কেউ মেসির ভক্ত হতেই পারে, অথবা রোনাল্ডোর ভক্ত। কেউ ব্রাজিলের ফুটবল ফ্যান, আবার কেউ আর্জেন্টিনার। কেউ বিএনপি করে, কেউ আওয়ামীলীগ। এই ভক্তির জায়গাটায় বাংলাদেশীদের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে, ব্যাখ্যা করছি।
আপনি যদি ব্রাজিল ভক্ত হোন, ব্রাজিলের ভালো খেলা আপনাকে আনন্দিত করবে। ব্রাজিলের খারাপ খেলা আপনাকে ব্যথিত করবে। যদি সুযোগ থাকে, আপনি ব্রাজিল কীভাবে আরো ভালো করতে পারতো এই নিয়ে মতামত দেবেন, আলোচনা করবেন। সচরাচর এইটাই আদর্শ প্র্যাকটিস ভক্তি শ্রদ্ধার। তেমনিভাবে আপনি যদি বিএনপি সাপোর্ট করেন, আপনার সচরাচর যেইটা করার কথা, বিএনপির ভালো কাজের প্রশংসা করা, খারাপ কাজের সমালোচনা করা, দলের সাথে থেকে মতামত দিয়ে বা কাজ করে আরো উন্নতি করা। আপনি আওয়ামী ভক্ত হলেও একই ধরণের কাজ করা হচ্ছে ভক্তি বা সাপোর্টার হিসেবে আপনার কমন দ্বায়িত্ব।
আমরা কি এই প্র্যাকটিস দেখি? উত্তর হচ্ছে না। বরং যেইটা দেখি সেটি হচ্ছে এন্টি-ফ্যান বেইজড ধরনের সাপোর্ট। মানে আপনি ব্রাজিল সাপোর্ট করলে আপনার প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে আর্জেন্টিনাকে পঁচানো। আওয়ামীলীগ করলে বিএনপিকে পঁচানো। আওয়ামী বা বিএনপির আভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড ইত্যাদি কীভাবে চলে সেইটা এডভান্সড লেভেলের জ্ঞান, আমি সে পর্যন্ত যাবোনা। কিন্তু বেসিকভাবে বলতে গেলে আপনাদের ভক্তি অন্ধভক্ত পর্যায়ের ও নেই। অন্তত অন্ধভক্ত হলে আপনি শুধু নিজের দল নিয়েই থাকতেন। যেমন গায়ক আসিফের অন্ধভক্ত শুধু আসিফের গান ই শুনবে, এরকম। কিন্তু এন্টি-ফ্যান বেইজড নিজের দলের ভালো মন্দের চেয়ে অন্যের দলের খারাপ নিয়ে পরে থাকে।
নোম চমস্কি একটা ইন্টারভিউতে , ‘হিরোশিমা’ মুভিটি সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলছিলেন উনি মুভিটা দেখে হল থেকে বের হয়ে আধা ঘন্টা কোন কথা বলতে পারেননি যুদ্ধ এবং নিউক্লিয়ার বোমার ভয়াবহতা দেখে। এবং সেটি হয়েছি জাপানীদের বিরুদ্ধে। এই যে বিপক্ষ দলের প্রতি সম্মান, সহমর্মিতা, এই প্র্যাকটিসটা জরুরী। যে জাতি যতটা সভ্য সে জাতি তত এর চর্চা করে। বাংলাদেশীরা এই অভ্যাসটির ব্যাপারে বর্বর পর্যায়ের। এখন আমি আরেকটু বিশ্লেষণ করছি এই অভ্যাস কীভাবে আমাদের আরো পিছিয়ে দিচ্ছে।
আপনি যখন অনবরত অন্যের দিকে আংগুল তুলে তৃপ্তি পাচ্ছেন, অন্যের গর্তে পরা দেখে মজা পাচ্ছেন, কিন্তু নিজের দিকে তাকাচ্ছেন না, এতে আপনার উন্নতি করার সময়টুকু আপনি নষ্ট করছেন। আপনি যখন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বা ব্রাজিলের ৭ আপ নিয়ে ঠাট্টা করছেন তখন আপনি আপনার নিজ দলের খেলোয়ারদের নাম পর্যন্ত জানছেন না, ফুটবলের নিয়ম জানছেন না। আমি বারবার ফুটবলের উদাহরণ টেনে আনছি কারণ এটি আপনার এই সামগ্রিক এন্টি-ফ্যান বেইজকে চমৎকার ব্যাখ্যা করে।
খেলা আপনার জীবনদের একটা অংশ মাত্র, কিন্তু আপনার পরিপুর্ন চরিত্র এটি দেখিয়ে দিচ্ছে। আমরা তেমনভাবে নিজেদের সমর্থিত রাজনৈতিক দলের দোষ বা গুণ দেখার বদলে অন্য দলের গর্তে পরা দেখে হাততালি দিই। এর প্রতিফলন ঘটে আমাদের ভোট দেয়ার ক্ষেত্রেও, সচরাচর দলের কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে আমরা আরেকটা দল নিয়ে আসি ভোটে জিতিয়ে। ভাবি যে এই দল অন্য দলের চেয়ে কম খারাপ হবে। এথেকে উত্তরণের সহসা কোন লক্ষন আমরা দেখছি না। সময়ের সাথে গ্লোবালাইজেশন এর কারণে আমরা হয়তো শিখে যাব। তবে খোলা চোখে কিছু জিনিস চোখে পরেছে যা দিয়ে হয়তো পরিবর্তন শুরু করা যেতে পারে।
আমাদের স্ট্যাটিসটিকস বা পরিসংখ্যান নির্ভর হতে হবে। আর সবকিছু ডাটা বেইজের আওতায় এনে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। চট্টগ্রাম কত পার্সেন্ট অর্থের জোগান দিচ্ছে, বিনিময়ে কত পার্সেন্ট সুবিধা পাচ্ছে। দেশের ধনীক শ্রেনী কত ভাগ, ট্যাক্স কতজন দেয়। ইত্যাদি ভাবে তথ্য সংগ্রহ, বিচার বিশ্লেষন করে সিদ্ধান্ত নিলে, সেইটা মুখবাজির চেয়ে বেশী ইফেক্টিভ হবে।
তারপর আছে তর্ক আড্ডা যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে হচ্ছে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য, ডাক্তার কুনালদের মতো তার্কিকদের হাত ধরে। অথচ এখানে হয় টকশো, আনা হয় দুইদলের দুই রাজনীতিকদের যারা পরস্পর কাদা ছুড়াছুড়ি করে গঠনমূলক আলাপের বদলে। এইটা এমন হতে পারতো একজন রাজনৈতিক এবং সাথে আলোচক হিসেবে সেই ফিল্ডের একজন বিশেষজ্ঞ যিনি বিচার বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে দেবেন উন্নতি কোথায় দরকার। দুই নেতা বা দুই বুদ্ধিজীবীর পরস্পরকে মুখবাজি করে হারিয়ে দিতে চাওয়ার প্রবণতায় আসলে পরিবর্তন হচ্ছে কোথায়?
সেই সাথে প্রতিপক্ষকে সম্মান জানানোর যে প্র্যাকটিস এইটা খুব খুব জরুরী। এই ব্যাপারটা একেবারে আমাদের মধ্য থেকে উঠে গেছে। জাপানের সামুরাই যোদ্ধারা প্রতিপক্ষকে সম্মানের সাথে মৃত্যুর সুযোগ দিতো।
আরেকটা বিষয় জরুরী যেইটা উপলব্ধি করার দরকার আছে। এই দেশটি এমনকি এই উপমহাদেশের ইতিহাস দেখলে দেখা যায় এখানে থেকে সবসময়ই মাইগ্রেশন হয়েছে। দেশ ভাগ হতে হতে এমনিতে ছোট একটা জায়গায় পরিনত হয়েছে, তারমধ্যে এই জনপদের মানুষ বৈচিত্র্য একেবারে পছন্দ করেনা। আরো স্পেসিফিক বলতে গেলে ঘৃণা করে। সেই তুলনায় পশ্চিমা দেশগুলো বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানায়, কয়েকটি দেশ মিলে একটা প্যাক গড়ে তোলে। আমেরিকা যেমন পঞ্চাশটি স্টেইটের সমন্বয়ে গঠিত, যেটি শুরু হয়েছিল মাত্র তেরোটি স্টেইট নিয়ে। এবং আমেরিকায় নানা দেশ থেকে নানা কিসিমের মানুষ এসে এই ডেস্কে সমৃদ্ধ করেছে শুধু।
আপাতত এই কয়টা জিনিস নিয়ে ভাবা দরকার। লেখা লম্বা হয়ে গেছে। পড়ে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না।
Leave a Reply