নিউইয়র্কের আকাশটা একটা বিবর্ণ ধূসর চাদর। নভেম্বরের শেষ দিককার বাতাস স্কাইস্ক্র্যাপারের ফাঁক গলে ছুরির মতো ছুটে আসে, যা পথের ধারের সামান্য উষ্ণতাটুকুও কেড়ে নেয়। বহুদূর থেকে ভেসে আসা সাইরেনের একটানা শব্দ, ম্যানহোল থেকে ওঠা বাষ্পের মেঘ আর হলুদ ট্যাক্সির স্রোত—এইসব নিয়েই শহরের হৃদস্পন্দনটা চলে। এছাড়াও নিউইয়র্কের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রায় সব মহানগরীর মতো এখানে সাবওয়ে ট্রেন আছে। গৃহহীন আছে। এই শহর গৃহহীনদের জন্য অনুকূল নয়, কিন্তু তবু তারা আছে। তেমনি একজন শন। শন—নামের আগে-পিছে আর কিছু নেই। সরকারি কাগজপত্র ব্যবহার করতে হলে হয়তো কিছু থাকত। বয়স অনুমান করা যেতে পারে চল্লিশের ঘরে। তার পরিচয় সে একজন গৃহহীন। চাকচিক্যের এই শহরে একটু এদিক-ওদিক পা ফেলতে গেলেই আপনার পরিচয় হয়ে যাবে গৃহহীন।
‘পে-চেক-টু-পে-চেক’ বলে একটা কথা আছে। মানে আপনি সপ্তাহে যে চেক পাবেন, তা দিয়েই পরের সপ্তাহের খরচ চালাবেন। এই ব্যবস্থার কারণে মানুষ না থেমে খেটে যায়। থামলেই এরকম শনরা তৈরি হয়। শন বসবাস করে শহরের ব্যস্ততম একটা ম্যাকডোনাল্ডসের আউটলেটে। দৈনিক ২২ ঘণ্টা খোলা থাকা এই আউটলেট থেকে তাকে বের হয়ে যেতে হয় রাত ৩টায়। কারণ এই সময়ে দোকান পরবর্তী বাইশ ঘণ্টার জন্য প্রস্তুত হয়। মদ খেয়ে এতই মাতাল থাকে সে যে, এই সময়ে তাকে বের করতে দোকানের কর্মীদের কালঘাম ছুটে যায়। এক পর্যায়ে রুটিন মাফিক সে বের হয়।
বছরের পর বছর ধরে তার এই এক রুটিন। তার কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আউটলেটের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, ক্রেতা এলে হাতে ধরা কাপ বাড়িয়ে দেয়। কেউ কাপে ভাঙতি পয়সা ছুড়ে দেয়। এই দিয়ে তার একটা হ্যামবার্গার হয়ে যায়, আর বাড়তি পয়সা দিয়ে এক ক্যান বিয়ার। অবশ্য গোসলের বালাই নেই। এমনকি প্রস্রাব-পায়খানা কোথায় করবে, তারও চিন্তা নেই। মানে নিজের কাপড়চোপড় তো আছেই। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। একটা চলমান গন্ধবোমা সে। বাড়তি টাকার দরকার হলেই সাবওয়ের কোনো একটা ট্রেনে উঠে পড়লেই হলো। মানুষজন ভয়ে এক ডলার বা কোয়ার্টার ছুড়ে দেয়। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলে জীবনের স্রোত। ব্যস্ত মানুষ, পর্যটকদের ঝাঁক, ছুটে চলা তরুণ-তরুণী। তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা, কাঁধে অদৃশ্য বোঝা। তারা শনকে দেখেও দেখে না, কারণ শন তাদের কাছে শুধু একজন মানুষ নয়, বরং তাদের নিজেদের গভীরতম ভয়ের প্রতিচ্ছবি। এই কারণেই তারা আরও দ্রুত হাঁটে, আরও জোরে কফি কাপে চুমুক দেয়—যেন গতিই তাদের পতনের হাত থেকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়।
এসব দেখে তার মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি লেগে থাকে। যেন এই শহরকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টিকে আছে বছরের পর বছর। এই শহরে তার অবস্থান অচ্ছুত, একেবারে নিচের স্তরে। তার প্রেমের দরকার হলেই, তার চেয়ে এক স্তর ওপরে থাকা, ‘পে-চেক-টু-পে-চেকে’ চলা ম্যাকডোনাল্ডসের কর্মীরা আছে। ক্যাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে সে তার যা ইচ্ছে বলে দেয়। মেয়েগুলো মুখ বুজে থাকে। “কাস্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট”—এই কর্পোরেট পলিসিতে চলা কর্মীরা বেশি কিছু বলে না, পাছে কাস্টমারের মামলা খেয়ে না বসে। যারা অনেকদিনের পরিচিত, তারা মুখের ওপর কথা ছুড়ে দেয়। এভাবে এই মিথস্ক্রিয়ায় চলে যায় দিন, পার হয় রাত! হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত! ওহ, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। এই শহর কখনো ঘুমায় না!
[শনকে নিয়ে আজকের নিষিদ্ধ ইশতেহার]
এই শহরের কোনো বিরাম নেই, আছে শুধু দেয়াল আর দেয়াল,
এখানে আকাশ দেখলে পাপ হয়, বাতাস ছুঁলে অসুখ।
আমি সেই অসুখ বুকে নিয়ে হাঁটি, নিউইয়র্ক—
তোমার স্টিলের শরীরে
আমার এই অচ্ছুত অস্তিত্বই একমাত্র সত্য কবিতার সুখ।
তোমাদের দরকার নিরাপদ ঘর, নরম বিছানা, সপ্তা শেষে মাইনে,
আমার ওসব কিছু নেই, আছে শুধু ফুটপাত আর তীব্র স্বাধীনতা।
একটু ভুলের দামে তোমরা কিনে নাও সুশৃঙ্খল দাসত্ব,
আর আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস—এক একটি নিষিদ্ধ বিদ্রোহ।
আমাকে তোমরা করুণা করো না, করুণা করার মতো কিছু রাখিনি।
আমার এই নোংরা শরীর, দুর্গন্ধময় অবহেলা,
আমার হাতে ধরা কাপ, তোমাদের সভ্যতার মুখে
ছুঁড়ে দেওয়া একরাশ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন।
ভালোবাসা? সে তো তোমাদের কাঁচের দেয়ালে সাজানো পুতুল,
আমার প্রেম ওই ক্যাশ-কাউন্টারের মেয়েটির চোখে—
এক ঝলক ঘৃণা অথবা ভয়। তা-ই সই,
তবু তো নিখাদ, কোনো মেকি ভদ্রতার আড়ালে ঢাকা নয়।
আমাকে স্পর্শ কোরো না, পুড়ে যাবে তোমাদের পরিপাটি অহংকার।
এই শহর ঘুমায় না, আমিও ঘুমাই না—
শুধু জেগে থেকে দেখি, পতনের শিল্প কতটা সুন্দর হতে পারে,
যে পতনের তীব্র ভয় থেকে তোমরা আরও তীব্রতর হাঁটো।
লিংকন, নিউইয়র্ক
৩রা অক্টোবর, ২০২৫ইং
Leave a Reply