সোশ্যাল মিডিয়া, নৈতিক পক্ষাঘাত এবং তথ্যের চক্র

আপনার মনে কি প্রশ্নের উদয় হয়, কেন আপনার কাপল ছবি বেশি লাইক পায়? কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী কোনো পোস্ট কারো ফিডে যায় না। উত্তর দেওয়ার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করি।

চুরি করা নিশ্চয়ই খারাপ কাজ। আগেকার সময়ে কোনো একটি চুরির খবর আপনি কীভাবে নিতেন? ধরা যাক, কোনো এলাকায় একটি চুরির ঘটনা ঘটলো। পরদিন সংবাদপত্রে সেটির খবর আসতো একটি নির্দিষ্ট কলামে, সম্পাদনার পর। খবরটি হতো এরকম: “গতরাতে অমুক এলাকায় একটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনার তদন্ত করছে।”

কিন্তু আজকের দিনে এই খবর আমরা কীভাবে পাচ্ছি? আমরা পাচ্ছি এই ধরনের অসংখ্য প্রতিক্রিয়া:

  • “চুরি তো হবেই, দেশে আইন নেই!”
  • “এই চোরকে নিশ্চয়ই অমুক পার্টি পাঠিয়েছে।”
  • “আরে, এই গৃহস্থ লোক ভালো না, সে অমুককে ঠকিয়েছিল।”
  • “চোরও মানুষ, পেটের দায়ে চুরি করেছে।”
  • “চোরকে পিটিয়ে মেরে ফেলা উচিত! এই চল সবাই!”

এই থেকে আপনি কী বুঝলেন? সোশ্যাল মিডিয়া “খবরের” প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি “প্রতিক্রিয়ার” প্ল্যাটফর্ম। এই প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আপনি পাচ্ছেন বিশ্লেষণ। এটাই সবচেয়ে মজার দিক অবশ্য! আমার তালিকায় গবেষক যেমন আছেন, তেমন “ইতালিয়ান প্রবাসী বোল্ট চালক রুবেল”-ও আছেন।

আগে যেমন আমরা খবর পড়ে নিজের উপসংহারে যেতাম যে, “চুরি খারাপ”। সোশ্যাল মিডিয়া এই কাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এটি আপনাকে “বাধ্যতামূলক আপেক্ষিকতাবাদ” (Forced Relativism)-এর মধ্যে ফেলে দেয়। আপনাকে চোরের পেটের ক্ষুধা এবং গৃহস্থের সম্পদ হারানোর বেদনা—দুটোই একযোগে অনুভব করতে বাধ্য করা হয়। আমাদের এরকম একটা স্টেটে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে যেখানে আমাদের মস্তিষ্ক বিবেচনা করতে পারছে না কোনো পক্ষ সঠিক, অথবা মনে হচ্ছে দু পক্ষই সঠিক (The Paralysis of Relativism)। এই অবস্থাকে আমরা Moral Paralysis বা নৈতিক পক্ষাঘাত বলতে পারি।

এত গেল একটা দিক। কিন্তু আমরা এই পর্যায়ে এসে পৌঁছালাম কীভাবে? চলুন একটু পিছনে ফিরে দেখি। আমরা খবরের জন্য আগে নির্ভর করতাম দৈনিক পত্রিকার ওপর, অথবা তাৎক্ষণিক খবর পেতে টিভি চ্যানেলের ওপর। এই সিস্টেমটি কীভাবে কাজ করতো, এটি যদি বলি তাহলে কিছুটা বুঝতে সুবিধা হবে। নিউজপেপারে একটা খবর বিভিন্ন সম্পাদনার মধ্য দিয়ে আসে, এখানে দায়বদ্ধতা থাকে, এবং এটি আর্কাইভের একটা অংশ। আপনি যখন একটি নিউজপেপার কিনতেন, তখন আপনি টাকার বিনিময়ে খবর পেতেন। আপনি ছিলেন ‘গ্রাহক’। সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনি ‘গ্রাহক’ নন; এখানে আপনিই হচ্ছেন পণ্য। ফেসবুক, টুইটার, টিকটকের আসল গ্রাহক হলো বিজ্ঞাপনদাতারা।

এই সিস্টেমটির লক্ষ্য আপনাকে জ্ঞানী (informed) করা নয়; সিস্টেমটির লক্ষ্য আপনাকে আসক্ত (hooked) রাখা। আপনার উদ্বেগ, আপনার ক্ষোভ, আপনার দ্বিধা—এগুলোই সেই ‘টোপ’ যা দিয়ে অ্যালগরিদম আপনাকে আটকে রাখে, যাতে পরবর্তী বিজ্ঞাপনটি আপনাকে দেখানো যায়। আপনার মানসিক অস্থিরতাই তাদের ব্যবসার মূলধন।

এছাড়াও, একটি নিউজপেপার আপনাকে এমন খবরও পড়তে বাধ্য করতো যা আপনার ভালো লাগে না। আপনি খেলার পাতা অপছন্দ করলেও আপনাকে হয়তো আন্তর্জাতিক খবরের জন্য খেলার পাতা উল্টাতে হতো। এটি আপনাকে একটি ‘সাধারণ বাস্তবতা’ বা Shared Reality-তে রাখতো। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম আপনার জন্য একটি ‘ব্যক্তিগত নরক’ বা Personal Hell তৈরি করে। আপনি যা ঘৃণা করেন, তা সে আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলে; আপনি যা বিশ্বাস করেন, শুধু সেই ধরনের তথ্যই সে আপনাকে দেখায়। এতে করে আপনি নিজের অজান্তেই উগ্রপন্থী (radicalized) হয়ে উঠছেন। সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে আপনার সমমনাদের একটি বদ্ধ ঘরে (চেম্বার) আটকে ফেলে, যেখানে বাইরের কোনো আওয়াজ (প্রতিধ্বনি) আসে না। নিউজপেপার সমাজকে একটি সাধারণ বিতর্কের জায়গা দিত; সোশ্যাল মিডিয়া সেই সমাজকে লক্ষ লক্ষ খণ্ডে বিভক্ত করে ফেলেছে।

আমরা যদি এই দুটি মাধ্যমের ডিজাইন খেয়াল করি, একটি নিউজপেপারের একটি শেষ পাতা আছে। আপনি পড়া শেষ করে পত্রিকাটি রেখে দিতেন। আপনার মস্তিষ্ক একটি ‘কাজ শেষ’ করার অনুভূতি পেত। সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো শেষ নেই। “ইনফিনিট স্ক্রল” (Infinite Scroll) ফিচারটি কোনো কারণ ছাড়াই তৈরি করা হয়নি। আপনি স্ক্রল করতেই থাকেন এই আশায় যে পরের পোস্টটি আপনাকে কিছু একটা আনন্দ (ডোপামিন) দেবে। নিউজপেপার ছিল ‘তথ্য’ (Information); সোশ্যাল মিডিয়া হলো একটি আচরণগত ‘আসক্তি’ (Behavioral Addiction)। আজকাল “ডুম স্ক্রলিং” (Doom Scrolling) শব্দটি আমরা এই পরিস্থিতি বর্ণনা করতে ব্যবহার করি।

এই ব্যক্তিগত জায়গা থেকে বের হয়ে আমরা একটি সামগ্রিক অবস্থাটা দেখি। আমি এখন প্রাসঙ্গিক যে বিষয় নিয়ে আলাপ করবো, সেটি হচ্ছে The Globalization of Anxiety বা উদ্বেগের বিশ্বায়ন। এটি বোঝানোর জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড মহামারী কেন এভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল? এর কারণ আমরা অনেক গ্লোবাল এখন, দুদিনের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যেতে পারছি বিভিন্ন রোগ বহন করে। ঠিক এই ঘটনাটি খবরের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। এখন কী অপরাধ কম বা বেশি হচ্ছে? কিন্তু আগে আপনার উদ্বেগ আপনার ক্ষমতার পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আপনি আপনার প্রতিবেশীর বিপদে উদ্বিগ্ন হতেন, কারণ তাত্ত্বিকভাবে আপনি তাকে সাহায্য করতে পারতেন।

কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া আপনার উদ্বেগের পরিধিকে অসীম করে দিয়েছে, অথচ আপনার ক্ষমতাকে এক বিন্দুও বাড়ায়নি। আগে ঢাকার কোনো ঘটনা হয়তো শুধু ঢাকার মানুষকেই উদ্বিগ্ন করতো। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সেই একই ঘটনা, একই তীব্রতায়, একই মুহূর্তে আমেরিকায় বসে থাকা একজন প্রবাসীকেও উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আপনি যখন আমেরিকায় বসে ঢাকার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, সেই উদ্বেগটি সম্পূর্ণ নিষ্ফল। এই “ক্ষমতাহীন উদ্বেগ” (Powerless Anxiety) হলো সবচেয়ে ভয়াবহ মানসিক চাপ। নিউজপেপার আপনাকে খবর দিত; সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে সেই খবরের সাথে জড়িত মানুষগুলোর রিয়েল-টাইম আতঙ্ক, কান্না এবং ক্ষোভের সরাসরি সম্প্রচার দেখাচ্ছে। আপনি অন্যের ট্রমাতে সরাসরি প্লাগ-ইন হয়ে যাচ্ছেন, যা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় সিস্টেম আপনাকে দিচ্ছে না।

এতক্ষণ যা বললাম, তার কিছু পয়েন্ট যদি তুলে ধরি তাতে বোঝা যাবে মূল সমস্যা শুধু “ভুল তথ্য” বা “ফেক নিউজ” নয়। মূল সমস্যা হলো তথ্যের ধরণ, পরিমাণ এবং এর প্রতিক্রিয়ার চক্র। সমস্যাগুলো হলো:

  • ১. তথ্যের অতিবর্ষণ (Information Overload): আমাদের মস্তিষ্ক এত তথ্য একবারে প্রক্রিয়া করতে পারে না।
  • ২. আবেগের পুঁজি (Emotional Exploitation): সিস্টেমটি আমাদের ক্ষোভ, ভয় এবং উদ্বেগ থেকে লাভবান হয়।
  • ৩. নৈতিক পক্ষাঘাত: কোনো বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারার ক্লান্তি।
  • ৪. আসক্তির নকশা (Addictive Design): ইনফিনিট স্ক্রল এবং নোটিফিকেশন আমাদের এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ থেকে বের হতে দেয় না।

এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ বা একক সমাধান নেই। তবে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে:

  • আত্মরক্ষা হিসেবে পরিত্যাগ বা সীমিতকরণ: যদি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব আপনার মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম বা কাজের ওপর পড়ে (যেমন হৃদরোগের উপসর্গ), তবে তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা বা কঠোরভাবে সীমিত করাই সবচেয়ে যৌক্তিক এবং সাহসী সিদ্ধান্ত।
  • সচেতন ব্যবহার: সোশ্যাল মিডিয়া “ব্রাউজ” করার জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট “ব্যবহার”-এর জন্য। অ্যালগরিদম আপনাকে যা খাওয়াতে চায় তা না দেখে, আপনি যা দেখতে চান তা সার্চ করে দেখুন। নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
  • “ধীর সংবাদ” গ্রহণ: বই পড়া, দীর্ঘ প্রবন্ধ বা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা। এই মাধ্যমগুলো আপনাকে চিন্তা করার সময় দেয়।
  • মানসিক সীমানা নির্ধারণ: এটিই সম্ভবত সবচেয়ে যৌক্তিক দিক যে এটা মেনে নেওয়া, আপনার পক্ষে পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধান করা বা সব বিষয়ে মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। নিজের মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া আপনার মূল বিষয় হওয়া উচিত।

সবশেষে বলতে চাই, আমার এই বিশ্লেষণ কিন্তু কোনো খবরের বিশ্লেষণ নয়। এটি অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, এবং এর প্রভাব নিয়ে আলাপ করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের একটি সংযুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু প্রায়শই এটি আমাদের একটি বিভক্ত এবং ক্লান্ত সমাজ উপহার দিয়েছে। সংবাদপত্র আমাদের জানালার বাইরে পৃথিবী দেখাতো; সোশ্যাল মিডিয়া সেই জানালা দিয়ে পাথর ছুঁড়ে মারে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। দিনশেষে, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ, কিন্তু যে ব্যবসায়িক মডেলের ওপর এটি দাঁড়িয়ে আছে তা নয়। আমাদের এই সিস্টেমের কাছে পরাজিত হলে চলবে না। আমাদের সচেতনভাবে নিজেদের সময়, মনোযোগ এবং মানসিক শান্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—তথ্য গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু তথ্যের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলে চলবে না।

Spread the love

accounting Broken Window Brooklyn Bridge economics george william plunkitt lincoln luminous rabiul hasan lincoln translation travel USA Politics কবিতা রম্য

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *