আমেরিকান তিনটা প্রধান শাখার মধ্যে চেক এন্ড ব্যালেন্স নিয়ে লিখেছিলাম। সে তিনটা শাখার একটি হচ্ছে এক্সিকিউটিভ ব্র্যাঞ্চ এবং সে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হচ্ছেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট। আমরা সবাই জানি ব্যক্তি হিসেবে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সবচেয়ে ক্ষমতাধর, কিন্তু সে আসলে কতটা ক্ষমতাধর? আজকে সেই বিষয়ে আলোকপাত করব। আমেরিকান সর্বপ্রথম প্রেসিডেন্ট, জর্জ ওয়াশিংটন কীভাবে তেরোটি স্টেইটকে (শুরুতে আমেরিকায় মাত্র তেরোটি স্টেইট ছিল, সে গল্প আরেক পর্বে) এক করবেন এই নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। তখন সে ভ্রমন শুরু করব প্রতিটি স্টেইটে, সাথে থাকত সহকারী, স্লেইভ, কুকুর, ঘোড়া ইত্যাদি। যখন যে রাজ্যে যেতেন, সেখানকার জনতা তাকে বিপুল সংবর্দনা দিতো। কী থাকতো না সেখানে, গান, বাদ্য বাজনা ইত্যাদি ইত্যাদি এবং সেই সাথে জনগণ নিজেদের রিয়েল আমেরিকান হিসেবে অনুভব করতো!
আসল আমেরিকান আসলে কারা? প্রতিটি প্রেসিডেন্ট ভিন্নভিন্ন ভাবে এর উত্তর দিয়েছেন। আর কিছু না হোক, “মেইক আমেরিকা গ্রেইট এগেইন”, এই উক্তিটি আপনাদের মনে থাকবার কথা। প্রথম প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন পুরো জাতিকে এক করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সাথে দাস নিয়ে ভ্রমণে যাওয়া কী সেই চিন্তাকে ভায়োলেট করেনা? তার প্রায় ২৩৪ বছর পর যদি আজকে বাইডেনকে দেখি, প্রতিবার একেকজন একেকভাবে নিজেদের ক্ষমতা দেখিয়েছে। বাইডেন যেমন সাসটেইনবেল এনার্জি নিয়ে কথা বলছে, কিংবা বিভিন্ন দেশে গনতন্ত্রের পুনঃবহাল নিয়ে একশনে যাচ্ছে এই সবই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাবলে। আমরা যদি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগ দেখি, তাহলে বলতে হবে মেক্সিকান বর্ডারে দেয়াল তুলে দেয়া কিংবা পেনডেমিকের সময় ইকোনমিক রিলিফ দেয়া এসব পরে। এর আগের প্রেসিডেন্ট এর পাওয়ার হিসেবে ওবামা নতুন ধারার একটি আক্রমনের সুচনা করেন। তা হচ্ছে ড্রোন স্ট্রাইকিং। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে কাউকে শেষ করে দেয়ার জন্য একটা লেজার গাইডেড বোম মেরে দিলেই হলো। এভাবে যত আগে যাওয়া যায় আপনারা প্রতিটি প্রেসিডেন্টের খতিয়ান দেখতে পাবেন। এই পোস্টে এখন পর্যন্ত সব প্রেসিডেন্টের এক্সিকিউটিভ অর্ডার দেখা যাবে- Federal Register :: Executive Orders
মুলত প্রেসিডেন্ট তিনভাবে ক্ষমতা হাতে পায়।
১) এক্সপ্রেসড পাওয়ার-সরাসরি সংবিধানে লিখিত ভাবে।
২) ডেলিগেট পাওয়ার-কংগ্রেস থেকে প্রাপ্ত পাওয়ার।
৩) ইনহেরিট পাওয়ার অব প্রেসিডেন্ট- বা এক্সিকিউটিভ অর্ডার।
এসব কঠিন কঠিন বাক্যের দিকে না গিয়ে আমরা দেখি আসলে প্রেসিডেন্ট কী কী করতে পারে। এর আগেই বলেছিলাম প্রেসিডেন্ট হচ্ছে কমান্ডার ইন চীফ। যদিও যুদ্ধ ঘোষণা করে কংগ্রেস, কিন্তু এরপর থেকে সে যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যায় প্রেসিডেন্ট। আবার এখানে কিছুটা লুপহোল আছে। ধরুন অন্যদেশ আক্রমনের আগে কংগ্রেস সভা বসিয়ে আলাপ আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু আক্রমনটা যদি আমেরিকার উপর হয়? যেমন পার্ল হারবারে বম্বিং এর উদাহরণ দেয়া যেতে পারে ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। এসব ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট নিজেই যুদ্ধে সৈন্য নিয়োগ [ট্রুপ কল] দিতে পারে কংগ্রেসের অনুমতি না নিয়েই। তবে শর্ত হচ্ছে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে জানাতে হবে, কারণ কংগ্রেস যুদ্ধের বাজেট ঠিক করে। আমেরিকার মিলিটারি বাজেট প্রায় ৭৭৮ বিলিয়ন, যেখানে ২য় স্থানে থাকা চীনের মিলিটারি বাজেট ১৯৩ বিলিয়ন এবং ভারত, ইউকে, এবং রাশিয়া যথাক্রমে ৬৪, ৬১, ৬০ বিলিয়ন ডলারের বাজেট নিয়ে ৩য়, ৪র্থ, ও ৫ম স্থান অধিকার করে আছে। এই বিশাল বাজেটের মিলিটারির সেনাপতি হচ্ছেন প্রেসিডেন্ট। এখানে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি, হোম ডিফেন্স ইত্যাদি বাজেট আসেনি। আপনারা টিভিতে বা ইউটিউবে প্রেসিডেন্টের ভিডিও যখন দেখেন দেখবেন তার আশেপাশে ব্রিফকেইস নিয়ে একজন লোক হাটছে। এই ব্রীফকেইসের নাম হচ্ছে দ্য ফুটবল, যা হচ্ছে নিউক্লিয়ার ওয়েপন লঞ্চিং কম্বিনেশন, যা শুধুমাত্র প্রেসিডেন্টের জানা। শুধুমাত্র আমেরিকার প্রেসিডেন্ট চাইলে এককভাবে নিউক্লিয়ার ওয়েপন লঞ্চ করতে পারেন। মানে প্রেসিডেন্ট মাত্র ২০ ফুট দূরে পৃথিবীকে কয়েকবার ধুলিস্যাত করে দেয়ার মারনাস্ত্র নিয়ে ঘুরছে। এমনকি পুতিনের [Could Putin or Biden Launch Nuclear Missiles by Themselves? (bbntimes.com)] কিংবা কিম জনের ও এককভাবে নিউক্লিয়ার ওয়েপন ছোড়ার কম্বিনেশন নেই (কী জানে থাকলেও থাকতে পারে!)
সেনাপতি হিসেবে ক্ষমতার কথা তো বললাম, এরপর আসে ডিপ্লোমেসি। প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ডিপ্লোমেট। এই ক্ষমতাটি এক্সপ্রেসড পাওয়ার, মানে সরাসরি সংবিধান কর্তৃক পাওয়া। এর আওতায় বিভিন্ন দেশে দুত নিয়োগের কাজটি সরাসরি প্রেসিডেন্টকে করতে হয়। এছাড়া তাকে স্টেইট অফ ইউনিয়ন (SOTU address) বা বাৎসরিক ভাষণ দিতে হয়। আগের পোস্টে বিলে ভেটো বা সাইন করার কথা উল্লেখ করেছিলাম। প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের প্রধান ব্যুরোক্র্যাট। ক্ষমতা পাওয়া মাত্র দেখবেন প্রচুর ফেডারেল কর্মী ছাটাই হচ্ছে এবং নিয়োগ হচ্ছে। প্রতিটা প্রশাসন তার নিজস্ব লোকবল দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এবং এই নিয়োগ বা ছাটাই প্রেসিডেন্টকে করতে হয়। প্রেসিডেন্টের আরেকটি প্রধান ভূমিকা হচ্ছে সে প্রধান ইকোনমিস্ট, এবং হেড অফ স্টেইট। এছাড়া সে পার্টি লিডার ও বটে।
এতসব দ্বায়িত্ব একজনের পক্ষে কী সামলানো সম্ভব? যেহেতু এইদেশে জন্মগ্রহণ করিনি তাই এইটা নিয়ে আমার না ভাবলেও চলবে। কারণ প্রেসিডেন্ট হতে হলে তার একটা রিকুয়ারমেন্ট হচ্ছে তাকে বাই বর্ন ইউএস সিটিজেন হতে হবে। একই কথা খাটে ভাইস প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রেও। ওবামার ক্ষেত্রে ট্রাম্প ক্যাচাল লাগিয়ে প্রমান করতে ব্যর্থ হয়যে ওবামার জন্ম কেনিয়ায়! যাই হোক, দ্বায়িত্বের কথায় আসি। প্রেসিডেন্ট তার বিভিন্ন দ্বায়িত্ব পালনের জন্য আশেপাশে প্রচুর সাগরেদ বা বিশেষজ্ঞ পান। যেমন চীফ ইকোনমিস্ট হিসেবে সে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির প্রফেসরের কাছ থেকে বিভিন্ন পরামর্শ গ্রহন করেন। মানে কাজটা কঠিন না আবার সহজ ও না ধরণের আরকি।


