আমরা একটা সাপ্তাহিক আলোচনা অনুষ্ঠান শুরু করেছিলাম, যেখানে আমরা পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতাম। একবার অস্ট্রেলিয়া থেকে রকি ভাই যুক্ত হয়ে একটা কথা বলেছিলেন আলোচনার প্রসঙ্গে। আমাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে জেনারেশন গ্যাপ তৈরি হয়, এবং আমাদের সেটা কমাতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ফেসবুক ব্যবহার করেন না এমন মানুষ আজকাল খুব কমই পাওয়া যায়। আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের অনেকেই এখন এখানে আসছেন। তারাও আমাদের মতো একটা কমিউনিটি খুঁজতে আসেন। অনেকেই খবরের কাগজে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’ সম্পর্কে শুনে এখানে আসেন। যদিও সোশ্যাল মিডিয়া বলতে ফেসবুক, এক্স, স্ন্যাপচ্যাট, ইনস্টাগ্রামসহ আরও অনেক প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, বাংলাদেশে ফেসবুক মূলত সোশ্যাল মিডিয়া হিসেবে পরিচিত। এখন, যদি আগের প্রজন্মের কেউ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ‘খবর’ পেতে চান, তাহলে তারা কীভাবে তা পাবেন? ফেসবুক তো আর সংবাদপত্র নয় যে এখানে খবর ছাপানো হয়। তাহলে এখানে খবর কীভাবে আসে?
এটি জানার আগে আমাদের ফেসবুক কীভাবে কাজ করে তা একটু জানা দরকার। ফেসবুক খুবই সিম্পল একটি স্ট্রাকচার, যেখানে আপনি নিজের প্রোফাইল তৈরি করে স্ট্যাটাস আকারে লম্বা লেখা, ছবি বা ভিডিও দিতে পারেন। আপনি অন্য প্রোফাইলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারেন এবং তাদের স্ট্যাটাস দেখতে পারেন। এভাবেই মূলত আপনি জানতে পারেন আপনার চারপাশে কী ঘটছে। এটাকেই আমরা সোশ্যাল মিডিয়া থেকে খবর পাওয়া বলি—মানে আপনি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে অন্যদের জানিয়ে দিলেন তাজা খবর, খবরের বিশ্লেষণ, ‘গুজব’, কিংবা শুধুই ফুল-ফল-লতা-পাতা।
এখন একজন পাঠক হিসেবে আপনি কীভাবে বুঝবেন যে অন্যের লেখা বা শেয়ার করা তথ্যটি নিছক গুজব, প্রোপ্যাগান্ডা, তাজা খবর, একটি ভালো বিশ্লেষণ, নাকি শুধু ফুল-ফল-লতা-পাতা? যদিও বোঝা সহজ নয়, গত পনেরো বছরের ফেসবুক ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে আমার কিছু পর্যবেক্ষণ আছে, যা আপনাকে কোনটি কী বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
ফুল-ফল-লতা-পাতা: এই ক্যাটাগরি সবচেয়ে সহজ। এতে ফুলের ছবি, পাতার ছবি, নিজের ছবি, প্রেমিক-প্রেমিকার হাতের তালু, ঘড়ি বা চুলের ছবি, কিংবা ‘হাই গাইজ গুড মর্নিং’ এর মতো স্ট্যাটাস দেয়া হয়। আবার অনেক বিশ্লেষক চলমান ইস্যুতে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে এই স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করেন। উদাহরণ হিসেবে দেখবেন, একদিকে মানুষ মরে কয়লা হয়ে যাচ্ছে, আর অন্যদিকে কেউ একজন ফুলের ছবি দিয়ে কবিতা লিখছে—যেমন, ‘যার পুঙ্গা যে মারুক, আমার কী, আমি আমার পুঙ্গায় হাত দিয়ে আছি।’
তাজা খবর এবং খবরের বিশ্লেষণ: এই ক্যাটাগরি সবচেয়ে সাহসী। অনেকে ব্রেকিং নিউজ দেন, যা অনেক সময় ভাইরালও হয়ে যায়। খবরের বিশ্লেষণ দেখে আমরা শুধু খবরই নয়, খবর প্রকাশকারীর দৃষ্টিভঙ্গিও বুঝে ফেলি। তবে এর সাথেই গুজব এবং প্রোপ্যাগান্ডা ক্যাটাগরি চলে আসে।
প্রোপ্যাগান্ডা: এই জাতীয় খবর বা লেখাগুলোতে সত্যের সাথে কিছু মিথ্যা মিশিয়ে বা মিথ্যার সাথে কিছু সত্য মিশিয়ে আসল ঘটনা আড়াল করা হয়। আপনারা যারা ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ শব্দটির সাথে পরিচিত, তারা এভাবে এটি দেখতে পারেন।
গুজব: আলাদা করে বলার দরকার নেই। মাথায় মগজ থাকলে লেখা থেকেই বুঝবেন, আর গু থাকলে আপনি নিজেই শেয়ার দিবেন।
এগুলোই মোটামুটি প্রধান ক্যাটাগরি। এর বাইরে আরো কিছু থাকতে পারে, তবে এই মুহূর্তে মনে আসছে না। আমরা যারা অনেক বছর ধরে এই লাইনে আছি, তাদের অনেকেই ব্লগে লেখালেখি করতাম। এজন্য আমরা লেখার পাশাপাশি লেখককেও জানা জরুরি মনে করি। ‘তাজা খবর এবং খবরের বিশ্লেষণ’ ক্যাটাগরি সাহসের প্রয়োজন, এই ধরণের লেখা লিখতে গিয়ে অনেকে জেলে গিয়েছে, অনেকে কল্লা হারিয়েছে। এজন্য এটা জরুরী কারণ কারো ধড়ে কল্লা দুইটা থাকেনা।
আমরা প্রায় সব সেলিব্রেটি, নেতা-নেত্রীসহ পাবলিক ফিগারকে পরিচিত নামের পাশাপাশি আরেকটি নামে চিনি। যেমন হরলিক্স ণূরা, কাগু, স্টিভ জব্বার ইত্যাদি। যাদের নাম এখানে নিয়েছি তারা এটি পড়ে থাকলে পারসোনালি নেবেন না। উদাহরণ দেয়ার জন্য এই নাম চলে এসেছে। তো, আমরা প্রতিটি মানুষের আলাদা আলাদা প্রোফাইল মাথায় তৈরি করে ফেলি। সময়ের সাথে তার কাজকর্ম, পারসোনালিটি, ডিগবাজীর ভিত্তিতে এই প্রোফাইল তৈরি হয়।
এজন্য যখন রেফারেন্স হিসেবে আমরা এই নামগুলো ব্যবহার করি লেখায় তখন যারা আগে থেকেই এর সাথে পরিচিত তারা চট করে বুঝে ফেলেন কী লিখা হয়েছে। এখন কেউ যদি এই প্রিকনসেপ্টগুলো না জানেন তার জন্য এটি বেশ কঠিন হয়ে যাবে, এমনকি লেখাটি বাংলা হলেও।
এই লেখাগুলো সেলফ-সেন্সরড হওয়ায় এদের ভাষা অনেক সময় দৃষ্টিকটু মনে হতে পারে। কিছু করার নেই—তাজা খবর নিতে আসলে এসব সহ্য করতে হবে। এজন্য অনেকেই চুপি চুপি পড়ে চলে যান, কোনো ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ না দিয়ে।
ইতিমধ্যে আপনি সোশ্যাল মিডিয়ার ১০১ জেনে ফেলেছেন। এবং এখন আপনার প্রশ্ন হতে পারে, ‘আমার কাছে তাজা খবর আসছে না কেন?’ এর কারণ হতে পারে, আপনি সেই বাবলে নেই। বাবলে ঢুকতে হলে আপনাকে সেই ধরনের খবর শেয়ার করা ব্যক্তিদের বন্ধু বানাতে হবে। যদিও আমি ‘বাবল’ শব্দটি পছন্দ করি না, এটি ভেন ডায়াগ্রামের মতো কাজ করে। আশা করি, আপনাকে ভেন ডায়াগ্রাম চেনাতে হবে না। যদি না চিনে থাকেন, তাহলে পরের প্যারাগ্রাফগুলো আপনার জন্য নয়। লাইক দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। ধন্যবাদ।
ভেনচিত্রের বৃত্তগুলো হলো একেকটা বাবল। যেকোনো একজন ইউজার অনেকগুলো বৃত্তে থাকতে পারে। এখানেই মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের ধারণাটি আসে। আমি মিউচুয়াল বলতে ফেসবুকের মিউচুয়াল ফ্রেন্ড নয়, বরং মানসিকতার দিক থেকে সমমানসিকতা বুঝাচ্ছি। আপনারা যারা দুইলাইন বেশী বুজ্জেন তাদের জন্যও লেখা এখানে শেষ। খুদাপেজ।
Leave a Reply