লটারী প্রাপ্তির বিড়ম্বনা

গ্রাম্য লটারীতে কালু আংকেল ভাবছেন একটা লটারী কিনবেন। না, আপনি হয়তো ভাবছেন দশ টাকার টিকেটে ত্রিশ লাখ টাকা জিতার মতো একটা ব্যাপার। আসলে এটি নিছক গ্রাম্য একটা লটারী খেলা, প্রথম পুরষ্কার ১৪ ইঞ্চি সাদাকালো টেলিভিশন। আজকাল হাতে হাতে সুপার এমোলেড ক্রিস্প স্ক্রিণের মোবাইল বা বিশাল এলইডি টিভি দেখা জেনারেশন হয়তো ভাবতে পারবেনা শুক্রবারের দুপুরে সাদাকালো টিভিতে বাংলা মুভিতে আলমগীর শাবানার ড্রামা দেখতে কেমন উপভোগ্য হতে পারে। কালু আংকেলের নিজের ভাগ্যের উপর তেমন ভরসা হয়তো ছিলোনা, তিনি আরেকটা জুয়া খেলে ফেললেন লটারি নিয়ে। ধর্মমতে এমনিতে লটারী খেলা পাপের কাজ, তার উপর জুয়া খেলা যেন পাপের উপর শোয়া পাপ। কালু আংকেলের কিছুটা প্রায়শ্চিত তো করতেই হয়। কেমনে কী হলো বিস্তারিত জানাচ্ছি ভণিতা না করে।

চন্দন কাকু গ্রামের ডাক্তার, বিপদে আপদে সবাই উনাকে পান। উনার ডিসপেনসারিতে গ্রামের মুরব্বীদের সলা-পরামর্শ আলাপ-আলোচনা শালিস-বিচার সব চলে। নাসের আংকেল উনার পাশের চেয়ারে বসে পান খেতে খেতে দাঁত খিলাচ্ছেন। উনি এলাকার মান্যগণ্য ব্যক্তিদের একজন, এলাকার সবাই সমীহ করে চলেন। কালু আংকেল হাসির ছলে নিজের বক্তব্য প্রকাশ করলেন নাসের কাকুর কাছে। বললেন, ‘ভাই দশ টাকা দ্যান, দেখি লটারীতে কী উঠে!” নাসের কাকু ও আগপিছ না ভেবে হাসতে হাসতে লুঙ্গির কোঁচ খুলে টাকার বান্ডিল বের করলেন। ছেপ দিয়ে গুণে একটা কচকচা দশ টাকা দিলেন কালু আংকেলের হাতে। সেই টাকা দিয়ে কালু আংকেল সেদিনের মতো লটারির টিকেট কিনে বাসায় ফিরলেন।

দিন গুণে গুণে লটারী ড্র’র দিন এলো। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কালু আংকেলের টিকেট প্রথম পুরষ্কার জিতে নিলেন! এরপরের ঘটনার নাটকের চেয়ে কম যায়না। উনি খুশীতে লাফাতে লাফাতে সাদাকালো টিভি কান্দে তুলে নিলেন। এদিকে নাসের কাকু দিলেন আপত্তি জানিয়ে। যেহেতু উনার টাকা দিয়ে টিকেট কেনা তাই এই টিভির দাবিদার নাসের কাকু!! এক পশলা চোটপাট হয়ে গেলো এনিয়ে। বিনাযুদ্ধে কেউ নাহি দেবে সুচাগ্র মেদেনি। চন্দন কাকুর ডিসপেনসারিতে সালিশ বসল টিভির মালিকানা কে হবে এইনিয়ে। এই পর্যায়ে আপনারাও চিন্তা করেন কাকে মালিকানা দেবেন।

আমার ছোট মাথায় তখন খেলেনি, এখনো খেলছেনা। আর এমনিতে আমরা এইসব বিচার আচারে আমরা বাচ্চারা কখনো মাথা গলাতে পারতাম না, এমন শত বিচার হয়ে গেছে আমাদের মাথার উপর দিয়ে। আক্ষরিক অর্থে মাথার উপর দিয়ে। কেমনে বুঝায় বলি, তাইলে ক্লিয়ার হবে বুঝতে। ধরেন একটা বিচার হচ্ছে, বাজারে সন্ধ্যায় এইটাও বিনোদনের অংশ। সবাই জড়ো হচ্ছে। চন্দন কাকু মাঝচেয়ারে, আশেপাশের চেয়ারগুলোতে মান্যগণ্য ব্যক্তিরা দখল করে বসেছেন। পাশের টুলে সিনিয়রটি অনুযায়ী অন্যারাও বসেছেন। যারা জায়গা পাননি তারা দাঁড়িয়ে বিচার আচার দেখেন। তো আমরা বাচ্চারা তো তো আর মুরব্বি না যে সামনের সাড়িতে গিয়ে বসব, আবার এত ছোটো ও না যে আংকেলদের কোলে গিয়ে বিচার দেখব। অগত্য সবার পিছনে দাঁড়িয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে যা দেখা যায় আরকি। মোটামুটি পিচ্চি সাইজের হওয়াতে এজন্য সবাই মাথার উপর সাইজের ই হতো। এজন্যই বললাম বিচার আচার মাথার উপর দিয়ে যেত।

কালু আংকেল ভার্সেস নাসের কাকু দখলস্বত্বে ফেরত আসি। দুপক্ষের বিস্তর গলাগলির পর সিদ্ধান্ত আসলো টিভির মালিকানা কালু কাকুর ই থাকবে। তবে উনি মুরব্বীদের বাসায় দাওয়াত খাওয়াতে হবে। উনিও রাজী হলেন। খুশী মনে সাদাকালো টিভি কান্দে নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিলেন। অবশ্য উনি উনার কথা রেখেছেন। টিভি জয়ের খুশীতে গ্রামের মুরব্বীদের দাওয়াত খাইয়েছেন। কতটাকা গেছে সেইটা জিজ্ঞেস করছেন তো আমাকে? মিয়া মস্কারী পাইছেন? আমি কী এখন উনার ঘরের খবর ও আপনাকে জানাব?!

Spread the love

accounting Broken Window Brooklyn Bridge economics george william plunkitt lincoln luminous rabiul hasan lincoln translation travel USA Politics কবিতা রম্য

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *