দ্বৈরথ

পড়ালেখায় পাঁঠা শ্রেণীর হওয়াতে আমাকে কালী কাকার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হল। কালী কাকা বাবার দূর সম্পর্কের আত্মীয়, থাকেন শহরের মস্ত ফ্ল্যাটে! অবশ্য গ্রাম থেকে যাওয়ার কারণে শহরের ফ্ল্যাট গুলো আমার মস্ত মস্ত ই লাগে। এর আগেও কালী কাকার বাসায় বেড়াতে গিয়েছি, কিন্তু তল্পিতল্পা গুছিয়ে এই প্রথম। কালী কাকার চৌদ্দপুরুষ জমিদার ছিলেন, জমিদারী রক্ত, চালচলনে জমিদারী ঠাটবাট।

পাশের ফ্ল্যাট অবিনাশ কাকার, তিনি জমিদার বংশের কেউ না হলেও একেবারে ফেলনা নন, প্রচুর কাঁচা পয়সার মালিক! তিনিও ঠাটবাট নিয়ে ঘোরেন। অবিনাশ কাকার সাথে কালী কাকার সাপে নেউলে সম্পর্ক, কিন্তু কালী কাকা অবিনাশ কাকার সাথে তেমন একটা যুত করতে পারেন না!

সেবার অবিনাশ কাকা একটি স্কুলের গোড়াপত্তন করে ফেললেন। দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানে গড়ে ঊঠতে লাগল, “অক্সফোর্ড স্কুল এন্ড কলেজ”, প্রাচ্যের নতুন অক্সফোর্ড বলা যায়। পত্রিকায় নতুন অক্সফোর্ডের বিজ্ঞাপন যায়। আমি দক্ষিন জানালায় বসে বসে অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ নিই। ঘ্রানেই অর্ধ ভোজন কিনা, অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ পেয়ে আমার বিদ্যাক্ষুদা চাগার দিয়ে উঠে।

এদিকে কালী কাকা থেমে নেই। মনে মনে দমে গেলেও অবিনাশ কাকাকে টেক্কা দেয়ার জন্য ফন্দি আঁটেন। সামনে মনসা পূজা, শহরের সবচেয়ে বড় পাঁঠা বলি দিয়ে তিনি অবিনাশ কাকাকে টেক্কা দেবেন! অবিনাশ কাকা যদি অক্সফোর্ড দিয়ে ইহকাল নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে কালী কাকা পাঁঠা দিয়ে ইহকাল পরকাল দুই ই সুনিশ্চিত করতে চান! তবে কালী কাকার পাঁঠা হতে হবে মস্ত বড় আর গায়ের রঙ কুচকুচে কালো।

টাকায় টাক আনে। কালী কাকার টাকায় নিজের মাথায় টাক না আনলেও টাকার ঘ্রানে কালী কাকার চারপাশে টাক মাথারা মাথা চুলকে ভিড় করেন। কালী কাকা এমনি এক টাক মাথাকে এসিস্ট্যান্ট বানিয়ে নিয়েছিলেন! পাঁঠার ঢাক ঢাক ঢোল রব পেয়ে টাক মাথা বিচলিত হন। খোঁজ খোঁজ রব রব, কিন্তু অতবড় কুচকুচে কালো পাঁঠা মিলবে কোথায়?

চারিদিক থেকে খবর আসে, কালী কাকা পাঁঠা দেখতে বের হন, কিন্তু পছন্দসই পাঁঠা মিলেনা, সবকটি দেখতে প্রমান সাইজের, কিন্তু উনার চাই ডাবল কিংবা ট্রিপল প্রমান সাইজ! খুঁজতে খুঁজতে নিরাশ কাকু হাল ছেড়ে দেবেন কিনা ভাবেন, মাথা চুলকে এসিস্ট্যান্ট বলেন, কামরুপ থেকে একটি পাঁঠা আনা যেতে পারে, কিন্তু দাম পড়বে মেলা! কাকুর চোখ চকচক করে! দামের ভাবনা কাকুর নেই, কাকুর টাকার অভাব নেই। অবিনাশকে এবার দেখিয়ে দেয়া যাবে!

দুইদিনের মাথায় গায়ে বোটকা গন্ধ নিয়ে বিশাল কুচকুচে কালো পাঁঠা হাজির। শহরের সবচেয়ে বড় পাঁঠা এবং পাঠার মালিক হিসেবে পত্রিকায় অক্সফোর্ডের বিজ্ঞাপনের পাশে কালী কাকার ছবি যায়। অক্সফোর্ডের বিজ্ঞাপনের পাশে কালী কাকার ছবি পাঁঠা সমেত হাসতে থাকে!

পাঁঠার জন্য খোঁয়াড় তৈরি হতে থাকে আমার জানালার পাশেই। অক্সফোর্ড আর আমার মাঝখানে ঢুকে যায় পাঁঠার খোঁয়াড়, আর অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ ঠেলে আমার নাকে আসতে থাকে পাঁঠার বোটকা গন্ধ। আমি জানালা বন্ধ করে দিই, অক্সফোর্ডের সব ঘ্রাণ এবারের মতো পাঁঠায় নিক!

শহরের এমাথা ওমাথা থেকে বড় পাঁঠা দেখতে মানুষের ভিড় বাড়ে। পাঁঠা সর্বভুক, কোন কিছুতেই অরুচি নেই। কাঠালপাতা, খড় ভুষি, কাপড় যা পায় তাই খাবার চেষ্টা করে। দর্শনার্থী দূর থেকে দেখে কালী কাকাকে বাহবা দেয়। একদিন এক দর্শনার্থী পাঁঠার খুব কাছ থেকে পাঠাকে পরখ করতে যায়, আর পাঁঠা উনার ধুতি মুখের কাছে পেয়ে উপাদেয় খাদ্য মনে করে কাছা ধরে টান দেয়! ভেজাল অক্সফোর্ডের ঘ্রাণ পেতে পেতে পাঁঠার অর্ধ শিক্ষায় ভেজাল প্রবেশ করে, দর্শনার্থী কে ধর্ষণ আর্তি মনে করে ইজ্জতের কাছা ধরে টান মারে পাঁঠা! দর্শনার্থী ধ্রুপদির মতো কাছার একপ্রান্ত ধরে টানাটানি করে কোনরকমে কাছাখানা হ্যাঁচকা টানে উদ্ধার করেন, যদিও ইজ্জতের কিছু অংশ পাঁঠার মুখে রয়ে যায়, আর পাঁঠা সেই অংশটি বিরস মনে জাবড়াতে থাকে!

পুজোর আর সপ্তাখানেক বাকি, সকালে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে চারিদিকে একটা চনমনে ভাব। আমি বাইরে বের হই, হাটতে হাটতে পাঁঠার খোঁয়াড়ের দিকে এগিয়ে যাই। পাঁঠার গায়ে সামান্য বৃষ্টির ছাঁট মতো লেগেছে মনে হয়, হঠাত ছাঁট লাগা অংশে আমার চোখ যায়। সেখানে কুচকুচে কালো রঙয়ের বদলে ধূসর রঙ প্রতিভাত হয়! আর পায়ের নিচে একটা কালো পানির ধারা! কালী কাকা খবর শুনে দৌড়ে আসেন। পাঠাকে ভাল করে দলাই মলাই দিয়ে স্নান করানো হয়, ইতিমধ্যে পাঁঠার গায়ে জায়গায় জায়গায় ভারত ভূখণ্ডের ম্যাপের মতো ধূসর রঙ প্রতিভাত হতে থাকে! আমাদের সকলের বুঝতে বাকি থাকেনা, টাক মাথার এজেন্ট কামাক্ষার পাঁঠার গায়ে ভেজাল কলপের প্রলেপ লাগিয়েছে! বিমর্ষ কালী কাকা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন।

Spread the love

accounting Broken Window Brooklyn Bridge economics george william plunkitt lincoln luminous rabiul hasan lincoln translation travel USA Politics কবিতা রম্য

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *