সেজির জীবনচরিত

আমি একটি কুকুর পালি, যার নাম সেজি। তার আগে আমার কাছে আরো অনেক কুকুর ছিল—কিছু মারা গেছে, কিছু অন্যের কাছে এডপশনে দিতে হয়েছে। প্রতিটি কুকুরের সাথে আমার সম্পর্ক আমাকে শিখিয়েছে যে, এদের মানসিকতা, আচরণ ও ব্যক্তিত্ব অনেক বেশি জটিল, যেমনটি আমরা অনেক সময় সাধারণভাবে ধরে নিই।

আমরা সাধারণত কুকুরদের নিয়ে একটি সহজ ধারণা রাখি—তাদেরকে একভাবে চালানো যায়, একরকম প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, এবং তাদের আচরণগুলো অনেকটা স্বাভাবিক এবং পূর্বাভাসযোগ্য। কিন্তু বাস্তবে কুকুরদের সাইকোলজি এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্য অনেকটাই মানবসুলভ। যেমন আমাদের মতোই, প্রতিটি কুকুরের নিজস্ব স্বতন্ত্র পারসোনালিটি থাকে। আমি যত কুকুর দেখেছি, প্রত্যেকেই ছিল আলাদা। কারো মধ্যে ছিল অতি উত্সাহী আচরণ, কারো মধ্যে ছিল শান্ত স্বভাব, আবার কেউ ছিল বেশ সংবেদনশীল ।

সেজি, আমার বর্তমান সঙ্গী, তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমার জীবনে একটি বিশেষ স্থান তৈরি করেছে। সে সহজে বিশ্বাস করে না, নিজের এলাকা বা আশেপাশের যে কোনো অদ্ভুত ব্যাপার বা মানুষের ওপর কৌতূহলী দৃষ্টি রাখে। তাদের মধ্যে এই ভিন্নতা আমাকে বুঝিয়েছে যে কুকুরের মানসিকতা এবং আচরণ কেবল প্রজাতি বা প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভর করে না, বরং তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পরিবেশ এবং তাঁদের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করা হয়, তার ওপরও নির্ভরশীল।

এই সিরিজটি মূলত এই সমস্ত পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে, যেখানে সেজি থাকবে কেন্দ্রে, তবে মাঝেমধ্যে আমার অন্যান্য কুকুরদের কথা তুলে আনব, যারা আমার জীবনের অংশ ছিল এবং তাঁদের ব্যক্তিত্বগুলোও আমার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।

প্রতিটি কুকুরের আলাদা বৈশিষ্ট্য দেখার পর আমি আর কখনোই কুকুরদের সাধারণ চোখে দেখি না। তাঁদেরকে এখন আমি একটি সংবেদনশীল প্রাণী হিসেবে দেখি, যারা আমাদের থেকে অনেক কিছু আশা করে এবং একইসাথে আমাদের নিজেদের ভালোবাসা ও যত্নও ফিরিয়ে দেয়।সেজি (Sezi) আমার বর্তমান কুকুর, যার সাথে আমার সম্পর্ক অনেক গভীর এবং বিশেষ। সেজি আসলে একটি রেস্কিউড ডগ, তাকে আমরা বাংলাদেশের চুয়েট (চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ক্যাম্পাস থেকে রেস্কিউ করি। সে তখন পাহাড়ে একটি দলের সাথে মিলে শিকার করে বেড়াতো এবং ক্যাম্পাসের চা দোকানে ছাত্রদের দেয়া চা বিস্কুট খেতো। ক্যাম্পাসের এক ছাত্র আমাদের জানায় যে, সেজি খোড়া হয়ে গেছে, সম্ভবত কোনো এক্সিডেন্ট করেছে, তাই তাকে রেস্কিউ করা দরকার।

যখন আমরা তাকে উদ্ধার করে বাসায় নিয়ে আসি, তখন সে বেশ ক্ষুব্ধ ছিল। এই উদ্ধারকাজ সেজি মেনে নিতে পারেনি। তার শরীরে তখন অনেক ক্ষত ছিল—গায়ে খোস-পাচড়া, আর সেগুলো থেকে ভীষণ দুর্গন্ধ আসছিল। তার অবস্থা দেখে আমরা দ্রুত সিভাসু’তে (চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এবং এনিমেল সাইন্সেস ইউনিভার্সিটি) নিয়ে যাই, যেখানে তার চিকিৎসা শুরু হয়। দীর্ঘ চিকিতসা এবং পরিচর্যার পর সেজি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে, এবং আজও সে আমাদের সাথে রয়েছে।

তবে এই সময়কালে সেজির সাথে আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো একেবারেই সহজ ছিল না। তার ক্ষোভ, তার শিকারি স্বভাব, এবং নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেয়ার চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। সেজি ধীরে ধীরে আমাদের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে, তার পারসোনালিটি এবং আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলো আমাকে কুকুরের মনস্তত্ত্ব নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে। তার সাথে কাটানো প্রতিটি দিন যেন নতুন কিছু শেখার সুযোগ দেয়।

এই সিরিজের প্রথম লেখাটি মূলত সেজির পরিচয় তুলে ধরার জন্য। এরপরের লেখাগুলোতে আমি সেজিকে ঘিরে আরো অনেক ঘটনার কথা শেয়ার করব—তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম, আমাদের সাথে তার মানসিকভাবে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা, এবং তার বিশেষ কিছু মুহূর্ত, যা আমাদের জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে।

Spread the love

accounting Broken Window Brooklyn Bridge economics george william plunkitt lincoln luminous rabiul hasan lincoln translation travel USA Politics কবিতা রম্য

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *