ভাঙা জানালা – পর্ব ৮

অনেক সময় দেখা যায়, ছোট শহরের বাসিন্দারা বড় শহরের একই রকম এলাকার বাসিন্দাদের তুলনায় তাদের পুলিশের কাজে বেশি সন্তুষ্ট থাকে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে তাদের মানসিকতা। তারা হয়তো ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার চেয়েও একটি গোষ্ঠীর বা সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির গবেষক এলিনর অস্ট্রোম এবং তার সহকর্মীরা এই বিষয়টি নিয়ে একটি চমৎকার গবেষণা করেন। তারা ইলিনয় রাজ্যের দুটি দরিদ্র ও সম্পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত ছোট শহর (ফিনিক্স এবং ইস্ট শিকাগো হাইটস)-এর সাথে শিকাগো শহরের তিনটি একই ধরনের কৃষ্ণাঙ্গ পাড়ার তুলনা করেন। গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধের হার কিংবা পুলিশ ও নাগরিকদের মধ্যেকার সাধারণ সম্পর্ক— উভয় ক্ষেত্রেই ছোট শহর এবং বড় শহরের পাড়াগুলোর মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না। কিন্তু মানসিকতার দিক থেকে একটি বড় পার্থক্য ছিল। ছোট শহরের বাসিন্দারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলত যে, তারা অপরাধের ভয়ে নিজেদের ঘরে গুটিয়ে রাখেন না। তারা পুলিশকে অনেক বেশি ক্ষমতা দিতেও রাজি ছিল; তারা মনে করত, এলাকার সমস্যা সমাধানের জন্য পুলিশের “যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার আছে”। এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা বিশ্বাস করত যে পুলিশ “সাধারণ নাগরিকদের ভালো-মন্দের দিকে খেয়াল রাখে”।

এর থেকে গবেষকরা একটি সিদ্ধান্তে আসেন: সম্ভবত ছোট শহরগুলোর বাসিন্দা এবং পুলিশ—উভয়েই নিজেদেরকে একটি দলের সদস্য হিসেবে দেখে। তাদের লক্ষ্য অভিন্ন: একসঙ্গে মিলেমিশে নিজেদের এলাকার জীবনযাত্রার একটি নির্দিষ্ট মান বজায় রাখা। অন্যদিকে, বড় শহরের বাসিন্দারা পুলিশকে একটি পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে দেখে। তাদের সম্পর্কটা অনেকটা লেনদেনমূলক: আমার সমস্যা হয়েছে, আমি ফোন করে পুলিশকে জানিয়েছি, পুলিশ এসে পরিষেবা দিয়ে চলে গেছে। এখানে কোনো সমষ্টিগত অনুভূতির স্থান নেই।

যদি উপরের কথাগুলো সত্যি হয়, তাহলে একজন বিচক্ষণ পুলিশ প্রধান তার সীমিত সংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়ে কী কৌশল অবলম্বন করবেন? এর কোনো সহজ বা একমাত্র উত্তর নেই।

  • প্রথম উত্তর: সত্যি কথা হলো, কেউই নিশ্চিতভাবে জানে না কোনটি সেরা উপায়। তাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো। যেমন, নিউয়ার্কে একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই বিভিন্ন পাড়ায় ভিন্ন ভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে দেখা উচিত যে কোনটি কোথায় সবচেয়ে ভালো কাজ করে। কারণ সব এলাকার চরিত্র এক নয়।
  • দ্বিতীয় উত্তর: এটিও একটি সতর্কতামূলক জবাব। পাড়া-মহল্লায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনই হয় না। পুলিশের অংশগ্রহণ খুব সামান্য রেখে, বা ক্ষেত্রবিশেষে একেবারেই না রেখেও অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। যেমন, একটি ব্যস্ত শপিং সেন্টার যেখানে সারাদিন প্রচুর মানুষ যাতায়াত করে, অথবা একটি শান্ত ও গোছানো শহরতলি—এই জায়গাগুলোতে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির প্রায় কোনো দরকারই পড়ে না। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই, ভালো ও আইন মেনে চলা মানুষের সংখ্যা এতটাই বেশি থাকে যে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা এমনিতেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে। একেই “অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণ” (informal social control) বলা হয়, যেখানে সমাজ নিজেই নিজেকে ঠিক রাখে।

