আমাদের এই ‘সোনার বাংলা’য় সোনা ফলুক আর না ফলুক, আলমারির লকারে সোনা থাকাটা কিন্তু চাই-ই চাই। মতিঝিলের যে কেরানি ভদ্রলোকটি সারাজীবন লোকাল বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে ঝুলে অফিস করলেন, কিংবা পুরান ঢাকার যে ব্যবসায়ীটি ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ে দিয়ে গদিতে বসে দিন পার করলেন—দিনশেষে তাঁদের উভয়েরই জীবনের একমাত্র মহৎ উদ্দেশ্য হলো মেয়ের বিয়ের জন্য অন্তত বিশ ভরি সোনা জমানো। ব্যাপারটা কী জানেন? আমাদের দেশে সোনা জিনিসটা ঠিক অলংকার নয়, ওটা হলো মধ্যবিত্তের ‘লাইফ জ্যাকেট’। গুলশানের কোনো কমিউনিটি সেন্টারে নববধূর গাভর্তি গয়না দেখে আত্মীয়স্বজনরা যতটা না তার রূপের প্রশংসা করেন, তার চেয়ে ঢের বেশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবেন—যাক বাবা, মেয়েটার ভবিষ্যৎ একেবারে ‘নিশ্ছিদ্র’ হলো! অর্থনীতির বাঘা বাঘা পণ্ডিতরা যাকে বলেন ‘ডেড ক্যাপিটাল’ বা মরা পুঁজি, আমাদের খালাম্মা-চাচিদের কাছে সেটাই হলো একমাত্র ‘জীবন্ত বিমা’। সোজা কথায়, আমরা সোনা কিনি সাজতে নয়, আমরা সোনা কিনি বাঁচতে।
গয়না কেনার সময় প্যারিসের কোনো মাদাম আর আমাদের ঢাকার ভাবিদের মাথার ভেতরের ক্যালকুলেটরটা কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা নিয়মে চলে। একজন পশ্চিমা নারী যখন জুয়েলারি শপে যান, তিনি ভাবেন—”এই নেকলেসটা কি আমার ইভিনিং গাউনের সাথে মানাবে? ডিজাইনটা কি যথেষ্ট ইউনিক?” তাঁদের কাছে গয়না হলো ফ্যাশন, অনেকটা ড্রয়িংরুমের শৌখিন ল্যাম্পশেডের মতো—দেখতে সুন্দর, কিন্তু বিপদে ওটা দিয়ে পেট ভরবে না। কারণ তাঁরা জানেন, তাঁদের আসল লক্ষ্মী তো বাঁধা আছে ব্যাংকে, বিমায় আর শেয়ার বাজারে। কিন্তু আমাদের মায়েরা? তাঁরা গয়না কেনার সময় ডিজাইনের দিকে তাকান আড়চোখে, আর আসল নজরটা থাকে ওজনের কাঁটায় আর হলমার্কের সিলমোহরে। কেনার মুহূর্তেই তাঁদের মাথায় ঘুরপাক খায়—”ধরা যাক কালই যদি জামাইটা বখাটেগিরি করে তাড়িয়ে দেয় কিংবা ব্যবসা লাটে ওঠে, তবে এটা বেচে কত পাওয়া যাবে?” খাদহীন একুশ ক্যারেট সোনার প্রতি আমাদের এই যে নাড়ির টান, তা প্রমাণ করে যে আমরা গয়নাকে গয়না ভাবি না, ভাবি ‘পোর্টেবল এটিএম বুথ’—যা শাড়ির আঁচলে বেঁধে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া যেখানে খুশি নিয়ে যাওয়া যায়।
