামলা করে— তবে পুলিশ তাকে সহজেই গ্রেপ্তার করতে পারে। কিন্তু একটি গ্যাং আইন না ভেঙেই একটি কমিউনিটির জন্য আতঙ্কের কারণ হতে পারে। তারা কোনো অপরাধ না করেও দলবদ্ধভাবে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, সদস্য সংগ্রহ করতে পারে এবং নিজেদের উপস্থিতি জাহির করতে পারে। গ্যাং-সম্পর্কিত যেসব অপরাধ ঘটে, তার অতি সামান্য একটি অংশই প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব হয়। সুতরাং, যদি আইনসম্মত গ্রেপ্তারই পুলিশের একমাত্র হাতিয়ার হয়, তবে বাসিন্দাদের মনের ভয় কখনোই দূর হবে না। এর ফলে পুলিশ সদস্যরা শীঘ্রই নিজেদের অসহায় বোধ করতে শুরু করবে, কারণ তারা দেখবে যে তাদের প্রধান অস্ত্র (গ্রেপ্তার) এই সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ। আর যখন বাসিন্দারা দেখবে যে তাদের ভয়ের কারণ সেই গ্যাংগুলো আগের মতোই রয়ে গেছে, তখন তাদের মধ্যে আবার সেই পুরনো বিশ্বাস ফিরে আসবে যে পুলিশ আসলে “কিছুই করে না”।

    এই পরিস্থিতিতে বাস্তবে পুলিশ যা করে তা হলো, একটি আইন-বহির্ভূত পন্থা অবলম্বন করা। তারা পরিচিত গ্যাং সদস্যদের ধরে প্রকল্প এলাকা থেকে জোর করে তাড়িয়ে দেয়। এক পুলিশ অফিসারের ভাষায় বলতে গেলে, “আমরা ওদের এলাকাছাড়া করি।” আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রকল্পের বাসিন্দারা পুলিশের এই বেআইনি কাজের কথা জানে এবং মনে মনে তা অনুমোদনও করে। কারণ তাদের কাছে আইনের জটিল প্রক্রিয়ার চেয়ে নিজেদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এইভাবেই পুলিশ ও নাগরিকদের মধ্যে একটি নীরব বা অলিখিত বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। এই বোঝাপড়াটি এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে আরও শক্তিশালী হয় যে, ওই এলাকায় ক্ষমতার দুটি কেন্দ্র রয়েছে— একপাশে পুলিশ, অন্যপাশে গ্যাং। আর এই লড়াইয়ে গ্যাং-কে কোনোভাবেই জিততে দেওয়া যাবে না।

    অবশ্যই, পুলিশের এই ধরনের কার্যকলাপ আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া (due process) বা ন্যায্য বিচারের ধারণার সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না। কারণ আইন অনুযায়ী, প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কোথাও থেকে বিতাড়িত করা যায় না। রবার্ট টেইলর হোমস-এর এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে, যেহেতু প্রকল্পের বাসিন্দা এবং গ্যাং সদস্য উভয়ই কৃষ্ণাঙ্গ, তাই বর্ণ বা জাতিগত পক্ষপাতের বিষয়টি বড় হয়ে ওঠেনি। কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্নও হতে পারত। একবার ভাবুন, যদি একটি শ্বেতাঙ্গ-অধ্যুষিত আবাসন প্রকল্পে একটি কৃষ্ণাঙ্গ গ্যাং-এর উপদ্রব হতো, অথবা এর উল্টোটা ঘটত, তখন পুলিশ যদি কোনো একটি পক্ষ নিয়ে এভাবে আইন হাতে তুলে নিত, তবে আমরা নিশ্চয়ই বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগে উদ্বিগ্ন হতাম।

    কিন্তু মূল সমস্যাটা একই থেকে যায়: প্রকাশ্য স্থানে মানুষের ভয় কমানোর জন্য পুলিশ কীভাবে একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বা অনানুষ্ঠানবিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে (informal social control) শক্তিশালী করতে পারে? শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে অপরাধী ধরা এই সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান নয়। কারণ একটি গ্যাং কোনো সদস্যকে শারীরিকভাবে আঘাত না করেও, কেবল ভয় দেখিয়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে বা পথচারীদের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করে একটি গোটা কমিউনিটিকে মানসিকভাবে দুর্বল এবং এমনকি ধ্বংস করে দিতে পারে।

    এই ধরনের জটিল বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে আমাদের প্রায়শই অসুবিধা হয়। এর কারণ শুধু এই নয় যে এখানকার নৈতিক এবং আইনি প্রশ্নগুলো খুব জটিল, বরং আসল কারণ হলো আমরা আইনকে মূলত একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমাদের আইনি ব্যবস্থা এভাবে কাজ করে: আইন ‘আমার’ অধিকারকে সংজ্ঞায়িত করে, ‘তার’ অন্যায় আচরণকে শাস্তি দেয়, এবং ‘ওই নির্দিষ্ট’ ক্ষতির কারণে একজন পুলিশ অফিসার আইন প্রয়োগ করে। এভাবে চিন্তা করার সময় আমরা অবচেতনভাবে ধরে নিই যে, যা একজন ব্যক্তির জন্য ভালো, তা সমগ্র কমিউনিটির জন্যই ভালো হবে। আমরা ভাবি, যে আচরণ একজনের ক্ষেত্রে ঘটলে তেমন কিছু যায় আসে না, তা যদি অনেকের ক্ষেত্রেও ঘটে, তাহলেও হয়তো তেমন কোনো বড় সমস্যা হবে না।

    সাধারণ পরিস্থিতিতে এই ধারণাগুলো হয়তো ঠিক। কিন্তু যখন কোনো আচরণ (যেমন, রাস্তার মোড়ে দলবেঁধে আড্ডা দেওয়া) একজন ব্যক্তির কাছে সহনীয় বা নির্দোষ মনে হলেও বহু মানুষের কাছে অসহনীয় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তখন সেই বহু মানুষের প্রতিক্রিয়া— যেমন ভয় পাওয়া, সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের না হওয়া, নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, বা শেষ পর্যন্ত এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া— একটি শৃঙ্খল বিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এই সম্মিলিত ভয়ের ফলে এলাকার সামাজিক জীবন ভেঙে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকের জন্য পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি খারাপ করে তোলে; এমনকি সেই ব্যক্তির জন্যও, যিনি প্রথমে এই বিষয়টিকে গুরুত্বহীন বলে নিজেকে উদাসীন দাবি করেছিলেন। কারণ একটি ভেঙে পড়া সমাজে কেউই নিরাপদ থাকতে পারে না।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৬

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৬

    শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, পুলিশের ‘প্রহরী’ হিসেবে ভূমিকাটি যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হলো কি না, সেই নিরিখে বিচার করা হতো না; বরং বিচার করা হতো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কি না, তার ভিত্তিতে। সেই লক্ষ্য ছিল শৃঙ্খলা, যা আসলে একটি অস্পষ্ট ধারণা, কিন্তু কোনো একটি এলাকার মানুষ সেই পরিস্থিতি দেখলে ঠিকই চিনতে পারত। এই শৃঙ্খলা আনার জন্য সেইসব উপায়ই ব্যবহার করা হতো, যা সেই এলাকার লোকেরাই ব্যবহার করত, যদি তাদের মধ্যে যথেষ্ট সংকল্প, সাহস এবং কর্তৃত্ব থাকত। এর বিপরীতে, অপরাধী শনাক্ত করা এবং গ্রেপ্তার করা ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্যের একটি উপায়, নিজে কোনো লক্ষ্য ছিল না; আইন প্রয়োগের চূড়ান্ত ফল হিসেবে আশা করা হতো একটি বিচার বিভাগীয় রায়। প্রথম থেকেই, পুলিশের কাছে আশা করা হতো যে তারা নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলবে, যদিও সেই নিয়মগুলো কতটা কঠোর হওয়া উচিত, তা নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে ভিন্নমত ছিল। এটা সবসময়ই বোঝা যেত যে, অপরাধী গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়ার সাথে ব্যক্তিগত অধিকার জড়িত, যা লঙ্ঘন করা অগ্রহণযোগ্য। কারণ তার মানে দাঁড়াবে, নিয়ম লঙ্ঘনকারী পুলিশ কর্মকর্তা নিজেই বিচারক এবং জুরির ভূমিকা পালন করছেন—যা তার কাজ নয়। দোষী বা নির্দোষ নির্ধারিত হবে বিশেষ পদ্ধতির অধীনে, সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়মকানুন অনুসারে।

    সাধারণত, এলাকার শৃঙ্খলা নিয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়া ব্যক্তিরা কোনো বিচারক বা জুরির সামনে আসেন না। এর কারণ শুধু এই নয় যে বেশিরভাগ মামলাই রাস্তার মধ্যেই অনানুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যায়, বরং এর আরেকটি কারণ হলো, বিশৃঙ্খলা নিয়ে তর্ক নিষ্পত্তির জন্য কোনো সার্বজনিন বা সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়ম নেই, এবং তাই একজন বিচারক এক্ষেত্রে একজন পুলিশ কর্মকর্তার চেয়ে বেশি জ্ঞানী বা কার্যকর নাও হতে পারেন। অনেক রাজ্যে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত, এবং কিছু জায়গায় আজও, পুলিশ “সন্দেহভাজন ব্যক্তি” বা “ভবঘুরে” বা “প্রকাশ্যে মদ্যপান” করার মতো অভিযোগে গ্রেপ্তার করে—এই অভিযোগগুলোর আইনি তাৎপর্য প্রায় নেই বললেই চলে। এই অভিযোগগুলো থাকার কারণ এটা নয় যে সমাজ চায় বিচারকরা ভবঘুরে বা মাতালদের শাস্তি দিক, বরং সমাজ চায় যে, রাস্তায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার অনানুষ্ঠানিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে, একজন কর্মকর্তার হাতে যেন এলাকা থেকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার আইনি হাতিয়ার থাকে।

    যখনই আমরা পুলিশের সব কাজকে বিশেষ পদ্ধতির অধীনে সার্বজনিন নিয়ম প্রয়োগের বিষয় হিসেবে ভাবতে শুরু করি, তখনই আমরা অনিবার্যভাবে প্রশ্ন তুলি যে, একজন ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ বলতে কী বোঝায় এবং কেন আমরা ভবঘুরেবৃত্তি বা মদ্যপানকে “অপরাধ” হিসেবে গণ্য করব। মানুষের সাথে যেন ন্যায্য আচরণ করা হয়, তা নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী এবং প্রশংসনীয় আকাঙ্ক্ষা আমাদের চিন্তায় ফেলে দেয় যে, পুলিশকে কোনো অস্পষ্ট বা সংকীর্ণ স্থানীয় মানদণ্ডের ভিত্তিতে মাতাল এলাকাছাড়া করার অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে কি না। আবার, এক ধরনের ক্রমবর্ধমান উপযোগবাদ—যা ততটা প্রশংসনীয় নয়—আমাদের মনে এই সন্দেহ তৈরি করে যে, যে আচরণ অন্য কারো ‘ক্ষতি’ করে না, তাকে আদৌ বেআইনি করা উচিত কি না। আর এভাবেই, আমরা যারা পুলিশের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করি, তাদের অনেকেই পুলিশকে সেই কাজটি করতে দিতে দ্বিধা বোধ করি, যা প্রতিটি এলাকা প্রবলভাবে চায় যে তারা করুক, কিন্তু যা পুলিশ কেবল তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতেই করতে পারে।

    এই ধরনের সম্মানহানিকর আচরণ, যা ‘কারো ক্ষতি করে না’, তাকে “অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার” ইচ্ছা—এবং এর মাধ্যমে এলাকার শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য পুলিশের হাতে থাকা চূড়ান্ত ব্যবস্থাটি সরিয়ে ফেলার প্রবণতা—আমাদের মতে, একটি ভুল। একজন মাতাল বা একজন ভবঘুরেকে গ্রেপ্তার করা, যিনি নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করেননি, তা অন্যায্য বলে মনে হয়, এবং এক অর্থে তা ঠিকও। কিন্তু কুড়িজন মাতাল বা একশোজন ভবঘুরের ব্যাপারে কিছুই না করাটা হয়তো পুরো একটি কমিউনিটিকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। একটি নির্দিষ্ট নিয়ম যা একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে যৌক্তিক মনে হয়, সেটি যখন একটি সার্বজনিন নিয়মে পরিণত হয় এবং সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তখন তা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। এটি অর্থহীন কারণ এটি একটি ভাঙা জানালা ফেলে রাখলে যে হাজারটা জানালা ভাঙা হয়, সেই সংযোগটি বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়। অবশ্যই, মাতাল বা মানসিকভাবে অসুস্থদের নিয়ে সমস্যাগুলোর সমাধানে পুলিশ ছাড়া অন্য সংস্থাও কাজ করতে পারত, কিন্তু বেশিরভাগ কমিউনিটিতে—বিশেষ করে যেখানে “ডি-ইনস্টিটিউশনালাইজেশন” (সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রাখার বদলে কমিউনিটিতে রেখে চিকিৎসা) আন্দোলন শক্তিশালী হয়েছে—তারা তা করে না।

    ন্যায্যতার প্রশ্নটি আরও গুরুতর। আমরা হয়তো একমত হতে পারি যে, কিছু আচরণের কারণে একজন ব্যক্তি অন্যের চেয়ে বেশি অবাঞ্ছিত হয়ে ওঠে, কিন্তু আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব যে বয়স বা গায়ের রঙ বা জাতীয় উৎস বা নিরীহ হাবভাব অবাঞ্ছিতদের থেকে অন্যদের আলাদা করার ভিত্তি হয়ে উঠবে না? সংক্ষেপে, আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব যে, পুলিশ এলাকার মানুষের গোঁড়ামি বা বিদ্বেষের প্রতিনিধি হয়ে উঠবে না?

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৫

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৫

    কিছু পুলিশ প্রশাসক এটা স্বীকার করেন যে এমনটা ঘটে, কিন্তু তাদের যুক্তি হলো, গাড়িতে টহল দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারাও পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তাদের মতোই কার্যকরভাবে পরিস্থিতি সামলাতে পারেন।কিন্তু অবজার্বেশন অনুযায়ী আমরা এতটা নিশ্চিত নই। তত্ত্ব অনুযায়ী, পুলিশের গাড়িতে থাকা একজন কর্মকর্তা পায়ে হাঁটা কর্মকর্তার মতোই সবকিছু দেখতে পারেন; তিনি পায়ে হাঁটা অফিসারের মতোই অনেকের সাথে কথা বলতে পারেন। কিন্তু গাড়ির কারণে পুলিশ-নাগরিক যোগাযোগের বাস্তবতা অনেকটাই বদলে যায়। পায়ে হাঁটা একজন কর্মকর্তা নিজেকে রাস্তার লোকজন থেকে আলাদা করতে পারেন না; যদি কেউ তার কাছে আসে, তবে পরিস্থিতি সামলানোর জন্য কেবল তার ইউনিফর্ম এবং ব্যক্তিত্বই ভরসা। আর সামনে কী ঘটতে চলেছে, সে সম্পর্কে তিনি কখনোই নিশ্চিত হতে পারেন না—হতে পারে কেউ পথের ঠিকানা জানতে চাইছে, কেউ সাহায্যের জন্য অনুরোধ করছে, কেউ রেগে গিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছে, কেউ ঠাট্টা করছে, কেউ বা বিভ্রান্ত হয়ে বিড়বিড় করছে, আবার কেউ হয়তো ভয় দেখাচ্ছে।

     গাড়িতে থাকলে একজন কর্মকর্তা সাধারণত জানালা নামিয়ে রাস্তার লোকজনের দিকে তাকিয়ে তাদের সাথে কথা বলেন। গাড়ির দরজা এবং জানালা কাছে আসা নাগরিককে একটা দূরত্বের মধ্যে রাখে; এগুলো এক ধরনের বাধা। কিছু কর্মকর্তা, হয়তো অবচেতনভাবেই, এই বাধার সুযোগ নেন এবং গাড়িতে থাকলে এমন আচরণ করেন যা তারা পায়ে হেঁটে থাকলে করতেন না। আমরা এটা বহুবার দেখেছি।

    একটা ঘটনার কথা বলতে পারি। একদিন একটি পুলিশের গাড়ি একটি মোড়ে এসে থামে যেখানে কিছু কিশোর আড্ডা দিচ্ছিল। গাড়ির জানালা নামানো হয়। কর্মকর্তা তাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারাও পাল্টা তাকায়। কর্মকর্তা তাদের একজনকে বলেন, “এদিকে আয়।” সে তার বন্ধুদের দিকে একটা স্বাভাবিক ভাব দেখিয়ে এমনভাবে হেলেদুলে এগিয়ে আসে যেন সে বোঝাতে চায় যে কর্তৃপক্ষকে সে পাত্তা দেয় না।

    “তোর নাম কী?”

    “চাক।”

    “পুরো নাম?”

    “চাক জোনস।”

    “কী করছিস, চাক?”

    “কিছু না।”

    “তোর কি পি.ও. [প্যারোল অফিসার] আছে?”

    “না।”

    “ঠিক তো?”

    “হ্যাঁ।”

    “ঝামেলা থেকে দূরে থাকিস, চাকি।”

    এর মধ্যেই, অন্য ছেলেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি আর কথা চালাচালি করে, সম্ভবত কর্মকর্তাকে নিয়েই। কর্মকর্তা আরও কড়া চোখে তাকান। কী বলা হচ্ছে তা তিনি ঠিক বুঝতে পারেন না, আবার তাদের সাথে যোগ দিয়ে রাস্তার চলতি রসিকতায় নিজের দক্ষতা দেখিয়ে এটাও প্রমাণ করতে পারেন না যে তাকে দমানো যাবে না। এই পুরো প্রক্রিয়ায়, কর্মকর্তা প্রায় কিছুই জানতে পারেন না, আর ছেলেরা ধরে নেয় যে এই কর্মকর্তা একটা বিচ্ছিন্ন শক্তি যাকে সহজেই উপেক্ষা করা যায়, এমনকি ঠাট্টাও করা যায়।

    আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, বেশিরভাগ নাগরিকই একজন পুলিশ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে ভালোবাসেন। এতে তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন, গল্প করার একটা বিষয় খুঁজে পান, এবং কর্তৃপক্ষকে তাদের উদ্বেগের কথা জানানোর সুযোগ পান (যার মাধ্যমে তারা সমস্যাটি নিয়ে ‘কিছু একটা করেছেন’—এই ধরনের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অনুভূতি পান)। পায়ে হাঁটা একজন মানুষের কাছে আপনি গাড়িতে থাকা মানুষের চেয়ে সহজে যেতে পারেন এবং তার সাথে স্বচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারেন। তাছাড়া, আপনি যদি কোনো কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগত আলাপের জন্য একপাশে ডেকে নেন, তবে আপনার পরিচয় গোপন রাখাও সহজ হয়। ধরুন, আপনি খবর দিতে চান যে কে হাতব্যাগ চুরি করছে, বা কে আপনাকে একটি চোরাই টিভি কেনার প্রস্তাব দিয়েছে। শহরের ভেতরের এলাকাগুলোতে, অপরাধী সম্ভবত কাছাকাছিই থাকে। পুলিশের একটি চিহ্নিত গাড়ির কাছে হেঁটে গিয়ে জানালার ভেতরে ঝুঁকে কথা বলা মানেই আপনি যে একজন “ইনফর্মার”, তা সবাইকে দেখিয়ে দেওয়া।

    শৃঙ্খলা বজায় রাখার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকার মূল কথা হলো, একটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করা। পুলিশ, বিপুল সম্পদ খরচ না করে, সেই অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বিকল্প হতে পারে না। অন্যদিকে, সেই স্বাভাবিক শক্তিগুলোকে সমর্থন করতে হলে পুলিশকে অবশ্যই তাদের সাথে মানিয়ে চলতে হবে। আর সমস্যাটা ঠিক এখানেই।

    রাস্তায় পুলিশের কার্যকলাপ কি রাষ্ট্রের নিয়মের পরিবর্তে এলাকার সামাজিক রীতি বা মানদণ্ড দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত? গত দুই দশকে, পুলিশের ভূমিকা শৃঙ্খলা-রক্ষা থেকে আইন-প্রয়োগে বদলে যাওয়ায়, তারা ক্রমশ আইনি বিধিনিষেধের আওতায় চলে এসেছে। গণমাধ্যমের অভিযোগ, আদালতের রায় এবং বিভাগীয় আদেশের ফলে এই নিয়মগুলো কার্যকর হয়েছে। এর ফলস্বরূপ, পুলিশের শৃঙ্খলা-রক্ষার কাজগুলো এখন সেইসব নিয়ম দিয়ে চালানো হচ্ছে, যা মূলত সন্দেহভাজন অপরাধীদের সাথে পুলিশের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আমরা মনে করি, এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন ঘটনা।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৪

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৪

    শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিটি শহরেই ‘শহুরে অবক্ষয়’ নামক প্রক্রিয়াটি ঘটে আসছে। কিন্তু আজকের দিনে যা ঘটছে, তা অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে ভিন্ন। প্রথমত, ধরা যাক, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়ে, শহরের বাসিন্দারা—টাকার অভাব, যাতায়াতের অসুবিধা এবং পারিবারিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের কারণে—পাড়ার সমস্যা থেকে সহজে দূরে সরে যেতে পারতেন না। যখন তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতেনও, সেটি সাধারণত গণপরিবহনের পথ ধরেই হতো। কিন্তু এখন, সবচেয়ে দরিদ্র বা যারা জাতিগত বিদ্বেষের কারণে বাধাগ্রস্ত, তাদের ছাড়া বাকি সবার জন্য অন্যত্র চলে যাওয়াটা ব্যতিক্রমীভাবে সহজ হয়ে গেছে। আগের যুগের অপরাধের ঢেউগুলোর মধ্যে এক ধরনের অন্তর্নির্মিত আত্ম-সংশোধন ব্যবস্থা ছিল: একটি পাড়া বা সম্প্রদায়ের তাদের নিজেদের এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার দৃঢ় সংকল্প। শিকাগো, নিউইয়র্ক এবং বস্টনের বিভিন্ন এলাকা অপরাধ এবং গ্যাং-যুদ্ধ দেখেছে, এবং তারপর আবার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে, কারণ যে পরিবারগুলোর অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় ছিল না, তারা রাস্তার উপর নিজেদের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করেছে।

    দ্বিতীয়ত, সেই আগের যুগে পুলিশ সম্প্রদায়ের পক্ষে, কখনও কখনও হিংস্রভাবে, কাজ করে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের এই কাজে সহায়তা করত। পাড়ার মাস্তান বা বখাটেদের শায়েস্তা করা হতো, লোকজনকে ‘সন্দেহের বশে’ বা ভবঘুরে হওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হতো, এবং পতিতা ও ছোটখাটো চোরদের এলাকাছাড়া করা হতো। ‘অধিকার’ ছিল মূলত ভদ্রলোকদের জন্য, এবং হয়তো সেইসব গুরুতর পেশাদার অপরাধীদের জন্য, যারা সহিংসতা এড়িয়ে চলত এবং একজন আইনজীবী রাখার সামর্থ্য রাখত।

    পুলিশের এই ধরনের কার্যকলাপ কোনো ব্যতিক্রম বা মাঝে মাঝে ঘটে যাওয়া বাড়াবাড়ি ছিল না। এই দেশের প্রথম থেকেই, পুলিশের কাজকে প্রাথমিকভাবে একজন নৈশপ্রহরীর ভূমিকার মতো দেখা হতো: শৃঙ্খলার প্রধান হুমকি—আগুন, বন্য প্রাণী এবং অশিষ্ট আচরণ—থেকে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। অপরাধের সমাধান করা পুলিশের দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব হিসেবে দেখা হতো। ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে, আমাদের মধ্যে একজন (উইলসন) একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিখেছিলেন যে কীভাবে পুলিশের ভূমিকা ধীরে ধীরে শৃঙ্খলা রক্ষা থেকে অপরাধ দমনে পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তন শুরু হয়েছিল ব্যক্তিগত গোয়েন্দাদের (প্রায়শই প্রাক্তন অপরাধী) আবির্ভাবের মাধ্যমে, যারা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য কাজের সাফল্যের উপর নির্ভরশীল পারিশ্রমিকের ভিত্তিতে কাজ করত। সময়ের সাথে সাথে, এই গোয়েন্দারা পৌরসভার পুলিশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং নিয়মিত বেতন পেতে শুরু করে; একই সাথে, চোরদের বিরুদ্ধে মামলা করার দায়িত্ব ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ নাগরিকের হাত থেকে পেশাদার আইনজীবীর হাতে চলে যায়। বিংশ শতাব্দীর আগে বেশিরভাগ জায়গায় এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয়নি।

    ১৯৬০-এর দশকে, যখন শহুরে দাঙ্গা একটি বড় সমস্যা ছিল, তখন সমাজ বিজ্ঞানীরা পুলিশের শৃঙ্খলা-রক্ষার ভূমিকাটি সাবধানে খতিয়ে দেখতে শুরু করেন এবং এটিকে উন্নত করার উপায় প্রস্তাব করতে থাকেন—রাস্তাকে নিরাপদ করার (যা এর আসল কাজ ছিল) উদ্দেশ্যে নয়, বরং গণসহিংসতার ঘটনা কমানোর জন্য। শৃঙ্খলা-রক্ষা কিছুটা হলেও ‘গণসম্পর্ক’-এর সমার্থক হয়ে ওঠে। কিন্তু, ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে যে অপরাধের ঢেউ শুরু হয়েছিল, তা বিন্দুমাত্র না কমে পুরো দশক এবং ১৯৭০-এর দশক জুড়ে চলতে থাকায়, পুলিশের ভূমিকার কেন্দ্রবিন্দু অপরাধ-দমনকারী হিসেবে। পুলিশের আচরণ নিয়ে গবেষণা তখন আর শৃঙ্খলা-রক্ষার বর্ণনা না হয়ে, বরং এমন উপায় প্রস্তাব ও পরীক্ষা করার চেষ্টায় পরিণত হলো যার মাধ্যমে পুলিশ আরও বেশি অপরাধের সমাধান করতে পারে, আরও বেশি গ্রেপ্তার করতে পারে এবং আরও ভালো প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারে। সমাজ বিজ্ঞানীরা ধরে নিয়েছিলেন, এই কাজগুলো করা গেলে নাগরিকদের ভয় কমে যাবে।

    এই পরিবর্তনের সময় অনেক কিছুই সাধিত হয়েছিল, কারণ পুলিশ প্রধান এবং বাইরের বিশেষজ্ঞরা উভয়েই তাদের পরিকল্পনায়, সম্পদের বণ্টনে এবং কর্মী মানোন্নয়নে অপরাধ-দমনের ভূমিকার উপর জোর দিয়েছিলেন। এর ফলে পুলিশ হয়তো আরও ভালো অপরাধ-দমনকারী হয়ে উঠেছিল। এবং সন্দেহ নেই যে তারা শৃঙ্খলার প্রতি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন ছিল। কিন্তু শৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ প্রতিরোধের মধ্যে যে সংযোগ, যা আগের প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল, তা বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল।

    এই সংযোগটি সেই প্রক্রিয়ার মতোই, যার মাধ্যমে একটি ভাঙা জানালা থেকে অনেকগুলো জানালা ভেঙে যায়। যে নাগরিক একজন দুর্গন্ধযুক্ত মাতাল, একদল হট্টগোলকারী কিশোর বা একজন নাছোড়বান্দা ভিক্ষুককে ভয় পান, তিনি কেবল অশালীন আচরণের প্রতি তার বিরক্তি প্রকাশ করছেন না; তিনি আসলে একটি লোকজ্ঞানেরও প্রকাশ ঘটাচ্ছেন যা একটি সঠিক সাধারণীকরণ—আর তা হলো, গুরুতর রাস্তার অপরাধ সেইসব এলাকাতেই ফুলেফেঁপে ওঠে যেখানে বিশৃঙ্খল আচরণকে বিনা বাধায় চলতে দেওয়া হয়। এই নিয়ন্ত্রণহীন ভিক্ষুকই হলো, কার্যত, প্রথম ভাঙা জানালা। ছিনতাইকারী এবং ডাকাতরা, তারা সুযোগসন্ধানী হোক বা পেশাদার, বিশ্বাস করে যে যদি তারা এমন রাস্তায় কাজ করে যেখানে সম্ভাব্য শিকাররা ইতিমধ্যেই বিরাজমান পরিস্থিতিতে ভীতসন্ত্রস্ত, তবে তাদের ধরা পড়ার বা এমনকি শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়। চোর যুক্তি দিতে পারে, যদি পাড়াটি একজন বিরক্তিকর ভিক্ষুককে পথচারীদের বিরক্ত করা থেকে আটকাতে না পারে, তাহলে সম্ভাব্য ছিনতাইকারীকে শনাক্ত করতে পুলিশকে ডাকার বা ছিনতাইয়ের সময় হস্তক্ষেপ করার সম্ভাবনা আরও কম।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ৩

    ভাঙা জানালা – পর্ব ৩

    এই পর্যায়ে এসে যে গুরুতর অপরাধ বাড়বেই বা অপরিচিতদের উপর হিংস্র আক্রমণ ঘটবেই, তা কিন্তু অবশ্যম্ভাবী নয়। কিন্তু এলাকার অনেক বাসিন্দা ভাবতে শুরু করেন যে অপরাধ, বিশেষ করে সহিংস অপরাধ, বাড়ছে এবং সেই অনুযায়ী তারা নিজেদের আচরণেও পরিবর্তন আনেন। তারা আগের চেয়ে কম রাস্তায় বের হন, এবং যখন বের হন, তখন অন্যদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন; তাদের চোখ থাকে অবনত, ঠোঁটে থাকে নীরবতা আর পদক্ষেপ হয় দ্রুত। “কারো ব্যাপারে নাক গলাতে নেই”—এই মনোভাব তৈরি হয়। কিছু বাসিন্দার জন্য, সমাজের এই ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না, কারণ এই পাড়াটি তাদের ‘ঘর’ নয়, কেবল ‘থাকার জায়গা’। তাদের আগ্রহ অন্যত্র; তারা cosmopolitan বা বিশ্বনাগরিক। কিন্তু অন্য অনেকের জন্য এটি বিরাট প্রভাব ফেলে, যাদের জীবনের অর্থ ও তৃপ্তি আসে বৈশ্বিক সংশ্লিষ্টতার চেয়ে স্থানীয় সম্পর্কের বাঁধন থেকে; তাদের কাছে, পাড়াটার অস্তিত্ব আর থাকে না, কেবল কয়েকজন নির্ভরযোগ্য বন্ধুর সঙ্গেই যা একটু দেখা-সাক্ষাৎ হয়।

    এমন একটি এলাকা অপরাধীদের অনুপ্রবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। যদিও এটা ঘটবেই এমন নয়, কিন্তু সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। যেসব জায়গায় মানুষ নিজেদের অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনসাধারণের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে বলে আত্মবিশ্বাসী, তাদের তুলনায় এই দুর্বল এলাকাগুলোতেই মাদক হাতবদল হয়, পতিতারা খদ্দের খোঁজে এবং রাস্তায় রাখা গাড়ির যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যায়। এখানে মাতালদেরকে হয়তো কিশোররা নিছক মজার ছলে ছিনতাই করে, আবার পতিতাদের খদ্দেরদেরকে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং সম্ভবত হিংস্রভাবেও ছিনতাই করে; এমনকি পথচারীদের থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের ঘটনাও ঘটে।

    যারা এই ধরনের পরিস্থিতি থেকে সহজে সরে যেতে পারেন না, তাদের মধ্যে বয়স্ক মানুষেরা অন্যতম। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, বয়স্কদের অপরাধের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা তরুণদের চেয়ে অনেক কম। এর থেকে কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, বয়স্কদের মধ্যে অপরাধ নিয়ে যে সুপরিচিত ভীতি রয়েছে, তা আসলে অতিরঞ্জিত। তারা মনে করেন, বয়স্কদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ কোনো কর্মসূচির প্রয়োজন নেই; বরং তাদের এই ভুল ভয় থেকে বের করে আনার চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু এই যুক্তিটি মূল বিষয়টিকে এড়িয়ে যায়। একজন অরক্ষিত মানুষের জন্য, এক উদ্ধত কিশোর বা এক মাতাল ভিক্ষুকের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা, একজন প্রকৃত ডাকাতের মুখোমুখি হওয়ার মতোই ভয়ের। আসলে, একজন অরক্ষিত মানুষের কাছে এই দুই ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য করা প্রায়শই অসম্ভব। তাছাড়া, বয়স্করা যে কম অপরাধের শিকার হন, তার কারণ হলো তারা নিজেদের সুরক্ষার জন্য ইতিমধ্যেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছেন—যার মধ্যে প্রধান হলো তালাবদ্ধ দরজার পিছনে থাকা। তরুণরা বয়স্ক মহিলাদের চেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার হয়, তার কারণ এই নয় যে তারা সহজ বা লাভজনক লক্ষ্য, বরং কারণ তারা রাস্তায় বেশি সময় কাটায়।

    বিশৃঙ্খলা এবং ভয়ের মধ্যেকার এই সম্পর্ক যে কেবল বয়স্করাই অনুভব করেন, তা নয়। হার্ভার্ড ল স্কুলের সুসান এস্ট্রিচ সম্প্রতি মানুষের ভয়ের উৎস নিয়ে বেশ কয়েকটি সমীক্ষার তথ্য জড়ো করেছেন। ওরেগনের পোর্টল্যান্ডে করা একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাক্ষাৎকার দেওয়া তিন-চতুর্থাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ একদল কিশোরকে দেখলে রাস্তা পার হয়ে অন্য দিকে চলে যান। বাল্টিমোরের আরেকটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মানুষ এমনকি একজন অচেনা যুবককে এড়াতেও রাস্তা পার হন। যখন একজন সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী একটি আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসা করেন যে সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গা কোনটি, তারা এমন একটি জায়গার কথা উল্লেখ করেন যেখানে তরুণেরা মদ্যপান এবং গান-বাজনার জন্য জড়ো হয়, যদিও সেখানে একটিও অপরাধ ঘটেনি। বস্টনের সরকারি আবাসন প্রকল্পগুলিতে সবচেয়ে বেশি ভয় প্রকাশ করেছেন সেইসব ভবনের বাসিন্দারা, যেখানে অপরাধ নয়, বরং বিশৃঙ্খলা এবং অসভ্যতা ছিল সবচেয়ে বেশি। এই তথ্য জানলে সাবওয়ের দেওয়াল-লিখনের মতো আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ বিষয়গুলোর তাৎপর্য বোঝা সহজ হয়। নাথান গ্লেজারের ভাষায়, দেওয়াল-লিখনের বিস্তার, এমনকি তা অশ্লীল না হলেও, সাবওয়ের যাত্রীকে এই “অপরিহার্য জ্ঞানের” মুখোমুখি করে যে, যে পরিবেশে তাকে দিনে এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় কাটাতে হয়, তা অনিয়ন্ত্রিত এবং নিয়ন্ত্রণহীন, এবং যে কেউ এতে প্রবেশ করে মনের খেয়ালখুশিমতো যেকোনো ক্ষতি বা অনাসৃষ্টি করতে পারে।

    ভয়ের প্রতিক্রিয়ায়, মানুষ একে অপরকে এড়িয়ে চলে, যা সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে দেয়। কখনও কখনও তারা পুলিশকে ফোন করে। পুলিশের টহল গাড়ি আসে, মাঝে মাঝে দু-একটি গ্রেপ্তারও হয়, কিন্তু অপরাধ চলতেই থাকে এবং বিশৃঙ্খলারও কোনো উপশম হয় না। নাগরিকরা পুলিশ প্রধানের কাছে অভিযোগ করেন, কিন্তু তিনি ব্যাখ্যা দেন যে তার বিভাগে কর্মীর অভাব এবং আদালত ছোটখাটো বা প্রথমবারের অপরাধীদের শাস্তি দেয় না। বাসিন্দাদের কাছে, টহল গাড়িতে আসা পুলিশ হয় অকার্যকর বা উদাসীন; আবার পুলিশের কাছে, এই বাসিন্দারা হলো পশুর মতো, যারা একে অপরের যোগ্য। শীঘ্রই নাগরিকরা পুলিশকে ফোন করা বন্ধ করে দেয়, কারণ তাদের মনে হয়, “ওদের দিয়ে কিছুই হবে না।”

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ২

    ভাঙা জানালা – পর্ব ২

    রাস্তার লোকগুলো ছিল মূলত কৃষ্ণাঙ্গ; আর যে অফিসার রাস্তায় টহল দিতেন তিনি ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। মানুষগুলো বিভক্ত ছিল “নিয়মিত” এবং “অপরিচিত”-দের মধ্যে। নিয়মিতদের মধ্যে “ভদ্রস্থ লোক” এবং কিছু মাতাল ও ভবঘুরে উভয়ই ছিল, যারা সবসময় সেখানেই থাকতো কিন্তু নিজেদের “সীমা” জানত। অপরিচিত মানে অপরিচিত, এবং তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হতো, কখনও কখনও উদ্বেগের সাথেও। সেই অফিসার—ধরা যাক তার নাম কেলি—জানতেন কারা নিয়মিত, এবং তারাও তাকে চিনত।

    কেলি তার কাজকে যেভাবে দেখতেন: তা হলো অপরিচিতদের ওপর নজর রাখা এবং এটা নিশ্চিত করা যে অশিষ্ট নিয়মিতরা কিছু অলিখিত কিন্তু ব্যাপকভাবে প্রচলিত নিয়ম মেনে চলে। মাতাল এবং মাদকাসক্তরা বাড়ির সামনের সিঁড়িতে বসতে পারত, কিন্তু শুয়ে যেতে পারবে না। মানুষজন পাশের গলিতে মদ্যপান করতে পারবে, কিন্তু প্রধান মোড়ে নয়। মদের বোতল কাগজের ব্যাগে রাখতে হবে। বাস স্টপে অপেক্ষারত মানুষের সাথে কথা বলা, তাদের বিরক্ত করা বা ভিক্ষা করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ । যদি কোনো ব্যবসায়ী এবং গ্রাহকের মধ্যে বিবাদ হতো, তবে ব্যবসায়ীকে সঠিক বলে ধরে নেওয়া হতো, বিশেষ করে যদি গ্রাহক অপরিচিত হতেন। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাঘুরি করলে, কেলি তাকে জিজ্ঞেস করতেন তার কোনো আয়ের উৎস আছে কি না এবং সে কী করে; যদি সে সন্তোষজনক উত্তর না দিত, তবে তাকে তার পথে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। যারা এই অলিখিত নিয়ম ভঙ্গ করত, বিশেষ করে যারা বাস স্টপে অপেক্ষারত লোকদের বিরক্ত করত, তাদের ভবঘুরে হিসেবে গ্রেপ্তার করা হতো। গোলমালকারী কিশোর-কিশোরীদের চুপ থাকতে বলা হতো।

    এই নিয়মগুলো রাস্তার “নিয়মিত” লোকদের সহযোগিতায় প্রচলিত এবং প্রয়োগ করা হতো। অন্য কোনো এলাকার নিয়ম হয়তো ভিন্ন হতে পারত, কিন্তু সবাই বুঝত যে এগুলোই এই এলাকার নিয়ম। যদি কেউ সেগুলো লঙ্ঘন করত, তবে নিয়মিতরা কেবল কেলির কাছে সাহায্যের জন্যই যেত না, বরং লঙ্ঘনকারীকে উপহাসও করত। কখনও কখনও কেলি যা করতেন তা “আইন প্রয়োগ” হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে, কিন্তু প্রায়শই তিনি অনানুষ্ঠানিক বা আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ নিতেন, যা এলাকার মানুষজন নিজেদের জন্য যে জনশৃঙ্খলা স্থির করেছিল, তা রক্ষা করতে সাহায্য করত। তার করা কিছু কাজ সম্ভবত আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে টিকত না।

    একজন দৃঢ় সংশয়বাদী হয়তো স্বীকার করবেন যে একজন দক্ষ ফুট-প্যাট্রোল অফিসার শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারেন, কিন্তু তারপরেও জোর দিয়ে বলবেন যে এই ধরনের “শৃঙ্খলার” সাথে সমাজের ভয়ের আসল উৎসের—অর্থাৎ, গুরুতর অপরাধের—তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। একদিক দিয়ে দেখলে, এটা সত্যি। কিন্তু দুটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখতে হবে। প্রথমত, বাইরের পর্যবেক্ষকদের এটা ধরে নেওয়া উচিত নয় যে তারা জানেন, বড় শহরের অনেক এলাকার endemic উদ্বেগের কতটা “আসল” অপরাধের ভয় থেকে আসে এবং কতটা আসে রাস্তার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি থেকে, যা বিরক্তিকর ও উদ্বেগজনক অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। নিউয়ার্কের মানুষ, তাদের আচরণ এবং সাক্ষাৎকারে দেওয়া মন্তব্য থেকে বিচার করলে, জনশৃঙ্খলাকে অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করে এবং পুলিশ যখন সেই শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে তখন তারা স্বস্তি ও reassurance বোধ করে।

    দ্বিতীয়ত, সামাজিক স্তরে, বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধ সাধারণত এক ধরনের ক্রমবিকাশের ধারায় একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। সমাজ মনোবিজ্ঞানী এবং পুলিশ কর্মকর্তারা প্রায়শই একমত হন যে যদি কোনো বিল্ডিংয়ের একটি জানালা ভেঙে যায় এবং তা মেরামত না করা হয়, তবে শীঘ্রই বাকি সব জানালাও ভেঙে যাবে। এই কথাটি যেমন অভিজাত এলাকার জন্য সত্য, তেমনই জরাজীর্ণ এলাকার জন্যও সত্য। জানালা ভাঙার ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটে না কারণ কিছু এলাকায় জানালা ভাঙার প্রবণতাসম্পন্ন লোক বাস করে আর অন্য এলাকায় জানালা-প্রেমী লোক বাস করে; বরং, একটি ভাঙা এবং অমেরামতকৃত জানালা এই সংকেত দেয় যে “কেউ পরোয়া করে না,” এবং তাই আরও জানালা ভাঙলে কোনো ক্ষতি নেই। (কারণ এটা বরাবরই মজার।)

    স্ট্যানফোর্ডের মনোবিজ্ঞানী ফিলিপ জিম্বারডো ১৯৬৯ সালে “ভাঙা জানালা তত্ত্ব” (broken-windows theory) পরীক্ষা করার জন্য কিছু গবেষণার কথা জানান। তিনি নম্বর প্লেট ছাড়া একটি গাড়িকে হুড খোলা অবস্থায় ব্রঙ্কসের একটি রাস্তায় এবং একই ধরনের আরেকটি গাড়িকে ক্যালিফোর্নিয়ার পালো অল্টোর একটি রাস্তায় পার্ক করিয়ে রাখেন। ব্রঙ্কসের গাড়িটি “পরিত্যক্ত” হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই “দুষ্কৃতকারীদের” দ্বারা আক্রান্ত হয়। প্রথমে যারা এসেছিল তারা ছিল একটি পরিবার—বাবা, মা এবং ছোট ছেলে—যারা গাড়ির রেডিয়েটর এবং ব্যাটারি খুলে নিয়ে যায়। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে, গাড়ির প্রায় সমস্ত মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। এরপর শুরু হয় যথেচ্ছ ধ্বংসযজ্ঞ—জানালা ভেঙে ফেলা হয়, যন্ত্রাংশ ছিঁড়ে নেওয়া হয়, সিটের গদি ছিঁড়ে ফেলা হয়। বাচ্চারা গাড়িটিকে খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। প্রাপ্তবয়স্ক “দুষ্কৃতকারীদের” অধিকাংশই ছিল সুসজ্জিত, পরিপাটি চেহারার শ্বেতাঙ্গ। পালো অল্টোর গাড়িটি এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অক্ষত অবস্থায় পড়ে ছিল। তারপর জিম্বারডো নিজে একটি হাতুড়ি দিয়ে গাড়িটির একটি অংশ ভেঙে দেন। শীঘ্রই, পথচারীরাও সেই কাজে যোগ দিতে শুরু করে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে গাড়িটিকে উল্টে দেওয়া হয় এবং সম্পূর্ণ ধ্বংস করে ফেলা হয়। এক্ষেত্রেও “দুষ্কৃতকারীরা” ছিল মূলত respectable শ্বেতাঙ্গ।

    অযত্নে পড়ে থাকা সম্পত্তি মজা বা লুটের জন্য বের হওয়া মানুষদের কাছে সহজ শিকারে পরিণত হয়; এমনকি এমন লোকেরাও এতে অংশ নেয় যারা সাধারণত এমন কাজ করার স্বপ্নও দেখে না এবং সম্ভবত নিজেদের আইন মেনে চলা নাগরিক হিসেবেই মনে করে। ব্রঙ্কসের সামাজিক জীবনের প্রকৃতির কারণে—যেমন সেখানকার পরিচয়হীনতা, প্রায়শই গাড়ি পরিত্যক্ত হওয়া এবং জিনিসপত্র চুরি বা ভাঙার ঘটনা, এবং “কেউ পরোয়া করে না” এই অতীত অভিজ্ঞতা—সেখানে ভাঙচুর অনেক দ্রুত শুরু হয়। কিন্তু রক্ষণশীল পালো অল্টো, যেখানে মানুষের বিশ্বাস জন্মেছে যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির যত্ন নেওয়া হয় এবং দুষ্টুমি করলে তার ফল ভুগতে হয়, সেখানে এমনটা হয় না। কিন্তু সাম্প্রদায়িক বাধা—পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সভ্য আচরণের দায়বদ্ধতা—যখন “কেউ পরোয়া করে না” এমন সংকেত দেওয়া কাজের মাধ্যমে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন যেকোনো জায়গাতেই ভাঙচুর ঘটতে পারে।

    আমরা মনে করি যে “উপেক্ষিত” আচরণও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়। একটি স্থিতিশীল এলাকা, যেখানে পরিবারগুলো তাদের বাড়ির যত্ন নেয়, একে অপরের সন্তানদের খেয়াল রাখে এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশকারীদের বাধা দেয়, তা কয়েক বছরের মধ্যে, এমনকি কয়েক মাসের মধ্যেই, একটি প্রতিকূল এবং ভীতিকর জঙ্গলে পরিণত হতে পারে। একটি সম্পত্তি পরিত্যক্ত হয়, আগাছা গজায়, একটি জানালা ভেঙে যায়। প্রাপ্তবয়স্করা উচ্ছৃঙ্খল শিশুদের বকাঝকা করা বন্ধ করে দেয়; শিশুরা সাহস পেয়ে আরও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে ওঠে। পরিবারগুলো এলাকা ছেড়ে চলে যায়, নিঃসঙ্গ প্রাপ্তবয়স্করা এসে বসবাস শুরু করে। কিশোর-কিশোরীরা কোণার দোকানের সামনে জড়ো হয়। দোকানদার তাদের সরে যেতে বললে তারা অস্বীকার করে। মারামারি হয়। আবর্জনা জমতে থাকে। লোকেরা মুদি দোকানের সামনে মদ্যপান শুরু করে; একসময়, কোনো মাতাল ফুটপাতে পড়ে ঘুমিয়ে থাকে এবং তাকে সেই অবস্থাতেই থাকতে দেওয়া হয়। পথচারীরা ভিক্ষুকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়।

  • ভাঙা জানালা – পর্ব ১

    ভাঙা জানালা – পর্ব ১

    ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি, নিউ জার্সি রাজ্য আঠাশটি শহরে জীবনের মান উন্নত করার লক্ষ্যে “নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন প্রতিবেশ কর্মসূচি” (Safe and Clean Neighborhoods Program) ঘোষণা করে। এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে, রাজ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের টহল গাড়ি থেকে বের করে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য শহরগুলোকে অর্থ প্রদান করে। গভর্নর এবং অন্যান্য রাজ্যের কর্মকর্তারা অপরাধ কমানোর একটি উপায় হিসেবে পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার বিষয়ে বেশ উৎসাহী থাকলেও, অনেক পুলিশ প্রধানই এ বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। তাদের দৃষ্টিতে, পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার পদ্ধতিটি অনেকটাই অচল বলে প্রমাণিত হয়েছিল। এটি পুলিশের গতিশীলতা কমিয়ে দিত, ফলে নাগরিকদের সেবার আহ্বানে সাড়া দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত এবং টহলরত কর্মকর্তাদের ওপর সদর দফতরের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যেত।

    অনেক পুলিশ কর্মকর্তাও পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া পছন্দ করতেন না, তবে তার কারণ ছিল ভিন্ন: এটি ছিল বেশ পরিশ্রমের কাজ, কনকনে ঠান্ডা বা বৃষ্টির রাতেও তাদের বাইরে থাকতে হতো এবং এর ফলে বড় কোনো অপরাধী ধরার সম্ভাবনা কমে যেত। কোনো কোনো বিভাগে, কর্মকর্তাদের পায়ে হেঁটে টহলের দায়িত্ব দেওয়াকে এক ধরনের শাস্তি হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। এমনকি, পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করা শিক্ষাবিদরাও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে পায়ে হেঁটে টহল অপরাধের হারে আদৌ কোনো প্রভাব ফেলবে কি না। অধিকাংশের মতে, এটি ছিল জনমতকে শান্ত রাখার জন্য একটি লোকদেখানো কৌশল মাত্র। কিন্তু যেহেতু রাজ্য এর জন্য অর্থ প্রদান করছিল, তাই স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।

    কর্মসূচি শুরু হওয়ার পাঁচ বছর পর, ওয়াশিংটন ডিসি-র পুলিশ ফাউন্ডেশন পায়ে হেঁটে টহল প্রকল্পের একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করে। মূলত নিউয়ার্কে পরিচালিত একটি নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষার বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে ফাউন্ডেশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, পায়ে হেঁটে টহল অপরাধের হার কমাতে পারেনি, যা প্রায় কেউই অপ্রত্যাশিত মনে করেনি। কিন্তু পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া এলাকাগুলোর বাসিন্দারা অন্য এলাকার মানুষের তুলনায় বেশি নিরাপদ বোধ করতেন, তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে অপরাধ কমেছে এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্য কম পদক্ষেপ নিতেন (যেমন, দরজা বন্ধ করে বাড়িতে থাকা)। অধিকন্তু, পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া এলাকাগুলোর নাগরিকদের পুলিশের প্রতি মনোভাব অন্য এলাকার বাসিন্দাদের চেয়ে বেশি অনুকূল ছিল। এবং টহল গাড়িতে থাকা কর্মকর্তাদের তুলনায়, যারা পায়ে হেঁটে টহল দিতেন, তাদের মনোবল, কর্মসন্তুষ্টি এবং নিজেদের এলাকার নাগরিকদের প্রতি মনোভাব অনেক উন্নত ছিল।

    এই ফলাফলগুলোকে হয়তো প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে যে সন্দিহান ব্যক্তিরাই সঠিক ছিলেন—পায়ে হেঁটে টহলের অপরাধের ওপর কোনো প্রভাব নেই; এটি কেবল নাগরিকদের বোকা বানিয়ে অনুভব করায় যে তারা আরও নিরাপদ। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিতে, এবং পুলিশ ফাউন্ডেশনের গবেষণার লেখকদের (যাদের মধ্যে কেলিং একজন ছিলেন) দৃষ্টিতে, নিউয়ার্কের নাগরিকরা মোটেও বোকা বনেননি। তারা জানতেন পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তারা কী করছেন, তারা জানতেন যে এটি গাড়িতে থাকা কর্মকর্তাদের কাজ থেকে ভিন্ন, এবং তারা এটাও জানতেন যে কর্মকর্তাদের পায়ে হেঁটে টহল দেওয়াটা তাদের এলাকাকে আরও নিরাপদ করে তুলেছিল।

    কিন্তু অপরাধের হার না কমে—এমনকি বেড়ে যাওয়ার পরেও—একটি এলাকা কীভাবে “নিরাপদ” হতে পারে? এর উত্তর খুঁজে পেতে হলে প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে যে প্রকাশ্য স্থানে মানুষ সাধারণত কিসে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। অনেক নাগরিকই অবশ্যই প্রাথমিকভাবে অপরাধকে ভয় পান, বিশেষ করে কোনো অপরিচিত ব্যক্তির দ্বারা আকস্মিক, হিংস্র আক্রমণের শিকার হওয়াকে। এই ঝুঁকি নিউয়ার্কের মতো অনেক বড় শহরেই অত্যন্ত বাস্তব। কিন্তু আমরা ভয়ের আরেকটি উৎসকে উপেক্ষা করি বা ভুলে যাই—তা হলো বিশৃঙ্খল লোকদের দ্বারা বিরক্ত হওয়ার ভয়। এরা হিংস্র লোক নয়, বা অপরিহার্যভাবে অপরাধীও নয়, বরং এরা হলো অশিষ্ট, উগ্র বা খামখেয়ালি স্বভাবের লোক: যেমন ভিক্ষুক, মাতাল, মাদকাসক্ত, উচ্ছৃঙ্খল কিশোর-কিশোরী, পতিতা, ভবঘুরে এবং মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তিরা।

    পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তারা যা করতেন তা হলো, নিজেদের সাধ্যমতো এই এলাকাগুলোতে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। যদিও এলাকাগুলো ছিল মূলত কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত এবং টহলরত পুলিশ কর্মকর্তারা ছিলেন মূলত শ্বেতাঙ্গ, পুলিশের এই “শৃঙ্খলা-রক্ষার” কাজটি উভয় পক্ষের সাধারণ সন্তুষ্টির সাথেই সম্পাদিত হতো। আমাদের মধ্যে একজন (কেলিং) নিউয়ার্কের পায়ে হেঁটে টহল দেওয়া কর্মকর্তাদের সাথে বহু ঘণ্টা হেঁটে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে তারা কীভাবে “শৃঙ্খলা”কে সংজ্ঞায়িত করতেন এবং তা বজায় রাখতে কী করতেন। একটি টহল এলাকা ছিল বেশ সাধারণ: নিউয়ার্কের কেন্দ্রস্থলে একটি ব্যস্ত কিন্তু জরাজীর্ণ এলাকা, যেখানে অনেক পরিত্যক্ত ভবন, প্রান্তিক দোকান (যার কয়েকটিতে জানালায় ছুরি এবং ক্ষুর স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করা ছিল), একটি বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, একটি ট্রেন স্টেশন ও কয়েকটি প্রধান বাস স্টপ ছিল।

    যদিও এলাকাটি জরাজীর্ণ ছিল, এর রাস্তাগুলো লোকে লোকারণ্য থাকতো, কারণ এটি ছিল একটি প্রধান পরিবহন কেন্দ্র। এই এলাকার “শৃঙ্খলা” কেবল সেখানে যারা বাস করতেন এবং কাজ করতেন তাদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং আরও অনেকের জন্যেও ছিল, যাদের বাড়ি, সুপারমার্কেট বা কারখানায় যাওয়ার পথে এর মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে হতো।