বেশ ক’বছর ধরে ভেবে রেখেছি হাইকিং করতে যাব। ১২ অগাস্ট, ২০২৩ এ সে সুযোগ এসে গেলো। প্রতিবেশী সান্তোজ জানালো হুক মাউন্টেইন এ হাইকিং করতে যেতে চায়, আমি যাবো কিনা। আমি আমার বন্ধু কামিলাকে জানাতে সে রাজী হয়ে গেলো। আমরা চারজনের টিম মিলে রওয়ানা দিলাম সকাল আটটায়। আধা ঘণ্টার ড্রাইভিং শেষে হুক মাউন্টেইন এর পাদদেশে পৌছালাম। সেখানে গাড়ি রেখে হাঁটা শুরু করতে হয়।


প্রথমে যে জিনিসটা অবাক করলো সেটা হচ্ছে নায়াক বীচের ভাস্কর্য, গুগল ম্যাপে ছবি দেখে ভেবেছিলাম বেশ বড়সড় কিছু একটা হবে। গিয়ে দেখি প্রমাণ সাইজের। মানে দেড় মানুষ সমান উঁচু। তবে বীচে বালিয়াড়ি নেই তেমন, মানে বসার জন্য বেঞ্চি দেয়া আছে অথবা হাডসন নদী তীরে বসার মতো প্রচুর জায়গা আছে। শুধুমাত্র হাডসন নদীতীরে বসার জন্য যেহেতু এতদূর আসা হয়নি তাই পর্বত আরোহণে মনযোগী হলাম।


বুনো গাছগাছালি ভেতর দিয়ে আমরা ট্রেইল ধরে উঠতে থাকলাম উপরে। যেকোনো পাহাড়ি ট্রেইলের মতো এই ট্রেইল ও আঁকাবাঁকা। সবদিকে একই রকম দেখতে ট্রেইল, বিশাল পর্বতে কেউ যাতে পথ হারিয়ে না ফেলে এজন্য গাছে সবুজ বর্গাকার মার্কিং দেয়া আছে। এই মার্কিং এর আইডিয়া চমৎকার লেগেছে। শুধুমাত্র এই মার্কিং এর কারণে ৬ মাইল দীর্ঘ ট্রেইলে এক বারের জন্য ও পথ হারাইনি।


হুক মাউন্টেইনে চেনা অচেনা নানা রকম গাছগাছালির সমাহার হলেও তেমন কোনো বুনো ফলের গাছ চোখে পরেনি। সীতাকুন্ডের ইকোপার্কেও এই ব্যাপারটি চোখে পরেছে। পর্বতে কী বুনো ফলের গাছ ইচ্ছে করেই বাড়তে দেয়া না হয় যাতে করে নতুন একটা খাদ্যশৃঙ্খল গড়ে না উঠে যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে? যেমন বুনো ফল খেতে পাখি, কাটবেড়ালী আসবে, আবার পাখি খেতে সাপ, শেয়ালের মতো শ্বাপদ জন্মাবে, সেগুলো খেতে বড় বাঘ সিংহ এধরণের প্রানী আসবে, ব্যাপারটা ঠিক এমন কিনা সিউর না। তবে ট্রেইলের ধারে বুনো বেরির গাছ থাকলে মন্দ হতোনা।


আঁকাবাঁকা পথ ধরে এগুতো এগুতে কিছু পুরনো স্থাপনা চোখে পরল। সেগুলো একসময় বরফ সংগ্রহের জন্য ব্যবহৃত হতো। সেসময়ের কথা বলছি যখন ফ্রিজ আবিষ্কার হয়নি। পুরনো স্থাপনা কত পুরনো? এই ধরুন এখন শুধু পাথুরে দেয়ালগুলো অবশিষ্ট আছে। এরকম বড়ছোট অনেক গুলো দেয়াল আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ট্রেইলকে হাইকারদের জন্য আকর্ষনীয় করে তুলেছে। শুধুমাত্র পাথুরে দেয়াল ছাড়া পথে বেশ কিছু বড় মরা গাছ পরে পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল, যেগুলোতে অনেক ফাঙ্গাস জন্মায়। আগেই বলেছি এখানে বেশকিছু চেনা অচেনা উদ্ভিদের দেখা মিলেছে। তার অনেকগুলোই সেই পুরনো শ্যাওলা ধরা গাছের গুড়ির আশেপাশে। বেশ কিছু হলদে ঘাসফুল দেখেছি, আর ছিল নরম কার্পেটের মতো ভেজা ঘাস। এই দেখতে দেখতে আমরা উঠে গেলাম চুড়ায়।


চুড়ায় চাতালের মতো স্থানে সবাই চেক-ইন করে, যাদের উচ্চতা নিয়ে ভীতি আছে আমার মতো তারা দুর থেকে চাতালের পাশ দিয়ে নিচে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে একেবারে খাঁড়া ক্লিপের ধার। কোনভাবে পা হড়কালে একেবারে প্রপাত ধরণী তল, কমপক্ষে দশ সেকেন্ড লাগবে নিজেকে হিউম্যান স্মুথি হিসেবে নিচে আবিষ্কার করতে। তবে সেই দশ সেকেন্ড আপনার জীবনের দীর্ঘ দশ সেকেন্ড হবে কিনা সেই অভিজ্ঞতা হয়নি আমার। চাতাল থেকেই দেখা মিলল ঈগল পাখির, পাখির হিসেবে যদি সে আকাশে উড়ছে, কিন্তু চাতাল থেকে দেখলে তাদের বেশ নিচুতে মনে হয়। দেখতে দেখতে অবশ্য ছবি তুলতে পারিনি পাখির, উঠার সময় এবং নাম্বার সময় দুবার হরিণের দেখা মিলেছিল। তার ছবিও তুলতে পারিনি। চাতাল থেকে আশেপাশের পাহাড়, নদী, নদীর ওপাড়ের বিলাসবহুল ম্যানশন দেখতে বেশ লাগে।


চাতালে বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা নিচে নামা শুরু করলাম। এই ট্রেইলের একটা মজার দিক হচ্ছে, যাওয়ার সময় আবার ফিরতি পথ ধরতে হয়না। ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে চুড়া, আবার চুড়া থেকে নামতে নামতে আপনি যেখান থেকে শুরু করেছেন সেখানে পৌঁছতে পারবেন। প্রায় চারঘন্টা লেগেছিল পুরো পথ শেষ করতে যদিও, পার্ক রেঞ্জার জানিয়েছিল দুই ঘণ্টায় শেষ করা সম্ভব। একেবারে শেষ করছি নায়াক গ্রামের চমৎকার একটি কফিশপের নাম নিয়ে। থরে থরে সাজানো খাবার দেখে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারিনি। একটা প্রেস্টি কিনলাম, আর সান্তোজ নিলো গাজরের কেক। প্রেস্ট্রির স্বাদ ছিল মুখে লেগে থাকার মতো।