কিন্তু বাঙালির এই হাড়কাঁপানো নিরাপত্তাহীনতা এল কোত্থেকে? এর শেকড় খুঁজতে হলে আমাদের একটু টাইম মেশিনে চড়ে পিছিয়ে যেতে হবে সাড়ে তিনশো বছর আগে, সোজা মোগল সুবেদারদের আমলে। বিনয় ঘোষের ‘বাদশাহী আমল’ বইটিতে ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের আমাদের এই গোপন অসুখটার নাড়ি টিপে ধরেছেন। বার্নিয়ের সাহেব মোগল ভারতে এসে তো থ! দেখলেন, এ দেশে ‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি’ বা প্রাইভেট প্রপার্টি বলে কিচ্ছুটি নেই। যা আছে সব সম্রাটের বা সুবেদারের। আজ আপনি জমিদার, কাল সুবেদার চোখ রাঙালে আপনি পথের ভিখারি। স্থাবর সম্পত্তি বলে কিছু নেই, সবই ‘অস্থাবর’।
বার্নিয়ের লিখছেন, এই যে আজ আছি কাল নেই—এই ভয় থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষরা একটা অদ্ভুত ফন্দি আঁটল। দালান-কোঠা তো আর পকেটে করে পালানো যায় না, আর মগ জলদস্যু কিংবা মোগল পেয়াদা যেকোনো সময় তা কেড়ে নিতে পারে। তাই বুদ্ধিমান বাঙালি তার সব ধন-সম্পত্তি গলিয়ে সোনা বানিয়ে ফেলল। তারপর সেই সোনা মাটির হাঁড়িতে করে পুঁতে রাখল, নয়তো গয়না বানিয়ে বাড়ির মেয়েদের গায়ে চড়িয়ে দিল। যাতে যুদ্ধ বাধুক বা মহামারি আসুক—গয়নাটুকু নিয়ে সোজা দৌড় দেওয়া যায়। বিনয় ঘোষের মতে, আমাদের এই সোনাপ্রীতি কোনো বিলাসিতা নয় মশাই, এ হলো ইতিহাসের এক মজ্জাগত ভয় থেকে জন্মানো আত্মরক্ষার ঢাল।
মজার ব্যাপার হলো, সেই শায়েস্তা খাঁ-ও নেই, মগ দস্যুও নেই; এখন আমাদের ব্যাংক আছে, শেয়ার বাজার আছে—তবু সেই ভয়টা আমাদের জিন থেকে যায়নি। মোগল আমলে এই অভ্যাসের ফলে বাংলা হয়েছিল ‘সোনার চোরাবালি’ বা ‘Sink of Gold’। সারা দুনিয়ার সোনা এ দেশে ঢুকত বটে, মসলিন বিক্রি করে আমরা সোনা আনতাম, কিন্তু তা আর বের হতো না। টাকাটা বাজারে না খেটে সিন্দুকবন্দি হয়ে থাকত বলে এ দেশে শিল্পবিপ্লব হলো না, হলো শুধু তাঁতি আর কারিগর। আজও আমরা সেই একই তিমিরে। হাজার হাজার কোটি টাকা আমরা আলমারিতে ফেলে রেখেছি ‘নিরাপত্তা’র নামে। অথচ এই টাকাটা যদি গাজীপুর বা সাভারের কোনো কারখানায় খাটত, তবে হয়তো আমাদের ঘরের ছেলেমেয়েদের চাকরির জন্য মামা-চাচা ধরতে হতো না।
‘সোনায় সর্বনাশ’ কথাটা শুনতে কানে লাগলেও, ওটাই খাঁটি সত্য। সোনা জমিয়ে আমরা নিজেদের বড়লোক ভাবি বটে, কিন্তু আদতে আমরা হচ্ছি সেই কৃপণ যে টাকার ওপর শুয়ে থেকেও না খেয়ে মরে। বিনয় ঘোষ আর বার্নিয়েরের চশমা দিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বাঙালি নারীর ওই গয়নার বাক্সটা আসলে সৌন্দর্যের আধার নয়, ওটা হলো আমাদের কয়েক শতাব্দীর অবিশ্বাসের এক করুণ দলিল। সোনাকে যতদিন আমরা ‘গয়না’ না ভেবে ‘বিমা’ ভাবব, ততদিন আমরা সত্যিকারের ধনী হতে পারব না। এখন সময় এসেছে সোনাকে গলায় না ঝুলিয়ে, পুঁজিকে বাজারে খাটানোর—তবেই যদি আমাদের ‘সোনার বাংলা’র কপালটা সত্যি সত্যি একটু খোলে!
লিংকন, নিউইয়র্ক
২৫ শে নভেম্বর, ২০২৫ ইং
Leave a Reply