আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ – পর্ব ১

প্রতি চার বছর অন্তর, ক্যাপিটল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে দেশের নতুন নেতা যখন শপথবাক্য পাঠ করেন, তখন তা শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা থাকে না, বরং জর্জ ওয়াশিংটনের সময় থেকে চলে আসা গণতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। এই দৃশ্যটি বিশ্বের প্রাচীনতম গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের এক শক্তিশালী বার্তা দেয়। মঞ্চে আইনসভা (কংগ্রেস) এবং বিচার বিভাগের (সুপ্রিম কোর্ট) উপস্থিতি এই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠা করে যে, এখানকার শাসনব্যবস্থা কোনো একক ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়, বরং ক্ষমতার বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। “শাসিতের সম্মতিতেই সরকার তার ন্যায্য ক্ষমতা লাভ করে”—স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের এই বাণীটিই হলো এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।

কিন্তু এই আদর্শ চিত্রের গভীরে তাকালেই চোখে পড়ে নানা জটিলতা ও বৈপরীত্য, যা প্রশ্ন তোলে—দেশ আসলে কারা চালায়? আমেরিকার ইতিহাসে পাঁচবার এমন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন যিনি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বা ‘পপুলার ভোট’ পাননি, যা ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ নামক এক পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থার ফল। আবার, এমনও দেখা গেছে যে, দেশের জনগণ কংগ্রেসের উপর সার্বিকভাবে ক্ষুব্ধ এবং তাদের সমর্থনের হার তলানিতে, অথচ নির্বাচনে সেই কংগ্রেসেরই প্রায় সকল সদস্য বিপুল ভোটে নিজ নিজ এলাকা থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। শাসনব্যবস্থার চূড়ায় রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নয়জন বিচারপতি, যারা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নন এবং আজীবন মেয়াদের জন্য নিযুক্ত হন। এই মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি দেশের কোটি কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তৈরি করা আইন বাতিল করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন, যা গণতন্ত্রের মূল ধারণার সাথেই এক ধরনের সংঘাত তৈরি করে।

এই প্রশ্নটি নতুন নয়। ১৭৮৭ সালে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তিনি কেমন সরকার দিয়েছেন, তার সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, “একটি প্রজাতন্ত্র—যদি তোমরা তা রক্ষা করতে পারো।” এই “রক্ষা করার” চ্যালেঞ্জটিই আমেরিকার রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি। সংবিধানের প্রথম শব্দ “WE THE PEOPLE” শুনতে যতটা শক্তিশালী, তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ছিল ততটাই সীমাবদ্ধ। শুরুতে এই ‘জনগণ’-এর মধ্যে নারী, দাস, দরিদ্র মানুষ বা আমেরিকার আদিবাসীরা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। দেশটির ইতিহাস হলো সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শকে সকলের জন্য বাস্তবায়িত করার এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস।

আজকের দিনেও সাধারণ মানুষের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যাওয়ার ভয় সমাজের গভীরে প্রোথিত। ১৯৬১ সালে রাষ্ট্রপতি আইজেনহাওয়ার দেশের সামরিক বাহিনী ও প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান আঁতাত, অর্থাৎ “মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স” নিয়ে সতর্ক করেছিলেন, যা নিজেদের স্বার্থে দেশের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারত। বর্তমানে এই ভয় নতুন রূপ নিয়েছে। একদিকে যেমন অনেকে মনে করেন যে, দেশের শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তি তাদের বিপুল অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনই অন্যদিকে অনেকের বিশ্বাস যে, অনির্বাচিত সরকারি আমলা এবং প্রভাবশালী গণমাধ্যমই আসল ক্ষমতার অধিকারী। অর্থাৎ, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে একটি সাধারণ অনুভূতি হলো—জনগণের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছে।

তাহলে ক্ষমতা আসলে কোথায় কেন্দ্রীভূত? রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এর উত্তরে কয়েকটি তত্ত্বের কথা বলেন। ‘অভিজাত তত্ত্বে’র মতে, ক্ষমতা আদতে অল্পসংখ্যক ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির হাতেই কুক্ষিগত, এবং মুলত তারা ঘুরেফিরে দেশকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেখানে দিনদিন আমেরিকায় বৈষম্য প্রকট হচ্ছে এবং সাধারণ জনগণের হাতে আসলে ক্ষমতার কিছুই থাকছে না, কিন্তু সে ধণীক শ্রেণী আরো ধণী এবং ক্ষমতাবান হচ্ছে। ‘আমলাতান্ত্রিক তত্ত্বে’র দাবি, আসল ক্ষমতা লুকিয়ে আছে সরকারের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো লক্ষ লক্ষ কর্মকর্তার হাতে, যারা নীরবে দেশের নীতি নির্ধারণ করেন। এর বিপরীতে, ‘বহুত্ববাদী তত্ত্ব’ বলে যে ক্ষমতা কোনো একক গোষ্ঠীর হাতে নেই, বরং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর (যেমন পরিবেশবাদী সংগঠন, ব্যবসায়ী সমিতি বা শ্রমিক ইউনিয়ন) মধ্যে ক্ষমতার লড়াই ও দর-কষাকষির মাধ্যমেই সরকারি নীতি নির্ধারিত হয়, যা বহু মানুষকে নিজেদের কথা বলার সুযোগ করে দেয়।

তবে এর বাইরেও ক্ষমতার একটি উৎস রয়েছে, যা প্রায়শই সব হিসাবকে ওলটপালট করে দেয়। সেটি হলো ‘সামাজিক আন্দোলন তত্ত্ব’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকরা যখন কোনো একটি উদ্দেশ্য নিয়ে সংগঠিত হয়ে পথে নামে, তখন তারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার (Black Lives Matter) সামাজিক আন্দোলন ২০১৫ সাল থেকে সক্রিয় থাকলেও, ২০২০ সালে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর এই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। এটি কোনো একক নেতার দ্বারা পরিচালিত আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল বর্ণবাদ এবং পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণ-আন্দোলন। এর প্রভাবে আমেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। ফলাফলের দিক থেকে, এই আন্দোলনের চাপে আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্য ও শহরে পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার করা হয়। যেমন, পুলিশের বিপজ্জনক কৌশল (যেমন শোকহোল্ড) নিষিদ্ধ করা হয় এবং পুলিশের জবাবদিহিতা বাড়াতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। এর পাশাপাশি, সমাজের গভীরে থাকা বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয় এবং অনেক বড় বড় কর্পোরেশন তাদের নীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। এছাড়া এই ঘটনাগুলোই ফ্র্যাঙ্কলিনের সেই সতর্কবাণীকে মনে করিয়ে দেয়—প্রজাতন্ত্র কোনো উপহার নয়, এটি এমন এক অর্জন যা রক্ষা করার দায়িত্ব প্রতিটি প্রজন্মের জনগণের উপরেই বর্তায়।

Spread the love

accounting Broken Window Brooklyn Bridge economics george william plunkitt lincoln luminous rabiul hasan lincoln translation travel USA Politics কবিতা রম্য

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *