Author: Rabiul Hasan

  • ইশ্বরীর নগর

    ঈশ্বরী যেদিন নগর পত্তন করলেন,
    সেদিনই কৌশলে আমাদের মননে
    ভালোবাসার বিষ ঢেলে দিয়েছিলেন।

    যেদিন তুমি চেয়েছিলে সব ভুলে যেতে,
    আমাকেও তখন বাধ্য হয়ে ভুলে যেতে হয়েছিল ‘আমাদের’।
    আমরা পরস্পরকে কেবল অভিমানটুকুই ভাগ করে দিতে পেরেছিলাম।

    ​সেদিন আমরা মনোযোগ দিয়ে পাখির ডাকে প্রেম খুঁজে ফিরতাম।

    আজ অখণ্ড অবসরে সেই পাখির ডাকেই কেবল হাহাকার মিশে থাকে।
    এই যান্ত্রিক নগরের বিষ আর বুকের ভেতর জমে থাকা হাহাকার—বড্ড ক্লান্ত করে তুলেছিল আমাকে।

    ​ঈশ্বরী আমার এই ক্লান্তি দেখলেন।
    করুণা হলো তাঁর, কিংবা কৌতুক।
    বর দিলেন—”তথাস্তু! তোমাকে দ্বিগুণ সময় দিলাম।”

    তারপর থেকে আমি ঘুমিয়ে আছি।

    লিংকন, নিউইয়র্ক

    ৪ই ডিসেম্বর, ২০২৫ইং

  • অস্তিত্বের সংকট ও অনিবার্য গন্তব্য: বাংলাদেশের ভৌত সীমাবদ্ধতা, অর্থনৈতিক মরীচিকা এবং ২০৩৫ সালের আসন্ন মহাবিপর্যয়ের একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ

    অধ্যায় ১: বর্তমান বাস্তবতা – ভৌত সীমাবদ্ধতা এবং ইকোলজিক্যাল ফুটপ্রিন্ট

    ১.১ ভূমির নির্মম গণিত এবং জনসংখ্যার চাপ

    বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বের যে সংকটটি সবচেয়ে প্রকট অথচ অদৃশ্যভাবে কাজ করছে, তা হলো ভূমির প্রাপ্যতা বনাম জনসংখ্যার চাহিদার এক অসম সমীকরণ। আমরা সচরাচর উন্নয়নকে জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের চশমায় দেখে অভ্যস্ত, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার প্রাথমিক ও মৌলিক শর্ত হলো তার ভৌত বা ফিজিক্যাল স্পেস। নেদারল্যান্ডসের উদাহরণ টেনে প্রায়শই বলা হয় যে প্রযুক্তির মাধ্যমে কম জমিতেও অধিক উৎপাদন সম্ভব, কিন্তু এই তুলনার আড়ালে বাংলাদেশের মাটির গভীরতর ক্ষয় ও অব্যবস্থাপনার চিত্রটি চাপা পড়ে যায় । নেদারল্যান্ডস আয়তনে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এবং অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ হয়েও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য রপ্তানিকারক দেশ হতে পেরেছে কারণ তারা জমির উৎপাদনশীলতাকে প্রযুক্তির মাধ্যমে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু বাংলাদেশ তার জমির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গিয়ে মাটির প্রাণশক্তিকেই নিঃশেষ করে ফেলেছে ।

    বাংলাদেশের বর্তমান মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার বা প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ একর। ১৮ কোটি বা তার অধিক জনসংখ্যার এই দেশে যদি আমরা সাধারণ গাণিতিক বিভাজন করি, তবে মাথাপিছু মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ০.২০ একর বা ২০ শতাংশ । এই পরিসংখ্যানটি আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হয়, বাস্তবতা তার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন। কারণ এই ০.২০ একরের পুরোটাই ব্যবহারযোগ্য বা আবাদযোগ্য নয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বিশাল নদী অববাহিকা, সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা, এবং ক্রমবর্ধমান নগরায়নের ফলে সৃষ্ট রাস্তাঘাট ও বসতবাড়ি। বিশ্বব্যাংক এবং ম্যাক্রোট্রেন্ডসের সাম্প্রতিক ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ক্রমাগত হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ০.০৫ হেক্টরের নিচে নেমে এসেছে । অর্থাৎ, একজন মানুষের সারা বছরের খাদ্য উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৭ থেকে ৮ কাঠা জমি, যা আধুনিকতম কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করলেও পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পুষ্টি সরবরাহের জন্য যথেষ্ট নয়।

    গ্লোবাল ফুটপ্রিন্ট নেটওয়ার্কের (Global Footprint Network) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, একজন মানুষের গড়পড়তা জীবনযাপনের জন্য—যা খুব বিলাসী নয় বরং মৌলিক চাহিদা পূরণ করে—প্রয়োজন ১.৭ গ্লোবাল হেক্টর বা প্রায় ৪.২ একর জমি 5। এই জমির মধ্যে শুধু খাদ্য উৎপাদনের জমিই নয়, বরং কাপড়ের জন্য তন্তু উৎপাদনের জমি, বর্জ্য ও কার্বন শোষণের জন্য বনভূমি এবং বসবাসের অবকাঠামোও অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি আমরা অত্যন্ত ন্যূনতম বা ‘ফকিরা’ লাইফস্টাইলও বিবেচনা করি, তবুও একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বছরে ১ টন খাদ্য ও আনুষঙ্গিক বায়োলজিক্যাল মেটেরিয়াল উৎপাদনের জন্য ন্যূনতম ০.৫ একর জমির প্রয়োজন হয়। এর সাথে আবাসন ও অবকাঠামোর জন্য ০.১ একর এবং কার্বন শোষণের (Carbon Sink) জন্য ০.৪ একর যোগ করলে মোট ন্যূনতম প্রয়োজন দাঁড়ায় ১.০০ একর । অথচ আমাদের হাতে আছে মাত্র ০.২০ একর। এই হিসাবটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ বর্তমানে তার প্রাকৃতিক সামর্থ্যের চেয়ে ৫ গুণ (5x) বেশি চাপে বা ‘ইকোলজিক্যাল ডেফিসিট’-এ রয়েছে । এই বিশাল ঘাটতি বা ‘দ্য ডেফিসিট’ প্রমাণ করে যে, বর্তমানে আমরা যে জীবনযাপন করছি তা টেকসই নয়, বরং এটি একটি ধার করা সময়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

    ১.২ অদৃশ্য জমি বা ‘গোস্ট একর’ আমদানি: বিভ্রমের অর্থনীতি

    স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, যদি আমাদের প্রয়োজনীয় জমি না থাকে এবং আমরা আমাদের ইকোলজিক্যাল সীমার বাইরে অবস্থান করি, তবে ১৮ কোটি মানুষ খাচ্ছে কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে বিশ্ববাণিজ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা “ভার্চুয়াল ল্যান্ড” বা “অদৃশ্য জমি” আমদানির ধারণার মধ্যে। বাংলাদেশ যখন বিদেশ থেকে গম, ভোজ্য তেল, ডাল, চিনি বা তুলা আমদানি করে, তখন সে কেবল পণ্য আমদানি করে না, বরং সে অন্য দেশের জমি ভাড়া করে ব্যবহার করে। একে বলা হয় “Importing Ghost Acres” । উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের যে বিশাল চাহিদা রয়েছে, তা মেটানোর জন্য সয়াবিন বা পাম তেল উৎপাদন করতে যে পরিমাণ জমির প্রয়োজন, তা আমাদের নেই। ফলে আমরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা বা ইন্দোনেশিয়ার লক্ষ লক্ষ একর জমি ব্যবহার করছি এই তেল উৎপাদনের জন্য । একইভাবে, তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য যে বিপুল পরিমাণ তুলা প্রয়োজন, তা আমেরিকা, ভারত বা আফ্রিকার মাটি থেকে আসে।

    গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ যদি তার আমদানিকৃত সকল পণ্য নিজস্ব জমিতে উৎপাদন করতে চাইত, তবে দেশের বর্তমান আয়তনের চেয়ে আরও ২ থেকে ৩ গুণ বেশি জমির প্রয়োজন হতো । অর্থাৎ, আমরা বিশ্ববাজার থেকে “অদৃশ্য জমি” ভাড়া নিয়ে আমাদের পেট চালাচ্ছি এবং অর্থনীতি সচল রাখছি। এই পরনির্ভরশীলতা বা ‘ট্রেড ডিপেন্ডেন্সি’ আমাদের খাদ্য নিরাপত্তাকে একটি বিপজ্জনক চক্রের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমরা আমাদের “উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা” বা লেবার ক্লাসকে বিদেশে রপ্তানি করছি, যারা সেখানে শ্রম দিয়ে ডলার উপার্জন করছে। সেই রেমিট্যান্সের ডলার দিয়ে আমরা বিশ্ববাজার থেকে খাদ্য বা “অদৃশ্য জমি” কিনছি। এই চক্রটি—মানুষ রপ্তানি করো > ডলার আনো > খাবার কেন > বেঁচে থাকো—ততক্ষণই চলবে যতক্ষণ বিশ্ববাজার স্থিতিশীল থাকবে এবং আমাদের জনশক্তি রপ্তানি অব্যাহত থাকবে 1। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ বা কোভিড-পরবর্তী সাপ্লাই চেইন ডিসরাপশনের মতো ঘটনায় যখন বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন এই ভঙ্গুর মডেলটি চরম আঘাতের সম্মুখীন হয়, যা আমরা সাম্প্রতিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির চিত্রে দেখতে পাচ্ছি ।

    ১.৩ মাটির সঞ্চয় ভেঙে খাওয়া: ইকোলজিক্যাল ওভারস্পেন্ডিং

    আমরা বর্তমানে যে উৎপাদনশীলতা দেখাচ্ছি, তা মাটির স্বাভাবিক ক্ষমতার বাইরে গিয়ে জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে, যাকে বলা হয় “Mining the Soil” । হাজার বছর ধরে মাটির নিচে যে খনিজ ও পুষ্টি উপাদান জমা হয়েছিল, তা আমরা গত কয়েক দশকের ইনটেন্সিভ ফার্মিং বা নিবিড় চাষাবাদের মাধ্যমে নিঃশেষ করে ফেলেছি। মাটির উর্বরতা শক্তি বা ‘টপসয়েল ফার্টিলিটি’ ধরে রাখার জন্য আমরা এখন ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করছি। কিন্তু অতিরিক্ত ইউরিয়া ও কেমিক্যাল ব্যবহারের ফলে মাটি তার জৈব প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলছে । এর ফলে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে: আগে ১ কেজি সারে যে পরিমাণ ধান উৎপাদিত হতো, এখন ২ কেজি সার ব্যবহার করেও সেই একই পরিমাণ উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। অর্থাৎ, উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু আউটপুট বা ফলন আনুপাতিক হারে বাড়ছে না, যাকে অর্থনীতিতে “ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্নস” বলা হয়।

    মাটির এই “বার্ধক্য” বা ক্লান্তি (Soil Fatigue) ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত। আজ আমরা যে জমিতে ১০ মণ ধান পাচ্ছি, মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে ২০ বছর পর সেখানে ৫ মণ ধানও পাওয়া কঠিন হবে । আমরা মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভাগের উর্বরতা ও সম্পদ আজকেই ভোগ করে ফেলছি। একে বলা হয় ‘ইকোলজিক্যাল ডেট’ বা পরিবেশগত ঋণ, যা পরিশোধ করার কোনো উপায় আমাদের জানা নেই। এই ঋণের বোঝা যখন অসহনীয় হয়ে উঠবে, তখন কৃষি ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।


    অধ্যায় ২: পানির সংকট এবং ভূতাত্ত্বিক বাস্তবতা – অতীতের ভুল এবং বর্তমানের দণ্ড

    ২.১ ভূগর্ভস্থ পানির স্তর: এক নীরব মৃত্যুঘণ্টা

    বাংলাদেশের কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ভিত্তি হলো পানি, কিন্তু এই পানি কোথা থেকে আসছে এবং কতদিন থাকবে, তা নিয়ে একটি ভয়াবহ ভ্রান্ত ধারণা বা “ইলিউশন” কাজ করছে। আমরা নিজেদের নদীমাতৃক দেশ বলে দাবি করি, কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের পানীয় জল এবং সেচ কার্যের ৯৭ শতাংশই আসে মাটির নিচের ভূগর্ভস্থ স্তর বা ‘একুইফার’ থেকে 10। এই ভূগর্ভস্থ পানি হাজার হাজার বছর ধরে মাটির নিচে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হয়েছে, যা আমাদের জন্য ছিল একটি প্রাকৃতিক সঞ্চয় বা ‘ফিক্সড ডিপোজিট’। কিন্তু গত ৩০ থেকে ৪০ বছরে, বিশেষ করে সবুজ বিপ্লবের পর থেকে, আমরা এই ৫০০০ বছরের সঞ্চয় প্রায় নিঃশেষ করে ফেলেছি।

    নাসার গ্রেস (GRACE) মিশনের স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ এবং উত্তর ভারতের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতিতে হ্রাস পাচ্ছে । নাসা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বলের সূক্ষ্ম পরিবর্তন পরিমাপ করে এই তথ্য দিয়েছে। যেখানে পানি কমে যায়, সেখানে মাটির ভর কমে যায় এবং মাধ্যাকর্ষণ সামান্য দুর্বল হয়। এই ডেটা কোনো জরিপ বা অনুমান নয়, এটি হার্ড সায়েন্স। ঢাকা ওয়াসার নিজস্ব তথ্যেও এই ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। নব্বইয়ের দশকে ঢাকায় যেখানে মাত্র ১০০-১৫০ ফুট নিচে পানি পাওয়া যেত, ২০২৪ সালে এসে সেখানে পানি পেতে ১,০০০ ফুট বা তার চেয়েও গভীরে পাম্প বসাতে হচ্ছে । ওয়াসার ইঞ্জিনিয়াররা প্রতি বছর মাটির গভীরে আরও নিচে নামতে বাধ্য হচ্ছেন, যা প্রমাণ করে যে আমরা একটি ‘ডেথ স্পাইরাল’-এ প্রবেশ করেছি। পানির স্তর প্রতি বছর ২-৩ মিটার করে নিচে নামছে, এবং এই হার ত্বরান্বিত হচ্ছে ।

    ২.২ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি বিপর্যয় এবং ক্রপ প্যাটার্ন পরিবর্তন

    পানির এই সংকট কেবল ঢাকার মতো মেগাসিটিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে। উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চল (রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ) একসময় ধানের ভাণ্ডার ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে সেচ কাজের জন্য শ্যালো মেশিন বা সাধারণ টিউবওয়েলে আর পানি উঠছে না। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BMDA)-এর ডেটা অনুযায়ী, পানির স্তর অনেক জায়গায় ১৫০-২০০ ফুটের নিচে নেমে গেছে 10। এর ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে ধান চাষ—যা প্রচুর পানি বা ‘ওয়াটার ইনটেন্সিভ’ ফসল—বাদ দিয়ে আম, পেয়ারা বা ড্রাগন ফলের বাগান করছেন ।

    এই পরিবর্তনকে আপাতদৃষ্টিতে ‘কৃষি বৈচিত্র্যকরণ’ বলা হলেও, এর পেছনের কারণটি হলো টিকে থাকার লড়াই। ১ কেজি বোরো ধান ফলাতে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয় । যখন মাটির নিচ থেকে এই পানি তোলা অসম্ভব বা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে (বিদ্যুৎ ও ডিজেলের খরচ বেড়ে যাওয়ায়), তখন কৃষকের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকে না। এটি প্রমাণ করে যে, পানির অভাব ইতিমধ্যেই আমাদের কৃষি মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে যখন পানির স্তর আরও নিচে নামবে, তখন ফলের বাগান করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

    ২.৩ নদী ও বন্যার পানি: রিচার্জের ভ্রান্ত তত্ত্ব

    একটি প্রচলিত ধারণা বা ‘মিথ’ হলো, বাংলাদেশ যেহেতু বদ্বীপ এবং এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও বন্যা হয়, তাই মাটির নিচের পানির স্তর প্রাকৃতিকভাবে রিচার্জ বা পূর্ণ হয়ে যায়। একে তাত্ত্বিকভাবে “Bengal Water Machine” বলা হলেও, সাম্প্রতিক হাইড্রো-জিওলজিক্যাল স্টাডি এবং মাটির গঠন বিশ্লেষণ এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। ঢাকা এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির নিচে ৩০ থেকে ১০০ ফুট পুরু লাল এঁটেল মাটি (Madhupur Clay) বা কাদার স্তর রয়েছে । এই কাদার স্তরটি একটি অভেদ্য বা “Impermeable” পর্দার মতো কাজ করে, অনেকটা পলিথিন শিটের মতো।

    বন্যার পানি যখন মাটির ওপরে ভাসে, তখন তা এই আঠালো কাদার স্তর ভেদ করে মাটির গভীর স্তরে (Deep Aquifer)—যেখান থেকে আমরা পরিষ্কার পানি তুলি—সেখানে পৌঁছাতে পারে না। একে ভূতাত্ত্বিক ভাষায় বলা হয় “Aquitard”। গবেষণায় দেখা গেছে, ওপরের স্তর থেকে এক ফোঁটা পানি গভীর স্তরে পৌঁছাতে ১০০ থেকে ৫০০ বছর সময় নিতে পারে 10। অথচ আমরা শক্তিশালী পাম্প দিয়ে সেই পানি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তুলে ফেলছি। অর্থাৎ, মাটির নিচের ব্যাংক থেকে টাকা তোলার গতি (Extraction Rate) টাকা জমা হওয়ার গতির (Recharge Rate) চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি। ফলে প্রতি বছরই ঘাটতি বাড়ছে এবং একটি স্থায়ী শূন্যতা বা “Permanent Deficit” তৈরি হচ্ছে 10। এছাড়া, ঢাকার মতো শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং কংক্রিটের জঙ্গল বৃষ্টির পানিকে মাটির সংস্পর্শে আসতে দেয় না; পানি ড্রেন হয়ে নদীতে এবং অবশেষে সাগরে চলে যায়, যাকে বলা হয় “Runoff” ।

    ২.৪ লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং আর্সেনিকের বিষ

    ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে উপকূলীয় জেলাগুলোতে এক নতুন বিপর্যয় দেখা দিয়েছে—লবণাক্ততা বৃদ্ধি বা “Salinity Intrusion”। মাটির নিচের মিষ্টি পানির চাপ বা প্রেসার কমে গেলে সাগরের লোনা পানি সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে মাটির নিচ দিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। সাতক্ষীরা, খুলনা বা বাগেরহাটের মতো এলাকাগুলোতে সাধারণ টিউবওয়েলে এখন লোনা পানি উঠছে, যা পান করা বা চাষাবাদ কোনো কাজেই লাগে না । মানুষ চারদিকে পানিতে থেকেও মাইলের পর মাইল হেঁটে এক কলসি মিষ্টি পানির জন্য ছুটছে।

    অন্যদিকে, মাটির উপরের স্তরের (Shallow Aquifer) পানিতে আর্সেনিক এবং নানা ধরনের জীবাণুর উপস্থিতি থাকায় মানুষ গভীর নলকূপের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু সেই গভীর স্তরের পানিও যখন শেষ হয়ে যাবে বা লোনা হয়ে যাবে, তখন আমাদের সামনে বিকল্প কী? সাগরের পানি শোধন করে পানযোগ্য করা বা “Desalination” প্রযুক্তি ইসরায়েল বা সৌদি আরবের মতো ধনী দেশগুলোর পক্ষে সম্ভব হলেও, বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য তা অসম্ভব। বর্তমানে মাটির নিচের ১,০০০ লিটার পানি তুলতে খরচ হয় মাত্র ৩-৫ টাকা (বিদ্যুৎ খরচ), কিন্তু সমপরিমাণ সাগরের পানি শোধন করে পাইপলাইনের মাধ্যমে ঢাকায় আনতে খরচ পড়বে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা । এই ৪০-৫০ গুণ বেশি খরচ বহন করার সামর্থ্য সরকার বা সাধারণ জনগণ কারোরই নেই। ফলে, ভবিষ্যতে পানি থাকলেও তা “কেনার ক্ষমতা” মানুষের থাকবে না।


    অধ্যায় ৩: অর্থনৈতিক বিভ্রম এবং রেমিট্যান্সের চক্র – ভবিষ্যৎ অন্ধকারের পূর্বাভাস

    ৩.১ রেমিট্যান্সের ‘ভেন্টিলেশন’ বা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম

    বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাকে একটি “আর্টিফিশিয়াল লাইফ সাপোর্ট” বা ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা যায়। এই ব্যবস্থার মূল মন্ত্র হলো একটি চক্র: মানুষ রপ্তানি করো > ডলার আনো > খাবার ও পণ্য কেন > বেঁচে থাকো । দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থান এবং সম্পদের অভাব থাকায় আমরা আমাদের “উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা” বা ‘Surplus Population’-কে বিদেশে রপ্তানি করছি। এই প্রবাসী শ্রমিকরা, যারা মূলত অদক্ষ বা সেমি-স্কিলড, হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খেটে দেশে ডলার পাঠাচ্ছে। এই ডলার দিয়েই আমরা বিদেশ থেকে খাদ্য, জ্বালানি এবং বিলাসদ্রব্য আমদানি করছি। অর্থাৎ, রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির সেই অক্সিজেন, যা বন্ধ হলে পুরো সিস্টেমটি ধসে পড়বে।

    ৩.২ দ্বিতীয় প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ এবং প্রভাবের অভাব

    রেমিট্যান্সের প্রবাহ চিরস্থায়ী নয়। প্রথম প্রজন্মের প্রবাসীরা (যারা বর্তমানে বিদেশে আছেন) দেশে থাকা মা-বাবা বা ভাই-বোনের প্রতি আবেগের টানে টাকা পাঠান। কিন্তু তাদের সন্তানরা, অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রজন্ম (Second Generation), যারা বিদেশের মাটিতে এবং বিদেশি সংস্কৃতিতে বড় হচ্ছে, তাদের বাংলাদেশের প্রতি সেই নাড়ির টান বা দায়বদ্ধতা থাকবে না। ফলে, এক প্রজন্মের মধ্যেই “Direct Cash Flow” বা সরাসরি টাকার প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার শতভাগ ঝুঁকি রয়েছে 1

    ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চীন বা ভারতের প্রবাসীরাও একসময় টাকা পাঠানো কমিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা টাকার বদলে দেশে নিয়ে এসেছে “প্রভাব” (Influence) এবং “বিনিয়োগ” (Investment)। তারা বিদেশের বড় বড় টেক জায়ান্ট বা বহুজাতিক কোম্পানির সিইও বা নীতি নির্ধারক হয়ে দেশের জন্য লবিং করেছে বা অফিস খুলেছে । কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ, আমরা মূলত যে “লেবার ক্লাস” বা অদক্ষ শ্রমিক রপ্তানি করছি, তাদের সন্তানরা কি বিদেশের মূলধারায় (Mainstream) মিশে সেই “ইনফ্লুয়েন্সার” লেভেলে পৌঁছাতে পারছে? নাকি তারাও সেখানে নিম্ন আয়ের কাজে বা স্ট্রাগল করে জীবন কাটাচ্ছে? যদি তারা মূলধারায় মিশতে না পারে, তবে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ না পাবে টাকা, না পাবে কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব। এটি আমাদের জন্য একটি “Lose-Lose Situation” তৈরি করবে ।

    ৩.৩ সস্তা শ্রমের দিন শেষ এবং অটোমেশনের হুমকি

    বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্ববাজারে টিকে আছে মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর ভর করে, যার প্রধান চালিকাশক্তি হলো সস্তা শ্রম। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’-এর আগমনে এই সুবিধাও হুমকির মুখে। উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে জার্মানি ও আমেরিকা, এখন অটোমেশন এবং রোবোটিক্সের দিকে ঝুঁকছে। যদি তারা রোবট দিয়ে টি-শার্ট তৈরি শুরু করে, তবে তাদের উৎপাদন খরচ বাংলাদেশের শ্রমিকের চেয়েও কম হবে এবং জাহাজ ভাড়ার (Shipping Cost) কোনো প্রয়োজন হবে না ।

    আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে যদি অটোমেশনের কারণে আমাদের গার্মেন্টস অর্ডার ৩০% থেকে ৪০% কমে যায়, তবে লাখ লাখ মানুষ বেকার হবে। একই সময়ে যদি দ্বিতীয় প্রজন্মের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে ভাটা পড়ে, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে “ডলার সংকট” এক ভয়াবহ রূপ নেবে। তেল, গ্যাস বা খাদ্য আমদানির মতো মৌলিক চাহিদা মেটানোর ডলার তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে থাকবে না। শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধস আমাদের জন্য একটি টাটকা উদাহরণ, যেখানে ডলার সংকটের কারণে পুরো দেশ অচল হয়ে পড়েছিল ।

    ৩.৪ বৈশ্বিক ইমিগ্রেশন ফিল্টার: ‘Skilled’ বনাম ‘Dependent’

    অনেকে ভাবেন জনসংখ্যা বাড়লে সমস্যা নেই, তাদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু এই ধারণাটি ভুল। উন্নত বিশ্ব এখন আর ঢালাওভাবে অভিবাসন বা ইমিগ্রেশন দিচ্ছে না; তারা এখন “ফিল্টার” করছে । জাপান, জার্মানি বা কানাডার জনসংখ্যা কমছে এবং তাদের মানুষের দরকার, এটা সত্য। কিন্তু তাদের দরকার “Skilled Human” বা দক্ষ মানুষ, কোনো “Dependent Human” বা অদক্ষ বোঝা নয়। আমাদের অদক্ষ জনশক্তি এখন বিশ্বের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যদি আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে দক্ষ করতে না পারি এবং জনসংখ্যা কমানোর নীতি গ্রহণ করি, তবে ৩০ বছর পর আমরা “Japan Scenario”-তে পড়ব—অর্থাৎ একটি বয়স্ক মানুষের দেশ—কিন্তু জাপানের মতো আমাদের কোনো সঞ্চিত অর্থ বা সম্পদ থাকবে না। একে অর্থনীতিতে বলা হয় “Getting old before getting rich” বা ধনী হওয়ার আগেই বুড়ো হয়ে যাওয়া ।


    অধ্যায় ৪: ২০৩০-৩৫ সালের মহাবিপর্যয় এবং কফিনে শেষ পেরেক

    ৪.১ জ্বালানি সংকট: ২০৩০ সালের ডেডলাইন

    বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প এবং বিদ্যুৎ খাতের একটি বিশাল অংশ সস্তা ও নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই সস্তা জ্বালানির দিন ফুরিয়ে আসছে। পেট্রোবাংলার রিপোর্ট এবং ভূতাত্ত্বিক জরিপ অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাসের রিজার্ভ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে । বর্তমানে আমরা চড়া দামে এলএনজি (LNG) আমদানি করে এই ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু ডলার সংকটের কারণে তা টেকসই হচ্ছে না।

    ২০২৫ সালের ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (IEA) রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে, এলএনজি আমদানির ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আগামী দশকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে । গ্যাস ফুরিয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৩ থেকে ৪ গুণ বেড়ে যাবে। এর সরাসরি এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাব পড়বে কৃষিতে। সেচ পাম্প চালানোর খরচ বাড়লে ধানের উৎপাদন খরচ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। সরকার তখন আর ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না ।

    ৪.২ খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলার সমীকরণ

    বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের কফিনে শেষ পেরেকটি কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা দুর্নীতি হবে না; এটি হবে পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতির একটি বিন্দুতে মিলে যাওয়া—”যেদিন ১ কেজি চাল উৎপাদনের খরচ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাবে” । একে অর্থনৈতিক ভাষায় বলা হয় “Stagflation with Resource Scarcity”। ২০৩০-৩৫ সালের দিকে যখন পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সেচ খরচ বাড়বে এবং গ্যাসের অভাবে সারের দাম আকাশছোঁয়া হবে, তখন চালের কেজি ২০০-৩০০ টাকায় পৌঁছাতে পারে।

    একই সময়ে ডলার সংকটের কারণে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি ব্যাহত হলে দেশে দুর্ভিক্ষাবস্থা তৈরি হবে। ক্ষুধার্ত মানুষ তখন কোনো যুক্তি, ধর্ম বা দেশপ্রেম মানবে না। এর ফলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা (Civil Unrest), খাদ্য গুদাম লুণ্ঠন এবং রাস্তায় ছিনতাই নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হবে। পুলিশ বা সামরিক বাহিনী দিয়ে ১৮ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এটি একটি “Death Spiral” বা মরণফাঁদ, যেখানে একটি সমস্যা অন্যটিকে আরও তীব্র করে তুলবে ।

    ৪.৩ জলবায়ু পরিবর্তন এবং বর্ডার ক্লোজার: আটকা পড়া জনগোষ্ঠী

    ভবিষ্যতের এই বিপর্যয়ের সাথে যুক্ত হবে জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭% জমি পানির নিচে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা কোটি কোটি মানুষকে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে (Climate Refugees) পরিণত করবে । অতীতে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় হিজরত করতে পারত, কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে তা অসম্ভব। ভারত ইতিমধ্যেই কাঁটাতার দিয়ে সীমান্ত ঘিরে রেখেছে এবং তারা কোনোভাবেই এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে ঢুকতে দেবে না। উন্নত বিশ্বও তাদের বর্ডার সিল করে দেবে। ফলে এই বিপুল জনগোষ্ঠী একটি ছোট ভূখণ্ডে আটকা পড়বে। এই পরিস্থিতিকে “Malthusian Correction” বা প্রকৃতির নিষ্ঠুর ভারসাম্য রক্ষা প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে মহামারী, দুর্ভিক্ষ বা গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে জনসংখ্যা কমে আসবে ।

    ৪.৪ সামষ্টিক আচরণে বিপর্যয়ের লক্ষণ (Collective Behavior)

    সরকারি ডেটা বা পরিসংখ্যান আড়াল করা হলেও, সমাজের মানুষের সামষ্টিক আচরণে (Collective Behavior) আসন্ন বিপর্যয়ের লক্ষণগুলো এখনই ফুটে উঠছে।

    ১) টিসিবির ট্রাকের পেছনে এখন শুধু বস্তিবাসী নয়, ভদ্রলোকরাও দাঁড়াচ্ছে। লজ্জা ঢাকতে তারা মাস্ক বা হেলমেট পরে থাকছে। এটি প্রমাণ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে (Hidden Poverty)।

    ২) মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় তারা ১ লিটার তেল বা বড় শ্যাম্পুর বোতল না কিনে ৫-১০ টাকার মিনিপ্যাক বা খোলা পণ্য কিনছে। এটি ব্যাপক দারিদ্র্যের লক্ষণ (Poverty Penalty)।

    ৩) মানুষের ভাতের পাতে মাছ বা মাংসের টুকরো ছোট হয়ে গেছে বা গায়েব হয়ে গেছে। তারা এখন প্রোটিন বাদ দিয়ে সস্তা কার্বোহাইড্রেট (ভাত/আলু/ভর্তা) খেয়ে পেট ভরাচ্ছে। এটি ‘পুষ্টির অভাব’ বা ‘Hidden Hunger’-এর লক্ষণ।

    ৪) নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি জেনেও মানুষ সাগর বা জঙ্গল পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাবা-মা শেষ সম্বল বিক্রি করে সন্তানকে অনিশ্চিত যাত্রায় পাঠাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে সমাজে দেশে টিকে থাকার আশা শেষ হয়ে গেছে (Mass Desperation)।

    ৫) তুচ্ছ ঘটনায় বা সামান্য তর্কে মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলার (গণপিটুনি) প্রবণতা বেড়েছে। এটি প্রমাণ করে মানুষের মানসিক সহ্যক্ষমতা শূন্যের কোঠায় এবং তারা চরম মানসিক চাপে (Resource Stress) ভুগছে।

    ৬) ৩০-৩৫ বছরের যুবকরা বিয়ে করতে ভয় পাচ্ছে এবং দম্পতিরা সন্তান নিতে চাইছে না। এটি প্রমাণ করে তারা নিজেদের এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম শঙ্কিত (Future Confidence Crisis)।

    ৭) পরিশ্রম করে ধনী হওয়ার পথ বন্ধ হওয়ায় তরুণরা অনলাইন জুয়া, বেটিং বা শর্টকাট পথে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার চেষ্টা করছে। এটি চরম অর্থনৈতিক হতাশার (Economic Despair) লক্ষণ।

    ৮) ব্যাংকের ওপর আস্থা হারিয়ে মানুষ টাকা তুলে ঘরে রাখছে অথবা ডলার ও সোনা কিনে জমাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর মানুষের ন্যূনতম বিশ্বাসটুকুও ভেঙে গেছে (Trust Deficit)।

    ৯) “পড়ে কী হবে, মামা-চাচার জোর না থাকলে চাকরি নাই”—এই বিশ্বাস থেকে মানুষ ডিগ্রির চেয়ে বিদেশ যাওয়ার স্কিলকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে সমাজে মেধার চেয়ে এখন ‘টিকে থাকা’ (Survival) মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    ১০) সমাজে বাহ্যিক ধর্মাচার (লেবাস/ওয়াজ) বাড়লেও একই সাথে দুর্নীতি ও ভেজাল বাড়ছে। মানুষ বিপদে পড়ে ঐশ্বরিক সাহায্য চাইছে, কিন্তু টিকে থাকতে গিয়ে অনৈতিক কাজ করছে। এটি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্যারাডক্স (Survival Instinct)।

    ১১) উর্বর কৃষি জমিতে সাইনবোর্ড ঝুলছে আবাসনের। জাতি খাবার উৎপাদনের চেয়ে ইট-পাথরের দালানকে বেশি লাভজনক মনে করছে, যা ভবিষ্যতের দুর্ভিক্ষের আগাম বার্তা।

    ১২) ভালো পরিবারের সন্তানরাও এখন ছিনতাই বা কিশোর গ্যাং কালচারে জড়াচ্ছে। এটি নেশার জন্য নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজের খরচ চালানো বা টিকে থাকার জন্য করা হচ্ছে (Survival Crime)।


    অধ্যায় ৫: অতীত পর্যালোচনা – সবুজ বিপ্লব এবং ভ্রান্ত নীতি

    ৫.১ সবুজ বিপ্লব: সাময়িক স্বস্তি, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি

    ষাটের দশকে যখন “সবুজ বিপ্লব” (Green Revolution) শুরু হয়েছিল, তখন উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান (HYV) এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। এটি স্বল্পমেয়াদে সফল হয়েছিল এবং আমরা দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি মাটির উর্বরতা এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে । এক ফসলি জমি বা “Monoculture”-এর কারণে মাটির মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট বা অনুখাদ্য শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা সেই ভুলের মাশুল দিচ্ছি। মাটির প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনা আর সম্ভব হচ্ছে না, এবং ফলন ধরে রাখতে আরও বেশি সার ও কীটনাশক ঢালতে হচ্ছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যকে বিষিয়ে তুলছে ।

    ৫.২ গ্যাসের অপচয় এবং নীতিগত ব্যর্থতা

    অতীতের আরেকটি বড় ভুল ছিল প্রাকৃতিক গ্যাসের অপব্যবহার। আমরা আমাদের মূল্যবান গ্যাস সম্পদকে সস্তা বিদ্যুৎ এবং গৃহস্থালি কাজে পুড়িয়ে ফেলেছি, যা দিয়ে হয়তো উচ্চমূল্যের শিল্প বা পেট্রোকেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা যেত। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে রিজার্ভ সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি । অনুসন্ধান বা এক্সপ্লোরেশনে বিনিয়োগ না করার কারণে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি, যার ফলে আজ আমরা আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছি। পেট্রোবাংলার তথ্যে দেখা যায়, গত দুই দশকে যে পরিমাণ গ্যাস খরচ হয়েছে, তার তুলনায় নতুন আবিষ্কার নগণ্য ।


    অধ্যায় ৬: রাজনৈতিক এবং মতাদর্শিক সমাধান – সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

    ৬.১ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব: সত্য গোপনের সংস্কৃতি

    দেশের রাজনীতিবিদ এবং নীতি নির্ধারকরা এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটগুলো সম্পর্কে অবগত থাকলেও, তারা অপ্রিয় সত্য প্রকাশে বা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে কুণ্ঠাবোধ করেন। গণতন্ত্র বা হাইব্রিড সিস্টেমে “জনপ্রিয়তা” হলো প্রধান মুদ্রা। ২০৩৫ সালের বিপর্যয় ঠেকাতে আজ যদি গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়, পানির ওপর কর আরোপ করা হয় বা কঠোর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন (যেমন: দুই সন্তানের বেশি হলে সরকারি সুবিধা বাতিল) করা হয়, তবে তা রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল হবে। তাই তারা “Kick the can down the road” নীতি অবলম্বন করেন, অর্থাৎ সমস্যাটি ভবিষ্যতের সরকারের ঘাড়ে ঠেলে দেন 1। পাশাপাশি, পরিসংখ্যান ম্যানিপুলেশন বা “Data Dressing”-এর মাধ্যমে প্রকৃত বেকারত্ব, দারিদ্র্য বা রিজার্ভের তথ্য আড়াল করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা সমস্যা সমাধানে বাধার সৃষ্টি করে।

    ৬.২ ইসলামী মডেল: তাত্ত্বিক সমাধান বনাম ভৌত বাস্তবতা

    দেশের একটি বড় অংশ ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে বা ইসলামী অর্থনীতিকে সমাধান হিসেবে মনে করে। ইসলামী দলগুলোর ইশতেহারে সুষম বণ্টন, জাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি এবং সাদাসিধে জীবনের কথা বলা হয়, যা দুর্নীতি ও অপচয় রোধে (Israf) কার্যকর হতে পারে । কিন্তু ভৌত সীমাবদ্ধতা (Physical Limits) বা জমি ও পানির অভাব কেবল নৈতিকতা দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। আপনি যদি দেশের সব ধনীর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগও করে দেন, তবুও মাথাপিছু জমির পরিমাণ ০.২০ একরই থাকবে; তা বাড়বে না ।

    তবে আপলোডকৃত দলিলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, ইসলামী দলগুলো যদি ক্ষমতায় আসে এবং তারা যদি “টেকনোক্র্যাটিক ইসলাম” বা বিজ্ঞান ও ধর্মের হাইব্রিড মডেল অনুসরণ করে, তবে কিছু সমাধান আসতে পারে। যেমন:

    • জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ: ইরানের মতো “ইজতিহাদ” প্রয়োগ করে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ফতোয়া জারি করা।
    • সুকুক বন্ড: আইএমএফ-এর সুদের ঋণের বদলে সম্পদ-ভিত্তিক (Asset-backed) সুকুক বন্ডের মাধ্যমে মেগা প্রজেক্টের অর্থায়ন করা 33
    • ওয়াকফ: অব্যবহৃত জমি বা সম্পদকে ওয়াকফের আওতায় এনে জাতীয় জলাধার বা সোলার প্ল্যান্ট তৈরি করা।
    • হিমা নীতি: কৃষি জমি রক্ষায় ইসলামের “হিমা” (সংরক্ষিত এলাকা) নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা ।

    কিন্তু চ্যালেঞ্জ হলো, যদি তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির (যেমন: জিএমও ফুড, নিউক্লিয়ার এনার্জি) চেয়ে আবেগ বা ধর্মীয় রক্ষণশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে খাদ্য ও শক্তি নিরাপত্তা আরও গভীর সংকটে পড়বে।

    ৬.৩ হাইব্রিড রাজনৈতিক মডেল: অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা

    বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কোনো একক মতবাদ হয়তো যথেষ্ট হবে না। এর জন্য প্রয়োজন “উদারপন্থী এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের” একটি হাইব্রিড মডেল বা “Techno-Islamic Alliance”। এই মডেলে অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, প্রযুক্তি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ চলবে সম্পূর্ণ কঠোর বিজ্ঞান ও ডেটার ভিত্তিতে—যেখানে আবেগের কোনো স্থান নেই। অন্যদিকে, বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে ধর্মীয় নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে কাজে লাগানো হবে। মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ বা তুরস্কের শুরুর দিকের মডেল এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে । তবে নারী স্বাধীনতা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে এই দুই মেরুর সংঘাত নিরসন করা হবে এই মডেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।


    উপসংহার: কোনো ম্যাজিক নয়, প্রয়োজন কঠোর বাস্তবতা মেনে নেওয়া

    এই দীর্ঘ বিশ্লেষণ এবং শত শত গবেষণা তথ্যের আলোকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি “ধার করা সময়ে” (Borrowed Time) চলছে। আমাদের বর্তমান সমৃদ্ধি বা স্থিতিশীলতা মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে: (১) মাটির নিচের জমানো পানি, (২) মাটির নিচের সস্তা গ্যাস, এবং (৩) প্রবাসীদের পাঠানো রক্ত-ঘাম করা অর্থ। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই তিনটি স্তম্ভই দ্রুত ফুরিয়ে আসছে বা হুমকির মুখে পড়ছে। ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সাল হবে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, যখন এই রিসোর্স কার্ভগুলো (Resource Curves) একে অপরকে ছেদ করবে এবং সংকটগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে এক মহাবিপর্যয়ের রূপ নেবে।

    নেদারল্যান্ডসের মতো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা জাপানের মতো আর্থিক সচ্ছলতা ছাড়া কেবল জনসংখ্যা কমিয়ে বা রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে এই বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের মতো উদ্যোগগুলো প্রয়োজনীয় হলেও, ১৮ কোটি মানুষের বিশাল চাহিদার বিপরীতে তা সাগরে এক ফোঁটা জলের মতো। প্রয়োজন অতিদ্রুত জাতীয় পর্যায়ে কৃষি প্রযুক্তির আমূল আধুনিকায়ন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও নির্মম নীতি গ্রহণ, এবং পানি ও জ্বালানি ব্যবহারে জিরো টলারেন্স নীতি। অন্যথায়, ভৌত সীমাবদ্ধতার এই নির্মম সমীকরণে বাংলাদেশ একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে বা মানবিক বিপর্যয়ের করুণ উদাহরণে পরিণত হতে পারে। রাজনীতি, ধর্ম বা আবেগ দিয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতির এই ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করার বা এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ আমাদের হাতে নেই।


    Works cited

    1. International Agricultural Productivity – Documentation and Methods – USDA ERS, accessed December 7, 2025, https://www.ers.usda.gov/data-products/international-agricultural-productivity/documentation-and-methods
    2. Bangladesh Arable Land | Historical Chart & Data – Macrotrends, accessed December 7, 2025, https://www.macrotrends.net/global-metrics/countries/bgd/bangladesh/arable-land
    3. Arable land (hectares per person) – World Bank Open Data, accessed December 7, 2025, https://data.worldbank.org/indicator/AG.LND.ARBL.HA.PC
    4. How many Earths? How many countries? – Earth Overshoot Day – Global Footprint Network, accessed December 7, 2025, https://overshoot.footprintnetwork.org/how-many-earths-or-countries-do-we-need/
    5. Open Data Platform – Global Footprint Network, accessed December 7, 2025, https://data.footprintnetwork.org/
    6. Bangladesh to remain world’s top cotton importer in 2025-26, accessed December 7, 2025, https://bd.apparelresources.com/business-news/trade/bangladesh-remain-worlds-top-cotton-importer-2025-26/
    7. Assessing the Socio-Economic and Natural Factors Shaping Türkiye’s Virtual Land Trade Balance – MDPI, accessed December 7, 2025, https://www.mdpi.com/2071-1050/17/17/8034
    8. Savings depleted middle class under strain amid inflation – Fahmida Khatun | CPD, accessed December 7, 2025, https://cpd.org.bd/savings-depleted-middle-class-under-strain-amid-inflation/
    9. Changes in Paddy Soil Fertility in Bangladesh Under the Green Revolution – ResearchGate, accessed December 7, 2025, https://www.researchgate.net/publication/361430762_Changes_in_Paddy_Soil_Fer
    10. ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নামছে কোথায় কোথায় https://www.prothomalo.com/bangladesh/environment/7fmrtjg6z1

  • সোনায় সর্বনাশ

    আমাদের এই ‘সোনার বাংলা’য় সোনা ফলুক আর না ফলুক, আলমারির লকারে সোনা থাকাটা কিন্তু চাই-ই চাই। মতিঝিলের যে কেরানি ভদ্রলোকটি সারাজীবন লোকাল বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে অফিস করলেন, কিংবা পুরান ঢাকার যে ব্যবসায়ীটি ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গদিতে বসে দিন পার করলেন—দিনশেষে তাঁদের উভয়েরই জীবনের একমাত্র মহৎ উদ্দেশ্য হলো মেয়ের বিয়ের জন্য অন্তত বিশ ভরি সোনা জমানো। ব্যাপারটা কী জানেন? আমাদের দেশে সোনা জিনিসটা ঠিক অলংকার নয়, ওটা হলো মধ্যবিত্তের ‘লাইফ জ্যাকেট’। গুলশানের কোনো কমিউনিটি সেন্টারে নববধূর গাভর্তি গয়না দেখে আত্মীয়স্বজনরা যতটা না তার রূপের প্রশংসা করেন, তার চেয়ে ঢের বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন—যাক বাবা, মেয়েটার ভবিষ্যৎ একেবারে ‘নিশ্ছিদ্র’ হলো! অর্থনীতির বাঘা বাঘা পণ্ডিতরা যাকে বলেন ‘ডেড ক্যাপিটাল’ বা মরা পুঁজি, আমাদের খালাম্মা-চাচিদের কাছে সেটাই হলো একমাত্র ‘জীবন্ত বিমা’। সোজা কথায়, আমরা সোনা কিনি সাজতে নয়, আমরা সোনা কিনি বাঁচতে।

    গয়না কেনার সময় প্যারিসের কোনো মাদাম আর আমাদের ঢাকার ভাবিদের মাথার ভেতরের ক্যালকুলেটরটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা নিয়মে চলে। একজন পশ্চিমা নারী যখন জুয়েলারি শপে যান, তিনি ভাবেন—”এই নেকলেসটা কি আমার ইভিনিং গাউনের সাথে মানাবে? ডিজাইনটা কি যথেষ্ট ইউনিক?” তাঁদের কাছে গয়না হলো ফ্যাশন, অনেকটা ড্রয়িংরুমের শৌখিন ল্যাম্পশেডের মতো—দেখতে সুন্দর, কিন্তু বিপদে ওটা দিয়ে পেট ভরবে না। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁদের আসল লক্ষ্মী তো বাঁধা আছে ব্যাংকে, বিমায় আর শেয়ার বাজারে। কিন্তু আমাদের মায়েরা? তাঁরা গয়না কেনার সময় ডিজাইনের দিকে তাকান আড়চোখে, আর আসল নজরটা থাকে ওজনের কাঁটায় আর হলমার্কের সিলমোহরে। কেনার মুহূর্তেই তাঁদের মাথায় ঘুরপাক খায়—”ধরা যাক কালই যদি জামাইটা বখাটেগিরি করে তাড়িয়ে দেয় কিংবা ব্যবসা লাটে ওঠে, তবে এটা বেচে কত পাওয়া যাবে?” খাদহীন একুশ ক্যারেট সোনার প্রতি আমাদের এই যে নাড়ির টান, তা প্রমাণ করে যে আমরা গয়নাকে গয়না ভাবি না, ভাবি ‘পোর্টেবল এটিএম বুথ’—যা শাড়ির আঁচলে বেঁধে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেখানে খুশি নিয়ে যাওয়া যায়।

    কিন্তু বাঙালির এই হাড়কাঁপানো নিরাপত্তাহীনতা এল কোত্থেকে? এর শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের একটু টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে যেতে হবে সাড়ে তিনশো বছর আগে, সোজা মোগল সুবেদারদের আমলে। বিনয় ঘোষের ‘বাদশাহী আমল’ বইটিতে ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের আমাদের এই গোপন অসুখটার নাড়ি টিপে ধরেছেন। বার্নিয়ের সাহেব মোগল ভারতে এসে তো থ! দেখলেন, এ দেশে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ বা প্রাইভেট প্রপার্টি বলে কিচ্ছুটি নেই। যা আছে সব সম্রাটের বা সুবেদারের। আজ আপনি জমিদার, কাল সুবেদার চোখ রাঙালে আপনি পথের ভিখারি। স্থাবর সম্পত্তি বলে কিছু নেই, সবই ‘অস্থাবর’।

    বার্নিয়ের লিখছেন, এই যে আজ আছি কাল নেই—এই ভয় থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষরা একটা অদ্ভুত ফন্দি আঁটল। দালান-কোঠা তো আর পকেটে করে পালানো যায় না, আর মগ জলদস্যু কিংবা মোগল পেয়াদা যেকোনো সময় তা কেড়ে নিতে পারে। তাই বুদ্ধিমান বাঙালি তার সব ধন-সম্পত্তি গলিয়ে সোনা বানিয়ে ফেলল। তারপর সেই সোনা মাটির হাঁড়িতে করে পুঁতে রাখল, নয়তো গয়না বানিয়ে বাড়ির মেয়েদের গায়ে চড়িয়ে দিল। যাতে যুদ্ধ বাধুক বা মহামারি আসুক—গয়নাটুকু নিয়ে সোজা দৌড় দেওয়া যায়। বিনয় ঘোষের মতে, আমাদের এই সোনাপ্রীতি কোনো বিলাসিতা নয় মশাই, এ হলো ইতিহাসের এক মজ্জাগত ভয় থেকে জন্মানো আত্মরক্ষার ঢাল।

    মজার ব্যাপার হলো, সেই শায়েস্তা খাঁ-ও নেই, মগ দস্যুও নেই; এখন আমাদের ব্যাংক আছে, শেয়ার বাজার আছে—তবু সেই ভয়টা আমাদের জিন থেকে যায়নি। মোগল আমলে এই অভ্যাসের ফলে বাংলা হয়েছিল ‘সোনার চোরাবালি’ বা ‘Sink of Gold’। সারা দুনিয়ার সোনা এ দেশে ঢুকত বটে, মসলিন বিক্রি করে আমরা সোনা আনতাম, কিন্তু তা আর বের হতো না। টাকাটা বাজারে না খেটে সিন্দুকবন্দি হয়ে থাকত বলে এ দেশে শিল্পবিপ্লব হলো না, হলো শুধু তাঁতি আর কারিগর। আজও আমরা সেই একই তিমিরে। হাজার হাজার কোটি টাকা আমরা আলমারিতে ফেলে রেখেছি ‘নিরাপত্তা’র নামে। অথচ এই টাকাটা যদি গাজীপুর বা সাভারের কোনো কারখানায় খাটত, তবে হয়তো আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকরির জন্য মামা-চাচা ধরতে হতো না।

    ‘সোনায় সর্বনাশ’ কথাটা শুনতে কানে লাগলেও, ওটাই খাঁটি সত্য। সোনা জমিয়ে আমরা নিজেদের বড়লোক ভাবি বটে, কিন্তু আদতে আমরা হচ্ছি সেই কৃপণ যে টাকার ওপর শুয়ে থেকেও না খেয়ে মরে। বিনয় ঘোষ আর বার্নিয়েরের চশমা দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বাঙালি নারীর ওই গয়নার বাক্সটা আসলে সৌন্দর্যের আধার নয়, ওটা হলো আমাদের কয়েক শতাব্দীর অবিশ্বাসের এক করুণ দলিল। সোনাকে যতদিন আমরা ‘গয়না’ না ভেবে ‘বিমা’ ভাবব, ততদিন আমরা সত্যিকারের ধনী হতে পারব না। এখন সময় এসেছে সোনাকে গলায় না ঝুলিয়ে, পুঁজিকে বাজারে খাটানোর—তবেই যদি আমাদের ‘সোনার বাংলা’র কপালটা সত্যি সত্যি একটু খোলে!

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ২৫ শে নভেম্বর, ২০২৫ ইং

  • নাইওর

    নাইওর

    আমেনা আসলো রহিম মিয়ার হইয়া নতুন বউ,
    আলতা পায়ে, মুখে হাসি, আনন্দের ঢেউ।
    বিয়ার বাশি থামতে না’ই, মাস গেলো ছয় গুনি,
    রহিম কইলো, “যাই বিদেশ, অভাবে দুই আনি।”
    আমেনা রয় শশুর বাড়ি, ঘোমটা দিয়া মুখে,
    চাইল মাপায়, চুলা ঠ্যালায়, কাইন্দা মরে দুখে।
    মন যে তার পইড়া আছে বাপের বাড়ির পানে,
    ‘নাইওর’ যাইবো কবে সে-ই? আল্লা-তালায় জানে।
    কবে আবার বাপের বাড়ি যাইবো আমেনা?
    মা’য়ের কাছে কইবো কথা, মন যে মানেনা।
    দিন আসে দিন ফুরায় আমেনার ‘নাইওর’ যাওয়ার আশা,
    শুকনা মুখে, কাইন্দা কাইন্দা তার বুকখান ভাসা।

    আর সে রহিম, দূর মুলুকে, ঘামে ভিজায় গা,
    টাকা কামায়, মাটির লাগি পরান যারে যা।
    দেশ মানেই আমেনা তার, দেশ মানেই ঘর,
    রহিমের ও ‘নাইওর’ লাগে, বুকটা থরথর।
    আমেনা চায় বাপের বাড়ি, রহিম যে চায় দেশ,
    দুই জনারই ‘নাইওর’ চাওয়া, দুঃখ নাহি শেষ।
    এক নাইওরের আশা বাঁচে আমেনার ওই চোখে,
    আরেক নাইওর রহিম মিয়া, পরবাসী ওই বুকে।
    আমেনা লেখে, “কবে আসবা?” কাগজ কইরা কালা,
    রহিম লেখে, “টাকা গুছাই, বুকে বড় জ্বালা।”
    দুইটা ‘নাইওর’ আটকা পড়া টাকার সুতার ফাঁসে,
    এক আমেনা, আরেক রহিম, পরান কাইন্দা ভাসে।

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ১৫ই নভেম্বর, ২০২৫ ইং

  • মোনালিসা

    মোনালিসা

    ল্যুভরের পেট চিরে চুরি যাওয়া আলোয়,
    শত প্রহরার ফাঁক গলে চুরি গেলো মোনালিসা!
    আহা, মোনালিসা!
    আহা, সেই ভূবনমোহিনী হাসি;
    লিওর জাদু আঁকা এক অনন্ত বিস্ময়।

    চুরি আমার করারই ছিল।
    তমালিকাকে পড়াব বলে।
    তমালিকা, যে হাতের ছোঁয়ায় পৃথিবী দেখে।
    তার চোখের আলো চুরি গেছে জন্ম থেকে।

    সেদিন সন্ধ্যায় সে ফ্রেমে হাত বুলিয়ে বুঝছিল।
    খোদাই করা কাঠের শক্ত, শীতল সীমানা।
    বস্তুত তমার সন্ধ্যা রাত দিন সব সমান,
    বাতাসে শুঁকলো আদিম স্মৃতি;
    শত বছরের পুরোনো তেল আর বার্নিশের ঘ্রাণ।

    তার আঙুলের ডগা প্রথমে পথ খুঁজছিল সেই বিশাল, টানটান শূন্যতায়।
    শুধু চোখ বা চিবুক নয়, সে পড়ছিল রঙের প্রতিটি আস্তরণ,
    ব্রাশের প্রতিটি টানের শুকনো খাঁজ।
    ত্বকের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সময়ের সূক্ষ্ম ফাটল,
    যেন শুকিয়ে যাওয়া নদীর মানচিত্র।

    ​আমি তার ঠোঁটে সে রহস্যময় হাসির অপেক্ষারত।
    আপনিও আমার সাথে দেখুন।
    দেখুন, তমা, আঙুল ছুঁইয়ে মোনালিসা দেখছে।
    দেখছে কারণ তার আলো চুরি গেছে জন্ম থেকে।

    ভেবেছিলাম আমার অপরাধ সার্থক হবে,
    তমা লিসার হাসি বুঝে ঠোঁট মেলাবে।
    আমি দ্বিধায় পড়ব কার হাসি বেশি সুন্দর ভেবে।
    ​এই তো, এখনই সেটি হবে।

    তমার আঙুল পুরোনো তেলরঙের ফাটল ছুঁয়ে
    লিসার ঠোঁট বরাবর এগিয়ে নিল।
    এই তো, এই তো, আপনিও দেখুন আমার সাথে।

    হঠাৎ চাপা কান্না।
    চুরমার আমার ভাবনার আয়না।
    আপনিও কি দেখছেন?
    তমা বলল, “না, এ হাসি নয় স্পষ্ট।
    এ গুমোট চেপে আসা কান্না।
    কেন আমাকে দেখালে এই কষ্ট?”

    তমার ​চোখে জল ছিল না,
    কিন্তু কথায় ছিল তীব্র বেদনা।
    আমার চুরির মোনালিসা তমার আয়না;
    হাসি কই? সে তো কষ্ট ছাড়া কিছু দেয়না।
    আমি চেয়েছিলাম তাকে হাসি দিতে উপহার,
    আর দিলাম এক যন্ত্রণার অন্ধকার।

    লিংকন, নিউ ইয়র্ক
    ২ নভেম্বর, ২০২৫ ইং

  • সোশ্যাল মিডিয়া, নৈতিক পক্ষাঘাত এবং তথ্যের চক্র

    আপনার মনে কি প্রশ্নের উদয় হয়, কেন আপনার কাপল ছবি বেশি লাইক পায়? কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী কোনো পোস্ট কারো ফিডে যায় না। উত্তর দেওয়ার আগে কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করি।

    চুরি করা নিশ্চয়ই খারাপ কাজ। আগেকার সময়ে কোনো একটি চুরির খবর আপনি কীভাবে নিতেন? ধরা যাক, কোনো এলাকায় একটি চুরির ঘটনা ঘটলো। পরদিন সংবাদপত্রে সেটির খবর আসতো একটি নির্দিষ্ট কলামে, সম্পাদনার পর। খবরটি হতো এরকম: “গতরাতে অমুক এলাকায় একটি চুরির ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ঘটনার তদন্ত করছে।”

    কিন্তু আজকের দিনে এই খবর আমরা কীভাবে পাচ্ছি? আমরা পাচ্ছি এই ধরনের অসংখ্য প্রতিক্রিয়া:

    • “চুরি তো হবেই, দেশে আইন নেই!”
    • “এই চোরকে নিশ্চয়ই অমুক পার্টি পাঠিয়েছে।”
    • “আরে, এই গৃহস্থ লোক ভালো না, সে অমুককে ঠকিয়েছিল।”
    • “চোরও মানুষ, পেটের দায়ে চুরি করেছে।”
    • “চোরকে পিটিয়ে মেরে ফেলা উচিত! এই চল সবাই!”

    এই থেকে আপনি কী বুঝলেন? সোশ্যাল মিডিয়া “খবরের” প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি “প্রতিক্রিয়ার” প্ল্যাটফর্ম। এই প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি আপনি পাচ্ছেন বিশ্লেষণ। এটাই সবচেয়ে মজার দিক অবশ্য! আমার তালিকায় গবেষক যেমন আছেন, তেমন “ইতালিয়ান প্রবাসী বোল্ট চালক রুবেল”-ও আছেন।

    আগে যেমন আমরা খবর পড়ে নিজের উপসংহারে যেতাম যে, “চুরি খারাপ”। সোশ্যাল মিডিয়া এই কাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এটি আপনাকে “বাধ্যতামূলক আপেক্ষিকতাবাদ” (Forced Relativism)-এর মধ্যে ফেলে দেয়। আপনাকে চোরের পেটের ক্ষুধা এবং গৃহস্থের সম্পদ হারানোর বেদনা—দুটোই একযোগে অনুভব করতে বাধ্য করা হয়। আমাদের এরকম একটা স্টেটে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে যেখানে আমাদের মস্তিষ্ক বিবেচনা করতে পারছে না কোনো পক্ষ সঠিক, অথবা মনে হচ্ছে দু পক্ষই সঠিক (The Paralysis of Relativism)। এই অবস্থাকে আমরা Moral Paralysis বা নৈতিক পক্ষাঘাত বলতে পারি।

    এত গেল একটা দিক। কিন্তু আমরা এই পর্যায়ে এসে পৌঁছালাম কীভাবে? চলুন একটু পিছনে ফিরে দেখি। আমরা খবরের জন্য আগে নির্ভর করতাম দৈনিক পত্রিকার ওপর, অথবা তাৎক্ষণিক খবর পেতে টিভি চ্যানেলের ওপর। এই সিস্টেমটি কীভাবে কাজ করতো, এটি যদি বলি তাহলে কিছুটা বুঝতে সুবিধা হবে। নিউজপেপারে একটা খবর বিভিন্ন সম্পাদনার মধ্য দিয়ে আসে, এখানে দায়বদ্ধতা থাকে, এবং এটি আর্কাইভের একটা অংশ। আপনি যখন একটি নিউজপেপার কিনতেন, তখন আপনি টাকার বিনিময়ে খবর পেতেন। আপনি ছিলেন ‘গ্রাহক’। সোশ্যাল মিডিয়াতে আপনি ‘গ্রাহক’ নন; এখানে আপনিই হচ্ছেন পণ্য। ফেসবুক, টুইটার, টিকটকের আসল গ্রাহক হলো বিজ্ঞাপনদাতারা।

    এই সিস্টেমটির লক্ষ্য আপনাকে জ্ঞানী (informed) করা নয়; সিস্টেমটির লক্ষ্য আপনাকে আসক্ত (hooked) রাখা। আপনার উদ্বেগ, আপনার ক্ষোভ, আপনার দ্বিধা—এগুলোই সেই ‘টোপ’ যা দিয়ে অ্যালগরিদম আপনাকে আটকে রাখে, যাতে পরবর্তী বিজ্ঞাপনটি আপনাকে দেখানো যায়। আপনার মানসিক অস্থিরতাই তাদের ব্যবসার মূলধন।

    এছাড়াও, একটি নিউজপেপার আপনাকে এমন খবরও পড়তে বাধ্য করতো যা আপনার ভালো লাগে না। আপনি খেলার পাতা অপছন্দ করলেও আপনাকে হয়তো আন্তর্জাতিক খবরের জন্য খেলার পাতা উল্টাতে হতো। এটি আপনাকে একটি ‘সাধারণ বাস্তবতা’ বা Shared Reality-তে রাখতো। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম আপনার জন্য একটি ‘ব্যক্তিগত নরক’ বা Personal Hell তৈরি করে। আপনি যা ঘৃণা করেন, তা সে আপনার কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলে; আপনি যা বিশ্বাস করেন, শুধু সেই ধরনের তথ্যই সে আপনাকে দেখায়। এতে করে আপনি নিজের অজান্তেই উগ্রপন্থী (radicalized) হয়ে উঠছেন। সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে আপনার সমমনাদের একটি বদ্ধ ঘরে (চেম্বার) আটকে ফেলে, যেখানে বাইরের কোনো আওয়াজ (প্রতিধ্বনি) আসে না। নিউজপেপার সমাজকে একটি সাধারণ বিতর্কের জায়গা দিত; সোশ্যাল মিডিয়া সেই সমাজকে লক্ষ লক্ষ খণ্ডে বিভক্ত করে ফেলেছে।

    আমরা যদি এই দুটি মাধ্যমের ডিজাইন খেয়াল করি, একটি নিউজপেপারের একটি শেষ পাতা আছে। আপনি পড়া শেষ করে পত্রিকাটি রেখে দিতেন। আপনার মস্তিষ্ক একটি ‘কাজ শেষ’ করার অনুভূতি পেত। সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো শেষ নেই। “ইনফিনিট স্ক্রল” (Infinite Scroll) ফিচারটি কোনো কারণ ছাড়াই তৈরি করা হয়নি। আপনি স্ক্রল করতেই থাকেন এই আশায় যে পরের পোস্টটি আপনাকে কিছু একটা আনন্দ (ডোপামিন) দেবে। নিউজপেপার ছিল ‘তথ্য’ (Information); সোশ্যাল মিডিয়া হলো একটি আচরণগত ‘আসক্তি’ (Behavioral Addiction)। আজকাল “ডুম স্ক্রলিং” (Doom Scrolling) শব্দটি আমরা এই পরিস্থিতি বর্ণনা করতে ব্যবহার করি।

    এই ব্যক্তিগত জায়গা থেকে বের হয়ে আমরা একটি সামগ্রিক অবস্থাটা দেখি। আমি এখন প্রাসঙ্গিক যে বিষয় নিয়ে আলাপ করবো, সেটি হচ্ছে The Globalization of Anxiety বা উদ্বেগের বিশ্বায়ন। এটি বোঝানোর জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড মহামারী কেন এভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল? এর কারণ আমরা অনেক গ্লোবাল এখন, দুদিনের মধ্যে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে চলে যেতে পারছি বিভিন্ন রোগ বহন করে। ঠিক এই ঘটনাটি খবরের ক্ষেত্রেও হচ্ছে। এখন কী অপরাধ কম বা বেশি হচ্ছে? কিন্তু আগে আপনার উদ্বেগ আপনার ক্ষমতার পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আপনি আপনার প্রতিবেশীর বিপদে উদ্বিগ্ন হতেন, কারণ তাত্ত্বিকভাবে আপনি তাকে সাহায্য করতে পারতেন।

    কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া আপনার উদ্বেগের পরিধিকে অসীম করে দিয়েছে, অথচ আপনার ক্ষমতাকে এক বিন্দুও বাড়ায়নি। আগে ঢাকার কোনো ঘটনা হয়তো শুধু ঢাকার মানুষকেই উদ্বিগ্ন করতো। কিন্তু এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে সেই একই ঘটনা, একই তীব্রতায়, একই মুহূর্তে আমেরিকায় বসে থাকা একজন প্রবাসীকেও উদ্বিগ্ন করে তুলছে। আপনি যখন আমেরিকায় বসে ঢাকার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হচ্ছেন, সেই উদ্বেগটি সম্পূর্ণ নিষ্ফল। এই “ক্ষমতাহীন উদ্বেগ” (Powerless Anxiety) হলো সবচেয়ে ভয়াবহ মানসিক চাপ। নিউজপেপার আপনাকে খবর দিত; সোশ্যাল মিডিয়া আপনাকে সেই খবরের সাথে জড়িত মানুষগুলোর রিয়েল-টাইম আতঙ্ক, কান্না এবং ক্ষোভের সরাসরি সম্প্রচার দেখাচ্ছে। আপনি অন্যের ট্রমাতে সরাসরি প্লাগ-ইন হয়ে যাচ্ছেন, যা থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় সিস্টেম আপনাকে দিচ্ছে না।

    এতক্ষণ যা বললাম, তার কিছু পয়েন্ট যদি তুলে ধরি তাতে বোঝা যাবে মূল সমস্যা শুধু “ভুল তথ্য” বা “ফেক নিউজ” নয়। মূল সমস্যা হলো তথ্যের ধরণ, পরিমাণ এবং এর প্রতিক্রিয়ার চক্র। সমস্যাগুলো হলো:

    • ১. তথ্যের অতিবর্ষণ (Information Overload): আমাদের মস্তিষ্ক এত তথ্য একবারে প্রক্রিয়া করতে পারে না।
    • ২. আবেগের পুঁজি (Emotional Exploitation): সিস্টেমটি আমাদের ক্ষোভ, ভয় এবং উদ্বেগ থেকে লাভবান হয়।
    • ৩. নৈতিক পক্ষাঘাত: কোনো বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারার ক্লান্তি।
    • ৪. আসক্তির নকশা (Addictive Design): ইনফিনিট স্ক্রল এবং নোটিফিকেশন আমাদের এই বিশৃঙ্খল পরিবেশ থেকে বের হতে দেয় না।

    এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার কোনো সহজ বা একক সমাধান নেই। তবে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে:

    • আত্মরক্ষা হিসেবে পরিত্যাগ বা সীমিতকরণ: যদি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব আপনার মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুম বা কাজের ওপর পড়ে (যেমন হৃদরোগের উপসর্গ), তবে তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা বা কঠোরভাবে সীমিত করাই সবচেয়ে যৌক্তিক এবং সাহসী সিদ্ধান্ত।
    • সচেতন ব্যবহার: সোশ্যাল মিডিয়া “ব্রাউজ” করার জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট “ব্যবহার”-এর জন্য। অ্যালগরিদম আপনাকে যা খাওয়াতে চায় তা না দেখে, আপনি যা দেখতে চান তা সার্চ করে দেখুন। নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
    • “ধীর সংবাদ” গ্রহণ: বই পড়া, দীর্ঘ প্রবন্ধ বা সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন পড়ার অভ্যাস ফিরিয়ে আনা। এই মাধ্যমগুলো আপনাকে চিন্তা করার সময় দেয়।
    • মানসিক সীমানা নির্ধারণ: এটিই সম্ভবত সবচেয়ে যৌক্তিক দিক যে এটা মেনে নেওয়া, আপনার পক্ষে পৃথিবীর সব সমস্যা সমাধান করা বা সব বিষয়ে মতামত দেওয়া সম্ভব নয়। নিজের মানসিক শান্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া আপনার মূল বিষয় হওয়া উচিত।

    সবশেষে বলতে চাই, আমার এই বিশ্লেষণ কিন্তু কোনো খবরের বিশ্লেষণ নয়। এটি অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, এবং এর প্রভাব নিয়ে আলাপ করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের একটি সংযুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু প্রায়শই এটি আমাদের একটি বিভক্ত এবং ক্লান্ত সমাজ উপহার দিয়েছে। সংবাদপত্র আমাদের জানালার বাইরে পৃথিবী দেখাতো; সোশ্যাল মিডিয়া সেই জানালা দিয়ে পাথর ছুঁড়ে মারে এবং আমাদের প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। দিনশেষে, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ, কিন্তু যে ব্যবসায়িক মডেলের ওপর এটি দাঁড়িয়ে আছে তা নয়। আমাদের এই সিস্টেমের কাছে পরাজিত হলে চলবে না। আমাদের সচেতনভাবে নিজেদের সময়, মনোযোগ এবং মানসিক শান্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—তথ্য গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু তথ্যের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেলে চলবে না।

  • জীবন করচা

    নিউইয়র্কের আকাশটা একটা বিবর্ণ ধূসর চাদর। নভেম্বরের শেষ দিককার বাতাস স্কাইস্ক্র্যাপারের ফাঁক গলে ছুরির মতো ছুটে আসে, যা পথের ধারের সামান্য উষ্ণতাটুকুও কেড়ে নেয়। বহুদূর থেকে ভেসে আসা সাইরেনের একটানা শব্দ, ম্যানহোল থেকে ওঠা বাষ্পের মেঘ আর হলুদ ট্যাক্সির স্রোত—এইসব নিয়েই শহরের হৃদস্পন্দনটা চলে। এছাড়াও নিউইয়র্কের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। প্রায় সব মহানগরীর মতো এখানে সাবওয়ে ট্রেন আছে। গৃহহীন আছে। এই শহর গৃহহীনদের জন্য অনুকূল নয়, কিন্তু তবু তারা আছে। তেমনি একজন শন। শন—নামের আগে-পিছে আর কিছু নেই। সরকারি কাগজপত্র ব্যবহার করতে হলে হয়তো কিছু থাকত। বয়স অনুমান করা যেতে পারে চল্লিশের ঘরে। তার পরিচয় সে একজন গৃহহীন। চাকচিক্যের এই শহরে একটু এদিক-ওদিক পা ফেলতে গেলেই আপনার পরিচয় হয়ে যাবে গৃহহীন।

    ‘পে-চেক-টু-পে-চেক’ বলে একটা কথা আছে। মানে আপনি সপ্তাহে যে চেক পাবেন, তা দিয়েই পরের সপ্তাহের খরচ চালাবেন। এই ব্যবস্থার কারণে মানুষ না থেমে খেটে যায়। থামলেই এরকম শনরা তৈরি হয়। শন বসবাস করে শহরের ব্যস্ততম একটা ম্যাকডোনাল্ডসের আউটলেটে। দৈনিক ২২ ঘণ্টা খোলা থাকা এই আউটলেট থেকে তাকে বের হয়ে যেতে হয় রাত ৩টায়। কারণ এই সময়ে দোকান পরবর্তী বাইশ ঘণ্টার জন্য প্রস্তুত হয়। মদ খেয়ে এতই মাতাল থাকে সে যে, এই সময়ে তাকে বের করতে দোকানের কর্মীদের কালঘাম ছুটে যায়। এক পর্যায়ে রুটিন মাফিক সে বের হয়।

    বছরের পর বছর ধরে তার এই এক রুটিন। তার কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই। আউটলেটের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, ক্রেতা এলে হাতে ধরা কাপ বাড়িয়ে দেয়। কেউ কাপে ভাঙতি পয়সা ছুড়ে দেয়। এই দিয়ে তার একটা হ্যামবার্গার হয়ে যায়, আর বাড়তি পয়সা দিয়ে এক ক্যান বিয়ার। অবশ্য গোসলের বালাই নেই। এমনকি প্রস্রাব-পায়খানা কোথায় করবে, তারও চিন্তা নেই। মানে নিজের কাপড়চোপড় তো আছেই। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। একটা চলমান গন্ধবোমা সে। বাড়তি টাকার দরকার হলেই সাবওয়ের কোনো একটা ট্রেনে উঠে পড়লেই হলো। মানুষজন ভয়ে এক ডলার বা কোয়ার্টার ছুড়ে দেয়। তার পাশ দিয়ে বয়ে চলে জীবনের স্রোত। ব্যস্ত মানুষ, পর্যটকদের ঝাঁক, ছুটে চলা তরুণ-তরুণী। তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা, কাঁধে অদৃশ্য বোঝা। তারা শনকে দেখেও দেখে না, কারণ শন তাদের কাছে শুধু একজন মানুষ নয়, বরং তাদের নিজেদের গভীরতম ভয়ের প্রতিচ্ছবি। এই কারণেই তারা আরও দ্রুত হাঁটে, আরও জোরে কফি কাপে চুমুক দেয়—যেন গতিই তাদের পতনের হাত থেকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়।

    এসব দেখে তার মুখে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি লেগে থাকে। যেন এই শহরকে সে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে টিকে আছে বছরের পর বছর। এই শহরে তার অবস্থান অচ্ছুত, একেবারে নিচের স্তরে। তার প্রেমের দরকার হলেই, তার চেয়ে এক স্তর ওপরে থাকা, ‘পে-চেক-টু-পে-চেকে’ চলা ম্যাকডোনাল্ডসের কর্মীরা আছে। ক্যাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে সে তার যা ইচ্ছে বলে দেয়। মেয়েগুলো মুখ বুজে থাকে। “কাস্টমার ইজ অলওয়েজ রাইট”—এই কর্পোরেট পলিসিতে চলা কর্মীরা বেশি কিছু বলে না, পাছে কাস্টমারের মামলা খেয়ে না বসে। যারা অনেকদিনের পরিচিত, তারা মুখের ওপর কথা ছুড়ে দেয়। এভাবে এই মিথস্ক্রিয়ায় চলে যায় দিন, পার হয় রাত! হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত! ওহ, বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। এই শহর কখনো ঘুমায় না!


    [শনকে নিয়ে আজকের নিষিদ্ধ ইশতেহার]

    এই শহরের কোনো বিরাম নেই, আছে শুধু দেয়াল আর দেয়াল,
    এখানে আকাশ দেখলে পাপ হয়, বাতাস ছুঁলে অসুখ।
    আমি সেই অসুখ বুকে নিয়ে হাঁটি, নিউইয়র্ক—
    তোমার স্টিলের শরীরে
    আমার এই অচ্ছুত অস্তিত্বই একমাত্র সত্য কবিতার সুখ।

    তোমাদের দরকার নিরাপদ ঘর, নরম বিছানা, সপ্তা শেষে মাইনে,
    আমার ওসব কিছু নেই, আছে শুধু ফুটপাত আর তীব্র স্বাধীনতা।
    একটু ভুলের দামে তোমরা কিনে নাও সুশৃঙ্খল দাসত্ব,
    আর আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস—এক একটি নিষিদ্ধ বিদ্রোহ।

    আমাকে তোমরা করুণা করো না, করুণা করার মতো কিছু রাখিনি।
    আমার এই নোংরা শরীর, দুর্গন্ধময় অবহেলা,
    আমার হাতে ধরা কাপ, তোমাদের সভ্যতার মুখে
    ছুঁড়ে দেওয়া একরাশ তীক্ষ্ণ প্রশ্ন।

    ভালোবাসা? সে তো তোমাদের কাঁচের দেয়ালে সাজানো পুতুল,
    আমার প্রেম ওই ক্যাশ-কাউন্টারের মেয়েটির চোখে—
    এক ঝলক ঘৃণা অথবা ভয়। তা-ই সই,
    তবু তো নিখাদ, কোনো মেকি ভদ্রতার আড়ালে ঢাকা নয়।

    আমাকে স্পর্শ কোরো না, পুড়ে যাবে তোমাদের পরিপাটি অহংকার।
    এই শহর ঘুমায় না, আমিও ঘুমাই না—
    শুধু জেগে থেকে দেখি, পতনের শিল্প কতটা সুন্দর হতে পারে,
    যে পতনের তীব্র ভয় থেকে তোমরা আরও তীব্রতর হাঁটো।

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ৩রা অক্টোবর, ২০২৫ইং

  • কাঠ করাতে সম্মিলিত আসবাব অথবা কয়লা

    কাঠ করাতে সম্মিলিত আসবাব অথবা কয়লা

    আমার টেবিলে পড়ে আছে রাষ্ট্রের সেই যান্ত্রিক বিধান,
    প্রতিটি অক্ষরে তার— হিসাবী জিঘাংসা।
    আমি পড়ি উন্নয়নের আস্ফালন, শুনি যুক্তির বজ্রধ্বনি,
    আর দেখি পাহাড়ের বুকে নেমে আসা এক গানিতিক নিধান।
    তার চোখে বৃক্ষটি শুধু অনাবাদী কাঠ, এক আদিম ভুল,
    তাই লৌহ-ক্ষুধায় ছুটে আসে ইস্পাতের করাত।

    অথচ আমার কানে বাজে সেই নীরব আর্তনাদ,
    যে আর্তনাদ ঢেকে যায় স্বর্নলতার সবুজ চক্রান্তে।
    কী আশ্চর্য স্নেহের শোষণ তার!
    বন্ধুত্বের ছদ্মবেশে বাড়িয়ে দেয় রেশমি শ্বাসরোধ।

    আমার কলমে জমে ওঠে সময়ের ধ্বংসস্তূপ,
    চোখের সামনে ভাসে হারানো দিনের উপাখ্যান।
    অথচ একদিন এই পাহাড় ছিল এক মহীরুহ,
    তার স্তব্ধ সমাধিতে ধ্যানমগ্ন ছিল অনাদি কাল।
    তারই ছায়ায় বেড়ে উঠেছিল লতা—সহাবস্থানের বিশ্বাসে,
    আর আঁধার নামলে উৎসব হতো আলোর—জোনাকিদের বিন্দু-বিপ্লবে।
    রাষ্ট্রের চোখে যা ছিল শুধু উদ্বৃত্ত ভূমি,
    আমাদের চোখে ছিল এক আত্মার স্থাপত্য।

    নিয়তি দাঁড়ানো এক বিদীর্ণ বিশ্বাসের মোড়ে।
    হয়তো করাতের নকশার ত্রাস জিতে যাবে,
    পাহাড়ের বুকে নেমে আসবে পাথুরে নৈঃশব্দ্য,
    আর পড়ে থাকবে শুধু স্মৃতির শবদেহ।

    অথবা,

    এই মখমলি মৃত্যু ঠেলে জেগে উঠবে বৃক্ষের অন্তিম প্রতিরোধ,
    মাটির গভীরে উচ্চারিত হবে তার শিকড়ের শপথ।
    আঁধারের বুকে তখনও জ্বলবে কোনো একাকী জোনাকির
    ফসফরাসের সাহস—এক আলোর বিদ্রোহ।

    আমার টেবিলে পড়ে থাকে খোলা খাতা,
    আর ইতিহাসের অশ্রু দিয়ে আমি শুধু লিখি
    এক বৃক্ষের জন্য লেখা অসমাপ্ত শোকগাথা।

    নিউইয়র্ক
    ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ইং

  • ফসিল

    ফসিল

    রূপের গুণ আর আগুনে জ্বালানো প্রেম,
    পাঁচ বছরে ফসিল হতে দেখেছি।
    প্রত্নতাত্ত্বিক সন্তানসন্ততি এসে বুক খুঁড়ে দেখার আগে
    বিশ্বাস হয়নি প্রেম মরে ভূত হয়ে গেছে
    সে চার বছর নয়শো নিরানব্বই দিনে।

    ইশ!

    প্রথম সুযোগে বিদেহী আত্মার চক্ষুদান
    ফরজ-এ-কেফায়া হিসেবে
    কোনো প্রেমান্ধকে দিয়ে দেওয়া উচিত ছিল,
    যাতে জলে ডোবার আগে
    তলের খোঁজটা অন্তত সে পেতে পারে।

  • ভাঙা শৃঙ্গের গান

    ভাঙা শৃঙ্গের গান

    বিস্তীর্ণ প্রান্তর আজ বিজন, পর্যদুস্ত।
    আমার শৃঙ্গে লেগেছিল যেটুকু আকাশ, আজ ম্রিয়মাণ।
    পিঠে বসে আছে এক ধূর্ত ফসলভোগী,
    তার চোখেমুখে আমার জিগীষার অপমৃত্যু নিয়ে এক নির্লিপ্ত কৌতুক।
    পথের ধারের ডোবার জলে দেখি প্রতিবিম্ব—
    এক নিকষ আঁধারে ডুবে থাকা পরাজিত জন্তু;
    শৃঙ্গ আছে, স্পৃহা নেই।
    যে উন্মত্ততায় ভেঙেছিলাম শিকল,
    সেই শক্তি আজ তার হাতের লাগামে বন্দী এক ক্রীতদাস।

    অথচ কী এক ক্ষণপ্রভা জ্বলেছিল সেদিন!
    আদিম তাড়নায় ভেঙেছিলাম জীর্ণ দরজা।
    সামনে ছিল দুটি পথ—
    একদিকে অনিন্দ্য এক বাগানের রূপরেখা, অঙ্কুরোদ্গমের শান্ত মন্ত্র;
    আর অন্যদিকে এক আপাতরম্য হাতুড়ি, প্রলয়কাণ্ডের প্রতিজ্ঞা।
    আমি ধ্বংসের সেই কুহকেই ভুলেছিলাম নিজেকে,
    ভাবিনি ভাঙার শব্দ থামলেই নেমে আসে অনন্ত শূন্যতা।
    ভেবেছিলাম, গুঁড়িয়ে দিলেই সবকিছুর অবসান;
    বুঝিনি, শূন্য মস্তিষ্ক সয়তানের কারখানা।

    কিন্তু ভাঙা শৃঙ্গ দিয়েও মাটি চেনা যায়।
    রক্তাক্ত ক্ষুর দিয়েও আগাছা উপড়ানো যায়।
    আমি আর দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য ষাঁড় নই, হব বনমালী।
    এই পর্যদুস্ত প্রান্তরেই করব প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর,
    অধ্যবসায় দিয়ে সিঞ্চন করব সময়ের বীজ,
    আর অসীম তিতিক্ষায় আগলে রাখব শেকড়ের কচি চারা।
    একদিন এইখানে মহীরুহ হবে, তার শাশ্বত ছায়ায়
    জন্ম নেবে নব কাকলী, আর উঠবে নতুন অংশুমালী।

    লিংকন, নিউইয়র্ক
    ২৭শে সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ইং