এমনকি যেসব এলাকায় অপরাধমূলক কার্যকলাপের ঝুঁকি রয়েছে, সেখানেও অনেক সময় পুলিশের বড় ধরনের ভূমিকা ছাড়াই শুধুমাত্র নাগরিকদের উদ্যোগই যথেষ্ট হতে পারে।

  • আলোচনা ও বোঝাপড়া: যেমন, ধরা যাক পাড়ার একটি নির্দিষ্ট মোড়ে কিছু কিশোর-তরুণ আড্ডা দিতে ভালোবাসে, কিন্তু এলাকার প্রাপ্তবয়স্কদের তাতে অসুবিধা হয়। এক্ষেত্রে পুলিশ ডাকার পরিবর্তে, উভয় পক্ষ আলোচনায় বসতে পারে। আলোচনার মাধ্যমে তারা কিছু নিয়মকানুন তৈরি করতে পারে—যেমন, কতজন একসঙ্গে আড্ডা দিতে পারবে, ঠিক কোন জায়গায় তারা বসবে এবং কতক্ষণ থাকবে। একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ বোঝাপড়া প্রায়শই পুলিশি হস্তক্ষেপের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়।
  • নাগরিকদের টহল (Citizen Patrols): যখন আলোচনা বা বোঝাপড়া সম্ভব হয় না, বা নিয়ম তৈরি হলেও তা কেউ মানে না, তখন নাগরিকরাই নিজেদের উদ্যোগে টহলদারির ব্যবস্থা করতে পারে। এই ধারণাটি মোটেও নতুন নয়। আমেরিকায় এর দুটি পুরনো ঐতিহ্য রয়েছে। একটি হলো “কমিউনিটির পাহারাদার” (community watchmen)-এর ধারণা, যা আমেরিকার প্রথম বসতি স্থাপনের সময় থেকেই চলে আসছে। উনিশ শতক পর্যন্ত পুলিশ নয়, বরং এলাকার স্বেচ্ছাসেবকরাই পালা করে নিজেদের এলাকা পাহারা দিত। তাদের মূল কাজ ছিল শৃঙ্খলা বজায় রাখা, কিন্তু তারা কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নিত না। অর্থাৎ, তারা কাউকে শাস্তি দিত না বা গায়ে হাত তুলত না। তাদের উপস্থিতিই অপরাধীদের মনে ভয় জাগাতো এবং কোনো গোলমাল শুরু হলে তারা বাকিদের সতর্ক করে দিত।
    • আধুনিক উদাহরণ: বর্তমানেও এই ধরনের শত শত উদ্যোগ সারা দেশে চালু আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো “গার্জিয়ান অ্যাঞ্জেলস” নামের একটি দল। এই দলের সদস্যরা হলো নিরস্ত্র তরুণ-তরুণী, যারা একটি বিশেষ ধরনের টুপি ও টি-শার্ট পরে। নিউ ইয়র্ক শহরের পাতাল রেলে (subway) টহল দেওয়ার মাধ্যমে তারা প্রথম পরিচিতি লাভ করে। এখন আমেরিকার ৩০টিরও বেশি শহরে তাদের কার্যক্রম রয়েছে।

দুর্ভাগ্যবশত, এই ধরনের নাগরিক উদ্যোগগুলো আদতে অপরাধ কমাতে কতটা সক্ষম, সে বিষয়ে আমাদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা পরিসংখ্যান খুব কম। কিন্তু একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: অপরাধের সংখ্যা কমুক বা না কমুক, এই দলগুলোর উপস্থিতি এলাকার সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের আস্থা ও সাহস জোগায়। মানুষ নিজেদের নিরাপদ বোধ করে। আর এই অনুভূতিটাই একটি এলাকার শৃঙ্খলা এবং সভ্য পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ, অপরাধ কমানোর পাশাপাশি “ভয় কমানো” ও একটি বড় সাফল্য।

Spread the love

accounting Broken Window Brooklyn Bridge economics george william plunkitt lincoln luminous rabiul hasan lincoln translation travel USA Politics কবিতা রম্য

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *