আমেরিকার রাজনীতির সহজ পাঠ – পর্ব ২

মার্কিন রাজনীতি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য রাজনীতির একটি চিরায়ত সংজ্ঞা বিবেচনা করা যেতে পারে: “কে”, “কখন” এবং “কীভাবে” “কী” পায়। প্রতিটি সমাজে অর্থ, ক্ষমতা এবং মর্যাদার মতো কাঙ্ক্ষিত জিনিসগুলো সীমিত। রাজনীতি এই সীমিত সম্পদ বণ্টনের নিয়ম ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, রাজনীতি হলো একটি সমাজের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াটি মূলত চারটি বিষয়ের উপর কেন্দ্র করে গঠিত: ধারণা (Ideas), প্রতিষ্ঠান (Institutions), স্বার্থ (Interests), এবং ব্যক্তি (Individuals)।

প্রথমত, মার্কিন রাজনীতি শক্তিশালী এবং প্রভাবশালী ধারণার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। “All men are created equal” – এই বিস্ময়কর ধারণাটি দিয়ে দেশটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। এর পাশাপাশি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সীমিত সরকার, আমেরিকান স্বপ্ন এবং ঈশ্বরে বিশ্বাস—এই মৌলিক ধারণাগুলো মার্কিন সমাজকে রূপ দিয়েছে। তবে এই ধারণাগুলোর প্রত্যেকটিরই দুটি ভিন্ন দিক রয়েছে এবং এগুলোর সংজ্ঞা ও বাস্তবায়ন নিয়ে ক্রমাগত বিতর্ক বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, গণতন্ত্রের অর্থ “জনগণের শাসন” হলেও, দেশটির প্রতিষ্ঠাতারা সাধারণ মানুষের সরাসরি শাসনের বিষয়ে সন্দিহান ছিলেন। সাংবিধানিক সম্মেলনের প্রথম দিনেই একজন প্রতিনিধি বলেছিলেন, “সরকারের বিষয়ে জনগণের সম্পৃক্ততা যত কম থাকে ততই মঙ্গল।” এই মনোভাবের ফলেই মার্কিন সংবিধানে জনগণের প্রভাব সীমিত করার জন্য ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের মতো ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা এলিট বা অভিজাতদের শাসনকে গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এর বিপরীতে বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী গণআন্দোলন, যেমন নাগরিক অধিকার আন্দোলন, এই এলিটতন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করে দেশটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

দ্বিতীয়ত, রাজনীতিকে বুঝতে হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা জানা অপরিহার্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়শই নির্দিষ্ট নেতা বা ব্যক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর বেশি জোর দেন। কংগ্রেস, আদালত, আইনসভা, সরকারি দপ্তর এবং সংবাদমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন ও কাঠামোর মাধ্যমে রাজনৈতিক কার্যকলাপকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম রয়েছে, যা কিছু মানুষকে বা গোষ্ঠীকে অন্যদের চেয়ে বেশি সুবিধা দেয়। বিষয়টি একটি সাধারণ উপমা দিয়ে বোঝা যায়: শ্রেণিকক্ষে যে শিক্ষার্থী যুক্তিতে পারদর্শী, সে সুবিধা পায়, কিন্তু বাস্কেটবল কোর্টে যে শিক্ষার্থী শারীরিকভাবে দক্ষ, সুবিধা তার। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ঠিক একইভাবে কাজ করে; তাদের নিয়মকানুন নির্ধারণ করে দেয় কোন স্বার্থগুলো প্রাধান্য পাবে। তাই যেকোনো রাজনৈতিক ঘটনা বিশ্লেষণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এর পেছনে কোন প্রতিষ্ঠানগুলো জড়িত?

তৃতীয়ত, স্বার্থ রাজনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা থেকে উদ্ভূত হয়। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো (Interest groups) যেমন পরিবেশবাদী সংগঠন বা বাণিজ্যিক লবি, নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, ‘র‍্যাশনাল চয়েস থিওরি’ বা যৌক্তিক পছন্দ তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যক্তিরা যেকোনো রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব করে। আবার, রাজনীতিবিদরা প্রায়শই “সর্বাধিক মানুষের জন্য সর্বাধিক কল্যাণ” বা জনস্বার্থের কথা বলেন, কিন্তু কোনটি ‘সর্বাধিক কল্যাণ’ তা নির্ধারণ করা নিয়েই বিরোধ তৈরি হয়। আচরণগত বিজ্ঞানীরা আরও দেখিয়েছেন যে, মানুষ সবসময় যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না; প্রায়শই তারা ভুল তথ্যের সম্মুখীন হলেও নিজেদের পূর্বের বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকে, যা রাজনৈতিক আচরণকে আরও জটিল করে তোলে।

চতুর্থত, ব্যক্তি এককভাবে রাজনীতিতে এবং সমাজে বিশাল পরিবর্তন আনতে পারে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিশালতার মাঝেও একজন সাধারণ মানুষের উদ্যোগ ইতিহাস বদলে দিতে পারে। এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ মার্লা রুজিকা। মাত্র ২৫ বছর বয়সী এই তরুণী যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান ও ইরাকে গিয়ে বেসামরিক মানুষের দুর্দশা দেখে মর্মাহত হন। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি ‘সিভিক’ (CIVIC) নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। পেন্টাগনের প্রাথমিক বিরোধিতা সত্ত্বেও, তার অক্লান্ত প্রচেষ্টা কংগ্রেসের সমর্থন লাভ করে। দুঃখজনকভাবে, এক বোমা হামলায় তিনি নিহত হন, কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি আজও বিশ্বজুড়ে নিরীহ মানুষদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলে একজন ব্যক্তিও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মার্লা রুজিকার মতোই, মার্কিন রাজনীতিতে একক উদ্যোগে বিশাল পরিবর্তন এনেছেন এমন আর একজন ব্যক্তির চমৎকার উদাহরণ হলেন রোসা পার্কস (Rosa Parks)।১৯৫৫ সালের ১ ডিসেম্বর, অ্যালাবামার মন্টগোমারি শহরে, বর্ণবৈষম্য আইন (Jim Crow laws) অনুযায়ী বাসগুলো বিভক্ত ছিল। রোসা পার্কস বাসের “রঙিন” অংশে বসে থাকার সময় চালক তাকে এক শ্বেতাঙ্গ যাত্রীকে তার আসন ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। তিনি এই অন্যায্য নির্দেশ মানতে অস্বীকার করেন।তার এই একক প্রতিবাদী পদক্ষেপের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা পুরো আফ্রিকান-আমেরিকান কমিউনিটিকে আলোড়িত করে এবং এর ফলে ঐতিহাসিক ‘মন্টগোমারি বাস বয়কট’ শুরু হয়। ডক্টর মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নেতৃত্বে এই বয়কট ৩৮১ দিন ধরে চলে এবং এর ফলে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাসে বর্ণবৈষম্যকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করতে বাধ্য হয়।রোসা পার্কসের এই একটি সাহসী পদক্ষেপকে মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনের (Civil Rights Movement) অন্যতম প্রধান অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং, তার ব্যক্তিগত সাহসিকতা শুধু একটি শহরের আইন পরিবর্তন করেনি, বরং পুরো দেশে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে নতুন শক্তি জুগিয়েছে এবং মার্কিন রাজনীতি ও সমাজকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।

পরিশেষে, এই চারটি বিষয়কে সঠিকভাবে বুঝতে হলে এদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানা প্রয়োজন। স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের মতো ধারণাগুলো কেন এত শক্তিশালী? কংগ্রেস বা সুপ্রিম কোর্টের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো কেন একটি নির্দিষ্ট উপায়ে আচরণ করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে তাদের ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্যে। ইতিহাস ছাড়া কোনো ধারণা, প্রতিষ্ঠান বা জাতির বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ গতিপথ বোঝা সম্ভব নয়।

Spread the love

accounting Broken Window Brooklyn Bridge economics george william plunkitt lincoln luminous rabiul hasan lincoln translation travel USA Politics কবিতা রম্য

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *